বৌ-ঠাকুরাণীর হাট/ত্রয়স্ত্রিংশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ত্রয়স্ত্রিংশ পরিচ্ছেদ।

 বহুদিনের পর উদয়াদিত্য রায়গড়ে আসিলেন, কিন্তু আগেকার মত তেমন আনন্দ আর পাইলেন না। মনের মধ্যে একট ভাবনা চাপিয়া ছিল, তাই কিছুই তেমন ভাল লাগিল না। তিনি ভাবিতেছিলেন, দাদা মহাশয় যে কাজ করিয়াছেন, তাঁহার যে কি হইবে তাহার ঠিকানা নাই, পিতা যে সহজে নিষ্কৃতি দিবেন এমন ত বােধ হয় না। আমার কি কুক্ষণেই জন্ম হইয়াছিল! তিনি বসন্তরায়ের কাছে গিয়া কহিলেন, “দাদা মহাশয়, আমি যাই, যশােহরে ফিরিয়া যাই।” প্রথম প্রথম বসন্তরায় গান গাহিয়া হাসিয়া এ কথা উড়াইয়া দিলেন; তিনি গাহিলেন—

আরকি আমি ছাড়্‌ব তােরে!
মন দিয়ে মন নাইবা পেলেম
জোর করে রাখিব ধােরে।
শূন্য ক’রে হৃদয়-পুরী প্রাণ যদি করিলে চুরি
তুমিই তবে থাক সেথায়
শূন্য হৃদয় পূর্ণ কোরে।

 অবশেষে উদয়াদিত্য বার বার কহিলে পর বসন্তরায়ের মনে আঘাত লাগিল, তিনি গান বন্ধ করিয়া বিষণ্ণমুখে কহিলেন, “কেন দাদা, আমি কাছে থাকিলে তাের কিসের অসুখ?” উদয়াদিত্য আর কিছু বলিতে পারিলেন না।

 উদয়াদিত্যকে উন্মনা দেখিয়া বসন্তরায় তাঁহাকে সুখী করিবার জন্য দিনরাত প্রাণপণে চেষ্টা করিতেন। সেতার বাজাইতেন, সঙ্গে করিয়া লইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেন—উদয়াদিত্যের জন্য প্রায় তাঁহার রাজকার্য্য বন্ধ হইল। বসন্তরায়ের ভয় পাছে উদয়াদিত্যকে না রাখিতে পারেন, পাছে উদয়াদিত্য আবার যশােহরে চলিয়া যান। দিন রাত তাঁহাকে চোখে চোখে রাখেন, তাঁহাকে বলেন, “দাদা, তােকে আর সে পাষাণ হৃদয়ের দেশে যাইতে দিব না।”

 দিন কতক থাকিতে থাকিতে উদয়াদিত্যের মনের ভাবনা অনেকটা শিথিল হইয়া আসিল। অনেক দিনের পর স্বাধীনতা লাভ করিয়া সঙ্কীর্ণপ্রসর পাষাণময় চারিটি কারাভিত্তি হইতে মুক্ত হইয়া বসন্তরায়ের কোমল হৃদয়ের মধ্যে, তাঁহার অসীম স্নেহের মধ্যে বাস করিতেছেন। অনেক দিনের পর চারিদিকে গাছপালা দেখিতেছেন, আকাশ দেখিতেছেন, দিগ্‌দিগন্তে পরিব্যাপ্ত উন্মুক্ত ঊষার আলাে দেখিতেছেন, পাখীর গান শুনিতেছেন, দূর দিগন্ত হইতে হু হু করিয়া সর্ব্বাঙ্গে বাতাস লাগিতেছে, রাত্রি হইলে সমস্ত আকাশময় তারা দেখিতে পান, জ্যোৎস্নার প্রবাহের মধ্যে ডুবিয়া যান, ঘুমন্ত স্তব্ধতার প্রাণের মধ্যে বিরাজ করিতে থাকেন। যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারেন, যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন, কিছুতেই আর বাধা নাই। ছেলেবেলা যে সকল প্রজারা উদয়াদিত্যকে চিনিত, তাহারা দূর দূরান্তর হইতে উদয়াদিত্যকে দেখিবার জন্য আসিল। গঙ্গাধর আসিল, ফটিক আসিল, হবিচাচা ও করিম্ উল্লা আসিল, মথুর তাহার তিনটি ছেলে সঙ্গে করিয়া আসিল, পরাণ ও হরি দুই ভাই আসিল, শীতল সর্দ্দার খেলা দেখাইবার জন্য পাঁচ জন লাঠিয়াল সঙ্গে লইয়া আসিল। প্রত্যহ যুবরাজের কাছে প্রজারা আসিতে লাগিল। যুবরাজ তাহাদের কত কি কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। এখনো যে উদয়াদিত্য তাহাদিগকে ভোলেন নাই, তাহা দেখিয়া প্রজারা অত্যন্ত আনন্দিত ও বিস্মিত হইল। মথুর কহিল, “মহারাজ, আপনি যে-মাসে রায়গড়ে আসিয়াছিলেন সেই মাসে আমার এই ছেলেটি জন্মায়, আপনি দেখিয়া গিয়াছিলেন, তার পরে আপনার আশীর্ব্বাদে আমার আরো দুটি সন্তান জন্মিয়াছে।” বলিয়া সে তাহার তিন ছেলেকে যুবরাজের কাছে আনিয়া কহিল, “প্রণাম কর।” তাহারা ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল। পরাণ আসিয়া কহিল, “এখান হইতে যশোরে যাইবার সময় হুজুর যে নৌকায় গিয়াছিলেন, আমি সেই নৌকায় মাঝি ছিলাম, মহারাজ!” শীতল সর্দ্দার আসিয়া কহিল, “মহারাজ, আপনি যখন রায়গড়ে ছিলেন, তখন আমার লাঠি খেলা দেখিয়া বক্‌সিস্ দিয়াছিলেন, আজ ইচ্ছা আছে একবার আমার ছেলেদের খেলা মহারাজকে দেখাইব। এস ত বাপধন, তোমরা এগোওত।” বলিয়া ছেলেদের ডাকিল। এইরূপ প্রত্যহ সকাল হইলে উদয়াদিত্যের কাছে দলে দলে প্রজারা আসিত ও সকলে একত্রে মিলিয়া কথা কহিত।

 এইরূপ স্নেহের মধ্যে, গাছপালার মধ্যে, আনন্দের মধ্যে, গীতোচ্ছ্বাসের মধ্যে থাকিয়া স্বভাবতই উদয়াদিত্যের মন হইতে ভাবনা অনেকটা শিথিল হইয়া আসিল। তিনি চোখ বুজিয়া মনে করিলেন, পিতা হয়ত রাগ করেন নাই, তিনি হয়ত সন্তুষ্ট হইয়াছেন, নহিলে এত দিন আর কি। কিছু করিতেন না!

 কিন্তু এরূপ চোখ-বাঁধা বিশ্বাসে বেশি দিন মনকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিলেন না। তাঁহার দাদা মহাশয়ের জন্য মনে কেমন একটা ভয় হইতে লাগিল। যশোহরে ফিরিয়া যাইবার কথা দাদা মহাশয়কে বলা বৃথা; তিনি স্থির করিলেন একদিন লুকাইয়া যশোহরে পালাইয়া যাইব। আবার সেই কারাগার মনে পড়িল। কোথায় এই আনন্দের স্বাধীনতা, আর কোথায় সেই সঙ্কীর্ণ ক্ষুদ্র কারাগারের একঘেয়ে জীবন! কারাগারের সেই প্রতি-মুহূর্ত্তকে এক এক বৎসর রূপে মনে পড়িতে লাগিল। সেই নিরালােক, নির্জ্জন, বায়ুহীন, বদ্ধ ঘরটি কল্পনায় স্পষ্ট দেখিতে পাইলেন, শরীর শিহরিয়া উঠিল। তবুও স্থির করিলেন, এখান হইতে একদিন সেই কারাগারের অভিমুখে পালাইতে হইবে। আজই পালাইব, এমন কথা মনে করিতে পারিলেন না—“একদিন পালাইব” মনে করিয়া অনেকটা নিশ্চিন্ত হইলেন।

 আজ বৃহস্পতিবার, বারবেলা, আজ যাত্রা হইতে পারে না, কাল হইবে। আজ দিন বড় খারাপ। সকাল হইতে ক্রমাগত টিপ্ টিপ্ করিয়া বৃষ্টি হইতেছে। সমস্ত আকাশ লেপিয়া মেঘ করিয়া আছে। আজ সন্ধ্যাবেলায় রায়গড় ছাড়িয়া যাইতেই হইবে বলিয়া উদয়াদিত্য স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। সকালে যখন বসন্তরায়ের সঙ্গে তাঁহার দেখা হইল, তখন বসন্তরায় উদয়াদিত্যকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিলেন, “দাদা, কাল রাত্রে আমি একটা বড় দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছি। স্বপ্নটা ভাল মনে পড়িতেছে না, কেবল মনে আছে, তােতে আমাতে যেন—যেন জন্মের মত ছাড়াছাড়ি হইতেছে।”

 উদয়াদিত্য বসন্তরায়ের হাত ধরিয়া কহিলেন, “না, দাদা মহাশয়!— ছাড়াছাড়ি যদি বা হয়, ত জন্মের মত কেন হইবে?”

 বসন্তরায় অন্য দিকে চাহিয়া ভাবনার ভাবে কহিলেন, “তা নয়ত আর কি! কত দিন আর বাঁচিব বল্, বুড়া হইয়াছি!”

 গত রাত্রের দুঃস্বপ্নের শেষ তান এখনাে বসন্তরায়ের মনের গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হইতেছিল, তাই তিনি অন্যমনস্ক হইয়া কি ভাবিতেছিলেন।

 উদয়াদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন—“দাদা মহাশয়, আবার যদি আমাদের ছাড়াছাড়ি হয় ত কি হইবে!”

 বসন্তরায় উদয়াদিত্যের গলা ধরিয়া কহিলেন, “কেন ভাই, কেন ছাড়াছাড়ি হইবে? তুই আমাকে ছাড়িয়া যাস্‌নে। এ বুড়া বয়সে তুই আমাকে ফেলিয়া পালাস্‌নে ভাই!”

 উদয়াদিত্যের চোখে জল আসিল। তিনি বিস্মিত হইলেন;—তাঁহার মনের অভিসন্ধি যেন বসন্তরায় কি করিয়া টের পাইয়াছেন। নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “আমি কাছে থাকিলেই যে তােমার বিপদ ঘটিবে দাদা মহাশয়!”

 বসন্তরায় হাসিয়া কহিলেন—“কিসের বিপদ ভাই? এ বয়সে কি আর বিপদকে ভয় করি! মরণের বাড়া ত আর বিপদ নাই! তা, মরণ যে আমার প্রতিবেশী; সে নিত্য আমার তত্ত্ব লইতে পাঠায়, তাহাকে আমি ভয় করি না। যে ব্যক্তি জীবনের সমস্ত বিপদ অতিক্রম করিয়া বুড়া বয়স পর্য্যন্ত বাঁচিয়া থাকিতে পারে, তীরে আসিয়া তাহার নৌকাডুবি হইলই বা?”

 উদয়াদিত্য আজ সমস্ত দিন বসন্তরায়ের সঙ্গে সঙ্গে রহিলেন। সমস্ত দিন টিপ্ টিপ্ করিয়া বৃষ্টি পড়িতে লাগিল।

 বিকালবেলায় বৃষ্টি ধরিয়া গেল, উদয়াদিত্য উঠিলেন। বসন্তরায় কহিলেন—“দাদা, কোথায় যাস্!”

 উদয়াদিত্য কহিলেন—“একটু বেড়াইয়া আসি!”

 বসন্তরায় কহিলেন—“আজ নাই বা গেলি।”

 উদয়াদিত্য কহিলেন—“কেন, দাদা মহাশয়?”

 বসন্তরায়: উদয়াদিত্যকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিলেন, “আজ তুই বাড়ি হইতে বাহির হ’স্ নে, আজ তুই আমার কাছে থাক ভাই!”

 উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমি অধিক দূর যাব না দাদা মহাশয়, এখনি ফিরিয়া আসিব।” বলিয়া বাহির হইয়া গেলেন।

 প্রাসাদের বহির্দ্বারে যাইতেই একজন প্রহরী কহিল, “মহারাজ আপনার সঙ্গে যাইব?”

 যুবরাজ কহিলেন—“না আবশ্যক নাই।”

 প্রহরী কহিল—“মহারাজের হাতে অস্ত্র নাই!”

 যুবরাজ কহিলেন—“অস্ত্রের প্রয়োজন কি?”

 উদয়াদিত্য প্রাসাদের বাহিরে গেলেন। একটি দীর্ঘ বিস্তৃত মাঠ আছে, সেই মাঠের মধ্যে গিয়া পড়িলেন। এক্‌লা বেড়াইতে লাগিলেন। ক্রমে, দিনের আলো মিলাইয়া আসিতে লাগিল। মনে কত কি ভাবনা উঠিল। যুবরাজ তাঁহার এই লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যহীন জীবনের কথা ভাবিতে লাগিলেন। ভাবিয়া দেখিলেন, তাঁহার কিছুই স্থির নাই, কোথাও স্থিতি নাই—পরের মুহূর্ত্তেই কি হইবে তাহার ঠিকানা নাই। বয়স অল্প, এখনো জীবনের অনেক অবশিষ্ট আছে—কোথাও ঘর বাড়ি বাঁধিয়া কোথাও স্থায়ী আশ্রয় না পাইয়া এই সুদুর-বিস্তৃত ভবিষ্যৎ এমন করিয়া কিরূপে কাটিবে? তাহার পর মনে পড়িল—বিভা। বিভা এখন কোথায় আছে? এত কাল আমিই তাহার সুখের সূর্য্য আড়াল করিয়া বসিয়াছিলাম—এখন কি সে সুখী হইয়াছে? বিভাকে মনে মনে কত আশীর্ব্বাদ করিলেন।

 মাঠের মধ্যে রৌদ্রে রাখালদের বসিবার নিমিত্ত অশথ, বট, খেজুর, সুপারি প্রভৃতির এক বন আছে—যুবরাজ তাহার মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিলেন। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। অন্ধকার করিয়াছে। যুবরাজের আজ পালাইবার কথা ছিল—সেই সংকল্প লইয়া তিনি মনে মনে আন্দোলন করিতেছিলেন। বসন্তরায় যখন শুনিবেন, উদয়াদিত্য পালাইয়া গেছেন, তখন তাঁহার কিরূপ অবস্থা হইবে—তখন তিনি হৃদয়ে আঘাত পাইয়া করুণ মুখে কেমন করিয়া বলিবেন—“অ্যাঁ। দাদা, আমার কাছ হইতে পালাইয়া গেল!” সে ছবি তিনি যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইলেন।—

 এমন সময়ে একজন রমণী কর্কশ কণ্ঠে বলিয়া উঠিল,—“এই যে গা, এইখানে তােমাদের যুবরাজ—এইখানে!”

 দুই জন সৈন্য মশাল হাতে করিয়া যুবরাজের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে দেখিতে আরাে অনেকে আসিয়া তাঁহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। তখন সেই রমণী তাঁহার কাছে আসিয়া কহিল, “আমাকে চিনিতে পার কি গা! একবার এইদিকে তাকাও! একবার এইদিকে তাকাও।” যুবরাজ মশালের আলােকে দেখিলেন, রুক্মিণী। সৈন্যগণ রুক্মিণীর ব্যবহার দেখিয়া তাহাকে ধমক দিয়া কহিল, “দূর হ মাগী!” সে তাহাতে কর্ণপাতও না করিয়া কহিতে লাগিল—“এ সব কে করিয়াছে? আমি করিয়াছি। এ সব কে করিয়াছে? আমি করিয়াছি। এ সব সৈন্যদের এখানে কে আনিয়াছে? আমি আনিয়াছি। আমি তোমার লাগিয়া এত করিলাম, আর তুমি—যুবরাজ ঘৃণায় রুক্মিণীর দিকে পশ্চাৎ ফিরিয়া দাঁড়াইলে!” সৈন্যগণ রুক্মিণীকে বলপূর্ব্বক ধরিয়া তফাৎ করিয়া দিল। তখন মুক্তিয়ার খাঁ সম্মুখে আসিয়া যুবরাজকে সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। যুবরাজ বিস্মিত হইয়া কহিলেন—“মুক্তিয়ার খাঁ, কি খবর?”

 মুক্তিয়ার খাঁ বিনীতভাবে কহিল, “জনাব, আমাদের মহারাজের নিকট হইতে আদেশ লইয়া আসিতেছি!”

 যুবরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি আদেশ!”

 মুক্তিয়ার খাঁ প্রতাপাদিত্যের স্বাক্ষরিত আদেশপত্র বাহির করিয়া যুবরাজের হাতে দিল।

 যুবরাজ পড়িয়া কহিলেন, “ইহার জন্য এত সৈন্যের প্রয়ােজন কি? আমাকে একখানা পত্র লিখিয়া আদেশ করিলেই ত আমি যাইতাম! আমি ত আপনিই যাইতেছিলাম, যাইব বলিয়াই স্থির করিয়াছি। তবে আর বিলম্বে প্রয়ােজন কি? এখনি চল। এখনি যশােহরে ফিরিয়া যাই।” মুক্তিয়ার খাঁ হাত যোড় করিয়া কহিল—“এখনি ফিরিতে পারিব না।”

 যুবরাজ ভীত হইয়া কহিলেন—“কেন?” মুক্তিয়ার খাঁ কহিল— “আর একটি আদেশ আছে, তাহা পালন না করিয়া যাইতে পারিব না।”

 যুবরাজ ভীত স্বরে কহিলেন—“কি আদেশ!”

 মুক্তিয়ার খাঁ কহিল—“রায়গড়ের রাজার প্রতি মহারাজা প্রাণদণ্ডের আদেশ করিয়াছেন।”

 যুবরাজ চমকিয়া উচ্চস্বরে কহিয়া উঠিলেন—“না, করেন নাই, মিথ্যা কথা!”

 মুক্তিয়ার খাঁ কহিল—“আজ্ঞা যুবরাজ, মিথ্যা নহে। আমার নিকট মহারাজের স্বাক্ষরিত পত্র আছে।”

 যুবরাজ সেনাপতির হাত ধরিয়া ব্যগ্র হইয়া কহিলেন, “মুক্তিয়ার খাঁ, তুমি ভুল বুঝিয়াছ। মহারাজ আদেশ করিয়াছেন যে যদি উদয়াদিত্যকে না পাও, তাহা হইলে বসন্তরায়ের—আমি যখন আপনি ধরা দিতেছি, তখন আর কি! আমাকে এখনি লইয়া চল, এখনি লইয়া চল—আমাকে বন্দী করিয়া লইয়া চল, আর বিলম্ব করিও না!”

 মুক্তিয়ার খাঁ কহিল—“যুবরাজ, আমি ভুল বুঝি নাই। মহারাজ স্পষ্ট আদেশ করিয়াছেন।”

 যুবরাজ অধীর হইয়া কহিলেন—“তুমি নিশ্চয়ই ভুল বুঝিয়াছ। তাঁহার অভিপ্রায় এরূপ নহে। আচ্ছা, চল, যশােহরে চল। আমি মহারাজার সম্মুখে তােমাদের বুঝাইয়া দিব, তিনি যদি দ্বিতীয় বার আদেশ করেন, তবে আদেশ সম্পন্ন করিও!”

 মুক্তিয়ার যােড়হস্তে কহিল, “যুবরাজ, মার্জ্জনা করুন, তাহা পারিব না!”

 যুবরাজ অধিকতর অধীর হইয়া কহিলেন, “মুক্তিয়ার, মনে আছে, আমি এক কালে সিংহাসন পাইব। আমার কথা রাখ, আমাকে সন্তুষ্ট কর!”

 মুক্তিয়ার নিরুত্তরে দাঁড়াইয়া রহিল।

 যুবরাজের মুখ পাংশুবর্ণ হইয়া গেল, তাঁহার কপালে ঘর্ম্মবিন্দু দেখা দিল। তিনি সেনাপতির হাত দৃঢ়ভাবে ধরিয়া কহিলেন—“মুক্তিয়ার খাঁ, বৃদ্ধ, নিরপরাধ, পুণ্যাত্মাকে বধ করিলে নরকেও তােমার স্থান হইবে না!”

 মুক্তিয়ার খাঁ কহিল—“মনিবের আদেশ পালন করিতে পাপ নাই।”

 উদয়াদিত্য উচ্চৈঃস্বরে কহিয়া উঠিলেন “মিথ্যা কথা। যে ধর্ম্মশাস্ত্রে তাহা বলে, সে ধর্ম্মশাস্ত্র মিথ্যা। নিশ্চয় জানিও মুক্তিয়ার, পাপ আদেশ পালন করিলে পাপ।”

 মুক্তিয়ার নিরুত্তরে দাঁড়াইয়া রহিল।

 উদয়াদিত্য চারি দিকে চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন, “তবে আমাকে ছাড়িয়া দাও। আমি গড়ে ফিরিয়া যাই। তােমার সৈন্যসামন্ত লইয়া সেখানে যাও—আমি তােমাকে যুদ্ধে আহ্বান করিতেছি। সেখানে রণক্ষেত্রে জয়লাভ করিয়া তার পরে তােমার আদেশ পালন করিও!”

 মুক্তিয়ার নিরুত্তরে দাঁড়াইয়া রহিল। সৈন্যগণ অধিকতর ঘেঁসিয়া আসিয়া যুবরাজকে ঘিরিল। যুবরাজ কোন উপায় না দেখিয়া সেই অন্ধকারে প্রাণপণে চীৎকার করিয়া উঠিলেন “দাদা মহাশয়, সাবধান!” বন কাঁপিয়া উঠিল—মাঠের প্রান্তে গিয়া সে সুর মিলাইয়া গেল। সৈন্যরা আসিয়া উদয়াদিত্যকে ধরিল। উদয়াদিত্য আর একবার চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“দাদা মহাশয়, সাবধান!” একজন পথিক মাঠ দিয়া যাইতেছিল —শব্দ শুনিয়া কাছে আসিয়া কহিল “কে গাে!” উদয়াদিত্য তাড়াতাড়ি কহিলেন—“যাও যাও—গড়ে ছুটিয়া যাও—মহারাজকে সাবধান করিয়া দাও,” দেখিতে দেখিতে সেই পথিককে সৈন্যেরা গ্রেফ্‌তার করিল। যে কেহ সেই মাঠ দিয়া চলিয়াছিল—সৈন্যেরা অবিলম্বে তাহাকে বন্দী করিল।

 কয়েক জন সৈন্য উদয়াদিত্যকে বন্দী করিয়া রহিল, মুক্তিয়ার খাঁ এবং অবশিষ্ট সৈন্যগণ সৈনিকের বেশ পরিত্যাগ করিয়া অস্ত্র শস্ত্র লুকাইয়া সহজ বেশে গড়ের অভিমুখে গেল। রায়গড়ের শতাধিক দ্বার ছিল, ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া তাহারা গড়ের মধ্যে প্রবেশ করিল।

 তখন সন্ধ্যাকালে বসন্তরায় বসিয়া আহ্নিক করিতেছিলেন। ওদিকে রাজবাড়ির ঠাকুর-ঘরে সন্ধ্যাপূজার শাঁক ঘণ্টা বাজিতেছে। বৃহৎ রাজবাটিতে কোন কোলাহল নাই, চারিদিক নিস্তব্ধ। বসন্তরায়ের নিয়মানুসারে অধিকাংশ ভৃত্য সন্ধ্যাবেলায় কিছুক্ষণের জন্য ছুটি পাইয়াছে।

 আহ্নিক করিতে করিতে বসন্তরায় সহসা দেখিলেন, তাঁহার ঘরের মধ্যে মুক্তিয়ার খাঁ প্রবেশ করিল। ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন—“খাঁ সাহেব, এ ঘরে প্রবেশ করিও না। আমি এখনি আহ্নিক সারিয়া আসিতেছি

 মুক্তিয়ার খাঁ ঘরের বাহিরে গিয়া দুয়ারের নিকট দাঁড়াইয়া রহিল। বসন্তরায় আহ্নিক সমাপন করিয়া তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া মুক্তিয়ার খাঁর গায়ে হাত দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাঁ সাহেব, ভাল আছ ত?”

 মুক্তিয়ার সেলাম করিয়া সংক্ষেপে কহিল, “হাঁ মহারাজ!”

 বসন্তরায় কহিলেন—“আহারাদি হইয়াছে?”

 মুক্তিয়ার—“আজ্ঞা হাঁ।”

 বসন্তরায়—“আজ তবে, তোমার এখানে থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিই।”

 মুক্তিয়ার কহিল—“আজ্ঞা না, প্রয়োজন নাই। কাজ সারিয়া এখনি যাইতে হইবে!”

 বসন্তরায়—“না, তা হইবে না খাঁ সাহেব, আজ তোমাদের ছাড়িব না, আজ এখানে থাকিতেই হইবে।”

 মুক্তিয়ার—“না, মহারাজ শীঘ্রই যাইতে হইবে।”

 বসন্তরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন বল দেখি? বিশেষ কাজ আছে বুঝি? প্রতাপ ভাল আছে ত?”

 মুক্তিয়ার—“মহারাজ ভাল আছেন।”

 বসন্তরায়—“তবে, কি তােমার কাজ, শীঘ্র বল। বিশেষ জরুরি শুনিয়া উদ্বেগ হইতেছে। প্রতাপের ত কোন বিপদ ঘটে নাই।”

 মুক্তিয়ার—“আজ্ঞা না, তাঁহার কোন বিপদ ঘটে নাই। মহারাজার একটি আদেশ পালন করিতে আসিয়াছি!”

 বসন্তরায় তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিলেন,“কি আদেশ—এখনি বল!”

 মুক্তিয়ার খাঁ এক আদেশপত্র বাহির করিয়া বসন্তরায়ের হাতে দিল। বসন্তরায় আলাের কাছে লইয়া পড়িতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে একে একে সমুদয় সৈন্য দরজার নিকট আসিয়া ঘেরিয়া দাঁড়াইল।

 পড়া শেষ করিয়া বসন্তরায় ধীরে ধীরে মুক্তিয়ার খাঁর নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“এ কি প্রতাপের লেখা?”

 মুক্তিয়ার কহিল, “হাঁ।”

 বসন্তরায় আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাঁ সাহেব, এ কি প্রতাপের স্বহস্তে লেখা?”

 মুক্তিয়ার কহিল—“হাঁ মহারাজ!”

 তখন বসন্তরায় কাঁদিয়া বলিয়া উঠিলেন, “খাঁ সাহেব, আমি প্রতাপকে নিজের হাতে মানুষ করিয়াছি!”

 কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন—অবশেষে আবার কহিলেন, “প্রতাপ যখন এতটুকু ছিল আমি তাহাকে দিনরাত কোলে করিয়া থাকিতাম—সে আমাকে এক মুহূর্ত্ত ছাড়িয়া থাকিতে চাহিত না! সেই প্রতাপ বড় হইল, তাহার বিবাহ দিয়া দিলাম, তাহাকে সিংহাসনে বসাইলাম—তাহার সন্তানদের কোলে লইলাম—সেই প্রতাপ আজ স্বহস্তে এই লেখা লিখিয়াছে খাঁ সাহেব?”

 মুক্তিয়ার খাঁর চোখের পাতা ভিজিয়া আসিল, সে অধোবদনে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

 বসন্তরায় জিজ্ঞাসা করিলেন—“দাদা কোথায়? উদয় কোথায়?”

 মুক্তিয়ার খাঁ কহিল, “তিনি বন্দী হইয়াছেন—মহারাজের নিকট বিচারের নিমিত্ত প্রেরিত হইয়াছেন।”

 বসন্তরায় বলিয়া উঠিলেন—“উদয় বন্দী হইয়াছে? বন্দী হইয়াছে খাঁ সাহেব? আমি একবার তাহাকে কি দেখিতে পাইব না?”

 মুক্তিয়ার খাঁ যােড়হাত করিয়া কহিল —“না জনাব, হুকুম নাই!”

 বসন্তরায় সাশ্রুনেত্রে মুক্তিয়ার খাঁর হাত ধরিয়া কহিলেন—“একবার আমাকে দেখিতে দিবে না খাঁ সাহেব!”

 মুক্তিয়ার কহিল—“আমি আদেশ-পালক ভৃত্য মাত্র।”

 বসন্তরায় গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন—“এ সংসারে কাহারাে দয়ামায়া নাই, এস সাহেব তােমার আদেশ পালন কর।”

 মুক্তিয়ার তখন মাটি ছুঁইয়া সেলাম করিয়া যোড়হস্তে কহিল— “মহারাজ, আমাকে মার্জ্জনা করিবেন—আমি প্রভুর আদেশ পালন করিতেছি মাত্র, আমার কোন দোষ নাই।”

 বসন্তরায় কহিলেন—“না সাহেব তােমার দোষ কি? তােমার কোন দোষ নাই। তােমাকে আর মার্জ্জনা করিব কি?” বলিয়া মুক্তিয়ার খাঁর কাছে গিয়া তাহার সহিত কোলাকুলি করিলেন—কহিলেন, “প্রতাপকে বলিও, আমি তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিয়া মরিলাম। আর দেখ খাঁ সাহেব, আমি মরিবার সময় তােমার উপরেই উদয়ের ভার দিয়া গেলাম, সে নিরপরাধ—দেখিও অন্যায় বিচারে সে যেন আর কষ্ট না পায়।”

 বলিয়া বসন্তরায় চোখ বুজিয়া ইষ্ট-দেবতার নিকট ভূমিষ্ঠ হইয়া রহিলেন, দক্ষিণ হস্তে মালা জপিতে লাগিলেন—ও কহিলেন, “সাহেব এইবার!”

 মুক্তিয়ার খাঁ ডাকিল, “আবদুল।” আবদুল মুক্ত তলােয়ার হস্তে আসিল। মুক্তিয়ার মুখ ফিরাইয়া সরিয়া গেল। মুহূর্ত্ত পরেই রক্তাক্ত অসি হস্তে আবদুল গৃহ হইতে বাহির হইয়া আসিল—গৃহে রক্তস্রোত বহিতে লাগিল!