বেতালপঞ্চবিংশতি/ঊনবিংশ উপাখ্যান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ঊনবিংশ উপাখ্যান

 

 বেতাল কহিল মহারাজ

 চিত্রকূট নগরে রূপদত্ত নামে রাজা ছিলেন। তিনি এক দিন একাকী অশ্বারোহণ করিয়া মৃগয়ায় গমন করিলেন। মৃগের অন্বেষণে ইতস্ততঃ অনেক ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে তিনি এক ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। তথায় এক পরম রমণীয় সরোবর ছিল তাহার তীরে গিয়া দেখিলেন কমল সকল প্রফুল্ল হইয়া আছে মধুকরেরা মধুপানে মত্ত হইয়া কমল হইতে কমলান্তরে ভ্রমণ করত গুন্‌ গুন্‌ রবে গান করিতেছে হংস সারস চক্রবাক প্রভৃতি জলবিহঙ্গমগণ তাহার তীরে ও নীরে বিহার করিতেছে চারি দিকে কিসলয়কুসুমসুশোভিত নানাবিধ পাদপসমূহ বসন্তলক্ষ্মীর সৌভাগ্য বিস্তার করিতেছে সর্ব্বতঃ শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন্দ সঞ্চার হইতেছে। রাজা মৃগয়াব্যাপারে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত ছিলেন বৃক্ষমূলে অশ্ব বন্ধন করিয়া তথায় উপবেশনপূর্ব্বক শ্রান্তি দূর করিতে লাগিলেন।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরে এক ঋষিকন্যা আসিয়া সেই সরোবরে স্নান করিতে অবতীর্ণ হইল। রাজা দর্শনমাত্র হতজ্ঞান হইলেন। স্নানবিধি সমাপন করিয়া ঋষিতনয়া আশ্রমাভিমুখী হইলে রাজা তাহার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া কহিলেন ঋষিকন্যে তোমার এ কেমন ধর্ম্ম। আমি আতপে তাপিত হইয়া বিশ্রামার্থে তোমার আশ্রমে অতিথি হইলাম। তুমি এমনই আতিথেয়ী যে এক বার সম্ভাষণ দ্বারাও আমার সৎকার করিলে না। ঋষিকন্যা শুনিয়া দণ্ডায়মান হইলেন।

 এই অবসরে ঋষিও বনান্তর হইতে ফল পুষ্প ও কুশ সমিধ আহরণ করিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। রাজা দর্শনমাত্র আত্মপরিচয় প্রদানপূর্ব্বক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলে ঋষি অভীষ্টসিদ্ধির্ভবতু বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন। রাজা আশীর্বাদ শ্রবণে মনে মনে দুষ্ট অভিসন্ধি করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিলেন মহাশয় আমি শুনিয়াছি কালত্রয়ে ঋষিবাক্য অন্যথা হয় না। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করিলেন আমার অভিলাষ পূর্ণ হইবেক কিন্তু আমি তাহার কোন সম্ভাবনা দেখিতেছি না। ঋষি কহিলেন আমি কহিতেছি অবশ্যই তোমার অভিলাষ পূর্ণ হইবেক। তখন রাজা অম্লান মুখে কহিলেন আমি এই কন্যার করগ্রহণের অভিলাষ করিয়াছি।

 ঋষি রাজার দুষ্ট অভিপ্রায়ে মনে মনে কুপিত হইয়াও আপন আশীর্বাদ যথার্থ করিবার নিমিত্ত রাজাকে কন্যা সম্প্রদান করিলেন। রাজা নবপ্রণয়িনীকে সমভিব্যাহারিণী করিয়া রাজধানী প্রতি চলিলেন। কিয়ৎ দূরে গিয়া রজনী উপস্থিত হইল। রাজা ও রাজপ্রেয়সী যথাসম্ভব ফলমূলাদি দ্বারা কথঞ্চিৎ ক্ষুধানিবৃত্তি করিয়া তৰুতলে শয়ন করিলেন।

 অর্দ্ধরাত্র সময়ে এক দুর্দান্ত রাক্ষস আসিয়া রাজাকে জাগরিত করিয়া কহিল আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত্ত হইয়া আসিয়াছি তোমার ভার্য্যাকে ভক্ষণ করিব। রাজা কহিলেন তুমি আমার প্রাণাধিকা প্রেয়সীকে পরিত্যাগ কর অন্য যাহা প্রার্থনা করিবে তাহাই আনিয়া দিব। তখন রাক্ষস কহিল যদি তুমি প্রশস্ত মনে স্বহস্তে দ্বাদশবর্ষীয় ব্রাহ্মণকুমারের মস্তকচ্ছেদন করিয়া আমার হস্তে দিতে পার তাহা হইলে আমি তোমার প্রিয়তমাকে পরিত্যাগ করি। রাজা প্রিয়তমার প্রাণরক্ষার্থে ব্রহ্মহত্যাতেও সম্মত হইলেন এবং কহিলেন তুমি সপ্তম দিবসে আমার রাজধানীতে যাইবে আমি তোমার প্রার্থিত বস্তু প্রদান করিব।

 এই রূপে রাজাকে ব্রহ্মধধপ্রতিজ্ঞায় বদ্ধ করিয়া রাক্ষস প্রস্থান করিল। রাজাও প্রভাত হইবামাত্র প্রেয়সীসমভিব্যাহারে রাজধানীতে আসিয়া প্রধান মন্ত্রীর সমক্ষে রাক্ষসবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। মন্ত্রী কহিল মহারাজ আপনি উৎকণ্ঠিত হইবেন না আমি অনায়াসে এই বিষয় সম্পন্ন করিয়া দিব। রাজা মন্ত্রিবাক্যে নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া নব প্রণয়িনীর সহিত পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

 মন্ত্রী এক পুৰুষপ্রমাণ কাঞ্চনময়ী প্রতিমা নির্মাণ করাইয়া রত্নালঙ্কারে মণ্ডিত করিয়া নগরের চতুষ্পথে স্থাপন করিলেন এবং প্রচার করিয়া দিলেন যে ব্রাহ্মণ বলিদানার্থে দ্বাদশবর্ষীয় পুত্ত্র প্রদান করিবেন তিনি এই প্রতিমা প্রাপ্ত হইবেন।

 নগরবাসী এক অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণের দ্বাদশবর্ষীয় পুত্ত্র ছিল। ব্রাহ্মণ ঘোষণার বিষয় অবগত হইয়া ব্রাহ্মণীর নিকট কহিলেন দেখ নির্দ্ধন ব্যক্তির সংসারাশ্রমে বাস করা বিড়ম্বনামাত্র। ধনই ধর্ম্ম ও সুখের মূল। আমি জন্মদরিদ্র। চির কালের মধ্যে সাংসারিক কোন সুখের মুখ দেখিতে পাইলাম না। এক্ষণে ধনাগমের এই এক সহজ উপায় উপস্থিত। যদি তুমি মত কর পুত্ত্র দিয়া স্বর্ণময়ী প্রতিমা লইয়া আসি তাহা হইলে পরম সুখে কালযাপন করিতে পারিব।

 ব্রাহ্মণী সম্মতা হইলেন। ব্রাহ্মণ পুত্ত্র দিয়া প্রতিমা লইয়া তদ্বিক্রয় দ্বারা ধনসংগ্রহ করিলেন। সপ্তম দিবস প্রত্যূষ সময়ে রাক্ষস সভায় আসিয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবামাত্র মন্ত্রী দ্বাদশবর্ষীয় ব্রাহ্মণবালক ও তীক্ষ্ণধার খড়্গ আনিয়া রাজার সম্মুখে রাখিল। অনন্তর রাজা শিরশ্ছেদনার্থে খড়্গ উদ্যত করিলে ব্রাহ্মণবালক অধোমুখে ঈষৎ হাস্য করিল। রাজা অম্লান মুখে তাহার মস্তকচ্ছেদন করিয়া রাক্ষসের হস্তে সমর্পণ করিলেন।

 ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ মৃত্যুসময়ে সকলেই রোদন করিয়া থাকে বালক হাস্য করিল কেন বল। রাজা কহিলেন বাল্যকালে পিতা মাতা প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তৎপরে কোন বিপদ্‌ ঘটিলে রাজা রক্ষা করিয়া থাকেন। কিন্তু আমার ভাগ্য সকলই বিপরীত হইল। পিতা মাতা অর্থলোভে বিক্রয় করিলেন এবং প্রাণভয়ে যে রাজার শরণাগত হইব তিনিই স্বয়ং মস্তকচ্ছেদনে উদ্যত। মনে মনে এই আলোচনা করিয়া সে হাস্য করিয়াছিল।

 ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।