বেতালপঞ্চবিংশতি/একাদশ উপাখ্যান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


একাদশ উপাখ্যান

 

বেতাল কহিল মহারাজ

পুণ্যপুর নগরে বল্লভ নামে প্রজাবল্লভ নরপতি ছিলেন। তাঁহার অমাত্যের নাম সত্যপ্রকাশ। এক দিবস রাজা সত্যপ্রকাশের নিকট কহিলেন দেখ যে ব্যক্তি রাজ্যেশ্বর হইয়া অভিলাষানুরূপ বিষয়ভোগ না করে তাহার রাজ্য ক্লেশপ্রপঞ্চমাত্র। অতএব অদ্যাবধি আমি ইচ্ছানুরূপ সুখ সম্ভোগে প্রবৃত্ত হইলাম তুমি সমস্ত রাজকার্য্যের ভার লইয়া আমাকে অবসর দাও। ইহা কহিয়া অমাত্যহস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পণ করিয়া রাজা ভোগসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

সত্যপ্রকাশ অগত্যা রাজপ্রস্তাবে সম্মত হইলেন কিন্তু স্বতন্ত্র রাজতন্ত্রনির্বাহ ও অহর্নিশ দুরবগাহনীভিশাস্ত্রপর্য্যালোচনা দ্বারা একান্ত ক্লান্ত হইতে লাগিলেন।

এক দিবস অমাত্য আপন ভবনে উৎকণ্ঠিত মনে নির্জনে বসিয়া আছেন এই অবসরে তাঁহার গৃহলক্ষ্মী লক্ষ্মীনাম্নী পত্নী তথায় উপস্থিত হইয়া স্বামীকে বিষণ্ণ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল এখন তোমাকে কি নিমিত্তে সর্ব্বদা উৎকণ্ঠিত দেখি এবং কি নিমিত্তেই বা তুমি দিন দিন দুর্বল হইতেছ। তিনি কহিলেন রাজা আমার প্রতি সমুদায় ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া ভোগসুখে কালযাপন করিতেছেন। আমি তাঁহার আদেশানুসারে ইদানীং সমস্ত রাজকার্য্য নির্বাহ করিতেছি এবং রাজ্যের নানাবিষয়িনী উৎকট চিন্তা দ্বারা এরূপ দুর্বল হইতেছি। তখন তাঁহার পত্নী কহিল তুমি অনেক দিন রাজকার্য্য করিলে এক্ষণে রাজার নিকট কিছু দিনের অবকাশ লইয়া নিশ্চিন্ত হইয়া তীর্থপর্য্যটন কর।

সত্যপ্রকাশ সহধর্ম্মিণীর উপদেশানুসারে রাজসমীপে আবেদন করিয়া বিদায় লইয়া তীর্থভ্রমণে নির্গত হইলেন। ক্রমে ক্রমে সমস্ত তীর্থ দর্শন করিয়া পরিশেষে তিনি সেরুবন্ধরামেশ্বরে উপস্থিত হইলেন। তথায় সূর্য্যবংশাবতংস শ্রীরামচন্দ্রপ্রতিষ্ঠিত দেবাদিদেব মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশপূর্ব্বক দর্শনবন্দনাদি করিয়া নির্গত হইয়া সমুদ্রে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র প্রবাহমধ্য হইতে এক স্বর্ণময় অদ্ভুত মহীরুহ বহির্গত হইল। দেখিলেন তদুপরি এক পরম সুন্দরী নায়িকা হস্তে বীণা লইয়া মধূর কোমল তানলয়বিশুদ্ধ স্বরসংযোগে সঙ্গীত করিতেছে। সত্যপ্রকাশ বিস্ময়াবিষ্ট ও অনন্যদৃষ্টি হইয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে ঐ অদ্ভুত তরু প্রবাহমধ্যে বিলীন হইল।

এইরূপ অঘটনঘটনা সন্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া সত্যপ্রকাশ ত্বরায় স্বদেশে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক রাজসমীপে কৃতাঞ্জলি হইয়া আবেদন করিলেন মহারাজ আমি এক আশ্চর্য্য দর্শন করিয়াছি কিন্তু বর্ণনা করিলে তাহাতে কোন প্রকারেই অন্যের বিশ্বাস জন্মাইতে পারিব না। প্রাচীন পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন যে বিষয় কাহারও বুদ্ধিগম্য ও বিশ্বাসযোগ্য না হয় তাহা কদাপি বর্ণন করিবেক না করিলে উপহাসাস্পদ হয়। কিন্তু মহারাজ আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি এই নিমিত্ত নিবেদন করিতেছি যে স্থানে ত্রেতাবতার ভগবান্‌ রামচন্দ্র দশাননবংশধ্বংসবিধানোদ্যোগে মহাকায়মহাবলকপিবলযাহায্যে শতযোজনবিস্তীর্ণ অর্ণবোপরি লোকাতীতকীর্ত্তিহেতু সেতু সঙ্ঘটন করিয়াছিলেন তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম উত্তালতরঙ্গমালাসঙ্কুল কল্লোলিনীবল্লভপ্রবাহমধ্য হইতে অকস্মাৎ এক স্বর্ণময় বৃক্ষ নির্গত হইল। তদুপরি এক পরম সুন্দরী কন্যা বীনাবাদনপূর্ব্বক আমি আপনকার নিকট সংবাদ দিতে আসিয়াছি।

রাজা শ্রবণমাত্র অতিমাত্র কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া পুনর্বার সত্যপ্রকাশের হস্তে রাজ্যভার প্রদানপূর্ব্বক সেতুবন্ধরামেশ্বরে উপস্থিত হইলেন। পরিশেষে নিরূপিত সময়ে মহাদেবের পূজা করিয়া মন্দির হইতে নির্গত হইয়া সত্যপ্রকাশের বর্ণনানুরূপ ভূরুহ নিরীক্ষণ করিলেন এবং সেই সকললোকললামভূতা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরীর সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে বিমূঢ় ও পূর্ব্বাপর পর্য্যালোচনাপরিশূন্য হইয়া ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক ঐ বৃক্ষের উপরি আরোহণ করিলেন বৃক্ষও রাজাকে লইয়া তৎক্ষণাৎ পাতালপুর প্রবিষ্ট হইল।

অনন্তর সেই কন্যা রাজার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল অহে বীরপুরুষ তুমি কে কি অভিপ্রায়ে এ স্থানে আগমন করিলে বল। তিনি কহিলেন আমি পুন্যপুরের রাজা নাম বল্লভ তোমার সৌন্দর্য্য ও সৌকুমার্য্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া আসিয়াছি। কন্যা কহিল আমি তোমার সাহসে সন্তুষ্ট হইয়াছি। যদি তুমি কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশীতে আমার সহিত সর্ব্বপ্রকার সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিতে পার তাহা হইলে আমি তোমাকে বিবাহ করি। রাজা শুনিয়া আনন্দপ্রবাহে মগ্ন ও তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। তৎপরে সে রাজাকে এই নিয়ম রক্ষার্থে পুনর্বার প্রতিজ্ঞারূঢ় করিয়া গান্ধর্ব্ব বিধান দ্বারা আপন প্রতিজ্ঞা সম্পন্ন করিল। রাজা পরম কৌতুকে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

কৃষ্ণ চতুর্দশী উপস্থিত হইল। কন্যা সাতিশয় আগ্রহ ও ব্যগ্রতা প্রদর্শন পূর্ব্বক রাজাকে নিকটে থাকিতে নিষেধ করিলে তিনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞা অনুসারে তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপসৃত হইলেন। কিন্তু কি কারণে পূর্ব্বে বচনবদ্ধ করিয়াছিল এবং এক্ষণে এতাদৃশ আগ্রহ ও ব্যগ্রতা প্রদর্শন পূর্ব্বক পুনরায় নিষেধ করিল যাবৎ ইহার সবিশেষ অবগত না হইব তাবৎ আমার অন্তঃকরণে এক বিষম সংশয় থাকিবেক। অতএব ইহার অনুসন্ধান করা আবশ্যক। এই বলিয়া কৌতুহলাকুলিত চিত্তে অন্তরালে থাকিয়া অবলোকন করিতে লাগিলেন।

অর্দ্ধরাত্রসময়ে সহসা এক রাক্ষস আসিয়া কন্যার অঙ্গে করার্পণ করিল। রাজা তর্দর্শনে একান্ত অসহমান হইয়া করতলে করাল করবাল ধারণপূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হইলেন এবং অশেষপ্রকার তিরস্কার করিয়া কহিলেন অরে দুরাচার রাক্ষস তুই আমার সমক্ষে প্রিয়তমার অঙ্গে হস্তার্পণ করিস না। যাবৎ তোরে না দেখিয়াছিলাম তাবৎ অন্তঃকরণে ভয় ছিল এক্ষণে দেখিয়া নির্ভয় হইয়াছি এবং তোর প্রাণদণ্ড করিতে আসিয়াছি। এই বলিয়া খড়্গপ্রহার দ্বারা তাহার শিরশ্ছেদ করিলেন। তখন কন্যা অকৃত্রিম সন্তোষ প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিল তুমি দুর্দান্ত রাক্ষসের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া আমারে জীবনদান করিলে। আমি এত দিম কি পর্য্যন্ত যন্ত্রণাভোগ করিয়াছি বর্ণনা করিতে পারি না।

রাজা জিজ্ঞাসিলেন সুন্দরি কি কারণে তুমি এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত এই দারুণ দৈবদুর্বিপাকগ্রস্ত ছিলে বল।

সে কহিল মহারাজ শ্রবণ কর আমি বিদ্যাধরনামক গন্ধর্ব্বরাজের কন্যা। নাম রত্নমঞ্জরী। ভোজনকালে আমি নিকটে উপবিষ্ট না থাকিলে পিতার তৃপ্তি হইত না। এজন্য নিত্যই ভোজনসময়ে তাঁহার সন্নিহিত থাকিতাম। এক দিন বাল্যখেলায় আসক্ত হইয়া ভোজনবেলায় গৃহে উপস্থিত ছিলাম না। পিতা আমার অপেক্ষায় বুভুক্ষায় কাতর হইয়া ক্রোধভরে এই শাপ দিলেন অদ্যাবধি তুমি রসাতলবাসিনী হইবে এবং কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশীতে এক রাক্ষস আসিয়া অশেষপ্রকার যন্ত্রণা দিবে। আমি শুনিয়া অত্যন্ত কাতর হইলাম এবং পিতার চরণে ধরিয়া বহুবিধ স্তুতি ও বিনীতি করিয়া নিবেদন করিলাম পিতঃ আমার দূরদৃষ্টক্রমে সামান্য অপরাধে গুরু দণ্ড বিধান করিলেন। এক্ষণে কৃপা করিয়া শাপমোচনের কোন উপায় করিয়া দেন নতুবা কত কাল যন্ত্রণাভোগ করিব। ইহা কহিয়া আমি রোদন করিতে লাগিলাম। তখন তিনি পূর্ব্বার্জ্জিত স্নেহরসের সহায়তা দ্বারা আমার বিনয়ের বশীভূত হইয়া কহিলেন এক মহাবল পরাক্রান্ত বীরপুরুষ আসিয়া সেই রাক্ষসের প্রাণদণ্ড করিলে তোমার শাপমোচন হইবেক। আমি সেই শাপানুসারে এই পাপাবিষ্ট ছিলাম। বহু দিনের পর তুমি আমাকে মুক্ত করিলে। এক্ষণে অনুমতি কর পিতৃদর্শনে যাই।

রাজা কহিলেন যদি তুমি উপকার স্বীকার কর তবে প্রথমে এক বার আমার ধাজধানীতে চল পরে পিতৃদর্শনে যাইবে। রত্নমঞ্জরী মহোপকারকের নিকট অবশ্যকর্ত্তব্য কৃতজ্ঞতাস্বীকারের অন্যথাভাবে অধর্ম্ম জানিয়া রাজার প্রার্থনায় সম্মত হইলে তিনি তাহাকে সমভিব্যাহারে লইয়া রাজধানীতে উপস্থিত হইলেন এবং কিয়ৎ কাল তৎসহবাসে বিষয়রসে কালযাপন করিয়া পরিশেষে অনিচ্ছাপূর্ব্বক তাহাকে পিতৃদর্শনে যাইতে অনুমতি করিলেন। তখন রত্নমঞ্জরী কহিল মহারাজ বহু কাল মনুষ্যসহবাস দ্বারা আমার গন্ধর্ব্বত্ব গিয়াছে এখন মনুষ্যভাবাপন্ন হইয়াছি। পিতা আমার গন্ধর্ব্বপতি এক্ষণে তাঁহার নিকটে গিয়া সমুচিত আদর পাইব না। অতএব আর আমার তথায় যাইবে অভিলাষ নাই তোমার নিকটেই যাবজ্জীবন অবস্থিতি কবিব। রাজা শুনিয়া অতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন এবং রাজকার্য্য বিস্মরণপূর্ব্বক দিন যামিনী সেই কামিনীর সহিত বিষয়বাসনায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। এই সমস্ত ব্যাপার দর্শন করিয়া প্রধান অমাত্য সত্যপ্রকাশ প্রাণত্যাগ করিলেন।

ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ কি কারণে অমাত্য প্রাণত্যাগ করিলেন বল। বিক্রমাদিত্য কহিলেন মন্ত্রী বিবেচনা করিলেন রাজা বিষয়রসে আসক্ত হইয়া রাজ্যচিন্তা পরিত্যাগ করিলেন প্রজা অনাথ হইল। এক্ষণে আর কোন ব্যক্তিই আমার প্রতি সমুচিত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিবেক না। অহোরাত্র এই বিষম চিন্তাবিষ শরীরে প্রবিষ্ট হওয়াতে সত্যপ্রকাশের প্রাণবিয়োগ হইল।

ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।