বিষয়বস্তুতে চলুন

বিসূচিকার নিগূঢ় তত্ত্ব/বিসূচিকা রোগের উৎপত্তির কারণ

উইকিসংকলন থেকে

বিসূচিকা রোগের উৎপত্তির কারণ।

 বিসূচিকা রোগের ইতিহাস পাঠে অবগত হওয়া যায়, বিসূচিকা রোগাক্রান্ত কোন ব্যক্তি অথবা তৎসম্বন্ধীয় কোন বস্ত্রাদি, কোন নগরে বা গৃহে উপস্থিত না হইলে ভারতবর্ষ বহিঃস্থিত মনুষ্যেরা কখন এ রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয় নাই। ভারতবর্ষের ন্যায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লোকেরা যদিও পান আহারাদি দ্বারা জীবন যাত্রা সমভাবে নির্ব্বাহ করিয়া থাকে, তথাপি ঐ সকল দেশের মধ্যে কোন কোন দেশে অদ্যাপি এই রোগের আবির্ভাব হয় নাই।

 এই সকল সত্য ঘটনা পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, ইহা কখনই সংস্রব ভিন্ন উৎপন্ন হয় না। এবং যাহা আমরা পান আহার করি কেবল সে সকল দ্রব্য হইতেও ইহার উৎপন্ন হয় না। এবং যদ্যপি এমত হইত তাহা হইলে যে সকল দ্রব্য ভারতবাসীরা আহার করিয়া থাকে, ঐ সকল দ্রব্য যেসকল দেশের লোকে ব্যবহার করিয়া থাকে তথায় এই রোগ দৃষ্টিগোচর হইত। এই কারণ বশতঃই বায়ু ঝটিকা অথবা বৃষ্টি এই রোগের কারণ বলিয়া গণ্য হইতে পারে না। কারণ এই সকল নৈসর্গিক অবস্থা এদেশেও যদ্রূপ এবং যে দেশে এরোগ দৃষ্টি গোচর হয় না সে দেশেও তদ্রূপ। এবিষয় আমরা এই রোগের ইতিহাস পাঠে অবগত হইতেছি। কেবল জল এই রোগের কারণ হইতে পারে না; কেন না পৃথিবীস্থ সমুদায় জাতিই জলপান করিয়া থাকে, কিন্তু কেবল বাঙ্গালার এবং ভারতবর্ষের অন্য কোন কোন অংশের লোকেরাই এই রোগের দ্বারাই প্রায় সর্ব্বদাই আক্রান্ত হয়। এই ইতিহাস দ্বারা স্থির সিদ্ধান্ত হইতেছে যে, কি খাদ্য সামগ্রী কি বৃষ্টি কি জল বায়ু কিছুই এই রোগের কারণ বলিয়া গণ্য হইতে পারে না। তবে উপরোক্ত বিষয় ভিন্ন এ রোগের অন্য কোন কারণ অবশ্যই থাকিবে, কারণ যদি উপরোক্ত বিষয়ের একটী কিম্বা অনেকটা এই রোগোৎপন্নের কারণ হইত, তাহা হইলে ঐ সকল বিষয় যে স্থানে ভারতবর্ষের তুল্য সমভাবে রহিয়াছে সেই সকল স্থানের মনুষ্যগণও এই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হইত; কিন্তু এ প্রকার আমাদের দৃষ্টিগোচরকদাচ হয় নাই।

 ইহা পূর্ব্বে উল্লেখ হইয়াছে যে, যেদেশে এই রোগ বর্ত্তমান আছে, তথা হইতে সমাগত কোন ব্যক্তি অথবা ওলাউঠা রোগীর বস্ত্রাদি না আসিলে ইংসণ্ডের ন্যায় দেশ সকলে এরোগের আবির্ভাব হইত না। ইহার বিষয় বিশেষ অনুসন্ধান করা আমাদিগের অতি আবশ্যক। যেহেতু এই রোগের যে প্রকারেই প্রথম উদ্ভব হউক না কেন, এক স্থানে ইহার প্রাদুর্ভাব হইলে, এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তি অথবা তৎসম্বন্ধীয় বস্ত্রাদির সংস্রব দ্বারা ইহা অন্যস্থানে যাইতে পারে। ইহার বিশেষ প্রমাণ জন্য আমরা পূর্ব্বোক্ত রুসিয়ারাজ ও তাহার পারিষদগণের বিষয় পুনরায় উল্লেখ করিতে পারি। ইহা হইতে আমারা এই শিক্ষা করিতেছি যে, কোন নগরে বিসূচিকা রোগ ভয়ানক রূপ ধারণ করিলেও তত্রস্থ ব্যক্তিগণ এই রোগাক্রান্ত জনের সামীপ্য ত্যাগ করিয়া বদ্ধ থাকিতে পারিলে নিরাপদে থাকিতে পারে। যেহেতু ইহারা ওলাউঠা রোগীর কোন সংস্রবে থাকে না। এই প্রকৃত বিবরণ দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ হইতেছে যে, ওলাউঠা রোগীর সংসর্গ জন্য এই রোগ এক স্থান হইতে অন্য স্থানে সংক্রমণ করিতে পারে, এবং সেই কারণে উক্ত প্রকার আবদ্ধ হইয়া সামীপ্য ত্যাগ করিতে পারিলে, আমাদিগের এই রোগ প্রাপ্ত হইবার কোন সম্ভাবনা থাকে না।

 অনেকে আশ্চর্য্য বোধ করিতে পারেন যে, ওলাউঠারোগীর গৃহে থাকিয়াও এবং তাহার শুশ্রূষাদি করিয়াও আমাদিগের এই রোগ হয় না; এবং আরও বলিতে পারেন যে, যেমন অগ্নি এক স্থানে রাখিলে ক্রমশঃ সমস্ত দিগ ব্যাপিয়া উঠে, এবং যতদূর দাহ্য পদার্থ প্রাপ্ত হয়, ততদূর দগ্ধ করে, তদ্রূপ ওলাউঠা রোগও এক জন হইতে অন্য জনে আবির্ভূত হইতে পারে। ভাল, যদি এই প্রকারই হয়, তবে সকল ব্যক্তিরই এরোগ হয় না কেন? প্রথম রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে যাহারা শুশ্রুষা করিয়াছে, এবং তাহার মৃতদেহ দাহনার্থ যাহারা নদীতীরে লইয়া গিয়াছে, তাহাদিগেরও এই রোগ হইতে পারিত। এবং তৎসংসর্গে তাহাদের বন্ধুবর্গেরও হইত, এরূপে ক্রমশঃ সমস্ত পৃথিবীই ধ্বংস হইয়া যাইত। কিন্তু কি জন্য ইহা এপ্রকার হয় না, তাহা এস্থলে আমাদিগের বিশেষ করিয়া বলিবার আবশ্যক নাই। এ পর্য্যন্ত বলিতে পারি যে, যাহাদিগের এই রোগ হয় তাহাদিগের হইতে অন্যান্য লোকেরও এই রোগ হইতে পারে। কিন্তু সুস্থ শরীরে রোগ নিবারণী শক্তি থাকায় সকলের ঘটে না। যেমন প্রদীপের শিখায় মধূচ্ছিষ্ট দ্রব হইয়া যায় কিন্তু সেই তাপে এক রৌপ্য খণ্ডের কোন বিকৃতি হয় না, অথবা যেমন হাপরের (অগ্নিকুণ্ডের) উত্তাপে কাচ দ্রব হইয়া যায় কিন্তু হীরক খণ্ড সমভাবে থাকে; সেই প্রকার ওলাউঠা রোগ সকলকে আক্রমণ করিতে পারে না। কেন না সকল ব্যক্তির শরীরের অবস্থা সমান নহে। কোন কোন সবল ব্যক্তির শরীর এ রোগ নিবারণ করিতে সমর্থ আর কোন কোন ব্যক্তির শরীর সেরূপ সমর্থ নহে। অপিচ এক ব্যক্তির শরীর সকল সময়ে সমান থাকে না। অল্প অথবা অতিরিক্ত আহারের দ্বারা পীড়িত অবস্থায় এই রোগ হইবার যত সম্ভাবনা তত সুস্থাবস্থায় নহে। অতএব আমরা সহজেই বুঝিতে পারি যে, যদিও ওলাউঠা রোগ এক ব্যক্তি হইতে অন্য ব্যক্তিতে গমন করে, তথাপি যে সকল ব্যক্তিদিগের শরীরে এই রোগ নিবারণ করিবার ক্ষতমা থাকে তাহারা অনায়সে ইহা হইতে অব্যাহতি পায়। আমাদিগের আর এক বক্তব্য এই যে, যদিও বিসূচিকা রোগের ইতিহাস হইতে আমরা দেখিতে পাই যে, রসন্ত রোগের ন্যায় ইহা এক জন হইতে অন্য জনে গমন করে, তথাপি ইহা উক্ত বসন্ত রোগের ন্যায় একেবারে অর্থাৎ অন্য কোন মধ্যবর্তী বস্তু অবলম্বন না করিয়া আইসে না। কিন্তু আমরা নিশ্চয় জানি যে, এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তির ভেদ বা বমনের কোন অংশ পানীয় জলের সহিত মিশ্রিত হইয়া কতক গুলি ব্যক্তি কর্ত্তৃক পীত হয়, তাহা হইলে তাহাদের মধ্যে যে সকলের ওলা উঠা রোগ নিবারণ করিবার ক্ষমতা না থাকে, তাহাদিগের এই রোগ হইয়া থাকে। ইহার কোন সন্দেহ নাই; কারণ এবিষয়ের অনেক অনেক প্রমাণ দেখা যায়। বহু সংখ্যক দৃষ্টান্ত হইতে আমি কেবল দুইটী মাত্র উল্লেখ করিতেছি। প্রথম দৃষ্টান্ত এই যে, ইংলণ্ড দেশের এক গৃহে ওলা উঠা রোগ উপস্থিত হওয়াতে তত্রস্থ কতকগুলি ব্যক্তির এ রোগ হইয়াছিল। উক্ত গৃহ হইতে একটী নালা এক কূপ পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল, ঐ সকল রোগাক্রান্ত জনের ভেদ জাত পদার্থ উহাতে নিক্ষেপ করা হইয়াছিল, এবং ঐ নালার কতকগুলি ইষ্টক ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে বিষ্ঠার ও বমনের কিয়দংশ ঐ কূপে পতিত হইয়া তন্মধ্যস্থ জলের সহিত মিলিত হয়। তৎকালে এ বিষয় কেহই জানিত না, অতএব একটা বৃদ্ধা স্ত্রী তথা হইতে অধিক দূরে বাস করিলেও ঐ কূপের জল দেশ মধ্যে সর্ব্বোৎকৃষ্ট মনে করিয়া প্রত্যহ উহা হইতে জল আনয়ন করিত। অনতি বিলম্বে এক দিবস তাহার ওলাউঠা রোগ হইয়া সেই রোগে তাহার মৃত্যু হয় তাহার ভৃত্য ও তৎপরে ঐ রোগাক্রান্ত হইয়া কালগ্রাসে পতিত হয়। বিশেষ অনুসন্ধানে এই প্রকাশ হইল যে, উক্ত প্রতিবাসীর মধ্যে কেবল এই দুই জনই পূর্ব্বোক্ত কূপের জলপান করিয়াছিল, এবং তাহাদিগের উভয়েরই ওলাউঠা হয়। ইহা দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ হইতেছে যে, ওলাউঠা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির ভেদ ও বমনের দ্বারা দুষিত জলপান করিলেই দূরস্থ জনেরও ওলাউঠা রোগ হইতে পারে। এই দৃষ্টান্তে, জানা যাইতেছে যে, ঐ দুষিত কূপের জল বোতলে করিয়া এই বৃদ্ধা স্ত্রীর ভবনে আনীত হইয়াছিল এবং তিনিও তাঁহার ভৃত্য ঐ জলপান করায় তদ্দ্বারা ওলাউঠা রোগাক্রান্ত হইয়া মরিয়া যান। আর এক দৃষ্টান্ত এই যে, এই দেশে এক কার্য্যালয়ে বহুসংখ্যক লোক কর্ম্ম করিত তত্রস্থ ঊনবিংশতি জন ওলাউঠা রোগীর ভেদ ও বমনের দ্বারা দুষিত জল পান করিয়া ছিল; তন্মধ্যে পঞ্চজন তিন দিবসের মধ্যেই বিসূচিকা রোগে আক্রান্ত হয়। অবশিষ্ট লোকের এই রোগ হয় নাই। এই দুইটী উদাহরণ হইতে নিশ্চয়ই অবগত হওয়া যাইতেছে যে, যদ্যপি ওলাউঠা রোগীর ভেদ ও বমন আমাদিগের পানীয় জল মধ্যে প্রবেশ করে, তাহা হইলে ঐ জল হইতেই ঐ রোগ উৎপন্ন হয়। ইহার কোন সন্দেহ নাই যে ওলাউঠা রোগের ভেদ বা বমন যদ্যপি পানীয় বারির সহিত সংমিলিত হয়, তাহা হইলে যে সকল লোক এই দুষ্ট জল পান করে, তাহা দিগের কতক ব্যক্তির ওলাউঠা হইয়া থাকে। কিন্তু ইহা জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, কি প্রকারে ওলাউঠা রোগী সংক্রান্ত বস্তু পানীয় জলের সহিত মিশ্রিত হয়? উত্তর ইহা অনেক প্রকারে ঘটিতে পারে। কোন ব্যক্তির এই রোগ হইলে তাহার ভেদ বা বমন বাটীর বাহিরে নিক্ষেপ করিবার অনেক সম্ভাবনা। এই ভেদও বমন মৃত্তিকাতে শুষ্ক হইয়া বৃষ্টিদ্বারা ধৌত হইয়া নালা মধ্য দিয়া কোন নিকটস্থ পুষ্করিণীতে পড়িতে পারে; অথবা কোন ওলাউঠা রোগী সংক্রান্ত পদার্থ, মৃত্তিকায় শুষ্ক হইয়া বৃষ্টিদ্বারা কূপে পতিত হইতে পারে। যথা হইতে নিকটস্থ ব্যক্তিগণ পানার্থ জল আহরণ করে, অথবা যে পূষ্করিণী হইতে পানীয় জল লইয়া যায়, তথায় উক্ত রোগী তদবস্থায় পরিধান বস্ত্র সহ স্নান করিলেও ঐ জল দুষিত হইতে পারে।

 এই প্রকারে এবং অন্যান্য অনেক প্রকারে এতদ্দেশে পুষ্করিণীর অথবা কূপের জল দুষিত হয়, ঐ জল পান করিয়া ব্যক্তি দিগের এই রোগ হইতে পারে। অতএব যদ্যপি নদী পুষ্করিণী অথবা কূপ সাবধান পূর্ব্বক রক্ষিত না হয়, তাহা হইলে যে সকল লোক তাহাতে জল পান করে তাহাদিগের এই রোগ হইতে পারে। আমরা পূর্ব্বে উল্লেখ করিয়াছি যে শরীরের সুস্থতা হেতু সকলের শরীর ওলাউঠা রোগ গ্রহণে উপযুক্ত নাহওয়াতে ব্যক্তি সকল উক্ত জলপান করিলেও তাহাদিগের সকলেরই এরোগ হয় না। অপর, কিছু কাল মধ্যে আপনা আপনি এই জল সংস্কত হইতে পারে। তখন আর এই জল পান করিলে ওলাউঠা রোগ হইবার কোন সম্ভাবনা নাই।