বেতালপঞ্চবিংশতি/তৃতীয় উপাখ্যান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


তৃতীয় উপাখ্যান

 

বেতাল কহিল মহারাজ

বর্দ্ধমান নগরে রূপসেন নামে অতি বিজ্ঞ গুণগ্রাহী পরম ধার্ম্মিক দয়ালু রাজা ছিলেন। এক দিবস দক্ষিণদেশনিবাসী বীরবরনামা রাজপুত কর্ম্মপ্রাপ্তির আশয়ে রাজদ্বারে উপস্থিত হইল। দ্বারবান্‌ তাহার প্রমুখাৎ সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া রাজসমীপে বিজ্ঞাপন করিল মহারাজ বীরবর নামে এক অস্ত্রধারী পুরুষ কর্ম্মের প্রার্থনায় আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছে। আজ্ঞা পাইলে সাক্ষাৎকারে আসিয়া বিশেষ রূপে আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। রাজা আজ্ঞা করিলেন অবিলম্বে লইয়া আইস।

অনন্তর রাজাজ্ঞা অনুসারে দ্বারী বীরবরকে নরপতিগোচরে উপস্থিত করিলে রাজা তাহার আকার প্রকার দর্শনে কর্ম্মঠ বোধ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন বীরবর কত বেতন পাইলে তোমার অনায়াসে নির্বাহ হইতে পারে। বীরবর নিবেদন করিল মহারাজ প্রত্যহ সহস্রস্বর্ণমুদ্রাপ্রদানের আদেশ হইলেই আমার চলিতে পারে। রাজা জিজ্ঞাসিলেন তোমার পরিবার কত। সে কহিল মহারাজ এক স্ত্রী এক পুত্ত্র ও এক কন্যা আর স্বয়ং এই চারি এতদ্বতিরিক্ত আর আমার পরিবার নাই। রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন ইহার পরিজন অতি অল্প তথাপি কি নিমিত্ত এত অধিক প্রার্থনা করে। যাহা হউক এক ভৃত্যের নিমিত্ত নিত্য নিত্য এতাদৃশ ব্যয় যুক্তিসিদ্ধ নহে। অথবা এ অর্থব্যয় ব্যর্থ হইবেক না অবশ্যই ইহার কোন বিশেষ গুণ থাকিবেক। অতএব কিয়ৎ কালের নিমিত্তে রাখিয়া ইহার গুণ পরীক্ষা করা উচিত। অনন্তর কোষাধ্যক্ষকে আহ্বান করিয়া আজ্ঞা দিলেন তুমি প্রতিদিন প্রাতঃকালে বীরবয়কে সহস্র সুবর্ণ দিবে কোন মতে অন্যথা না হয়।

বীরবর রাজাজ্ঞাশ্রবণে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া ধন্যবাদ করিতে লাগিল এবং কোষাধ্যক্ষের নিকট হইতে তদ্দিবসপ্রাপ্য নির্দ্ধারিত সুবর্ণ গ্রহণপূর্ব্বক নৃপনির্দিষ্ট বাসস্থানে গমন করিল। তথায় উপস্থিত হইয়া প্রথমতঃ সেই স্বর্ণকে ভাগদ্বয়ে বিভক্ত করিয়া এক ভাগ বিপ্রসাৎ করিল অবশিষ্ট ভাগ পুনর্বার দ্বিভাগ করিয়া এক অর্দ্ধ বৈরাগী বৈষ্ণব সন্ন্যাসী প্রভৃতিকে দিল অন্য অর্দ্ধ দ্বারা নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ করিয়া শত শত দীন দুঃখী অনাথ প্রভৃতিকে যথোচিত ভোজন করাইয়া অবশিষ্ট যৎকিঞ্চিৎ স্বয়ং পুত্ত্র কলত্র ও দুহিতার সহিও আহার করিল।

প্রতিদিন এই রূপে দিনপাত করিয়া সায়ংকালে বর্ম্ম ও খড়্গ চর্ম্ম ধারণপূর্ব্বক সমস্ত রজনী রাজদ্বারে উপস্থিত থাকে। রাজা তাহার শক্তি ও প্রভুভক্তি পরীক্ষার্থে কি দ্বিপ্রহর কি তৃতীয় প্রহর রাত্রি যখন যাহা আজ্ঞা করেন অতি দুঃসাধ্য হইলেও সে তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পন্ন করিয়া আইসে।

এক দিবস নিশীথ সময়ে অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের রোদনধ্বনি শুনিয়া রাজা বীরবরকে আহ্বান করিলে সে তৎক্ষণাৎ সম্মুখবর্ত্তী হইয়া কহিল মহারাজ কি আজ্ঞা হয়। রাজা কহিলেন দক্ষিণ দিকে স্ত্রীলোকের ক্রন্দনশব্দ শুনা যাইতেছে ত্বরায় ইহার তথ্যানুসন্ধান করিয়া আমাকে সংবাদ দাও। বীরবর যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিল। রাজা বীরবরকে এক মুহূর্ত্তের নিমিত্তেও আজ্ঞাপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ না দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং তাহার সাহস দেখিবার নিমিত্ত আপনিও গুপ্ত ভাবে পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।

বীরবর সেই রোদনশব্দ লক্ষ্য করিয়া অতি প্রসিদ্ধ এক ভয়ঙ্কর শ্মশানে উপস্থিত হইল। দেখিল এক সর্ব্বালঙ্কারভূষিতা পরম সুন্দরী স্ত্রী শিরে করাঘাত ও হাহাকার করিয়া উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতেছে। বীরবর দেখিয়া অতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইল এবং সাহসপূর্ব্বক সম্মুখবর্ত্তী হইয়া জিজ্ঞাসিল তুমি কে কি দুঃখে এই ঘোর রজনীতে একাকিনী শ্মশানবাসিনী হইয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছ। সে কিছুই উত্তর দিল না বরং পূর্ব্ব অপেক্ষায় অধিক রোদন করিতে লাগিল। অনন্তর বীরবর বিশেষ ব্যগ্রতা প্রদর্শনপূর্ব্বক বারংবার জিজ্ঞাসিতে লাগিল। সে কহিল আমি রাজলক্ষ্মী রাজা রূপসেনের গৃহে নানা অন্যায় ও অলক্ষ্মীর হইতেছে; তৎপ্রযুক্ত তদীয় আবাসে অচিরাৎ অলক্ষ্মীর প্রবেশ হইবেক। সুতরাং আমি রাজার রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া যাইব। আমি প্রস্থান করিলে পর অল্প দিনের মধ্যেই রাজার প্রাণবিয়োগ হইবেক সেই দুঃখে দুঃখিতা হইয়া রোদন করিতেছি।

প্রভুর এইরূপ অসম্ভাবিত ভাবী অমঙ্গল শ্রবণে বিষাদসমুদ্রে মগ্ন হইয়া বীরবর কহিল দেবি আপনি যে আজ্ঞা করিলেন তাহাতে কোন ক্রমেই সন্দেহ করিতে পারি না। কিন্তু যদি কোন উপায় থাকে বলুন আমি রাজার মঙ্গলের নিমিত্ত প্রাণান্ত পর্য্যন্ত স্বীকার করিতে প্রস্তুত আছি। রাজলক্ষ্মী কহিলেন পূর্ব্ব দিকে যোজনান্তে এক দেবী আছেন। যদি কেহ ঐ দেবীর নিকটে আপন পুত্ত্রকে স্বহস্তে বলিদান দেয় তবে তিনি প্রসন্না হইয়া রাজার সমস্ত বিঘ্ন বিনাশ করিতে পারেন।

রাজলক্ষ্মীর এইরূপ বাক্য শুনিয়া বীরবর সত্বর গৃহাভিমুখে গমন করিল। রাজাও কৌতুকাবিষ্ট হইয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। বীরবর গৃহে উপস্থিত হইয়া আপন পত্নীকে জাগরিত করিয়া সমস্ত জ্ঞাত করিলে সে তৎক্ষণাৎ পুত্ত্রের নিদ্রাভঙ্গ করিয়া কহিল বৎস তোমার মস্তক দিলে রাজার অচল রাজ্য হয়। তখন পুত্ত্র কহিল হে মাতঃ প্রথমতঃ আপনকার আজ্ঞা দ্বিতীয়তঃ স্বামিকার্য্য তৃতীয়তঃ পাঞ্চভৌতিক বিনশ্বর দেহ দেখসেবায় নিয়োজিত হইবেক। ইহা অপেক্ষা আমার প্রাণত্যাগের উত্তম সময় আর ঘটিবেক না। অতএব শুভ কর্ম্মে বিলম্ব করা কর্ত্তব্য নহে। আপনারা সত্বর হইয়া কার্য্য সম্পাদন করুন।

বীরবর পুত্ত্রের এইরূপ পরমাদ্ভুত বাক্য শ্রবণে বিস্ময়া পন্ন হইয়া অশ্রুমুখে সহধর্ম্মিণীকে কহিল যদি তুমি সচ্ছন্দ মনে পুত্ত্র প্রদান কর তবেই আমি দেবীর নিকট বলিদান দিয়া রাজকার্য্য নিষ্পাদন করি। এইরূপ স্বামিবাক্য শ্রবণানন্তর বীরবরের ভার্য্যা আবেদন করিল নাথ ধর্ম্মশাস্ত্রে কহে স্বামী মূক বধির পঙ্গু অন্ধ কাণ খঞ্জ কুব্জ কুষ্ঠী যেরূপ হউন তাঁহাকে সন্তুষ্ট রাখিতে পারিলে নারী যেরূপ চরিতার্থতা প্রাপ্ত হয় শাস্ত্রবিহিত দান ধ্যান ব্রত তপস্যাদি দ্বারা তাদৃশ হয় না। আর যদি স্বামীর প্রতি অনাদর করিয়া পারলৌকিক সুখসম্ভোগ লেভে নানা ধর্ম্ম কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে তাহার সে সকল নিষ্ফল ও অন্তে অধোগতির কারণ হয়। অতএব আমার পুত্ত্র পৌত্রে প্রয়োজন কি তোমার চরণশুশ্রূষা করিলেই উভয় লোকে নিস্তার পাইব। তাহার পুত্ত্র কহিল হে পিতঃ যে ব্যক্তি স্বামিকার্য্যসম্পাদনে সমর্থ তাহারই জন্ম সার্থক এবং সেই স্বর্গলোকে অনন্ত কাল সুখসম্ভোভ করে। অতএব আর কি নিমিত্তে সংশয়ে কালহরণ করিতেছেন কার্য্যসাধনে তৎপর হউন। বিলম্বে কার্য্যহানিসম্ভাবনা।

ইত্যাকার নানাপ্রকার কথোপকথনান্তে বীরবর সপরিবারে দেবীর মন্দিরোদ্দেশে গমন করিল। রাজা এই রূপে বীরবরের সপরিবারের প্রভুভক্তির প্রবলতা ও অচলতা দেখিয়া অত্যন্ত চমৎকৃত ও আহ্লাদিত হইলেন এবং মনে মনে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদানপূর্ব্বক গুপ্ত ভাবে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে বীরবর দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইল এবং গন্ধ পুষ্প ধূপ দীপ নৈবেদ্য আদি নানা উপচার দ্বারা যথাবিধি পূজা করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত পূর্ব্বক দেবীর সম্মুখে কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল হে জগদীশ্বরি তোমাকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত আমি প্রাণাধিকপ্রিয় পুত্ত্রকে স্বহস্তে বলিদান দিতেছি। কৃপা কর যেন আমার প্রভুর দীর্ঘ আয়ুঃ ও অচল রাজ্য হয়।

এই বলিয়া খড়্গ লইয়া বীরবর অকাতরে পুত্ত্রের মস্তকচ্ছেদন করিল। বীরবরের কন্যা এই রূপে জীবিতাধিক সহোদরের প্রাণবিয়োগ দেখিয়া খড়্গপ্রহার দ্বারা প্রাণত্যাগ করিল। তাহার পত্নীও শোকে অধীরা হইয়া তৎক্ষণাৎ তনয় তনয়ার অনুগামিনী হইল। তখন বীরবর বিবেচনা করিল প্রভুকার্য্য সম্পন্ন করিলাম। এক্ষণে আর কি নিমিত্ত দাসত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ থাকি আর কি সুখেই বা জীবন ধারণ করি। এই বলিয়া সেই বিষম খড়্গ দ্বারা স্বীয় শিরশ্ছেদন করিল।

এই রূপে ক্রমে ক্রমে চারি জনের অদ্ভুত মরণ দেখিয়া রাজার অন্তঃকরণে অত্যন্ত নির্বেদ উপস্থিত হইল। তখন তিনি কহিতে লাগিলেন যে রাজ্যের নিমিত্ত এতাদৃশ প্রভুভক্ত সেবকের সর্ব্বনাশ হইল আর আমি সেই বিষন রাজ্যের ভোগে প্রবৃত্ত হইব না। আমি অতিশয় স্বার্থপর। নতুবা কি নিমিত্ত বীরবরকে পুত্ত্রহত্যা হইতে নিবৃত্ত করিলাম না। কি নিমিত্তই বা তাহাকে আত্মঘাতী হইতে দিলাম। উপক্রমেই এই ঘোরতর অধ্যবসায় হইতে বীরবরকে বিরত করা আমার উচিত কর্ম্ম ছিল। সর্ব্বথা আমি অতি অসৎ কর্ম্ম করিয়াছি। এক্ষণে আত্মহত্যারূপ প্রায়শ্চিত্ত ব্যতীত চিত্তসন্তোষ জন্মিবেক না।

এই বলিয়া খড়্গ লইয়া মস্তকচ্ছেদনে উদ্যত হইবামাত্র ভগবতী কাত্যায়নী তৎক্ষণাৎ আবিভূতা হইয়া হস্তধারণপূর্ব্বক রাজাকে মরণব্যবসায় হইতে নিবৃত্ত করিলেন। কহিলেন বৎস তোমার সাহস দেখিয়া প্রসন্ন হইয়াছি অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর। রাজা কহিলেন মাতঃ যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন এই চারি জনের জীবন দান করুন। ইহা অপেক্ষা এক্ষণে আমার আর গুরুতর প্রার্থয়িতব্য নাই। দেবী তথাস্তু বলিয়া অবিলম্বে পাতল হইতে অমৃত আনয়নপূর্ব্বক তাহাদের গাত্রে সেচন করিবামাত্রে চারি জনেই তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় গাত্রোত্থান করিল। রাজা যথার্থ প্রভূভক্ত বীরবরকে অপত্য কলত্র সহিত পুনর্জীবিত দেখিয়া অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন এবং দেবীর চরণারবিন্দে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া নানাবিধ স্তুতি ও বিনতি করিতে লাগিলেন। পরিশেষে দেবী রাজাকে নানা অভিলষিত বর প্রদান দ্বারা চরিতার্থ করিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। অনন্তর তাঁহারা সকলেই স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।

পর দিন প্রভাত হইবামাত্র গাত্রোত্থান করিয়া রাজা রূপসেন সভাসমারোহণপূর্ব্বক সর্ব্বভাজনসমক্ষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রভুপরায়ণ বীরবরকে অর্দ্ধরাজ্যেশ্বর করিলেন। দেশে বিদেশে রাজা ও বীরবর উভয়ের নির্বিবাদ ধন্যবাদ হইল।

এই রূপে কথা সমাপ্ত করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ পূর্ব্বাপর সমস্ত শ্রবণ করিলে। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি কাহার ঔদার্য্য অধিক হইল। বিক্রমাদিত্য উত্তর দিলেন আমার বোধে রাজার ঔদার্য্য অধিক। বেতাল কহিল কেন। রাজা বলিলেন স্বামীর নিমিত্ত সর্ব্বনাশস্বীকার ও প্রাণদান করা সেবকের উচিত কর্ম্ম। অতএব বীরবর রাজকার্য্যার্থে ঈদৃশ সাহস প্রকাশ করিয়া আত্মধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়াছে। কিন্তু রাজা যে সেবকের নিমিত্ত রাজ্যাধিকার তৃণতুল্য বোধ করিয়া অনায়াসে প্রাণত্যাগে উদ্যত হইলেন ইহা কেবল দয়ার্দ্রচিত্ততা ও অকৃত্রিম ঔদার্য্যের কর্ম্ম।

ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।