বিষয়বস্তুতে চলুন

বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ)/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

 বাসায় প্রত্যাগমনপূর্ব্বক আহারাদি শীঘ্র শীঘ্র সমাপন করিয়া বেলা এগারটার সময় যে স্থলে মস্তকটী রক্ষিত হইযাছে সেই স্থানে গিয়া উপনীত হইলাম। দেখিলাম সেইস্থান একবারে লোকে লোকারণ্য হইয়া পড়িয়াছে। এরূপ জনতার ভিতর প্রবেশ করা নিতান্ত সহজ নহে।

 এরূপ অবস্থায় সেইস্থানে দণ্ডায়মান হইয়া কিরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে সমর্থ হইব, তাহাই ভাবিতেছি, এমন সময় একজন পুলিস-কর্ম্মচারীকে সম্মুখে দেখিতে পাইয়া তাঁহাকে সেই পত্রখানি দেখাইলাম। তিনি উহা পাঠ করিবামাত্রই আমাকে সঙ্গে করিয়া একটী ঘরের ভিতর লইয়া গেলেন। এবং আমার ইচ্ছানুসারে সংবাদপত্রের জনৈক সংবাদদাতা বলিয়া সকলের নিকট আমার পরিচয় দিলেন। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া মধ্যস্থলে একটা টেবিলের উপর সাष কাপড়ের দ্বারা আচ্ছাদিত একটা পদার্থ রহিয়াছে দেখিলাম। তিনি সেই বস্ত্রখানি উঠাইয়া ফেলিবামাত্র সেই মস্তকটী বাহির হইয়া পড়িল। আমি উহা উত্তমরূপে পরীক্ষা করিতে লাগিলাম। পরীক্ষা শেষ হইলে উহা পূর্ব্বের ন্যায় সেই বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত করিয়া পূর্ব্বোক্ত কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম,—

 “যে বালকেরা এই মস্তকটী সর্ব্বপ্রথম দেখিতে পায়,— তাহারা কোথায়?”

 কর্ম্মচারী। এখানেই আছে।

 এই বলিয়া তিনি বালকদ্বয়কে আমার সম্মুখে আনয়ন করিলেন।

 আমি তাহাদিগকে একান্তে লইয়া গিয়া তাহাদিগের নিকট সমস্ত বিষয় আনুপূর্ব্বিক শ্রবণ করিলাম। পরিশেষে তাহা দিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম—“যখন তোমরা মস্তকটী সর্ব্বপ্রথম দেখিতে পাও, তখন নদীর অবস্থা কিরূপ ছিল? জোয়ার না ভাঁটা।”

 বালকদ্বয়। ভাঁটা।

 আমি। তোমরা মস্তকটী পর্ব্বতের পাদদেশে দেখিতে পাও?

 বালকদ্বয়। হাঁ মহাশয়। আমি।

 মস্তক ব্যতীত আর কিছু দেখিতে পাইয়াছিলে?

 বালকদ্বয়। না।

 আমি। যে স্থানটীতে মস্তকটী দেখিতে পাও, আমাকে সেই স্থানটী দেখাইয়া দিতে পারিবে?

 বালকদ্বয়। হাঁ মহাশয়!

 আমি। ভাল, তোমরা এখন আপনাপন বাড়ীতে গমন পূর্ব্বক আহারাদি শেষ করিয়া সেই স্থানে গমন কর। কিন্তু সাবধান! কেহ যেন কিছু জানিতে না পারে। আমিও সেই স্থানে থাকিব।

 বালকদ্বয় তথাস্তু বলিয়া গমন করিল। এদিকে এক এক করিয়া প্রায় আট দশ জন লোক সেই মস্তকটী দেখিবার নির্মিত্ত ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল ও বহির্গত হইয়া গেল। আমি সেই টেবিলের পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিয়া সমস্তই দেখিতে লাগিলাম। এইরূপে দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া গেল। দিবা পাচটার সমর একটী স্ত্রীলোক বস্ত্রের দ্বারা আপাদমস্তক আচ্ছাদিত করিয়া সেই ঘরে প্রবেশ করিল। তাহার বয়স চল্লিশ বৎসর। আমিও বস্ত্রখানি উঠাইয়া লইলাম। স্ত্রীলোকটী অনিমেঘ নয়নে মস্তকটীর প্রতি চাহিয়া রহিল। অতি অল্পক্ষণ পরেই স্ত্রীলোকটা কাঁদিয়া ফেলিল ও দেখিতে দেখিতে মূর্চ্ছিতা হইয়া ভূতলে পতিত হইল। এরূপ অবস্থায় আমি আর স্থির পাকিতে পারিলাম না। তাহাকে ভূমি হইতে উঠাইয়া অন্য একটী ঘরে লইয়া গেলাম, ও মুখে চক্ষে জল প্রদান করিতে লাগিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে স্ত্রীলোকটীর চৈতন্য হইল। আস্তে আস্তে উঠিয়া বসিল। এই স্থানে বলা আবশুক যে, যখন স্ত্রীলোকটী মুর্চ্ছিতা হইয়া পতিত হয়, সেই সময় তাহার মস্তকের কাপড় সরিয়া যাওয়ায় তাহার কেশাবলী আমার নয়নপথে পতিত হয়। আমিও উহা দেখিয়া একবারে স্তম্ভিত হইয়া পড়ি। কারণ, দেহশূন্য মস্তকটীতে যে চুল দেখিয়াছিলাম, তাহার সহিত এই স্ত্রীলোকটীর চুলের কিছুমাত্র বিভিন্নতা নাই। উভয় মস্তকেরই কেশদাম একই রংএর এবং একই ধরণের।

 স্ত্রীলোকটী করিবার পর আমি ধীরে ধীরে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম—আপনি কি মস্তকটা চিনিতে পারিয়াছেন?”

 স্ত্রীলোক। নিশ্চয়ই! উহা আমার করার মস্তক।

 আমি। তাহা আপনি কিরূপে জানিলেন?

 স্ত্রী। তাহার চুলে।

 আমি। আপনি কি মনে করেন যে, আপনার কন্যাকে হত্যা করিলে কাহারও অভীষ্ট সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা?

 স্ত্রী। কখনই না।

 আমি। আপনার কন্যাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না?

 স্ত্রী। হাঁ, গত আট দশ সপ্তাহ হইতে

 আমি। আপনার কন্যা কি বিবাহিতা?

 স্ত্রী। না।

 আমি। তাহার চরিত্র কিরূপ ছিল?

 স্ত্রী। আমাকে মাপ করিবেন। পারিবারিক কলঙ্ক কিরূপে সর্ব্বসমক্ষে প্রকাশ করিব?

 আমি। এরূপ অবস্থায় না করিলে চলিবে না।

 স্ত্রী। আমার কন্যার চরিত্র ভাল ছিল না। কোন একটী লোক তাহার চরিত্র নষ্ট করে।

 আমি। আচ্ছা, চুল ব্যতীত অপর কোনও অঙ্গের সহিত আপনার কন্যার অঙ্গের সাদৃশ্য আছে কি?

 স্ত্রী। হাঁ, এ মস্তকটী যে আমার কন্যার, সে সম্বন্ধে আর কোন সন্দেহ নাই। চুল না থাকিলেও মস্তকটী আমি চিনিতে পারিতাম।

 আমি। আপনার কন্যার বয়স কত?

 স্ত্রী। কুড়ি বৎসর।

 আমি। বোধ হয়, আপনার ভুল হইতেছে। কারণ, মস্তকটী দেখিয়া বোধ হইতেছে, উহার বয়স চৌদ্দ পনের বৎসরের অধিক নহে।

 এইরূপ কথাবার্ত্তার পর স্ত্রীলোকটা ঘরের বাহিরে আসিয়া এক স্থানে উপবেশন করিল।

 স্ত্রীলোকটী বহির্গত হইয়া গেলে, পূর্ব্বোক্ত কর্ম্মচারী আমাকে বলিলেন,—“রহস্য ত উদ্ঘাটিত হইয়া গেল।”

 আমি। না, প্রকৃতপক্ষে উহা আরও গভীর হইয়া আসিল। ঐ স্ত্রীলোকটার ভ্রম প্রমাদ ঘটিয়াছে।

 কর্ম্ম। কেন? স্ত্রীলোকটী ত স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া গেল যে, উহা তাহার কন্যার মস্তক।

 আমি। হাঁ। কিন্তু চেষ্টা করিলে ঐরূপ আরও অনেকে আসিয়া বলিতে পারে।

 কর্ম্ম। তবে কি স্ত্রীলোকটা আমাদিগের সহিত প্রবঞ্চনা করিল?

 আমি। তাহা বলিতে পারা যায় না; পরে দেখিতে পাইবেন।

 কর্ম্ম। এক্ষণে কি করা কর্ত্তব্য?

 আমি। কোন গতিকে দেহটিকে খুঁজিয়া বাহির করাই আমাদিগের প্রধান কার্য্য।

 এই বলিয়া আমি সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলাম।