বিষয়বস্তুতে চলুন

বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ)/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

 এই স্থানে বলা আবশ্যক যে, যখন ঐ মৃতদেহটি থানায় আনীত হইতেছিল, সেই সময় “বিয়াম” নামক একটি লোক আসিয়া উহা দেখিয়া যান। তিনি কেন যে ঐ মৃতদেহ বিশেষ আগ্রহের সহিত দেখিতেছিলেন, তাহা জিজ্ঞাসা করায়, তিনি তাহার বিশেষ কোনরূপ সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করিতে পারেন না। কিন্তু তাঁহাকে তাঁহার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করায়, তিনি উহার উত্তর প্রদান পূর্ব্বক থানা হইতে প্রস্থান করেন।

 এই ঘটনার পর এক দিবস পূর্ব্বোক্ত ঠিকানায় একটি সামান্য লোক একখানি পত্রহস্তে গিয়া উপস্থিত হয়। যে ঘরে “বিয়াম” বসিয়াছিলেন, তথায় গিয়া আগন্তুক তাঁহার হস্তে পত্রখানি প্রদান করে। তিনিও বিনা বাক্যব্যয়ে পত্র খানি পাঠ করিতে লাগিলেন। এই সময় আগন্তুকের দৃষ্টি একখানি সুবর্ণের চিরুণির উপর পতিত হইল। উহাতে লেখা ছিল।—

“আয়েষা!

প্রণয়োপহার স্বরূপ তোমায় এই চিরুণী খানি দিলাম।

তোমারই,
হোসেন।”

 পত্রপাঠ শেষ হইলে তিনি বলিয়া উঠিলেন “আমি আয়েষাকে কোনও রূপে সাহায্য করিতে প্রস্তুত নহি। আমার অনেকগুলি টাকা কড়ি প্রভৃতি চুরি করিয়া পলায়ন করিয়াছে। আমার ইচ্ছা আছে, তাহাকে পাইলে পুলিসে দিব।”

 আগন্তুক। তবে কি আপনি তাহাকে সাহায্য করিতে একবারেই অসম্মত?

 বিয়াম। তবে কি তুমি চিঠিখানি পড়িয়াছ?

 আগ। হাঁ মহাশয়!

 বিয়াম। তথাপি আমি তোমাকে পড়িয়া শুনাইতেছি।

 এই বলিয়া তিনি পত্রখানি আগন্তুককে শুনাইয়া শুনাইয়া পাঠ করিতে লাগিলেন।

“প্রিয়তম!

 আমি তোমার নিকট হইতে পলাইয়া আসিয়া নিতান্ত অন্যায় কার্য্য করিয়াছি। তদ্ব্যতীত নানারূপ বিপদ্‌গ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছি। এখন অভাগিনীর ভিক্ষা এই যে, পত্রপাঠ লোক মারফত কিছু টাকা পাঠাইয়া দিবেন, অথবা আমাকে আপনার নিকট গমন করিতে অনুমতি করিবেন।

তোমার,
আয়েষা।”

 পত্রপাঠ শেষ হইলে “বিয়াম” জিজ্ঞাসা করিলেন “এই স্ত্রীলোকটী এখন কোথায়? তাহাকে চিঠি পত্র লিখিতে হইলে কোন্ ঠিকানায় লিখিতে হইবে?”

 আগ। তাহার ঠিকানা বলিতে আমাকে নিষেধ করিয়াছে ও বলিয়া দিয়াছে, আপনি তাহার ঠিকানা জানেন।

 বিয়াম। তুমি কে? থাক কোথায়? তোমাকে পত্র লিখিতে হইলে কোন্ ঠিকানায় লিখিব?

 আগ। আমার নাম মহম্মদ আলি। বড় ডাকঘরে আমার নামে চিঠি পাঠাইলে আমি তাহা প্রাপ্ত হইব।

 এই সময় বিয়াম হঠাৎ সাতিশয় রাগান্বিত হইয়া বলিয়া উঠিল “তুমি কে বুঝিতে পারিয়াছি।”

 আগ। আমিও তোমার সমস্ত ব্যাপার অবগত হইয়াছি।

 বিয়াম। জাল চিঠির সহিত এরূপ ভাবে আমার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করার কারণ আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যাহা হউক, তোমাকে এই নিমিত্ত শাস্তি গ্রহণ করিতে হইবে। আমার টাকা কড়ির অভাব নাই।

 আগ। দেখ হোসেন! ইহাতে তুমি যে বিশেষ কৃতকার্য্য হইবে, আমার এরূপ বোধ হয় না।

 আগন্তুকের কথা শুনিয়া হঠাৎ বিয়ামের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। কিন্তু নিমেষ মধ্যে উহা গোপন করিয়া বলিয়া উঠিল “আমার নাম হোসেন নয়। অথবা এরূপ নাম-বিশিষ্ট কোন ব্যক্তিকেও আমি জানি না।”

 আগ। আচ্ছা পরে দেখা যাইবে।

 হোসেন। যদি ভাল চাও, তাহা হইলে সাবধান। আমার নিকট আগমন করিও না। তুমি যে এই স্থান হইতে জীবিতাবস্থায় প্রস্থান করিতে সমর্থ হইতেছ, ইহাই যথেষ্ট মনে করিবে।

 আগ। হত্যাকারী! তোমাকে একদিন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিতে হইবে।

 হো। দূর হও।

 আগ। কার্য্য শেষ হইয়াছে বলিয়া আমি প্রস্থান করিতেছি। আবশ্যক হইলে এই স্থানে অবস্থিতি করিতে আমার কিছুমাত্র আপত্তি ছিল না।

 হো। শীঘ্র দূর হও। নতুবা তোমাকে পুলিসে দিব।

 আগ। আমাকে অনায়াসে পুলিসে দিতে পার। কিন্তু যদি তাহা কর, তাহা হইলে নিশ্চয় জানিও, আমি তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া ভাসমান মস্তকের রহস্য উদ্ঘাটন করিয়া দিব।

 শেষোক্ত কথা শুনিয়া হোসেন একবারে হাসিয়া উঠিল। পরে কহিল “তা বেশ। সাধ্যমত চেষ্টা করিতে আপত্তি কি?”

 আগন্তুক আর সেইস্থানে থাকা উচিত নয় ভাবিয়া উঠিয়া প্রস্থান করিলেন। স্বয়ং

 পাঠকগণের মধ্যে অনেকেই হয় ত জিজ্ঞাসা করিবেন “আগন্তুকটী কে?” আগন্তুক আর কেহই নহেন। আমি। বিয়াম বা হোসেন যে কে? কেন যে আমি তাহার, নিকট ঐরূপ ভাবে গমন করিয়াছিলাম? ও কিরূপে বা তাহার ঠিকানা অবগত হইতে পারিয়াছিলাম? তাহার বিবরণ পাঠকগণ পরে জানিতে পারিবেন।