বিষাদ সিন্ধু

উইকিসংকলন থেকে
(বিষাদ-সিন্ধু থেকে পুনর্নির্দেশিত)
Jump to navigation Jump to search







প্রিমিয়ার পাব্‌লিশিং হাউস্‌

৮, শ্যামাচরণ দে ষ্ট্রীট, কলেজ স্কোয়ার, কলিঃ

1
বিষাদ-সিন্ধু.djvu

(এই স্থানধারক প্রতিস্থাপন করতে একটি চিত্র আপলোড করুন।)

বিষাদ-সিন্ধু" প্রনেতা

সংক্ষিপ্ত জীবনী

e/و

চেতলায় অবস্থানকালে মৌলভী নাদির হোসেনের প্রথম কর লতিফুন্নেসার সহিত মোশাররফ হোসেনের বিবাহ সম্বন্ধ স্থির হয়। এ সংবাদ পিতামাতা অথবা বাড়ীর অন্ত কেহ জানিতেন না। নানা কারণে এই নির্দিষ্ট কস্তার সহিত বিবাহ না দিয়া নাদির হোসেন সাহেব দ্বিতীয় কন্ত মোসাম্মাৎ আজিজুন্নেসার সহিত তাহার বিবাহ দেন। ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দের ১৯শে মে এই বিবাহকাৰ্য্য অনুষ্ঠিত হয়। পিতৃবন্ধুর এই আচরণে মোশাররফ হোসেন অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। ইহার আট বৎস পরে তিনি পুনরায় বিবাহ করেন। তার এই নব পরিণীত স্ত্রীর শি বিবি কুলসুম। বিবি কুলম্বমের অনেকগুলি পুত্রকন্ত হইয়াছিল। { মীর মোশারক হোসেন পাঠ্যজীবন শেষ করিয়া সংসাজীবন প্রবেশ করিলেন। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় छभिमांद्रौ.cनप्प्रेआर्भि চাকরী করিয়া ছিলেন। ফরিদপুর নবাব এষ্ট্রেটে দীর্ঘকাল বাধ্য করিবার পর ধ্বংয়স্ট-১ সাল হইতে ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমাছ গজনী সাহেবদের দেলদুয়ার এষ্টেটের ম্যানেজার পদ কাৰ্য্য করিতে থাকেন। জীবনের শেষ সময় পৰ্য্যন্ত তিনি এই পরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বনিয়া শুনা যায়। J মীর মোশাররফ হোসেন, দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর কার্ল বাংলা সাহিত্য শেন করিয়া গিয়াছেন। এই সাহিত্য-সেবার মধ্য দিয়া দেশ ও সমাজের কাছে স্থার পরিচয় , সাহিত্যিক হিসাবে লে কে তাহাকে চিনিয়াছে, তার প্রতিভার পরিচয় পাইয়াছে । তিনি সময়ে সাহিত্য-সেবায় হাত দিয়াছিলেন তখন সাহিভা-সেবীদের অস্মৃতি অন্ত ছিল না । কাগজ তখন এখনকার মত প্রচুর পাওয়া যাইত ন ছাপাখানারও সংখ্যা ছিল অস্তি মুষ্টিমেয়, কোন গ্রেসে বই প দিয়া গ্রন্থকারকে ধৈৰ্য্যহার হইতে হইত। কারণ মুদ্রাযন্ত্রেক হইতে বই বাহির করা সহজ সাধ্য ছিল না। এমনি । র মোশাররফ হোসেন সাহিত্য চর্চা • له আরম্ভ করেন, তাহাও আবার স্বরে পল্লীতে থাকিয়। সুতরাং তাহাকে কত বাধা-বিয়ের মধ্য দিয়া সাহিত্যসেবা করিতে হইয়াছে, তাহ সহজেই অমুমেয় । মীর সাহেবের লিখিত পুস্তক-সংখ্যা কম নহে। ক্ষুদ্র বৃহৎ পচিশখানি বইয়ের সন্ধান এ পর্য্যন্ত পাওয়া গিয়াছে । একমাত্র “ব্লিষাদসিন্ধু”ই মীর সাহেবকে যুগ-মানব সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় করিয়া রাথিয়াছে। “বিষাদ সিন্ধু”র ‘মহরম পৰ্ব্ব বাংলা ১২৯১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। ইহার পর যথাক্রমে ১২৯৪ সালের ১লা শ্রাবণ “উদ্ধার পৰ্ব্ব’ এবং ১২৯৭ সালে “এজিদ-বধ পৰ্ব্ব” প্রকাশিত হইয়াছিল। “বিষাদ সিন্ধু” বাহির হইলে সাহিত্য সমাজে এক, তুমুল সাড়া পড়িয়া যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামপ্রাণ গুপ্ত, রামতনু লাহিড়ী প্রভৃতি তখনকার সাহিত্যিকগণ মীর সাহেবের সাহিত্য-প্রতিভাকে শত মুখে প্রশংসা করেন। এমন বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় কোন মোসলমাঃ বই লিখিতে পারেন, মীর সাহেবের “বিষাদ সিন্ধু” বাহির হইবার পূৰ্ব্বে এই ধারণা কাহারও ছিল না । পুথি সাহিত্যের প্রভাব এড়াইয়া সে যুগে যে সমস্ত মোসলমান সাহিত্যিক প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় বই লিখিতে আরম্ভ করেন, মীর মোশাররফ হোসেনকে তাছাদের মধ্যে অগ্রণী বলা যায়। মীর সাহেব “আজিজুন্নাহার” নামক একখানি মাসিক পাঠক বাহির করেন। খুব সম্ভব ইহা মোসলমান সমাজে সূৰ্ব্বপ্রথম মাৰ্মিক পত্রিক। কোথা হইতে কোন সালে ইহা সৰ্ব্ব প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল, দুঃখের বিষয়, বিস্কৃতির আঁধার যবনিক ভেদ করিয়া এখন তাহার কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। মীর সাহেব প্রভাকর গ্রামবার্তা, কুমারখালির গ্রামবাৰ্ত্ত প্রকাশিকা একৃতি তৎকালীন পত্রিকায় নিয়মিতভাবে লিখিতেন। @ 藝 মীর সাহেবের দ্বিতীয় উপাদেয় গ্রন্থ “গাজী মিয়ার বস্তানী"। বাংলা ১৩০৬ সালের আশ্বিন মাসে ৪০০ শত পৃষ্ঠার এই বৃহৎ বইখানি সৰ্ব্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। অনেকের ধারণ তৎকালীন পূৰ্ব্ব বঙ্গের কোন এক বিখ্যাত মোসলমান জমিদার পরিবারের সহিত এই বইয়ের বিষয়-বস্তুর নাকি অনেকটা সম্বন্ধ রহিয়াছে। তবে গাজী মিয় যে কে, গ্রন্থকার সে রহস্ত গোপন রাখিয়া কাজ উদ্ধার করিয়াছেন । “গাজীমিয়ার বস্তানী” উপন্যাসের ছাচে লেখা, ইহাতে নাই, এমন জিনিষ ও,বিষয় দুল্লভ। পড়িীত পড়িতে মনে হইবে আমাদের সকলকে লক্ষ্য করিয়াই বুঝি বইখানি লিখিত হইয়াছে। সমস্ত দুর্নীতি এবং অনাচারের বিরুদ্ধে গাজী মিয়। কশাঘাত করিয়াছেন। এই কশা প্রত্যেকের পিঠে পড়িয়ছে। গাজী মিয়ার “বস্তানীর” ভাষা, ভাব এবং কাহিনী বিন্যাস-কৌশল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। দুঃখের বিষয় এই অমূল্য শিক্ষামূলক বইখানির প্রকাশ বন্ধ হইয়। গিয়াছে। সমাজের তীব্র অসন্তোষ বোধ হয় ইহার কারণ। o *(్కfনামেৰ্বের “গে জীবন” “উদাসীন পথিকের মনের কথা” “মোসলেম বীরত্ব” “হজরত বেলালের জীবনী” “বিবি কুলসুম” প্রভৃতি পচিশখানি পুস্তকের প্রচার আর নাই। তিনি “আমার জীবনী" নামক এক স্ববৃহৎ আত্মজীবনী লিপ্পিয়া গিয়াছেন। ৪১৫ পৃষ্ঠা পূর্ণ ১২ খণ্ডে ইহা প্রকাশিত হইয়াছিল। ১৯০৮ খ্ৰীষ্টাব্দে প্রথম খণ্ড এবং ১৯১০ খ্ৰীঃাব্দে শেষ খণ্ড প্রকাশিত হয় । দুঃখের বিষয়, এই বইখানিও কোথাও এখী আর দেখিতে পাওয়া যায় না। মোট কথা—এক "বিষাদ সিন্ধু”-ই মীর সাহেবের সমস্ত প্রতিভ, সাহিত্য সাধনাকে জাগ্রত রাখিয়াছে। ‘বিষাদসিন্ধু”র প্রত্যেকটা তরঙ্গ-লহরী তাহার জয়গান করিতেছে। বাংলা ১৩১৮ সালে মীর মোশাররফ হোসেন পরিণত বয়সে পরলোক 'গমন করেন।

—প্রকাশক

বিষাদ-সিন্ধু

উপক্রমণিকা

একদা প্রভু মহাম্মদ সেই সময় স্বর্গীয় প্রধান দূত জিবরাইল, প্রভু মোহাম্মদের নিকট উপস্থিত হইয়া পরম কারুণিক পরমেশ্বরের আদেশবাক্য কহিয়া অন্তর্হিত হইলেন।স্বর্গীয় সৌরভে চতুর্দিক আমোদিত হইল।প্রভু মোহাম্মদ ক্ষণকাল ম্লানমুখে নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন। শিষ্যগণ তাঁহার তাদৃশ অবস্থা দেখিয়া নিতান্তই ভয়াকুল হইলেন। কী কারণে প্রভু এরূপ চিন্তিত হইলেন, কেহই তাহা কিছু স্থির করিতে না পারিয়া বিষন্ন-নয়নে তাঁহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন।পবিত্র বদনের মলিনভাব দেখিয়া সকলের নেত্রই বাষ্প-পরিপ্লুত হইল। কিন্তু কেহই জিজ্ঞাসা করিতে সাহসী হইলেন না।

প্রভু মোহাম্মদ শিষ্যগণের তাদৃশ অবস্থা দর্শনে মনের ভাব গোপন করিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোমরা হঠাৎ এরূপ দুঃখিত ও বিষাদিত হইয়া কাঁদিতেছ কেন?"

শিষ্যগণ করজোড়ে বলিতে লাগিলেন, "প্রভুর অগোচর কী আছে? ঘনাগমে কিংবা নিশাশেষে পূর্ণচন্দ্র হঠাৎ মলিনভাব ধারণ করিলে তারাদলের জ্যোতিঃ তখন কোথায় থাকে? আমরা আপনার চির-আজ্ঞাবহ। অকস্মাৎ প্রভুর পবিত্র মুখের মলিনভাব দেখিয়াই আমাদের আশঙ্কা জন্মিয়াছে। যতক্ষণ আপনার সহাস্য আস্যের ঈদৃশ বিসদৃশ ভাব বিদ্যমান থাকিবে, ততক্ষণ ততই আমাদের দুঃখবেগ পরিবর্ধিত হইবে। আমরা বেশ বুঝিয়াছি, সামান্য বাত্যাঘাতে পর্বত কম্পিত হয় নাই, সামান্য বায়ুপ্রবাহেও মহাসমুদ্রে প্রবল তরঙ্গ উত্থিত হয় নাই। প্রভো! অনুকম্পা-প্রকাশে শীঘ্র ইহার হেতু ব্যক্ত করিয়া অল্পমতি শিষ্যগণকে আশ্বস্ত করুন।"

প্রভু মোহাম্মদ নম্রভাবে কহিলেন, "তোমাদের মধ্যে কাহারো সন্তান আমার প্রাণাধিক প্রিয়তম হাসান-হোসেনের পরম শত্রু হইবে। হাসানকে বিষপান করাইয়া মারিবে এবং হোসেনকে অস্ত্রাঘাতে নিধন করিবে, তাহারই নিদর্শনস্বরূপ আজ দুই ভ্রাতা আমার নিকট সবুজ ও লাল রঙের বসন প্রার্থনা করিয়াছে।"

এই কথা শুনিয়া শিষ্যগণ নির্বাক্ হইলেন। কাহারো মুখে একটিও কথা সরিল না। তাঁহাদের কণ্ঠ ও রসনা ক্রমে শুষ্ক হইয়া আসিল। কিছুকাল পরে তাঁহারা বলিতে লাগিলেন, "প্রভুর অবিদিত কিছুই নাই। কাহার সন্তানের দ্বারা এরূপ সাংঘাতিক কার্য সংঘটিত হইবে, শুনিতে পাইলে তাহার প্রতিকারের উপায় করিতে পারি। যদি তাহা ব্যক্ত না করেন, তবে আমরা অদ্যই বিষপান করিয়া আত্মবিসর্জন করিব। যদি তাহাতে পাপগ্রস্ত হইয়া নারকী হইতে হয়, তবে সকলেই অদ্য হইতে আপন আপন পত্নীগণকে একেবারে পরিত্যাগ করিব। প্রাণ থাকিতে আর স্ত্রী-মুখ দেখিব না, স্ত্রীলোকের নামও করিব না।"

প্রভু মোহাম্মদ কহিলেন, "ভাই সকল! ঈশ্বরের নিয়োজিত কার্যে বাধা দিতে এ জগতে কাহারো সাধ্য নাই; তাঁহার কলম রদ করিতে কাহারো ক্ষমতা নাই। তাঁহার আদেশ অলঙ্ঘনীয়। তবে তোমরা-অবশ্যম্ভাবী ঘটনা স্মরণ করিয়া কেন দুঃখিত থাকিবে? নিরপরাধিনী সহধর্মিণীগণের প্রতি শাস্ত্র-বহির্ভূত কার্য করিয়া অবলাগণের মনে কেন ব্যথা দিবে? তাহাও তো মহাপাপ! তোমাদের কাহারো মনে দুঃখ হইবে বলিয়াই আমি তাহার মূল বৃত্তান্ত প্রকাশ করিতে ইতস্তত করিতেছি। নিতান্ত পক্ষে যদি শুনিতে বাসনা হইয়া থাকে, বলিতেছি-শ্রবণ কর। তোমাদের মধ্যে এই প্রিয়তম মাবিয়ার এক পুত্র জন্মিবে; সেই পুত্র জগতে এজিদ্ নামে খ্যাত হইবে; সেই এজিদ্ হাসান-হোসেনের পরম শত্রু হইয়া প্রাণবধ করাইবে। যদিও মাবিয়া এ পর্যন্ত বিবাহ করেন নাই, তথাপি সেই অসীম জগদ্বিধান জগদীশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন হইবার নহে, কখনোই হইবে না। সেই অব্যক্ত সুকৌশলসম্পন্ন অদ্বিতীয় প্রভুর আদেশ কখনোই ব্যর্থ হইবে না।"

মাবিয়া ধর্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, "জীবন থাকিতে বিবাহের নামও করিব না; নিজে ইচ্ছা করিয়া কখনো স্ত্রীলোকের মুখ পর্যন্ত দেখিব না।"

প্রভু মোহাম্মদ কহিলেন, "প্রিয় মাবিয়া! ঈশ্বরের কার্য,-তোমার মত ঈশ্বরভক্ত লোকের এরূপ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হওয়া নিতান্ত অনুচিত। তাঁহার মহিমার পার নাই, ক্ষমতার সীমা নাই, কৌশলের অন্ত নাই।" এই সকল কথার পর সকলেই আপন আপন বাটীতে চলিয়া গেলেন।

কিছুদিন পরে একদা মাবিয়া মূত্রত্যাগ করিয়া কুলুখ [১] লইয়াছেন, সেই কুলুখ এমন অসাধারণ বিষসংযুক্ত ছিল যে, তিনি বিষের যন্ত্রণায় ভূতলে গড়াগড়ি দিতে দিতে অস্থির হইয়া পড়িলেন। বন্ধুবান্ধব সকলের কর্ণেই মাবিয়ার পীড়ার সংবাদ গেল। অনেকরূপ চিকিৎসা হইল; ক্রমশ বৃদ্ধি ব্যতীত কিছুতেই যন্ত্রণার হ্রাস হইল না। মাবিয়ার জীবনের আশায় সকলেই নিরাশ হইলেন। ক্রমে ক্রমে তদ্বিষয় প্রভু মোহাম্মদের কর্ণগোচর হইল, তিনি মহাব্যস্তে মাবিয়ার নিকটে আসিয়া ঈশ্বরের নাম করিয়া বিষসংযুক্ত স্থানে ফুৎকার প্রদানে উদ্যত হইলেন। এমন সময় স্বর্গীয় দূত আসিয়া বলিলেন, "হে মোহাম্মদ, কী করিতেছ? সাবধান! সাবধান! ঈশ্বরের নাম করিয়া মন্ত্রপূত করিয়ো না। এ সকলই ঈশ্বরের লীলা। তোমার মন্ত্রে মাবিয়া কখনোই আরোগ্যলাভ করিবে না। সাবধান! ইহার সমুচিত ঔষধ স্ত্রী-সহবাস। স্ত্রী-সহবাসমাত্রেই মাবিয়া বিষম বিষ-যন্ত্রণা হইতে মুক্তিলাভ করিবে। উহা ব্যতীত এ বিষের যন্ত্রণা নিবারণের ঔষধ জগতে আর দ্বিতীয় নাই।" এই কথা বলিয়া স্বর্গীয় দূত অন্তর্হিত হইলেন। এমন সময় স্বর্গীয় দূত আসিয়া বলিলেন, "হে মোহাম্মদ, কী করিতেছ? সাবধান! সাবধান! ঈশ্বরের নাম করিয়া মন্ত্রপূত করিয়ো না। এ সকলই ঈশ্বরের লীলা। তোমার মন্ত্রে মাবিয়া কখনোই আরোগ্যলাভ করিবে না। সাবধান! ইহার সমুচিত ঔষধ স্ত্রী-সহবাস। স্ত্রী-সহবাসমাত্রেই মাবিয়া বিষম বিষ-যন্ত্রণা হইতে মুক্তিলাভ করিবে। উহা ব্যতীত এ বিষের যন্ত্রণা নিবারণের ঔষধ জগতে আর দ্বিতীয় নাই।" এই কথা বলিয়া স্বর্গীয় দূত অন্তর্হিত হইলেন।

প্রভু মোহাম্মদ শিষ্যগণকে বলিতে লাগিলেন, "ভাই সকল! এ রোগের ঔষধ নাই। ইহজগতে ইহার উপযুক্ত চিকিৎসা নাই। একমাত্র উপায় স্ত্রী-সহবাস। যদি মাবিয়া স্ত্রী-সহবাস করিতে সম্মত হন, তবেই প্রাণরা হইতে পারে।" মাবিয়া স্ত্রী-সহবাসে অসম্মত হইলেন। 'আত্মহত্যা মহাপাপ' প্রভু কর্তৃক এই উপদেশ শুনিতে লাগিলেন। পরিশেষে সাব্যস্ত হইল যে, অশীতিবর্ষীয়া কোন বৃদ্ধা স্ত্রীকে শাস্ত্রানুসারে গ্রহণ করিয়া তাহার সহিত সহবাস করিবেন। কার্যেও তাহাই ঘটিল। বিষম রোগ হইতে মাবিয়া মুক্ত হইলেন। জীবন রক্ষা হইল।

অসীম করুণাময় পরমেশ্বরের কৌশলের কণামাত্র বুঝিয়া উঠা মানবপ্রকৃতির সাধ্য নহে। সেই অশীতিবর্ষীয়া বৃদ্ধা স্ত্রী কালক্রমে গর্ভবতী হইয়া যথাসময়ে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন। মাবিয়া পূর্ব হইতে স্থিরসঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে, যদি পুত্র হয়, তখনই তাহাকে মারিয়া ফেলিবেন; কিন্তু পুত্রের সুকোমল বদনমণ্ডলের প্রতি একবার নয়ন-গোচর করিবামাত্রই বৈরীভাব অন্তর হইতে একেবারে তিরোহিত হইল। হৃদয়ে সুমধুর বাৎসল্যভাবের আবির্ভাব হইয়া তাঁহার মন আকর্ষণ করিল। তখন পুত্রের প্রাণ হরণ করিবেন কি, নিজেই পুত্রের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। আপন প্রাণ হইতেও তিনি এজিদ্কে অধিক ভালবাসিতে লাগিলেন।

বয়োবৃদ্ধির সহিত ভালবাসাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। কিন্তু সময়ে সময়ে সেই নিদারুণ হৃদয়বিদারক বাক্য মনে করিয়া নিতান্তই দুঃখিত হইতেন। কিছুদিন পরে মাবিয়া দামেস্ক নগরে স্থায়ীরূপে বাস করিবার বাসনা প্রভু মোহাম্মদ ও মাননীয় আলীর নিকটে প্রকাশ করিয়া অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। আরো বলিলেন, "এজিদের কথা আমি ভুলি নাই। হাসান-হোসেনের নিকট হইতে তাহাকে দূরে রাখিবার অভিলাষেই আমি মদিনা পরিত্যাগ করিতে সঙ্কল্প করিতেছি।"

মাননীয় আলী সরলহৃদয়ে সন্তুষ্টচিত্তে জ্ঞাতি-ভ্রাতা মাবিয়ার প্রার্থনা গ্রাহ্য করিয়া নিজ অধিকৃত দামেস্ক নগর তাঁহাকে অর্পণ করিলেন। প্রভু মোহাম্মদ কহিলেন, "মাবিয়া দামেস্ক কেন, এই জগৎ হইতে অন্য জগতে গেলেও ঈশ্বরের বাক্য লঙ্ঘন হইবে না।"

মাবিয়া লজ্জিত হইলেন, কিন্তু পূর্বসঙ্কল্প পরিত্যাগ করিলেন না। অল্পদিবসের মধ্যে তিনি সপরিবারে মদিনা পরিত্যাগ করিয়া দামেস্ক নগরে গমন করিলেন এবং তত্রত্য রাজসিংহাসনে উপবেশন করিয়া প্রজাপালন ও ঈশ্বরের উপাসনায় অধিকাংশ সময় যাপন করিতে লাগিলেন।

এদিকে প্রভু মোহাম্মদ হিজরি ১১ সনের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার বেলা সপ্তম ঘটিকার সময় পবিত্র-ভূমি মদিনায় পবিত্র দেহ রাখিয়া স্বর্গবাসী হইলেন। প্রভুর দেহত্যাগের ছয় মাস পরে বিবি ফাতেমা (প্রভুকন্যা, হাসান-হোসেনের জননী, মহাবীর আলীর সহধর্মিণী) হিজরি ১১ সনে পুত্র ও স্বামী রাখিয়া জান্নাত (বেহেশ্তের নাম) বাসিনী হইলেন। মহাবীর হজরত আলী হিজরি ৪০ সনের রমজান মাসের চতুর্থ দিবস রবিবারে দেহত্যাগ করেন। তৎপরেই মহামান্য ইমাম হাসান মদিনার সিংহাসনে উপবেশন করিয়া ধর্মানুসারে রাজ্যপালন করিতে লাগিলেন। দামেস্ক নগরে এজিদ্ বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে পরিবর্ণিত ঘটনা শুরু হইল।


স্বর্গের নাম

  1. কুলুখ-ঢিল, পানির পরিবর্তে ঢিল ব্যবহার করা শাস্ত্রসঙ্গত