বিসূচিকার নিগূঢ় তত্ত্ব/বিসূচিকা রোগের নিবারণের উপায়
বিসূচিকা রোগের নিবারণের উপায়।
পূর্ব্বে আমরা উল্লেখ করিয়াছি যে, ওলাউঠা রোগ এক ব্যক্তি হইতে অন্য ব্যক্তিতে গমন করিতে পারে, অথবা রোগীর বস্ত্রাদি যদি এক স্থান হইতে অন্য স্থানে আনীত হয়, তাহা হইলেও উক্ত রোগ হইতে পারে। অবশেষে আমরা ইহার প্রমাণ দেখাইয়াছি যে এ রোগ কেবল দুষিত জল পান দ্বারাই এক জন হইতে অন্য জনে যাইতে পারে। এক্ষণে আমাদিগের জিজ্ঞাস্য এই যে, কি প্রকারে স্ব স্ব শরীর এমত ভাবে রাখিতে পারি যে উক্ত রোগ না হইতে পারে।
(প্রথম) ভারতবর্ষে সর্ব্বদাই এ রোগ বর্ত্তমান রহিয়াছে, এজন্য ওলাউঠা রোগান্বিত ব্যক্তির সহিত কোন সংস্রব না রাখা অতি অসম্ভব। কারণ আমরা রুসিয়া রাজার ন্যায় কোন গৃহে বদ্ধ হইয়া অন্য লোকদিগকে তথায় আসিতে নিবারণ করিতে পারি না। যে হেতু আমাদিগের প্রাত্যহিক কার্য্য বশতঃ ইহা কোন মতেই হইতে পারে না। সুতরাং আমাদিগের বিপদ হইবার অধিক সম্ভাবনা; কিন্তু ইহা অতি সামান্য বিপদ যেহেতু এ দেশে এ প্রকারে সর্ব্বদাই হয় না। কারণ আমরা দেখিতে পাই যে ডাক্তার এবং দাতব্য ঔষধালয়ের ভৃত্য গণ প্রায়ই এই পীড়ার দ্বারা আক্রান্ত হয় না। অতএব এই সকল রোগী দিগের শুশ্রুষা করিতে অথবা তাহাদিগের এবং তন্নিকটস্থ জনের সংসর্গ ত্যাগ করিতে আমাদিগের ভয়ের কোন আবশ্যক করে না।
দ্বিতীয়। দেশে দুষিত জল পান দ্বারাই অধিকাংশ লোকের ওলাউঠা রোগ হয়। অতএব জিজ্ঞাস্য এই যে, আমরা উক্ত জলপান করিয়া ওলাউঠা রোগ নিবারণ করিতে পারি কি না? ইতি পূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে যে যদ্যপি আমরা ওলাউঠা রোগীর ভেদ বা বমন মিশ্রিত কিঞ্চিৎমাত্র দুষ্ট জল আনয়ন করি, তাহা হইলে ঐ জল পান করিয়া ঊনবিংশতি জনের মধ্যে পঞ্চ জন পরিমাণে লোকদিগের উক্ত রোগ হইতে পারে। কিন্তু আমরা অবশ্য স্মরণ করিয়া দেখিলে জানিতে পারিব যে, অতি অল্প মাত্র ঐ দোষ প্রাপ্ত জল সেবন করিলেও ওলাউঠা রোগ হইতে পারে।
কোন ব্যক্তি উক্ত রোগ হইতে আরোগ্য হইয়া কোন পুষ্করিণীতে শরীর ধৌত করিলে তখন উহার জল কিছুকালের নিমিত্ত অতি ভয়ানক থাকে এবং তৎকালে যে সকল ব্যক্তি উহা পান করে তাহাদিগের এই পীড়া হইবার সম্ভাবনা। অপর কোন ব্যক্তি এই রোগ হইতে মুক্ত• হইয়া এক কূপের পার্শ্বে স্নান করিলে এবং তাহার শরীর ধৌত জল মৃত্তিকায় শুকাইলে এই জল অল্প দিবসের মধ্যে পান করিলে ওলাউঠা রোগ হইবার সম্ভাবনা। আকাশে সূর্য্য আছে বলিলে যদ্রূপ সত্য বোধ হয় তদ্রূপ এইসকল বিষয়ও সত্য। এ কথা কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না। কিন্তু ইহা দ্বারা সকলেরই বিশেষ উপকার হইতে পারে না; কারণ কলিকাতা নিবাসীদিগের জন্যই আমার বিশেষ উদ্দেশ্য। এই স্থানে কলের জল অতি পরিষ্কার, ওলাউঠা রোগ সংক্রান্ত কোন বস্তু ইহাতে পড়িতে পারে না। সুতরাং এই জল পান করিলে উক্ত রোগ হইতে পারে না। যাহারা কলিকাতা নগরে বাস না করেন, তাহাদিগের বিষয় আমরা কিছুই বলিতে চাহি না; কারণ আমরা তাহাদিগের জন্য লিখিতেছি না, কেবল এই নগরে যথায় অনায়াসে পরিষ্কার জল পাওয়া যায়, সেই স্থানের জন্যই লিখিতেছি। অতএব যদ্যপি এই নগর নিবাসী গণের কোন দুষিত জল পান করিয়া ওলাউঠা রোগ হয়, তাহা হইলে ইহা তাহাদিগেরই নিজ নিজ দোষ। আরও আমরা বলিতেছি যে, যদ্যপি বিসূচিকা হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য আমরা এই জল পান করি, অথচ কোন পুষ্করিণীতে যাইয়া স্নান করি কিম্বা তাহার জল মুখে দি, তাহা হইলে কলের জল পান করা বা না করা সমান হইল। কারণ কিছুমাত্র ইহার জল উদরস্থ হইলে যদ্যপি কোন প্রকার ইহা দুষিত হয় তাহা হইলে ইহাতে ওলাউঠা হইতে পারে। অতএব আমরা অবশ্য কোন পুষ্করণীতে স্নান অথবা তাহার জল পান করিব না। যেহেতু আমরা অল্প পরিশ্রমে এস্থানে পরিষ্কার জল পাইতে পারি যে জলে কোন ওলাউঠার কারণ ভূত তৎসম্বন্ধীয় সামগ্রী থাকিতে পারে না। আমরা বালক বৃদ্ধ ধনী নির্দ্ধন সকলকে পুনঃ পুনঃ কহিতেছি যে, কলিকাতার কলের জল ভিন্ন অন্য জল পান বা অন্য জল স্নান একেবারে না করেন। তাহা হইলে তাহাদিগের ঐ ভয়ঙ্কর রোগ হইবেক না। কিন্তু এই সকল করিলেও আমাদিগের দুগ্ধের সহিত দুষিত জলমিশ্রিত থাকিতে পারে; এবং ঐ দুগ্ধ পান করিয়া এই পীড়া হইতে পারে। কারণ সকলেই জ্ঞাত আছেন যে গোপেরা অতি অসচ্চরিত্র ও অপরিচ্ছন্ন ব্যক্তি। ইহারা দুগ্ধ বিক্রয় করিবার পূর্ব্বে নিকটবর্ত্তী কোন অপরিষ্কার কূপে অথবা পুষ্করিণী হইতে জল আনয়ন করিয়া দুগ্ধের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেয়। ইহাও হইতে পারে যে, উহার জল ওলাউঠার কোন বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা দোষপ্রাপ্ত হইয়াছে। সুতরাং দুগ্ধ পান করিলে বিসূচিকা রোগ হইতে পারে। এক্ষণে আমরা দেখিব আমরা ইহাকে নিবারণ করিতে পারি কি না।
বোধ হয় নিজ নিজ গাভী না থাকিলে অনেকে ইহা নিবারণ করিতে পারেন না। কারণ তাহারা গোপদিগকে দুগ্ধে জল মিশ্রিত করা হইতে নিবারণ করিতে পারেন না। কিন্তু যদিও এরূপ নিবারণ করিতে না পারেন, এবং যদিও দুগ্ধ ওলাউঠা সংক্রান্ত জলের সহিত মিশ্রিত হয়, তাহা হইলেও জ্বাল দিয়া সিদ্ধ করিলে বিষাক্ত পদার্থ প্রায় দূর হইয়া যায়। অতএব যদ্যপি আমাদিগের স্ব স্ব গাভী না থাকে, অথবা গোপদিগকে বিশ্বাস না করি, তাহা হইলে আমরা কখনই অসিদ্ধ দুগ্ধ পান করিব না, বিশেষতঃ যে সময়ে অনেক ব্যক্তির ওলাউঠা হইতেছে এমন সময়ে আমরা ঐ প্রকার কখনই করিব না। আর যখন বিসূচিকার অতিশয় প্রাদুর্ভাব হয় তখন আমরা সর্ব্বাপেক্ষা এত অধিক সাবধান হইব যে আমরা কল হইতে জল তুলিয়াই এবং বায়ুতে ক্ষণমাত্র না রাখিয়া পান করিব। কলিকাতায় থাকিয়া যদ্যপি ওলাউঠা হইতে নিষ্কৃতি পাইবার ইচ্ছা থাকে তবে পরিষ্কার জল পরিষ্কার পাত্রে রাখিয়া এবং কল হইতে তুলিয়াই পান করিবে। আর অন্য কোন জল পান করিবেক না।
ফাল্গুন, চৈত্র বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন কলিকাতায় ওলাউঠা রোগ অতিশয় প্রবল হয়, তখন এই প্রকার সতর্ক হওয়া বিশেষ আবশ্যক এবং তখন আমরা কল হইতে জল আনিয়াই পান করিব, আর অন্য কোন জল পান করিব না। এই প্রকার করিলে এবং কোন কূপ বা পুষ্করিণীর জল ব্যবহার না করিলে আমাদিগের ওলাউঠা রোগ অবশ্যই হইবেক না।