বেতালপঞ্চবিংশতি/বিংশ উপাখ্যান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


বিংশ উপাখ্যান

 

 বেতাল কহিল মহারাজ

 বিশালপুর নগরে অর্থদত্ত নামে ধনাঢ্য বণিক্‌ ছিল। সে কমলপুরনিবাসী মদনদাস বণিকের সহিত আপন কন্যা অনঙ্গমঞ্জরীর বিবাহ দিয়াছিল। কিছু দিন পরে মদনদাস ভার্য্যাকে তাহার পিত্রালয়ে রাখিয়া বাণিজ্যার্থে দ্বীপান্তর প্রস্থান করিল।

 এক দিবস অনঙ্গমঞ্জরী গবাক্ষদ্বার দিয়া রাজপথ অবলোকন করিতেছে ঐ সময়ে কমলাকরনামক সুকুমার ব্রাহ্মণকুমার তথায় উপস্থিত হইল। উভয়ের নয়নে নয়নে আলিঙ্গন হইলে পরস্পর পরস্পরের রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত হইল। ব্রাহ্মণকুমার নিকাম ব্যাকুল হইয়া গৃহগমনপূর্ব্বক প্রিয় বয়স্যের নিকট স্বীয় বিরহবেদনা নিবেদন করিয়া বিচেতন ও শয্যাগত হইল। তাহার সখা উশীরানুলেপন চন্দনবারিসেচন সরসকমলদলশয়্যা ও জলাদ্রতালবৃন্তসঞ্চালন দ্বারা শুশ্রূষা করিতে লাগিল।

 এ দিকে অনঙ্গমঞ্জরীও অনঙ্গশরপ্রহারে জর্জ্জরিতাঙ্গী হইয়া ধরাশয্যা অবলম্বন করিলে তাহার সখী সবিশেষ জিজ্ঞাসা দ্বারা সমস্ত অবগত হইয়া প্রবোধদানচ্ছলে অনেক ভর্ৎসনা করিল। তখন সে কহিল সখি আমি নিতান্ত অবোধ নহি কিন্তু মন আমার প্রবোধ মানে না। নির্দয় কন্দর্পের নিরন্তর শরপ্রহারে আমি জর্জ্জরিত হইয়াছি। আর যাতনা সহ্য হয় না। যদি সেই চিত্তচোরকে ধরিয়া দিতে পার তাহা হইলেই প্রাণধারণ করিব নতুবা আত্মঘাতিনী হইব।

 ইহা কহিয়া অনঙ্গমঞ্জরী অশ্রুপূর্ণ নয়নে অত্যায়ত নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিল। তখন তাহার সহচরী কালবিলম্ব অনুচিত বিবেচনা করিয়া কমলাকরের আলয়ে গমনপূর্ব্বক তাহাকেও স্বীয় সহচরীর তুল্যাবস্থ দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিল দুরাত্মা কন্দর্পের কিছুই অসাধ্য নাই কি স্ত্রী কি পুরুষ সকলকেই সমান রূপে কুসুমময় শরাসনের আজ্ঞাকারী করিতে পারে। অনন্তর সে কমলাকরের নিকট কহিল অর্থদত্তশেঠের কন্যা অনঙ্গমঞ্জরী প্রার্থনা করিতেছে তুমি তাহার প্রাণদান কর। কমলাকর শুনিয়া তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান করিল এবং কহিল আপাততঃ তুমি এই অমৃতায়মান মনোহর বাক্য দ্বারা আমায় প্রাণদান করিলে।

 পরে সহচরী কমলাকরকে সমভিব্যাহারে লইয়া অনঙ্গমঞ্জরীর আবাসে উপস্থিত হইয়া দেখিল সে প্রাণত্যাগ করিয়াছে। অমনি কমলাকর হা প্রেয়সি বলিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন।

 অনঙ্গমঞ্জরীর গৃহজন এই সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া উভয়কে শ্মশানে লইয়া এক চিতায় অগ্নিদান করিল। দৈবযোগে অর্থদত্তের জামাতা মদনদাসও সেই সময়ে শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল এবং নিজ ভার্য্যা অনঙ্গমঞ্জরীর মৃত্যুবৃত্তান্ত শুনিয়া হাহাকার করিতে করিতে ঊর্দ্ধশ্বাসে শ্মশানে গিয়া জ্বলচ্চিতায় ঝম্পপ্রদানপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিল।

 ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই তিনের মধ্যে কোন্‌ ব্যক্তি অধিক ইন্দ্রিয়দাস। রাজা কহিলেন মদনদাস। বেতাল বলিল কেন। রাজা কহিলেন তাহার স্ত্রী পরপুরুষে অনুরাগিণী হইয়া বিরহে প্রাণত্যাগ করিল তাহাতে তাহার অন্তঃকরণে বিরাগ জন্মিল না। প্রত্যুত তাহার বিয়োগে প্রাণধারণ করিতে অসমর্থ হইয়া অগ্নিপ্রবেশ করিল।

 ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।