বৌ-ঠাকুরাণীর হাট/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।

 বসন্তরায় উদয়াদিত্যের ঘরে আসিয়া কহিলেন, “দাদা তাের সঙ্গে আর দেখা হইবে না।” বলিয়া উদয়াদিত্যকে বৃদ্ধ দুই হাতে জড়াইয়া ধরিলেন।

 উদয়াদিত্য বসন্তরায়ের হাত ধরিয়া কহিলেন, “কেন দাদামহাশয়?”

 বসন্তরায় সমস্ত বলিলেন। কাঁদিয়া কহিলেন, “ভাই, তােকে আমি ভালবাসি বলিয়াই তাের এত দুঃখ। তা, তুই যদি সুখে থাকিস্ ত এক’টা দিন আমি একরকম কাটাইয়া দিব।”

 উদয়াদিত্য মাথা নাড়িয়া কহিলেন, “না, তাহা কখনই হইবে না। তােমাতে আমাতে দেখা হইবেই। তাহাতে কেহ বাধা দিতে পারিবে না। তুমি গেলে দাদামহাশয়, আমি আর বাঁচিব না।”

 বসন্তরায় ব্যাকুল হইয়া কহিলেন, “প্রতাপ আমাকে বধ করিল না, তােকে আমার কাছ হইতে কাড়িয়া লইল। দাদা, আমি যখন চলিয়া যাইব, আমার পানে ফিরিয়া চাহিস্‌নে, মনে করিস্‌ বসন্তরায় মরিয়া গেল!”

 উদয়াদিত্য শয়নকক্ষে সুরমার নিকটে গেলেন। বসন্তরায় বিভার কাছে গিয়া বিভার চিবুক ধরিয়া কহিলেন, “বিভা দিদি আমার, একবার ওঠ্! বুড়ার এই মাথাটায় একবার ঐ হাত বুলাইয়া দে।” বিভা উঠিয়া বসিয়া দাদা মহাশয়ের মাথা লইয়া পাকা চুল তুলিয়া দিতে লাগিল।

 উদয়াদিত্য সুরমাকে সমস্ত কহিলেন ও বলিলেন,—“সুরমা, পৃথিবীতে আমার যাহা কিছু অবশিষ্ট আছে তাহাই কাড়িয়া লইবার জন্য যেন একটা যড়যন্ত্র চলিতেছে।” সুরমার হাত ধরিয়া কহিলেন—“সুরমা, তােমাকে যদি কেহ আমার কাছ হইতে ছিনিয়া লইয়া যায়?”

 সুরমা দৃঢ়ভাবে উদয়াদিত্যকে, আলিঙ্গন করিয়া দৃঢ়স্বরে কহিল, “সে যম পারে, আর কেহ পারে না।”

 সুরমার মনেও অনেকক্ষণ ধরিয়া সেইরূপ একটা আশঙ্কা জন্মিতেছে। সে যেন দেখিতে পাইতেছে একটা কঠোর হস্ত তাহার উদয়াদিত্যকে তাহার কাছ হইতে সরাইয়া দিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে। সে মনে মনে উদয়াদিত্যকে প্রাণপণে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল, মনে মনে কহিল, “আমি ছাড়িব না, আমাকে কেহ ছাড়াইতে পারিবে না।”

 সুরমা আবার কহিল, “আমি অনেকক্ষণ হইতে ভাবিয়া রাখিয়াছি আমাকে তােমার কাছ হইতে কেহই লইতে পারিবে না।”

 সুরমা ঐ কথা বার বার করিয়া বলিল। সে মনের মধ্যে বল সঞ্চয় করিতে চায়, যে বলে সে উদয়াদিত্যকে দুই বাহু দিয়া এমন জড়াইয়া থাকিবে যে, কোন পার্থিব শক্তি তাহাদের বিচ্ছিন্ন করিতে পারিবে না। বার বার ঐ কথা বলিয়া মনকে সে বজ্রের বলে বাঁধিতেছে।

 উদয়াদিত্য সুরমার মুখের দিকে চাহিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন সুরমা, দাদামহাশয়কে আর দেখিতে পাইব না!”

 সুরমা নিশ্বাস ফেলিল।

 উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমি নিজের কষ্টের জন্য ভাবি না সুরমা,—কিন্তু দাদামহাশয়ের প্রাণে যে বড় বাজিবে। দেখি, বিধাতা আরো কি করেন। তাঁর আরও কি ইচ্ছা আছে!”

 উদয়াদিত্য বসন্তরায়ের কত গল্প করিলেন।

 বসন্তরায় কোথায় কি কহিয়াছিলেন, কোথায় কি করিয়াছিলেন সমুদায় তাঁহার মনে পড়িতে লাগিল। বসন্তরায়ের করুণ হৃদয়ের কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ, কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কথা, তাঁহার স্মৃতির ভাণ্ডারে ছােট ছােট রত্নের মত জমা করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহাই আজ একে একে সুরমার কাছে বাহির করিতে লাগিলেন।

 সুরমা কহিল, “আ—হা, দাদামহাশয়ের মত কি আর লােক আছে?”

 সুরমা ও উদয়াদিত্য বিভার ঘরে গেলেন।

 তখন বিভা তাহার দাদা মহাশয়ের পাকা চুল তুলিতেছে, ও তিনি বসিয়া গান গাইতেছেন;—

“ওরে, যেতে হবে, আর দেরী নাই,
পিছিয়ে প’ড়ে র’বি কত, সঙ্গীরা তাের গেল, সবাই।
আয়রে ভবের খেলা সেরে, আঁধার করে এসেছেরে,
(ওরে) পিছন ফিরে বারে বারে কাহার পানে চাহিস্‌রে ভাই।
খেল্‌তে এল ভবের নাটে, নতুন লোকে নতুন খেলা,
হেথা হতে আয়রে সরে, নইলে তােরে মার্‌বে ঢেলা,
নামিয়ে দেরে প্রাণের বােঝা, আরেক দেশে চল্‌রে সোজা,
(সেথা) নতুন করে বাঁধবি বাসা, নতুন খেলা খেল্‌বি সে ঠাঁই।

 উদয়াদিত্যকে দেখিয়া বসন্তরায় হাসিয়া কহিলেন, “দেখ ভাই, বিভা আমাকে ছাড়িতে চায় না। কি জানি আমাকে উহার কিসের আবশ্যক! এক কালে যে দুধ ছিল, বুড়া হইয়া সে ঘোল হইয়া উঠিয়াছে, তা, বিভা দুধের সাধ ঘােলে মিটাইতে চায় কেন? আমি যাব শুনিয়া বিভা কাঁদে! এমন আর কখন শুনিয়াছ? আমি ভাই, বিভার কান্না দেখিতে পারি না।” বলিয়া গাহিতে লাগিলেন,

“আমার যাবার সময় হল,
আমায় কেন রাখিস্ ধরে,
চোখের জলের বাঁধন দিয়ে
বাঁধিস্‌নে আর মায়া-ডােরে।

ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি;
ফিরিয়ে নে তাের নয়ন দুটি,
নাম ধরে আর ডাকিস্‌নে ভাই,
যেতে হবে ত্বরা করে!”

 “ঐ দেখ, ঐ দেখ, বিভার রকম দেখ! দেখ্ বিভা, তুই যদি অমন করিয়া কাঁদবি ত—” বলিতে বলিতে বসন্তরায়ের আর কথা বাহির হইল না। তিনি বিভাকে শাসন করিতে গিয়া নিজেকে আর সামলাইতে পারিলেন না, তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া হাসিয়া কহিলেন, “দাদা, ঐ দেখ ভাই সুরমা কাঁদিতেছে! এই বেলা ইহার প্রতিবিধান কর; নহিলে আমি সত্য সত্যই থাকিয়া যাইব; তােমার জায়গাটি দখল করিয়া বসিব। ঐ দুই হাতে পাকাচুল তােলাইব, ঐ কানের কাছে এই ভাঙা দাঁতের পাটির মধ্য হইতে ফিস্‌ফিস্ করিব, আর কানের অত কাছে গিয়া আর যদি কোন প্রকার অঘটন সংঘটন হয় তবে তাহার দায়ী আমি হইব না!”

 বসন্তরায় দেখিলেন, কেহ কোন কথা কহিল না, তখন তিনি কাতর হইয়া তাঁহার সেতারটা তুলিয়া লইয়া ঝন্ ঝন্ করিয়া বিষম বেগে বাজাইতে সুরু করিলেন। কিন্তু বিভার চখের জল দেখিয়া তাঁহার সেতার বাজাইবার বড়ই ব্যাঘাত হইতে লাগিল, তাঁহার চোখ মাঝে মাঝে ঝাপ্‌সা হইয়া আসিতে লাগিল, মাঝে মাঝে বিভাকে এবং উপস্থিত সকলকে তিরস্কারচ্ছলে রাশ রাশ কথা বলিবার বাসনা হইতে লাগিল, কিন্তু আর কথা যােগাইল না, কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল, সেতার বন্ধ করিয়া নামাইয়া রাখিতে হইল। অবশেষে বিদায়ের সময় আসিল।

 উদয়াদিত্যকে দীর্ঘকাল আলিঙ্গন করিয়া শেষ কথা এই বলিয়া গেলেন, “এই সেতার রাখিয়া গেলাম দাদা, আর সেতার বাজাইব না। সুরমা ভাই সুখে থাক; বিভা—” কথা শেষ হইল না, অশ্রু মুছিয়া পাল্কীতে উঠিলেন।