বিসূচিকার নিগূঢ় তত্ত্ব/বিসূচিকা রোগের ইতিহাস
বিসূচিকা রোগের ইতিহাস।
অন্যান্য রোগ অপেক্ষা যদিও এক্ষণে ওলাউঠা রোগ অতিশয় ভয়ানক, তথাপি আমরা নিশ্চয় বলিতে পারি না যে, বঙ্গদেশে ইহার আবির্ভাব অধিক দিবস হইয়াছে। কারণ বসন্তাদি রোগ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য যেমন অতি প্রাচীন কালাবধি ইহাদিগের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণকে পূজা করিবার রীতি প্রচলিত আছে, ওলাউঠা রোগের তেমন কোন দেবতার পূজাদি দৃষ্টিগোচর হয় না।
১৮১৭ খৃঃ অব্দে যশোহর নগরে ইহার প্রথম আবির্ভাব হয়। পরে তথা হইতে ক্রমশঃ সমুদায় ভারতবর্ষে বিস্তৃত হয়। কেবল ভারতবর্ষই নহে, অধুনা দূরবর্তী সমুদ্র পারস্থ ইংলণ্ড দেশও ইহাদ্বারা আক্রান্ত হইয়াছে। ইতি পূর্ব্বে সেখানকার অধিবাসী গণ ইহার নাম পর্য্যন্ত ও অবগত ছিলেন না, এক্ষণে শত শত লোক এই রোগ দ্বারা সর্ব্বদা আক্রান্ত হইয়া শমন সদনে গমন করিতেছে। আমরা সর্ব্বদা দেখিতে পাই যে, কোন নগরে বা গ্রামে ইহা প্রথম প্রকাশ পাইবার পূর্ব্বে তথায় এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তি বা তাহার বস্ত্রাদি অবশ্যই কোন না কোন প্রকারে উপস্থিত হয়। এবং ইহা আরও দেখা যায় যে, যেখানে ও রোগ কখন জ্ঞাত হয় নাই সেস্থানে যাহাদিগের এই রোগাক্রান্ত বক্তির বা তাহার বস্ত্রাদির সহিত কোন রূপে সংসর্গ হয়, প্রায় তাহাদিগের মধ্যেই ওলাউঠা প্রথমে প্রকাশ পায়। ইহা নিশ্চয় হইয়াছে যে, যেনগরে গ্রামে বা গৃহে কখনও এরোগ হয় নাই তথায় যদি এই রোগাক্রান্ত কোন ব্যক্তি অথবা অল্প দিন মধ্যে এই রোগ মুক্ত কোন ব্যক্তি অথবা তাহার বস্ত্রাদি তথায় আনীত হয়, তবে এই সংস্রবে উক্ত নগরে গ্রামে বা গৃহে এই রোগের আবির্ভাব হয়। এবং এজন্যই রুসিয়াতে যখন এই রোগ প্রথম আগমন করে তখন রুসিয়ার সম্রাট এবং তাহার পারিষদগণ এক উচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত বৃহৎ প্রাসাদে দুই তিন মাসের খাদ্য দ্রব্য লইয়া অবস্থিতি করিয়াছিলেন। এবং কাহাকেও প্রাসাদ মধ্যে যাইতে বা তথা হইতে আসিতে অনুমতি করেন নাই, এই প্রকার বদ্ধ থাকাতে উক্ত প্রাসাদ মধ্যস্থ কোন লোকেরই এই পীড়া হয় নাই। কিন্তু ইহার বহিঃস্থ সহস্র সহস্র লোক এই রোগে প্রত্যহ কাল দশনে পেশিত হইয়াছিল।
পূর্ব্বোক্ত ঘটনার ন্যায় ইহার ইতিরত্ত পুস্তকে শত শত দৃষ্টান্ত প্রাপ্ত হওয়া যায়। যদি কোন নগরে বা দেশে ভয়ঙ্কর বিসূচিকা রোগের প্রাদুর্ভাব হয়, তাহা হইলে যে সকল স্থানের লোক এই রোগগ্রস্ত ব্যক্তির সংস্রব নারাখে কি তাহাদিগের ব্যবহৃত বস্ত্রাদি ও অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী স্পর্শ না করে, বিশেষতঃ তাহারা যদি পানীয় জল পরিষ্কার করিয়া রাখে তবে সে স্থলে এই ভয়ঙ্কর রোগ হইবার সম্ভাবনা থাকে না। এবং আমি পরে বিশেষ করিয়া বলিতেছি যে, কোন ব্যক্তি কেবল গৃহবদ্ধ থাকিয়া এবং ঐরূপ রোগীর অথবা তাহার বস্ত্রাদির সংস্রব হইতে দূরে থাকিলেই যে ঐ রোগ হইতে মুক্ত থাকিতে পারেন এমত নহে; যে নদীর বা যে পুষ্করিণীর জলে অল্পকাল মুক্ত উক্ত রূপ রোগী স্নান করে, ঐ সকল জল ব্যবহার করিলেও বিসূচিকা রোগ হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা। বঙ্গ দেশে যদিও কোন কোন বৎসর ওলাউঠা রোগ কম হয় তথাচ ১৮১৭ খৃঃ হইতে বর্ত্তমান কাল পর্য্যন্ত দেখা যাইতেছে যে প্রধান প্রধান নগর বা উপনগরে প্রায় প্রতি বৎসরেই ওলাউঠা রোগ দর্শন দিয়া থাকে। অনেকানেক সময়ে ওলাউঠা রোগ ভীষণ ভাব ধারণ করতঃ বহু সংখ্যক লোকের প্রাণ নাশ করিয়াছে। কলিকাতার নিমতলা শব দাহের ঘাটের গত ২৫ বৎসরের হিসাব দৃষ্টে জানা যাইতেছে যে প্রতি বৎসর সর্ব্ব শুদ্ধ প্রায় (৫০০০) পাঁচ হাজার লোক কেবল ওলাউঠা রোগে মরিয়াছে। এই রোগ ফাল্গুণ হইতে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্য্যন্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। কিন্তু ভারত বর্ষের সর্ব্বত্রই প্রতি বৎসর ওলাউঠা রোগের আবির্ভাব হয় না। যেমন পঞ্জাব এবং ভারত সীমার বহির্ভাগ প্রদেশে। বঙ্গদেশের মধ্যে যেমন ঐ রোগ সর্ব্বদা ঘটে পৃথিবীর আর কোন অংশে এরূপ ঘটেনা। বাঙ্গলা এবং মান্দ্রাজ ও বোম্বায়ের পরেই পঞ্জাব দেশের লোক ঐ রোগ দ্বারা অত্যন্ত আক্রান্ত হয়। এবং এই দেশের পরেই পারস্য দেশ (যাহা ভারত বর্ষের সহিত সংলগ্ন,) তথাকার লোক ও ঐ রোগ দ্বারা অতিশয় আক্রান্ত হয়। তৎপরেই আরব দেশ ও রূসিয়া এই দুই দেশ ভারতবর্ষের নৈকট্য প্রযুক্ত অন্যান্য দূরবর্ত্তী দেশ সকল অপেক্ষা এইরোগ দ্বারা অধিকতর আক্রান্ত হয়। ফলতঃ ভারতবর্ষের দূরবর্ত্তী দেশ সকল অপেক্ষা নিকটবর্ত্তী দেশের লোকেরা এই রোগ দ্বারা অধিক আক্রান্ত হয়। ইহা এতদূর নিশ্চয় যে, সমুদ্রের দ্বারা বিভিন্ন হইয়া যে দেশ ভারতবর্ষের অত্যন্ত দূরে অবস্থিতি করিতেছে, তথায় এরোগ অদ্যাপি ও উপস্থিত হয়নাই। এই প্রযুক্ত ইহা স্পষ্ট দেখা যাইতেছে যে, যেদেশ যতই ভারতবর্ষের নিকটবর্ত্তী সে দেশের লোক ততই এরোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এবং যে দেশ যতই ভারত বর্ষের দূরবর্ত্তী ততই সে দেশের লোক এই রোগ হইতে মুক্ত থাকে।
১৮১৭ খৃঃ অব্দ অবধি ইংলণ্ডে (বিলাতে) ইহা চারি বার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উপস্থিত হইয়াছে। এবং অতি অল্পকাল থাকিয়া নিবৃত্তি গাইয়াছে। যতবার বিলাতে এই রোগ হইয়াছে ততবারই ইহা ভারতবর্ষ হইতে ইউরোপের অন্যান্য দেশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইয়াছে। অগ্নির ন্যায় এই রোগ ভারতবর্ষ হইতে উৎপন্ন হইয়া যে যে স্থান দিয়া গমন করে সেই সেই স্থানে ইহা কাষ্ঠ ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের পরিবর্ত্তে মনুষ্য গণকে দগ্ধ করিয়া থাকে। এই রোগাক্রান্ত কোন ব্যক্তি অথবা তৎসংস্রুত কোন সামগ্রী যাহা এরূপ রোগীর সংস্পর্শ হইয়াছে, এই রূপ কোন ব্যক্তি বা বস্তুর উপস্থিতি ব্যতিরেকে ইংলণ্ডে অথবা অন্য কোন দেশে এই রোগ উপস্থিত হইয়াছে এ পর্য্যন্ত দৃষ্টি গোচর হয়নাই। এই সত্য আমরা ইতিহাস পাঠে অবগত হইতেছি। কেমন করিয়া এই রোগ ব্যাপ্ত হয় ইহার কারণ অনুসন্ধান করা ভারতবর্ষের ন্যায় বৃহৎ ও নিরক্ষর দেশে অতিশয় কঠিন। কেননা ইহা সর্ব্বদাই এদেশে উপস্থিত হইয়া থাকে। এবং তজ্জন্যই আমরা কোন্ বাটী অথবা কোন্ মনুষ্য হইতে এই রোগের প্রথম সূত্র হয় তাহার অনুসন্ধানে অসমর্থ।
কিন্তু ইংলণ্ডের ন্যায় দেশে যেখানে এ রোগ কখন কখন আবির্ভাব হয় এবং যাহা সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত এবং যথায় জাহাজ ব্যতিরেকে উপস্থিত হইবার অন্য কোন উপায় নাই, সেই স্থানে কেমন করিয়া প্রথম ব্যক্তি এই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহা আমরা অনুসন্ধান করিতে সমর্থ হইয়া থাকি।
ইহা আমাদের সর্ব্বদাই দৃষ্টি গোচর হয় যে, সমুদ্রতীরবর্ত্তী নগরে এই রোগ প্রথম আবির্ভূত হয়, এবং যেদেশে এরোগ উপস্থিত ছিল তথা হইতে আগত ব্যক্তিই প্রথম এরোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই রোগাক্রান্ত প্রথম ব্যক্তি হইতে অন্য ব্যক্তির অনুসরণে সমর্থ হই। একারণ আমরা বিশ্বাস করি যে, যে দেশে বিশেষ অনুসন্ধানের উপায় আছে, সে দেশে যে সকল কারণে এরোগ এক ব্যক্তি হইতে অন্য বক্তিকে আক্রমণ করে, সেই সকল কারণ দ্বারাই অবশ্য এরোগ বঙ্গদেশেও বিস্তৃ ত হইয়া থাকে এখানে এবিষয়ের অনুসন্ধান করা অতিশয় কঠিন; কারণ এদেশে এরোগ সর্ব্বদাই বর্ত্তমান থাকে। যেরূপ নিম্ববৃক্ষ, যাহা বঙ্গদেশে অতি সাধারণ এবং যাহা ইংলণ্ডে জন্মে না, তাহা যদি কেহ ইংলণ্ডের কোন উদ্যানে দৃষ্টি করে, তবে সে অবশ্যই আশ্চর্য্য হইয়া কহিবে যে, ইহা নূতন বৃক্ষ, ইহা কখনই পূর্ব্বে দৃষ্টি করি নাই, ইহা কেমন করিয়া এস্থলে আসিল? এখানে ঐ উদ্যানাধিকারীর নিকট ইহার অনুসন্ধান জানা অতি সহজ। তিনি বলিবেন যে, কোন ব্যক্তি দ্বারা বঙ্গদেশ হইতে এই গাছের বীজ প্রেরিত হইয়াছে এবং এই অনুসন্ধানকারী ইহার উৎপত্তি ও অন্যান্য বিষয় ঐ ব্যক্তি হইতে সমুদায় জ্ঞাত হইতে পারেন। কিন্তু যদ্যপি আমরা বঙ্গদেশের কোন বাগানে ঐ গাছ দেখিতে পাই, তাহা হইলে ঐ গাছ কোথাহইতে তথায় আসিয়াছে, সেবিষয় অনুসন্ধান করা অতিশয় কঠিন কেননা ঐ গাছের বীজ অন্য বীজের সহিত ও আসিতে পারে, কিম্বা কোন পক্ষী তাহার বাসায় যাইবার সময় ঐ গাছের বীজ সহিত তাহার ডাল ঐ উদ্যানে নিক্ষেপ করিয়া ও যাইতে পারে; ফলতঃ অন্যান্য শত শত কারণে উক্ত বাগানে ঐ বীজ আসিতে পারে, এবং সেজন্যই কি প্রকারে ইহা ঐ বাগানে আসিয়াছে, তদ্বিষয় অনুসদ্ধান করা নিতান্ত অসম্ভব। ওলাউঠা রোগের পক্ষেও ঐরূপ। যদ্যপি ইহার সমুদায় তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি, তাহা হইলে যেদেশে ঐ রোগ কেবল সময়ে সময়ে আবির্ভূত হয়, সেই স্থলে ইহার অনুসন্ধান করিতে সমর্থ হই। এবং ঐ অনুসন্ধানের মর্ম্ম বঙ্গদেশের পক্ষে ও প্রকৃত সত্য ঘটনা বলিয়া অনুসন্ধান করা যাইতে পারে। যদ্যপি আমরা ইংলণ্ড হইতে এই নিম্ব বৃক্ষ সমূলেবিনাশ করিতে চেষ্টাকরি, তবে যাহাতে উহার বীজ ভারতবর্ষ হইতে তথায় যাইতে না পারে, তাহার চেষ্টা পাইলেই তদ্বিষয়ে কৃত কার্য্য হইতে পারি। এবং সেইরূপ যদি ভারত বর্ষ হইতে ঐ বৃক্ষের মূলোৎপাটন করিতে পারা যায়, তাহা হইলেই ইহার উৎপন্ন সর্ব্বতোভাবে ধ্বংস হয়। কিন্তু ইংলণ্ড দেশে ঐরূপ চেষ্টা করা ভারতবর্ষ অপেক্ষা অতি সহজ।