বীরবলের হালখাতা/সাহিত্যে চাবুক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সাহিত্যে চাবুক সেদিন স্টার-থিয়েটারে ‘আনন্দ-বিদায়ে’র অভিনয় শেষে দক্ষযজ্ঞের অভিনয়ে পরিণত হয়েছিল শুনে দুঃখিত এবং লজ্জিত হলুম। তার প্রথম কারণ এই যে, শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মতো লোককে দর্শকমণ্ডলী লাঞ্ছিত করেছেন ; এবং তার দ্বিতীয় কারণ এই যে, শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্ৰকাশ্যে লাঞ্ছনা দেবার উদ্দেশ্যেই রঙ্গমঞ্চে আনন্দ-বিদায়ের অবতারণা করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রবাবু লিখেছেন যে, তিনি সকল রকম “মি’র বিপক্ষে। ন্যাকামি জ্যাঠামি ভণ্ডামি বোকামি প্ৰভৃতি যে-সকল 'মি'-ভাগান্ত পদার্থের তিনি উল্লেখ করেছেন, সেগুলির যে-কোনো ভদ্রলোকেই পক্ষপাতী, এরূপ আমার বিশ্বাস নয় ; অন্তত পক্ষপাতী হলেও সে কথা কেউ মুখে স্বীকার করবেন না। কিন্তু সমাজে থাকতে হলেই পাঁচটি ‘মি’নিয়েই আমাদের ঘর করতে হয়, এবং সেই কারণেই সুপরিচিত 'মি’গুলি, সাহিত্যে না হোক, জীবনে আমাদের সকলেরই অনেকটা সওয়া আছে। কিন্তু যা আছে, তার উপর যদি একটা নতুন ‘মি এসে আমাদের ঘাড়ে চাপে, তা হলে সেটা নিতান্ত ভয়ের বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা এতদিন নিরীহ প্ৰকৃতির লোক বলেই পরিচিত ছিলুম। কিছুদিন থেকে DgOB LBD TD DDD SS DBDDB BDBBLDBBS BBDD BBDSS TD রাজনীতির রঙ্গভূমিতেই আমরা তার।পরিচয় পেয়েছি ; সুরাট-কনগ্রেসে সেই 'মি'র তাণ্ডবনৃত্যের অভিনয় হয়েছিল। আমার বিশ্বাস ছিল যে, সুরাটে যে যবনিকাপাতন হয়েছে, তা আর সহসা উঠবে না। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি যে, রাজনীতিতে প্ৰশ্ৰয় পেয়ে যণ্ডামি ক্রমশ সমাজের অপর-সকল দেশও অধিকার করে নিয়েছে। ষণ্ডামিজিনিসটের আর যে ক্ষেত্রেই সার্থকতা থাক, সাহিত্যে নেই; কেননা, সাহিত্যে বাহুবলের কোনো স্থান নেই। স্টার-থিয়েটারের বক্স হতে শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে গায়ের জোরে নামানো সহজ, কিন্তু তিনি বঙ্গসাহিত্যে যে উচ্চ আসন লাভ করেছেন, বাহুবলে তঁাকে সেখান থেকে নামানো অসম্ভব। লেখকমাত্রেই নিন্দ প্ৰশংসা সম্বন্ধে পরাধীন। সমালোচকদের চোখ রাঙানি সহ্য করতে লেখকমাত্রেরই প্ৰস্তুত হওয়া আবশ্যক। কিন্তু সাহিত্যজগতের ঢ়িলাটে মারলে যে জড় জগতের পাটকেলটা আমাদের খেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ওরকম একটা নিয়ম প্ৰচলিত হলে সাহিত্য রাজ্যে আমাদের বাস করা চলবে না। কারণ এ কথা সর্ববাদিসম্মত যে, বুদ্ধির জোর গায়ের জোরের কাছে বরাবরই হার মানে। এই কারণেই শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যেভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন, তার জন্য আমি বিশেষ দুঃখিত এবং লজিত । সাহিত্যে চাবুক voግ R কিন্তু শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যে, এ যুগের সাহিত্যে আবার ‘কবির লড়াই' ফিরে আনবার প্রয়াস পেয়েছেন, তার জন্য আমি আরো বেশি দুঃখিত। ও কাজ একবার আরম্ভ করলে শেষটা খেউড় ধরতেই হবে। দ্বিজেন্দ্রবাবু বোধ হয় এ কথা অস্বীকার করবেন না যে, সেটি নিতান্ত অবাঞ্ছনীয়। এ পৃথিবীতে মানুষে আসলে খালি দুটি কাৰ্যই করতে জানে ; সে হচ্ছে হাসতে এবং কঁদিতে। আমরা সকলেই নিজে হাসতেও জানি, কঁদতেও জানি ; কিন্তু সকলেরই কিছু-আর অপরকে হাসাবার কিংবা কঁদাবার শক্তি নেই। অবশ্য অপরকে চপেটাঘাত করে কাদানো কিংবা কাতুকুতু দিয়ে হাসানো আমাদের সবারই আয়ত্ত, কিন্তু সরস্বতীর বীণার সাহায্যে কেবল দুটি-চারটি লোকই ঐ কাৰ্য করতে পারেন। যাদের সে ভগবৎ দত্ত ক্ষমতা আছে, তঁদেরই আমরা কবি বলে মেনে নিই। বাদবাকি সব বাজে লেখক। কাব্যে, আমার মতে শুধু তিনটিমাত্র রস আছে ; করুণ রস, হাস্যরস, আর হাসিকান্নামিশ্রিত মধুর রস। যে লেখায়। এর একটি-না-একটি রস আছে, তাই কাব্য ; বাদবাকি সব নীরস লেখা। দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি যা খুশি তা হতে পারে, কিন্তু কাব্য নয়। বাংলাসাহিত্যে হাস্যরসে শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় অদ্বিতীয়। তার গানে হাস্যরস ভাবে কথায় সুরে তালে লয়ে পকীকৃত হয়ে মূর্তিমান হয়ে উঠেছে। হাসির গান তঁর সঙ্গে জুড়িতে গাইতে পারে, বঙ্গসাহিত্যের আসরে এমন গুণী আর-একটিও নেই। কান্নার মতো হাসিরও নানাপ্রকার বিভিন্ন রূপ আছে, এবং দ্বিজেন্দ্রবাবুর মুখে হাসি নানা আকারেই প্ৰকাশ পেয়েছে। সাহিত্যে যে কেবল আমাদের মিষ্টি হাসিই হাসতে হবে, এ কথা আমি মানি নে। সুতরাং দ্বিজেন্দ্ৰবাবু যে বলেছেন যে, কাব্যে বিদ্রুপের হাসির ও ন্যায্য স্থান আছে, সে কথা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু উপহাস জিনিসটের প্রাণই হচ্ছে হাসি। হাসি বাদ দিলে শুধু তার উপটুকু থাকে। কিন্তু তার রূপটুকু থাকে না। হাসতে হলেই আমরা অল্পবিস্তর দন্তবিকাশ করতে বাধ্য হই। কিন্তু দন্তবিকাশ করলেই যে সে ব্যাপারটা হাসি হয়ে ওঠে তা নয় : দাঁতখিচুনি বলেও পৃথিবীতে একটা জিনিস আছে- সে ক্রিয়াটি যে ঠিক হাসি নয়, বরং তার উলটো, জীবজগতে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ আছে। সুতরাং উপহায়ুজিনিসটে সাহিত্যে চললেও কেবলমাত্র তার মুখভঙ্গিটি সাহিত্যে চলে না। কোনো জিনিস দেখে যদি আমাদের হাসি পায়, তা হলেই আমরা অপরকে হাসাতে পারি। কিন্তু কেবলমাত্র যদি রাগই হয়, তা হলে সে মনোভাবকে হাসির ছদ্মবেশ পরিয়ে Y9ሪbዎ বীরবলের হালখাতা প্ৰকাশ করলে দর্শকমণ্ডলীকে শুধু রাগাতেই পারি। দ্বিজেন্দ্রবাবু এই কথাটি মনে য়াখলে লোককে হাসাতে গিয়ে রাগাতেন না । VO) দ্বিজেন্দ্রবাবু বলেছেন যে, নাটকাকারে প্যারডি কোনো ভাষাতেই নেই। যা কোনো দেশে কোনো ভাষাতেই ইতিপূর্বে রচিত হয় নি, তাই স্বষ্টি করতে গিয়ে তিনি একটি অদ্ভুত পদার্থের সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বামিত্রের তপোবল আমাদের কারো নেই ; সুতরাং বিশ্বামিত্রও যখন নূতন সৃষ্টি করতে গিয়ে অকৃতকাৰ্য হয়েছিলেন, তখন আমরা যে হব, এ তো নিশ্চিত । মানুযে মুখ ভ্যাংচালে দর্শকমাত্ৰই হেসে থাকে। কেন যে সে কাজ করে, তার বিচার অনাবশুক ; কিন্তু ঘটনা হচ্ছে এই যে, ওরূপ মুখভঙ্গি দেখলে মানুষের হাসি পায়। প্যারডি হচ্ছে সাহিত্যে মুখ-ভ্যাংচানো। প্যারডি নিয়ে যে নাটক হয় না, তার কারণ দু ঘণ্টা ধরে লোকে একটানা মুখ ভেংচে যেতে পারে না ; আর যদিও কেউ পারে তো, দর্শকের পক্ষে তা অসহ্য হয়ে ওঠে। হঠাৎ এক মুহুর্তের জন্য দেখা দেয় বলেই, এবং তার কোনো মানেমোদ নেই বলেই, মানুষের মুখ-ভ্যাংচানি দেখে হাসি পায়। সুতরাং ভ্যাংচানির মধ্যে দর্শন বিজ্ঞান সুনীতি সুরুচি প্ৰভৃতি ভীষণ জিনিস সব পুরে দিতে গেলে ব্যাপারটা মানুষের পক্ষে রুচিকর হয় না। ঐ রূপ করাতে ভ্যাংচানির শুধু ধর্মনিষ্টই হয়। শিক্ষাপ্ৰদ ভ্যাংচানির স্বষ্টি করতে গিয়ে দ্বিজেন্দ্রবাবু রসজ্ঞানের পরিচয় দেন নি। যদি প্যারডির মধ্যে কোনোরূপ দৰ্শন থাকে তো সে 丐颈币【1 8 দ্বিজেন্দ্রবাবু তার ‘আনন্দ-বিদায়ে’র ভূমিকায় প্ৰকারান্তরে স্বীকারই করেছেন যে, লোক হাসানো নয়, লোকশিক্ষা দেওয়াই তঁর মনোগত অভিপ্ৰায় ; প্ৰহসন শুধু অছিলামাত্র। বেত হাতে গুরুমশাইগিরি করা, এ যুগের সাহিত্যে কোনো লোকের পক্ষেই শোভা পায় না। “পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কতাম। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভব।ামি যুগে যুগে ॥’- এ কথা শুধু অবতীর্ণ ভগবানের মুখেই সাজে, সামান্য মানবের মুখে সাজে না । লেখকেরা যদি নিজেদের এক-একটি ক্ষুদ্র অবতারস্বরূপ মনে করেন, কিংবা যদি তঁরা সকলে কেষ্টবিষ্ট হয়ে ওঠেন, তা হলে পৃথিবীর সাধুদেরও পরিত্রাণ হবে না, এবং দুষ্টদের ও শাসন হবে না ; লাভের মধ্যে লেখকেরা পরস্পর শুধু কলমের খোঁচাখুঁচি করবেন। দ্বিজেন্দ্ৰবাবুর ইচ্ছাও যে তাই হয়। এবং তিনি ঐ রূপ খোঁচাখুঁচি সাহিত্যে চাবুক Vd DBD GDB DSBDD sKK DBBB BDBLBuBu DBD DDDD BBBBDBD S DDD বলেন যে, ওআর্ডসওআর্থকে ব্রাউনিং চাবৃকেছিলেন, এবং ওআর্ডসওআর্থ বায়রন এবং শেলিকে চাবুকেছিলেন। বিলেতের কবিরা যে অহরহ পরস্পরকে চাবুকা-চালকি করে থাকেন, এ জ্ঞান আমার ছিল না । ওআর্ডসওআর্থ সম্বন্ধে ব্ৰাউনিং Lost Leader নামে যে একটি ক্ষুদ্র কবিতা রচনা করেন, সেটিকে কোনো হিসাবেই চাবুক বলা যায় না। কবিসমাজের সর্বমান্য এবং পূজ্য দলপতি দলত্যাগ করে অপর-দলভুক্ত হওয়াতে কবিসমাজ যে গভীর বেদনা অনুভব করেছিলেন, ঐ কবিতাতে ব্ৰাউনিং সেই দুঃখই প্ৰকাশ করেছেন। ওআর্ডসওআর্থ যে বায়রন এবং শেলিকে চাবুকেছিলেন, এ কথা আমি জানতুম না। বায়রন অবশ্য র্তার সমসাময়িক কবি এবং সমালোচকদের প্রতি দুহাতে ঘুষে চালিয়েছিলেন, কিন্তু সে আত্মরক্ষার্থ। অহিংসা পরমধর্ম হলেও আততায়ী-বধে পাপ নেই। দ্বিজেন্দ্রবাবু যে নজির দেখিয়েছেন, সেই নজিরের বলেই প্রমাণ করা যায় যে, চাবুক পদার্থটার বিলেতি কবিসমাজে চলন থাকলেও তার ব্যবহারে যে সাহিত্যের কোনো ক্ষতিবুদ্ধি হয়েছে, তা নয়। ওআর্ডসওআর্থ শেলি বায়রন প্ৰভৃতি কোনো কবিই কোনো প্ৰতিদ্বন্দ্বীর তাড়নার ভয়ে নিজের পথ ছাড়েন নি, কিংবা সাহিত্য রাজ্যে পাশ কাটিয়ে যাবারও চেষ্টা করেন নি। কবিমাত্রেরই মত যে 'স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরী:ধর্মে ভয়াবহ’। চাবুকের ভয় কেবলমাত্র তারাই করে, যাদের ‘স্বধৰ্ম’ বলে জিনিসটা আদপেই নেই এবং সাহিত্যে পরমুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এ শ্রেণীর লেখকেরা কী লেখেন আর না-লেখেন, তাতে সমাজের কিংবা সাহিত্যের বড়ো কিছু আসে যায় না। এ কথা আমি অস্বীকার করি নে যে, সাহিত্যে চাবুকের সার্থকতা আছে। হাসিতে রস এবং কব দুইই আছে। এবং ঠিক মাত্ৰা-অনুসারে কষের খাদ দিতে পারলে হাস্যরসে জমাট বঁধে । কিন্তু তাই বলে “কষে’র মাত্ৰা অধিক বাড়ানো উচিত নয় যে, তাতে হাসি জিনিসটা ক্ৰমে অন্তহিঁত হয়ে, যা খাটি মাল বাকি থাকে, তাতে শুধু 'কশাঘাত” করা চলে। সাহিত্যেও অপরের গায়ে নাইট্রিক অ্যাসিড ঢেলে দেওয়াটা বীরত্বের পরিচয় নয়। দ্বিজেন্দ্ৰবাবু ‘কষাঘাত’কে ‘কশাঘাত" বলে ভুল করে ষত্ব-ণত্ব জ্ঞানের পরিচয় দেন নি। সাহিত্যে কোনো ব্যক্তিবিশেষের উপর চাবুক প্রয়োগ করাটা অনাচার। সমগ্র সমাজের পৃষ্ঠেই ওর প্রয়োগটা সনাতন প্ৰথা। মিথ্যা যখন সমানুঞ্জ আশকার পেয়ে সত্যের সিংহাসন অধিকার করে বসে, এবং রীতি যখন নীতি ব’লে সম্মান লাভ করে ও সমগ্ৰ সমাজের উপর নিজের শাসন বিস্তার করে, তখনি বিদ্রুপের দিন আসে। পৃথিবীতে সব চাপা যায়, কিন্তু হাসি চাপা যায় না। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি 80 বীরবলের হালখাতা চাবুকের প্রয়োগ চলেনা। কোনো লেখক যদি নিতান্ত অপদাৰ্থ হয়, তা হলে তার উপর কশাঘাত করাটা কেবল নিষ্ঠুরতা ; কেননা, গাধা পিটে ঘোড়া হয় না। অপরপক্ষে যদি কোনো লেখক সত্যসত্যই সরস্বতীর বরপুত্র হন, তা হলে তঁর লেখার কোনো বিশেষ অংশ কিংবা ধরন মনোমত না হলেও, সেই বিশেষ ধরনের প্রতি যেরূপ বিদ্রুপ সংগীত, সেরূপ বিন্দ্রপকে আর যে নামেই অভিহিত করা, 'চাবুক' বলা চলে না। কারণ, ওরূপ ক্ষেত্রে কবির মর্যাদা রক্ষা না করে বিদ্রুপ করলে সমালোচকেরও আত্মমৰ্যাদা রক্ষিত হয়। না। কোনো ফাক পেলেই কলি যেভাবে নলের দেহে প্ৰবেশ করেছিলেন, সমালোচকের পক্ষে সেইভাবে কবির দেহে প্ৰবেশ করা শোভনও নয়, সংগতিও নয়। চাবুক ব্যবহার করবার আর-একটি বিশেষ দোষ আছে। ও কাজ করতে করতে মানুষের খুন চড়ে যায়। দ্বিজেন্দ্রবাবুরও তাই হয়েছে। তিনি একমাত্র 'চাবুকে' সন্তুষ্ট না থেকে, ক্ৰমে “ঝটিকা’ 'চাটিকা’ প্ৰভৃতি পদার্থেরও প্রয়োগ করবার চেষ্টা করেছেন। আমি বাংলায় অনাবশ্যক ‘ইক’-প্ৰত্যায়ের বিরোধী। সুতরাং আমি নিৰ্ভয়ে দ্বিজেন্দ্ৰবাবুকে এই প্রশ্ন করতে পারি যে, 'চাটিকা’র ‘ইক’ বাদ দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে, সে জিনিসটে মারাতে কি কোনো লেখকের পদমৰ্যাদা বৃদ্ধি পায় ? “বাঁটা’ সম্বন্ধে আমার বক্তব্য এই যে, সম্মার্জনীর উদ্দেশ্য ধুলোঝাড়া, গায়ের ঝালবাড়া নয়। বিলেতিসরস্বতী মাঝে মাঝে রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করলেও বঙ্গসরস্বতীর পক্ষে ঝাটা উচিয়ে রঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হওয়াটা যে নিতান্ত অবাঞ্ছনীয়, এ কথা বোধ হয়। কেউ অম্বীকার করবেন না। W শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নিজে মার-মূর্তি ধারণ করবার যে কারণ দেখিয়েছেন, আমার কাছে সেটি সব চেয়ে অদ্ভুত লাগল। দ্বিজেন্দ্ৰবাবুর মতে, “যদি কোনো কবি কোনো কাব্যকে সাহিত্যের পক্ষে অমঙ্গলকর বিবেচনা করেন, তাহা হইলে সেরূপ কাব্যকে সাহিত্যক্ষেত্ৰ হইতে চাব কাইয়া দেওয়া তঁহার কর্তব্য’। এক কথায়, সাহিত্যের মঙ্গলের জন্য নৈতিক চাবুক মারাই দ্বিজেন্দ্রবাবুর অভিপ্ৰায়। পৃথিবীতে অনেক লোকের ধারণা যে কাউকে ধর্মাচরণ শেখাতে হলে মৃত্যুর মতো তার চুল চেপে ধরাটাই তার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়, এবং সেইজন্য কর্তব্য । স্কুলে জেলখানায় ঐ সমাজের মঙ্গলের জন্যই বেত মারবার নিয়ম প্ৰচলিত ছিল। কিন্তু আজকাল অনেকেরই এ জ্ঞান জন্মেছে যে, ও পদ্ধতিতে সমাজের কোনো মঙ্গলই সাধিত হয় না ; লাভের মধ্যে, শুধু, ষে বেত মারে এবং যাকে মারা হয়, উভয়েই তার ফলে মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুত্ব লাতি করে। সাহিত্যে চাবুক 8 Y 'অপরের উপর অত্যাচার করবার জন্য শারীরিক বলের প্রয়োগটা যে বর্বরতা, এ কথা সকলেই মানেন ; কিন্তু একই উদ্দেশ্যে নৈতিক বলের প্রয়োগটাও যে বর্বরতামাত্র, এ সত্য আজও সকলের মনে বসে যায় নি। কঠিন শাস্তি দেবার প্রবৃত্তিটি আসলে রূপান্তরে প্ৰতিহিংসাপ্রবৃত্তি। ও জিনিসটিকে সমাজের মঙ্গলজনক মনে করা শুধু নিজের মনভোলানো মাত্র। নীতিরও একটা বোকামি গোড়ামি এবং গুণ্ডামি আছে। নিত্যই দেখতে পাওয়া যায়, একরকম প্ৰকৃতির লোকের হাতে নীতি পদার্থটা পরের উপর অত্যাচার করবার একটা অন্ত্রমাত্র। ধর্ম এবং নীতির নামে মানুষকে মানুষ যত কষ্ট দিয়েছে, যত গৰ্হিত কাৰ্য করেছে, এমন বোধ হয় আর কিছুরই সাহায্যে করে নি। আশা করি দ্বিজেন্দ্ৰবাবু সে শ্রেণীর লোক নন, যাদের মতে সুনীতির নামে সাত খুন মাপ হয়। ইতিহাসে এর ধারাবাহিক প্ৰমাণ আছে যে, নীতির বোকামি গোঁড়ামি এবং গুণ্ডামির অত্যাচার সাহিত্যকে পুরোমাত্রায় সহ্য করতে হয়েছে। কারণ সাহিত্য সকল দেশে সকল যুগেই বোকামি গোড়ামি এবং গুণ্ডামির বিপক্ষ এবং প্ৰবল শক্ৰ । নীতির, অর্থাৎ যুগবিশেষে প্ৰচলিত রীতির, ধর্মই হচ্ছে মানুষকে বাধা; কিন্তু সাহিত্যের ধর্ম হচ্ছে মানুষকে মুক্তি দেওয়া। কাজেই পরস্পরের সঙ্গে দা-কুমড়োর সম্পর্ক। ধর্ম এবং নীতির দোহাই দিয়েই মুসলমানের আলেকজাণ্ডিয়ার লাইব্রেরি ভস্মসাৎ করেছিল। এ যুগে অবশ্য নীতিবীরদের বাহুবলের এক্তিয়ার হতে আমরা বেরিয়ে গেছি, কিন্তু সুনীতির গোয়েন্দারা আজও সাহিত্যকে চোখে-চোখে রাখেন, এবং কারো লেখায় কোনো ছিদ্র পেলেই সমাজের কাছে লেখককে ধরিয়ে দিতে উৎসুক হন । কাব্যামৃত রসাস্বাদ করা এক, কাব্যের ছিদ্রান্বেষণ করা আর । শ্ৰীকৃষ্ণের বঁাশি কবিতার রূপকমাত্র। কারণ, সে বঁাশির ধর্মই এই যে, তা ‘মনের আকুতি বেকত করিতে কত নাসন্ধান জানে”। ছিদ্রান্বেষী নীতিধর্মীদের হাত পড়লে সে বঁাশির ফুটাগুলো যে তঁরা বুজিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন, তাতে আর সন্দেহ কী ৷ একশ্রেণীর লোক চিরকালই এই চেষ্টা করে অকৃতকাৰ্য হয়েছেন; কারণ, সে ছিদ্র স্বয়ং ভগবানের হাতে-করা বিধ, তাকে নিরেট করে দেবার ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। ‘মি’ জিনিসটিই খারাপ, কিন্তু আমাদের শাস্ত্ৰমতে, মানুষের পক্ষে সবচাইতে সর্বনেশে 'মি' হচ্ছে “আমি” । কারণ, ও পদার্থটির আধিক্য থাকলে আমাদের বিদ্যাবুদ্ধি কাণ্ডজ্ঞান সবই লুপ্ত হয়ে আসে। অন্যান্য সকল 'মি' ঐ “আমি”কে আশ্ৰয় করেই থাকে। কিন্তু “আমি” এত অব্যক্তভাবে আমাদের সমস্ত মনটাঙ্গ ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে যে, আমরা নিজেও বুঝতে পারি নে যে, তারই তাড়নায় আমরা পরের উপর কুব্যবহার করতে উদ্যত হই, সমাজ কিংবা সাহিত্য কারো মঙ্গলের জন্য নয়। এই কথাটা স্পষ্ট বুঝতে পারলে আমরা পরের উপর নৈতিক চাবুক প্রয়োগ করতে কুষ্ঠিত 3 R বীরবলের হালখাতা হই। এই কারণেই, যদি একজন কবি অপর-একজন সমসাময়িক কবির সমালোচক হয়ে দাঁড়ান, তা হলে তাঁর নিকট কবি এবং কাবের ভেদবুদ্ধিটি নষ্ট হওয়া অতি সহজ। ܘ দ্বিজেন্দ্রবাবু শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা হতে দুনীতির যে প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, তা হাস্যরসাত্মক না হোক, হাস্যকর বটে। “কোন যামিনী না যেতে জাগালে ন’- এ কথাটা ভারতবাসীর পক্ষে যে অপ্রীতিকর, তা আমি স্বীকার করতে বাধ্য ; কেননা, যামিনী গেলেও আমরা জাগবার বিপক্ষে। আমরা শুধু রাতে নয় অষ্টপ্রহর ঘুমতে চাই । সুতরাং যদি কেউ অন্ধকারের মধ্যেই চোখ খোলবার পক্ষপাতী হন, তা হলে তার উপর বিরক্ত হওয়া আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক। সে যাই হোক, ও গানটিতে বঙ্গসাহিত্যের যে কী অমঙ্গল ঘটেছে, তা আমি বুঝতে পারলুম না। এ দেশের কাব্য রাজ্যে অভিসার বহুকাল হতে প্ৰচলিত আছে। রাধিকার নামে বেনামি করলে ও কবিতাটি সম্বন্ধে দ্বিজেন্দ্ৰবাবুর বোধ হয় আর কোনো আপত্তি থাকত না। আমরা যে নাম-জিনিসটির এতটা অধীন হয়ে পড়েছি, সেটা আমাদের পক্ষে মোটেই শ্লাঘার বিষয় নয়। আর যদি দ্বিজেন্দ্রবাবুর মতে ও গানটি ভদ্রসমাজে অশ্রাব্য হয়, তা হলে সেটির প্যারডি করে তিনি কি তাকে এতই সুশ্রাব্য করে তুলেছেন যে, সেটি রঙ্গালয়ে চীৎকার করে না গাইলে আর সমাজ উদ্ধার হয় না ? দ্বিজেন্দ্রবাবু যেমন বিলেতি নজিরের বলে চাবুকা-চাবুকি বঙ্গসাহিত্যে প্ৰচলিত করতে চেয়েছেন, তেমনি তিনি আমাদের সাহিত্যে বিলেতি puritanism-এর ভূত নামাতে চান। ভারতবর্ষীয় সাহিত্যের অনেক ক্ৰটি আছে, কিন্তু puritanism-নামক ন্যাকামি এবং গোঁড়ামি হতে এদেশীয় সাহিত্য চিরকালই মুক্ত ছিল। দ্বিজেন্দ্রবাবুর মত যদি আমাদের গ্রাহ করতে হয়, তা হলে অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত' থেকে শুরু করে জয়দেবের গীতগোবিন্দ’ পর্যন্ত অন্তত হাজার বৎসরের সংস্কৃতকাব্যসকল আমাদের অগ্ৰাহ করতে হবে ; একখানিও টিকবে না। তার পর বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস থেকে আরম্ভ করে ভারতচন্দ্ৰ পৰ্যন্ত সকল কবির সকল গ্ৰন্থই আমাদের অস্পৃশ্য হয়ে উঠবে ; একখানিও বাদ যাবে না। যারা রবীন্দ্রবাবুর সরস্বতীর গাত্রে কোথায় কী তিল আছে তাই খুজে বেড়ান, তারা যে ভারতবর্ষের পূর্বকবিদের সরস্বতীকে কী করে তুষারগৌরীরূপে দেখেন, তা আমার পক্ষে একেবারেই দুর্বোধা । শেষ কথা, puritanism-এর হিসেব থেকে স্বয়ং দ্বিজেন্দ্রবাবুও কিছু কম অপরাধী নন। BD sBBDSBDB DDSDDB DBBSYSS SDBDSSLLL LLLL LllL JB SDD হবে, এ আশা যদি তিনি করে থাকেন, তা হলে সে আশা সফল হবে না । Svya