বৌ-ঠাকুরাণীর হাট/একবিংশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

একবিংশ পরিচ্ছেদ।

 বিধবা রুক্মিণীর (মঙ্গলার) কিঞ্চিৎ নগদ টাকা আছে। সেই টাকা খাটাইয়া সুদ লইয়া সে জীবিকা নির্ব্বাহ করে। রূপ এবং রূপা এই দুয়ের জোরে সে অনেককে বশে রাখিয়াছে। সীতারাম সৌখীন লােক, অথচ ঘরে এক পয়সার সংস্থান নাই, এইজন্য রুক্মিণীর রূপ ও রূপা উভয়ের প্রতিই তাহার আন্তরিক টান আছে। যে দিন ঘরে হাঁড়ি কাঁদিতেছে, সে দিন সীতারামকে দেখ, দিব্য নিশ্চিন্ত মুখে হাতে লাঠি লইয়া পাতলা চাদর উড়াইয়া বুক ফুলাইয়া রাস্তা দিয়া চলিতেছে, মঙ্গলার বাড়ি যাইবে। পথে যদি কেহ জিজ্ঞাসা করে, “কেমন হে সীতারাম, সংসার কেমন চলিতেছে?” সীতারাম তৎক্ষণাৎ অম্লানবদনে বলে, “বেশ চলিতেছে! কাল আমাদের ওখানে নিমন্ত্রণ রহিল!” সীতারামের বড় বড় কথাগুলা কিছুমাত্র কমে নাই, বরঞ্চ অবস্থা যতই মন্দ হইতেছে কথার পরিমাণ লম্বা ও চওড়ার দিকে ততই বাড়িতেছে। সীতারামের অবস্থাও বড় মন্দ হইতে চলিল। সম্প্রতি এমন হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, পিসা তাঁহার অনারারি পিসা-বৃত্তি পরিত্যাগ করিয়া স্বদেশে ফিরিয়া যাইতে মানস করিতেছেন।

 আজ টাকার বিশেষ আবশ্যক হইয়াছে, সীতারাম রুক্মিণীর বাড়িতে আসিয়াছে। হাসিয়া, কাছে ঘেঁসিয়া কহিল—

“ভিক্ষা যদি দেবে রাই,
(আমার) সােনা রূপায় কাজ নাই,
(আমি) প্রাণের দায়ে এসেছি হে,
মান রতন ভিক্ষা চাই।”

 না ভাই, ছড়াটা ঠিক খাটিল না। মান রতনে আমার আপাতত তেমন আবশ্যক নাই, যদি আবশ্যক হয় পরে দেখা যাইবে; আপাতত কিঞ্চিৎ সােনা রূপা পাইলে কাজে লাগে!”

 রুক্মিণী সহসা বিশেষ অনুরাগ প্রকাশ করিয়া কহিল, “তা’ তােমার যদি আবশ্যক হইয়া থাকে ত তোমাকে দিব না ত কাহাকে দিব?”

 সীতারাম তাড়াতাড়ি কহিল, “নাঃ—আবশ্যক এমনিই কি! তবে কি জান ভাই, আমার মার কাছে টাকা থাকে, আমি নিজের হাতে টাকা রাখি না। আজ সকালে মা যােড়াঘাটায় তাঁর জামাইয়ের বাড়ি গিয়াছেন। টাকা বাহির করিয়া দিতে ভুলিয়া গেছেন। তা আমি কালই শােধ করিয়া দিব!”

 মঙ্গলা মনে মনে হাসিয়া কহিল, “তােমার অত তাড়াতাড়ি করিবার আবশ্যক কি? যখন সুবিধা হয় শােধ দিলেই হইবে। তােমার হাতে দিতেছি, এ ত আর জলে ফেলিয়া দিতেছি না?” জলে ফেলিয়া দিলেও বরঞ্চ পাইবার সম্ভাবনা আছে, সীতারামের হাতে দিলে সে সম্ভাবনা টুকুও নাই, এই প্রভেদ।

 মঙ্গলার এইরূপ অনুরাগের লক্ষণ দেখিয়া সীতারামের ভালবাসা একেবারে উথলিয়া উঠিল। সীতারাম রসিকতা করিবার উদ্যোগ করিল। বিনা টাকায় নবাবী করা ও বিনা হাস্যরসে রসিকতা করা সীতারামের স্বভাবসিদ্ধ। সে যাহা মুখে আসে তাহাই বলে, ও আর কাহারাে অপেক্ষা না করিয়া নিজেই হাসিতে থাকে। তাহার হাসি দেখিয়া হাসি পায়! সে যখন রাজবাড়ির প্রহরী ছিল, তখন আন্যান্য প্রহরীদের সহিত সীতারামের প্রায় মাঝে মঝে দাঙ্গাহাঙ্গামা বাধিবার উদ্যোগ হইত, তাহার প্রধান কারণ, সীতারাম যাহাকে মজা মনে করিত, আর সকলে তাহাকে মজা মনে করিত না। হনুমানপ্রসাদ তেওয়ারি পাহারা দিতে দিতে ঢুলিতে ছিল, সীতারাম আস্তে আস্তে তাহার পশ্চাতে গিয়া হঠাৎ পিঠে এমন এক কিল মারিল যে, সেই হাড়ভাঙ্গা রসিকতার জ্বালায় তাহার পিঠ ও পিত্ত এক সঙ্গে জ্বলিয়া উঠিল। সীতারাম উচ্চৈঃস্বরে হাসিতে লাগিল, কিন্তু হনুমানপ্রসাদ সে হাসিতে যােগ না দিয়া, কিলের সহিত হাস্যরসের প্রভেদ ও করুণ রসের সম্বন্ধ উদাহরণ দ্বারা সীতারামকে অতিশয় স্পষ্ট করিয়া বুঝাইয়া দিয়াছিল। সীতারামের রসিকতার এমন আরো শত শত গল্প এইখানে উদ্ধৃত করা যাইতে পারে।

 পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে সীতারামের অনুরাগ সহসা উথলিত হইয়া উঠিল, সে রুক্মিণীর কাছে ঘেঁসিয়া প্রীতিভরে কহিল, ‘“তুমি আমার সুভদ্রা, আমি তােমার জগন্নাথ।”

 রুক্মিণী কহিল, “মর্ মিন্সে। সুভদ্রা যে জগন্নাথের বােন!”

 সীতারাম কহিল, “তাহা কেমন করিয়া হইবে? তাহা হইলে সুভদ্রাহরণ হইল কি করিয়া!”

 রুক্মিণী হাসিতে লাগিল, সীতারাম বুক ফুলাইয়া কহিল, “না, তা হইবে না, হাসিলে হইবে না, জবাব দাও! সুভদ্রা যদি বােনই হইল তবে সুভদ্রা হরণ হইল কি করিয়া।”

 সীতারামের বিশ্বাস যে, সে এমন প্রবল যুক্তি প্রয়ােগ করিয়াছে যে, ইহার উপরে আর কথা কহিবার যাে নাই।

 রুক্মিণী অতি মিষ্টস্বরে কহিল, “দূর মূর্খ।”

 সীতারাম গলিয়া গিয়া কহিল, “মূর্খই ত বটে তােমার কাছে আমি ত ভাই হারিয়াই আছি, তােমার কাছে আমি চিরকাল মূর্খ!” সীতারাম মনে মনে ভাবিল, খুব জবাব দিয়াছি, বেশ কথা যােগাইয়াছে।

 আবার কহিল, “আচ্ছা ভাই, কথাটা যদি তােমার পছন্দ না হইল, কি বলিয়া ডাকিলে তুমি খুসী হইবে, আমাকে বল!”

 রুক্মিণী হাসিয়া কহিল, “বল প্রাণ।”

 সীতারাম কহিল, “প্রাণ!”

 রুক্মিণী কহিল, “বল প্রিয়ে।”

 সীতারাম কহিল, “প্রিয়ে!”

 রুক্মিণী কহিল, “বল প্রিয়তমে!”

 সীতারাম কহিল, “প্রিয়তমে!”

 রুক্মিণী কহিল, “বল প্রাণপ্রিয়ে।”

 সীতারাম কহিল, “প্রাণপ্রিয়ে!”

 “আচ্ছা ভাই প্রাণ-প্রিয়ে, তুমি যে টাকাটা দিলে, তাহার সুদ কত লইবে?”

 রুক্মিণী রাগ করিল, মুখ বাঁকাইয়া কহিল, “যাও যাও, এই বুঝি তােমার ভালবাসা! সুদের কথা কোন্ মুখে জিজ্ঞাসা করিলে?”

 সীতারাম আনন্দে উচ্ছ্বসিত হইয়া কহিল, “না না, সে কি হয়? আমি কি ভাই সত্য বলিতেছিলাম? আমি যে ঠাট্টা করিতেছিলাম, এইটে আর বুঝিতে পারিলে না? ছি প্রিয়তমে!”

 সীতারামের মায়ের কি রােগ হইল, জানি না, আজ কাল প্রায় মাঝে মাঝে সে জামাই-বাড়ি যাইতে লাগিল ও টাকা বাহির করিয়া দিবার বিষয়ে তাহার স্মরণশক্তি একেবারে বিলুপ্ত হইয়া গেল! কাজেই সীতারামকে প্রায় মাঝে মাঝে রুক্মিণীর কাছে আসিতে হইত। আজ কাল দেখা যায় সীতারাম ও রুক্মিণীতে মিলিয়া অতি গােপনে কি একটা বিষয় লইয়া পরামর্শ চলিতেছে। অনেকদিন পরামর্শের পর সীতারাম কহিল, “আমার ভাই অত ফন্দি আসে না। এ বিষয়ে ভাগবতের সাহায্য না লইলে চলিবে না।”

 সেই দিন সন্ধ্যাবেলায় অত্যন্ত ঝড় হইতেছে। রাজবাড়ির ইতস্তত দুম্‌দাম্ করিয়া দরজা পড়িতেছে। বাতাস এমন বেগে বহিতেছে যে, বাগানের বড় বড় গাছের শাখা হেলিয়া ভূমিস্পর্শ করিতেছে। বন্যার মুখে ভগ্ন চূর্ণ গ্রামপল্লীর মত, ঝড়ের মুখে ছিন্নভিন্ন মেঘ ছুটিয়া চলিয়াছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ, ঘন ঘন গর্জ্জন। উদয়াদিত্য চারিদিকের দ্বার রুদ্ধ করিয়া ছােট একটি মেয়েকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন। ঘরের প্রদীপ নিভাইয়া দিয়াছেন। ঘর অন্ধকার। মেয়েটি কোলের উপর ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সুরমা যখন বাঁচিয়াছিল, এই মেয়েটিকে অত্যন্ত ভালবাসিত। সুরমার মৃত্যুর পর ইহার মা ইহাকে আর রাজবাড়িতে পাঠায় নাই। অনেক দিনের পর সে আজ একবার রাজবাড়িতে বেড়াইতে আসিয়াছিল। সহসা উদয়াদিত্যকে দেখিয়া “কাকা” “কাকা” বলিয়া সে তাঁহার কোলের উপরে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল। উদয়াদিত্য তাহাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া তাঁহার শয়নগৃহে লইয়া আসিয়াছেন। উদয়াদিত্যের মনের ভাব এই যে, “সুরমা এই মেয়েটিকে যদি একবার দেখিতে আসে! ইহাকে যে সে বড় ভালবাসিত! এত স্নেহের ছিল, সে কি না আসিয়া থাকিতে পারিবে!” মেয়েটি একবার জিজ্ঞাসা করিল, “কাকা, কাকীমা কোথায়?”

 উদয়াদিত্য রুদ্ধকণ্ঠে কহিলেন—“একবার তাঁহাকে ডাক্ না।” মেয়েটি “কাকী মা কাকী মা” করিয়া ডাকিতে লাগিল। উদয়াদিত্যের মনে হইল, ঐ যেন কে সাড়া দিল। দূর হইতে ঐ যেন কে বলিয়া উঠিল, “এই যাই রে!” যেন স্নেহের মেয়েটির করুণ আহ্বান শুনিয়া স্নেহময়ী আর থাকিতে পারিল না, তাহাকে বুকে তুলিয়া লইতে আসিতেছে। বালিকা কোলের উপর ঘুমাইয়া পড়িল। উদয়াদিত্য প্রদীপ নিভাইয়া দিলেন। একটি ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে করিয়া অন্ধকার ঘরে একাকী বসিয়া রহিলেন। বাহিরে হুহু করিয়া বাতাস বহিতেছে। ইতস্তত খট্ খট্ করিয়া শব্দ হইতেছে। ঐ না পদশব্দ শুনা গেল? পদশব্দই বটে। বুক এমন দুড়দুড় করিতেছে যে, শব্দ ভাল শুনা যাইতেছে না। দ্বার খুলিয়া গেল, ঘরের মধ্যে দীপালোক প্রবেশ করিল। ইহাও কি কখন সম্ভব! দীপ হস্তে চুপি চুপি ঘরে একটি স্ত্রীলোক প্রবেশ করিল। উদয়াদিত্য চক্ষু মুদ্রিত করিয়া কহিলেন, “সুরমা কি?” পাছে সুরমাকে দেখিলে সুরমা চলিয়া যায়। পাছে সুরমা না হয়।

 রমণী প্রদীপ রাখিয়া কহিল, “কেন গা, আমাকে কি আর মনে পড়ে না?”

 বজ্রধ্বনি শুনিয়া যেন স্বপ্ন ভাঙিল। উদয়াদিত্য চমকিয়া উঠিয়া চক্ষু চাহিলেন। মেয়েটি জাগিয়া উঠিয়া কাকা বলিয়া কাঁদিয়া উঠিল। তাহাকে বিছানার উপরে ফেলিয়া উদয়াদিত্য উঠিয়া দাঁড়াইলেন। কি করিবেন কোথায় যাইবেন যেন ভাবিয়া পাইতেছেন না। রুক্মিণী কাছে আসিয়া মুখ নাড়িয়া কহিল, “বলি, এখন মনে ত পড়িবেই না। তবে এককালে কেন আশা দিয়া আকাশে তুলিয়াছিলে?” উদয়াদিত্য চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, কিছুতেই কথা কহিতে পারিলেন না।

 তখন রুক্মিণী তাহার ব্রহ্মাস্ত্র বাহির করিল। কাঁদিয়া কহিল, “আমি তােমার কি দোষ করিয়াছি, যাহাতে তােমার চক্ষুশূল হইলাম। তুমিই ত আমার সর্ব্বনাশ করিয়াছ। যে রমণী যুবরাজকে একদিন দেহ প্রাণ বিকাইয়াছে সে আজ ভিখারিণীর মত পথে পথে বেড়াইতেছে এ পোড়া কপালে বিধাতা কি এই লিখিয়াছিল?”

 এইবার উদয়াদিত্যের প্রাণে গিয়া আঘাত লাগিল। সহসা তাহার মনে হইল আমিই বুঝি ইহার সর্ব্বনাশ করিয়াছি। অতীতের কথা ভুলিয়া গেলেন। ভুলিয়া গেলেন যৌবনের প্রমত্ত অবস্থায় রুক্মিণী কি করিয়া পদে পদে তাঁহাকে প্রলােভন দেখাইয়াছে, প্রতিদিন তাঁহার পথের সম্মুখে জাল পাতিয়া বসিয়াছিল, আবর্ত্তের মত তাঁহাকে তাহার দুই মােহময় বাহু দিয়া বেষ্টন করিয়া ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া মুহূর্ত্তের মধ্যে পাতালের অন্ধকারে নিক্ষেপ করিয়াছিল—সে সমস্তই ভুলিয়া গেলেন। দেখিলেন রুক্মিণীর বসন মলিন, ছিন্ন; রুক্মিণী কঁদিতেছে! করুণহৃদয় উদয়াদিত্য কহিলেন, “তােমার কি চাই?”

 রুক্মিণী কহিল, “আমার আর কিছু চাই না, আমার ভালবাসা চাই। আমি ঐ বাতায়নে বসিয়া তােমার বুকে মুখ রাখিয়া তােমার সােহাগ পাইতে চাই। কেন গা, সুরমার চেয়ে কি এ মুখ কালাে? যদি কালােই হইয়া থাকে ত সে তােমার জন্যই পথে পথে ভ্রমণ করিয়া। আগে ত কালো ছিল না।”

 এই বলিয়া রুক্মিণী উদয়াদিত্যের শয্যার উপর বসিতে গেল। উদয়াদিত্য আর থাকিতে পারিলেন না। কাতর হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “ও বিছানায় বসিও না, বসিও না।”

 রুক্মিণী আহত ফণিনীর মত মাথা তুলিয়া বলিল, “কেন বসিব না?”

 উদয়াদিত্য তাহার পথ রােধ করিয়া কহিলেন, “না ও বিছানার কাছে তুমি যাইও না! তুমি কি চাও আমি এখনি দিতেছি।”

 রুক্মিণী কহিল, “আচ্ছা তোমার আঙুলের ঐ আংটিটি দাও।”

 উদয়াদিত্য তৎক্ষণাৎ তাঁহার হাত হইতে আংটি খুলিয়া ফেলিয়া দিলেন। রুক্মিণী কুড়াইয়া লইয়া বাহির হইয়া গেল। মনে ভাবিল ডাকিনীর মন্ত্রমোহ এখনো দূর হয় নি, আরো কিছুদিন যাক, তাহার পর আমার মন্ত্র খাটিবে। রুক্মিণী চলিয়া গেলে উদয়াদিত্য শয্যার উপরে আসিয়া পড়িলেন। দুই বাহুতে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিয়া কহিলেন, “কোথায়, সুরমা কোথায়! আজ আমার এ দগ্ধ বজ্রাহত হৃদয়ে শান্তি দিবে কে?”