বিষয়বস্তুতে চলুন

বিষম ভ্রম (প্রথম অংশ)/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

 সেই দিবস রাত্রি দশটার সময় আমি একটী কাপিখানায় গমনপূর্ব্বক একটা ঘরে বসিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। প্রায় অর্দ্ধ ঘণ্টা অতীত হইতে না হইতেই বোধ হইল, জন লোক আসিয়া পার্শ্ববর্ত্তী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া কথোপকথনে নিযুক্ত হইল। বলা বাহুল্য, প্রথম ব্যক্তি বিয়াম এবং দ্বিতীয়টা ইস্‌মাইল। আমিও একটি ছিদ্রের মধ্য দিয়া তাহাদিগের কথা গুলি শ্রবণ করিতে লাগিলাম।

 বি। দেখ, ইসমাইল! আমি তোমার জ্বালায় একেবারে জ্বালাতন হইয়াছি। আর আমি কিছুমাত্র সহ্য করিব না।

 ইস। তাহার উপায় আমিও অবগত আছি।

 বি। কি?

 ইস। বালিকার মাতা এখনও জীবিতা। আর তিনি কোথায় থাকেন, তাহাও আমি অবগত আছি।

 বি। ইহা আমিও পূর্ব্বে জানিতাম।

 ইস। এখন আমি তাহার নিকট গমন করিয়া অনায়াসে সমস্ত বিষয় প্রকাশ করিয়া দিতে পারি।

 বি। তোমার যাহা ইচ্ছা, করিতে পার। আমি তোমায় আর এক পয়সাও প্রদান করিব না।

 ইস। মৃতদেহটী যে তাহার কন্যার, তাহা সে অবগত নহে।

 বি। তাহা সে উত্তমরূপে অবগত আছে!

 ইস। সে ইহাও অবগত নহে যে, তাহার কন্যা জীবিতা আছে।

 বি। তাহা তুমি জান না?

 ইস। নিশ্চয়ই জানি।

 বি। তবে তুমি আমার সহিত কোনরূপ সম্পর্ক রাখিতে ইচ্ছা কর না?

 ইস। না। আমি বোধ হয়— নুর মহম্মদের সহিত মিলিত হইব।

 বি। দেখ, ইস্‌মাইল! আমাদিগের মধ্যে বিবাদ হওয়া কি উচিত? বিশেষতঃ ইহাতে তোমার কিছুমাত্র লাভ নাই।

 ইস। বিবাদ যদি হয়, তাহা হইলে উহা তোমার দোষ।

 বি। আচ্ছা। শীঘ্রই আমি তোমাকে ২৫০ টাকা প্রদান করিব।

 ইস। ভাল।

 বি। আচ্ছা, হামিদা ও নুর মহম্মদের বিষয় তুমি কিরূপে অবগত হইতে পারিলে?

 ইস। তাহা আমি বলিব না।

 বি। দেখ, আমি হামিদার সহিত একবার সাক্ষাৎ করিতে ইচ্ছা করি। অতএব তোমায় অনুরোধ করিতেছি, সে কোথায় থাকে, তাহা আমায় বলিয়া দাও। আমি ইহার নিমিত্ত তোমায় ৫০, পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি।

 ইস। আচ্ছা, অদ্য নয়।

 বি। তা না হয়, নুর মহম্মদ কোথায় থাকে বলিয়া দাও।

 ইস। যখন ৫০ পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিবে, তখন আমি বলিব। অগ্রে বলিব না।

 বি। আচ্ছা, এই লও ৫০ টাকা।

 তখন ইসমাইল টাকাগুলি পকেটে রাখিয়া বলিল “বেশ”।

 বি। এখন নুর মহম্মদের ঠিকানা আমায় বলিয়া দাও।

 ইস। আচ্ছা, বলা যাইবে।

 বি। এখনই বল। ইস। এখন না। ২।৪ দিবস পরে।

 বি। আর তামাসা করিতে হইবে না। বলিয়া দাও।

 ইস। আমি তামাসা করিতেছি না।

 ইহা শুনিয়া বিয়াম ক্রোধে একেবারে অধৈর্য্য হইয়া পড়িল। দেখিতে দেখিতে একখানি বৃহৎ ছুরিকা বাহির করিয়া ইসমাইলের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। ইসমাইলও ছাড়িবার পাত্র নহেন। সেও এক খানি ছুরি বাহির করিয়া কহিল “সাবধান, আর অগ্রসর হইও না।”

 বিয়াম বেগতিক দেখিয়া বসিয়া বলিল “দেখ ভাই! কেন অনর্থক আমার সহিত বিবাদ করিতেছ? যাহা হইবার হইয়াছে, এখন এস, একটু কাপি পান করা যাউক।”

 এই বলিয়া কাপি ওয়ালাকে ২ পেয়ালা কাপি আনিতে আদেশ করিল। বলা বাহুল্য, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আদেশ প্রতি পালিত হইল। একটী বালক আসিয়া টেবিলের উপর দুই পেয়ালা কাপি স্থাপনপূর্ব্বক প্রস্থান করিল। এই সময় বিয়াম নিকটস্থ দেওয়ালের উপর ইস্‌মাইলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া কহিল “দেখ কেমন সুন্দর ছবিখানি।” ইহা শুনিয়া ইস্‌মাইল যেমন সেই দিকে ফিরিয়া দেখিতে লাগিল, অমনি বিয়াম একটী ছোট শিশির মধ্য হইতে ৪।৫ ফোঁটা জলীয় পদার্থ ইসমাইলের কাপিতে ঢালিয়া দিল। কিয়ৎক্ষণ পরে ইসমাইল কাপি-পেয়ালাটী হস্তে লইয়া পান করিতে যাইতেছে, এখন সময় সহসা একটী ভয়ঙ্কর শব্দ হওয়াতে, ইসমাইলের হস্তস্থিত কাপির পেয়ালাটী ভূমে পতিত হইল। এদিকে বিয়াম সেস্থান হইতে দৌড়িয়া প্রস্থান করিল। পরক্ষণেই আমি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। আমাকে দেখিবামাত্র ইসমাইল বলিয়া উঠিল “পিস্তল কি আপনি ছুড়িয়াছেন?”

 আমি। হাঁ।

 ইস। কেন?

 আমি তোমার জীবন রক্ষা করিবার নিমিত্ত।

 ইস। সে কি?

 আমি। কাপিতে বিষ মিশ্রিত করা হইয়াছিল।

 ইস। কাহার দ্বারা।

 আমি। বিয়াম যখন দেওয়ালের দিকে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহা মনে আছে।

 ইস। আছে।

 আমি। সেই সাবকাশে সে কাপিতে বিষ মিশ্রিত করিয়া দেয়।

 ইস। কি ভয়ানক।