বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
এই অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইবার দুই এক দিবস পরে অন্য স্থানে গমন উপলক্ষে রাত্রি বারটার সময় রেলওয়ে ষ্টেসনের নিকট উপস্থিত হইয়াছি, এমন সময় একটী স্ত্রীলোকের উপর হঠাৎ আমার নয়নদ্বয় পতিত হইল। আমি তাহার মুখ দেখিবামাত্রই একবারে স্তম্ভিত হইয়া পড়িলাম। পরক্ষণেই প্রকৃতিস্থ হইয়া, যে দিকে ঐ স্ত্রীলোকটী দণ্ডায়মান ছিল, সেই দিকে ছুটিলাম। ইহার কারণ, যে স্ত্রীলোকটীর মৃতদেহ আমরা পূর্ব্বে প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, তাহার সহিত এই জীবিতা স্ত্রীলোকটীর কিছুমাত্র বিভিন্নতা নাই। কিছুক্ষণ এইরূপে দৌড়িয়া গিয়া কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। এদিকে একখানি গাড়ি রেল ষ্টেসন হইতে ছাড়িয়া দিল, আমি তাড়াতাড়ি ষ্টেসন মাষ্টারকে জিজ্ঞাসা করিলাম “ষ্টেসনে একটী স্ত্রীলোককে দেখিয়াছেন কি?”
ষ্টেসন-মাষ্টার। কই না।
আমাদিগের মধ্যে এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময় একটা স্ত্রীলোক সেইস্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিবামাত্রই চিনিতে পারিলাম। বলা বাহুল্য, ইনিই বলিয়াছিলেন, মৃতদেহ তাঁহার কন্যার। আমাকে দেখিয়াই তিনি বলিয়া উঠিলেন “আমার অত্যন্ত ভয় হইয়াছিল।”
আমি। আমিও ভয় পাইয়াছিলাম।
স্ত্রী। আপনি কি দেখিয়া ভীত হইয়াছিলেন?
আমি। কিছু পূর্ব্বে অন্ধকারে তোমায় ও তোমার মস্তকের চুল দেখিয়া মনে ভয়ের সঞ্চার হইতেছিল। বোধ হইতেছিল, যেন মৃতদেহ কবর হইতে উত্থিত হইয়া বিচরণ করিতেছে।
স্ত্রী। আপনি কি তাহাকে দেখিয়াছেন?
আমি। তবে কি তুমি ইহার পূর্ব্বে এই স্থানে উপস্থিত ছিলে না?
স্ত্রী। আমি এই মাত্র আসিতেছি।
আমি। গাড়ি ছাড়িবার পূর্ব্বে তুমি কি এখানে ছিলে না?
স্ত্রী।না মহাশয়।
আমি। তবেই ত গোলের কথা।
স্ত্রী। আপনি শুনিয়া আশ্চর্য্যান্বিত হইবেন যে, আমি অদ্য রাত্রিতে আমার মৃতা কন্যাকে দেখিতে পাইয়াছি।
আমি। কি! ভূত দেখিয়াছেন?
স্ত্রী। হাঁ মহাশয়।
আমি। কতক্ষণ পূর্ব্বে?
স্ত্রী। দশ মিনিটও গত হয় নাই।
আমি। কোথায়?
স্ত্রী। যখন আমি ষ্টেসনের দরজার নিকট উপস্থিত হই।
আমি। ও কিছু নয়। তোমার মনের আতঙ্ক মাত্র।
স্ত্রী। কখনই নয়।
আমি। আচ্ছা, আমাকে সঙ্গে লইয়া সেইস্থানে চল।
স্ত্রীলোকটী তথাস্তু বলিয়া আমাকে সঙ্গে লইয়া চলিতে লাগিল। অতি অল্পদূর গমন করিতে না করিতেই, বোধ হইল, যেন একটী মনুষ্য আমাদিগের অগ্রে অগ্রে গমন করিতেছে। ইহা দেখিয়া স্ত্রীলোকটা আমার নিকট সরিয়া আসিয়া আস্তে আস্তে বলিল “ওই সেই।”
আমি। কি?
স্ত্রী। ভূত।
আমি। তুমি এইস্থানে দণ্ডায়মান থাক। আমি দেখিয়া আসিতেছি—“উহা কি!”
এই বলিয়া আমি দ্রুতপদে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সেই মনুষ্য-আক্বতিও সজোরে চলিতে লাগিল। আমি যতদূর পারিলাম, তাহাকে অনুসরণ করিতে লাগিলাম। এইরূপে কিছুদূর গমন করিবার পর, আমরা উভয়ে একটী সমাধিক্ষেত্রের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলাম। আর স্থির থাকিতে না পারিয়া আমি দৌড়াইতে আরম্ভ করিলাম।
আক্বতিও তাহাই করিল। তখন আমি উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলাম “দাড়াও”। সে আমার কথায় কর্ণপাতও না করিয়া ক্রমে পলাইতে লাগিল। আমিও পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিলাম। এইরূপে কিছুদূর গমন করিবার পর, হঠাৎ তাহা অদৃশ্য হইয়া পড়িল। অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। তখন আমার পকেট হইতে ক্ষুদ্র আলোকটী বাহির করিয়া জ্বালিলাম এবং উহার সাহায্যে উত্তমরূপে ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে একটা সমাধি মন্দিরের নিকট আগমন করিয়া বোধ হইল, যেন উহার পশ্চাতে কে লুকাইয়া রহিয়াছে। আমিও একবারে উহার নিকট গিয়া উপস্থিত হইলাম। তখন একটি স্ত্রীকণ্ঠে নিম্নলিখিত কথা কয়টী মৃদুভাবে উচ্চারিত হইল।—
“মহাশয়! আপনি কেন আমার অনুসরণ করিতেছেন?”
আমি। আপনিই বা এত রাত্রিতে এখানে কি করিতেছেন?
স্বর। আমি ত কাহারও অনিষ্ট করিতেছি না।
ইহার উত্তরে আমি আরও অগ্রসর হইয়া আলোকটী উহার মুখের উপরে ধরিলাম। যাহা আমি হিতাহিত-জ্ঞানশূন্য হইয়া গেলাম লাগিল। চতুর্দ্দিক অন্ধকার দেখিতে। দেখিলাম, তাহাতে আমার মস্তক ঘুরিতে লাগিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হইয়া দেখিলাম, এই স্ত্রীলোকটীর সহিত মৃতদেহের কিছুমাত্র প্রভেদ নাই।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “তোমার নাম কি? আয়েষা!”
উত্তর আসিল- “আমার নাম যাহাই হউক, তাহাতে আপনার কি?”
আমি। তোমাকে আমার সহিত গমন করিতে হইবে।
স্ত্রী। আপনার সহিত আমি কেন যাইব? আমি কোনও দোষ করি নাই।
আমি। তোমার মাতার নিকট লইয়া যাইব।
স্ত্রী। আমি মাতার নিকট যাইতে ইচ্ছা করি না।
আমি। তোমাকে অবশ্য যাইতে হইবে।
স্ত্রী। কখনই না।
আমি। তুমি এখানে আসিয়াছ কেন?
স্ত্রী। বলিতে পারি না।
আমি। অবশ্য কোন কারণ আছে।
স্ত্রী। আপনি চলিয়া যান। আমি এই স্থানে থাকিব।
আমি। তোমাকে আমার সহিত অবশ্য যাইতে হইবে।
আমার কথা শুনিয়া স্ত্রীলোকটা সহসা উত্থিত হইল। আমার বোধ হইল, পলাইবার চেষ্টা করিবে। অতএব তাহাকে ধরিবার নিমিত্ত হাত বাড়াইলাম। কিন্তু কি সর্ব্বনাশ! বালিকা এক খানি ছুরি বাহির করিয়া আমাকে দেখাইল। আমিও বিশেষ কৌশলের সহিত তাহার হস্ত হইতে ছুরিকাখানি কাড়িয়া লইলাম ও বিলম্ব না করিয়া তাহাকে ধৃত করিলাম। সহসা এই সময় একটী বিকট চীৎকার আমাদিগের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে বালিকাও চুপ করিল। পরক্ষণেই বলিয়া উঠিল, “উহা কিসের শব্দ।”
এই কথাটি শেষ হইতে না হইতেই আমার সঙ্গিনী পূর্ব্বকথিত স্ত্রীলোকটী সেই স্থানে আসিয়া উপনীত হইল। বালিকাটাকে দেখিতে পাইয়াই জিজ্ঞাসা করিল “জীবিতা আছে ত?”
বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ) - প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৯০১).pdf/২৪ আমি। আছে।
স্ত্রী। এ আমার কন্যা।
আমি। আমারও তাহাই বোধ হয়।
কিয়ৎক্ষণ পরে আমি বলিলাম, “মৃতদেহটীর রহস্য ত দেখিতেছি, উদ্ঘাটিত হইল না!”
আমার কথা শুনিয়া বালিকা কহিল, “আমি সমস্ত অবগত আছি।”
আমি। ভাল, নিকটবর্ত্তী ঐ বৃক্ষতলে চল। সেই স্থানে তোমাদিগের নিকট সমস্ত শ্রবণ করিব।
তখন আমরা সকলে সেই বৃক্ষতলে গমন করিলাম। বলা বাহুল্য, তথায় উপস্থিত হইয়া কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিবার পর প্রবীণা স্ত্রীলোকটী বলিতে লাগিলেন, “আমার নাম হামিদা। প্রায় ২০ বৎসর অতীত হইল, কোন ভয়ঙ্কর শত্রুর হস্ত হইতে আমার একমাত্র কন্যা আরেষাকে রক্ষা করিবার অভিপ্রায়ে সাধারণে প্রকাশ করি যে, সে মরিয়া গিয়াছে। এদিকে তাহাকে দূরবর্তী একটী স্থানে কোন আত্মীয়ের নিকট প্রেরণ করা হয়। তাহার এক বৎসর পরে আমার আর একটী কন্যা হয়। তাহাকেও ঐরূপ উপায়ে রক্ষা করিবার সঙ্কল্প করিতেছি, এমন সময় হঠাৎ এক দিবস শত্রুগণ তাহাকে চুরি অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহাকে করিয়া লইয়া প্রস্থান করে। প্রাপ্ত হওয়া যায় না। এই অবস্থায় বহু দিবস গত হইয়া যায়। তাহার পর আমি আমার বড় কন্যাকে আনয়ন করিয়া তাহার সহিত এ পর্য্যন্ত নিরাপদে বসবাস করিয়া আসিতেছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একদিন সে নিরুদ্দেশ হইয়া পড়িল।
অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহাকে প্রাপ্ত হইলাম না। অবশেষে মৃতদেহটী দেখিয়া বুঝিতে পারি যে, সে আর ইহজগতে নাই। আর যে বালিকাটীকে আজ আপনি প্রাপ্ত হইয়াছেন, ও আমার দ্বিতীয়া কন্যা মেহেরউন্নিসা।” এই বলিয়া স্ত্রীলোকটী চুপ করিল।
তাহার পর মেহেরউন্নিসা বলিতে লাগিল, “শৈশবাবস্থার কথা আমার অতি সামান্যই মনে হয়। এইমাত্র মনে আছে যে, এক দিবস বাগানে একাকী বেড়াইতেছি, এমন সময় দুই জন লোক আসিয়া—আমার মুখের উপর একখানি রুমাল ফেলিয়া দেয়। আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ি। তাহার পর আমার অদৃষ্টে যে কি ঘটে, তাহা আমার মনে হয় না। বহু দিবস পরে আমি কোনও একটা থিয়েটারের দলে অভিনয় কারতেছিলাম। সেই সময় একটী লোক আমাকে তাহার কথা বলিয়া পরিচয় দিল।“
আমি। সে লোকটী কে?
বালিকা। যে দুইজন আমাকে চুরি করিয়া লইয়া আসে, এ ব্যক্তি তাহাদিগের একজন। সেও পূর্ব্বোক্ত থিয়েটারে অভিনয় করিয়া থাকে। তাহার নাম ইস্মাইল।
আমি। যখন তোমার চৈত্য হয়, তখন তুমি কেবল তাহাকেই দেখিতে পাও?
বালিকা। হাঁ মহাশয়।
আমি। তুমি যাহা যাহা অবগত আছ, বলিয়া যাও।
বা। এক দিবস অভিনয় শেষ হইবার পর আমি বিশ্রাম করিতেছি, এমন সময় “বিয়াম” নামক এক ব্যক্তি আসিয়া আমার প্রতিপালকের সহিত সাক্ষাৎ করে।
আমি। কি! “বিয়াম?”
বা। হাঁ, তাহার নাম “বিয়াম।“
আমি। সে সর্ব্ব প্রথম কাহার সহিত কথা কহিতে আরম্ভ করে? তুমি না তোমার প্রতিপালক?
বা। আমার প্রতিপালকের সহিত তাহার কথাবার্ত্তা হয়।
আমি। তখন তোমার বয়স কত?
বা। দশ বৎসর।
আমি। তোমার প্রতিপালকের সহিত তাহার যে সকল কথাবার্ত্তা হয়, তাহা তোমার মনে আছে?
বা। সমস্তই মনে আছে।
আমি। বলিয়া যাও।
বালিকা বলিতে লাগিল। “বিয়াম আমার প্রতিপালককে দেখিতে পাইয়াই বলিয়া উঠিল “পাপিষ্ঠ! এতদিনে তোমাকে প্রাপ্ত হইয়াছি।” তাহার পর আমার দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ পূর্ব্বক কহিল “আমি বালিকাটীকে চিনিতে পারিয়াছি। আমার সঙ্গে পুলিস-কর্ম্মচারিগণ আসিয়াছেন। এখনই তোমাকে তাহাদিগের হস্তে অর্পণ করিব।”
আমি। ইহার উত্তরে তোমার প্রতিপালক কি বলিলেন?
বা। সে নিতান্ত ভীত হইয়া বলিল “আমি চুরির বিষয় কিছুই অবগত নহি।”
ইহা শুনিয়া বিয়াম বলিল “তুমি মেয়েটাকে আমার হন্তে প্রদান করিবে, কি না?”
“উত্তরে আমার প্রতিপালক বলিল “ইহাতে আমি স্বীকৃত আছি। কিন্তু আপনি আমাকে পুলিসে দিতে পারিবেন না।”
“বিয়াম সম্মত হইল। কিন্তু বলিল “কাপড়গুলি ও প্রদান করিতে হইবে।”
আমি। কিসের কাপড়?
বা। তাহা বলিতে পারি না। বোধ হয়, যখন আমাকে চুরি করে, সেই সময় আমার পরিধানে যে সকল কাপড় ছিল, তাহাই।
আমি। তাহার পর?
বা। তাহার পর বিয়াম, আমার নিকট আগমন করিয়া কহিল যে, সে আমার মাতুল।আরও কহিল যে,সে আমাকে তাহার সহিত লইয়া যাইবে, এবং আমাকে নিজের কন্যার ন্যায় প্রতিপালন করিবে।
আমি। কার্য্যেও কি উহা পরিণত হয়?
বা। হাঁ মহাশয়।—আমাকে লইয়া গিয়া তাহার বাড়ীতেই রাখিয়া দেয়।
আমি। তাহার পর।
বা। এইরূপে আট বৎসর অতীত হইয়া যায়। আট বৎসর পরে অর্থাৎ গত বৎসর বিয়াম এক দিবস আমার নিকট আগমন করিয়া আমাকে বিবাহ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বলা বাহুল্য, আমি কিছুতেই তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলাম না দেখিয়া সে আমাকে যৎপরোনাস্তি তিরস্কার ও ভয় প্রদর্শন করে। এইরূপে কয়েক দিবস গত হইবার পর, আমি তাহার গৃহ পরিত্যাগ করিবার সঙ্কল্প করি ও সুযোগ পাইয়া এক দিবস সেইস্থান হইতে পলায়ন করিয়া তাহার হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করি। এক ব্যক্তি আমাকে আশ্রয় প্রদান করে, এ পর্য্যন্ত তাহার আশ্রয়েই বাস করিতেছিলাম। ইহার পর কয়েক মাস নির্বিঘ্নে অতীত হইয়া যায়। অদ্য সন্ধ্যার সময় হঠাৎ বিয়ামের সহিত সাক্ষাৎ হইল। আমাকে দেখিবামাত্রই সে পুনরায় তাহার গৃহে লইয়া যাইবার নিমিত্ত অনুরোধ করিল। বলা বাহুল্য, আমি সম্মত হইলাম না দেখিয়া সে নানারূপ ভয় প্রদর্শন করিতে লাগিল। আমিও বেগতিক দেখিয়া সেইস্থান হইতে পলায়ন পূর্ব্বক এই সমাধিক্ষেত্রে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি।”
এই বলিয়া মেহেরউন্নিসা চুপ করিল।