বৌ-ঠাকুরাণীর হাট/ষড়্‌বিংশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ষড়বিংশ পরিচ্ছেদ।

 রামচন্দ্র রায় ভাবিলেন, বিভা যে চন্দ্রদ্বীপে আসিল না, সে কেবল প্রতাপাদিত্যের শাসনে ও উদয়াদিত্যের মন্ত্রণায়। বিভা যে নিজের ইচ্ছায় আসিল না, তাহা মনে করিলে তাঁহার আত্ম-গৌরবে অত্যন্ত আঘাত লাগে। তিনি ভাবিলেন, প্রতাপাদিত্য আমাকে অপমান করিতে চাহে, অতএব সে কখন বিভাকে আমার কাছে পাঠাইবে না। কিন্তু এ অপমান আমিই তাহাকে ফিরাইয়া দিই না কেন? আমিই তাহাকে এক পত্র লিখি না কেন যে, তােমার মেয়েকে আমি পরিত্যাগ করিলাম, তাহাকে যেন আর চন্দ্রদ্বীপে পাঠান না হয়। এইরূপ সাতপাঁচ ভাবিয়া পাঁচ জনের সহিত মন্ত্রণা করিয়া প্রতাপাদিত্যকে ঐ মর্ম্মে এক পত্র লেখা হইল। প্রতাপাদিত্যকে এরূপ চিঠি লেখা বড় সাধারণ সাহসের কর্ম্ম নহে। রামচন্দ্র রায়ের মনে মনে বিলক্ষণ ভয় হইতেছিল। কিন্তু ঢালু পর্ব্বতে বেগে নাবিতে নাবিতে হাজার ভয় হইলেও যেমন মাঝে মাঝে থামা যায় না, রামচন্দ্র রায়ের মনেও সেইরূপ একটা ভাবের উদয় হইয়াছিল!—সহসা একটা দুঃসাহসিকতায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন, শেষ পর্য্যন্ত না পৌঁছিয়া যেন দাঁড়াইতে পারিতেছেন না। রামমোহনকে ডাকিয়া কহিলেন—“এই পত্র যশোহরে লইয়া যা।” রামমোহন যোড়হস্তে কহিল, “আজ্ঞা, না মহারাজ, আমি পারিব না। আমি স্থির করিয়াছি, আর যশোহরে যাইব না। এক যদি পুনরায় মা-ঠাকুরাণীকে আনিতে যাইতে বলেন ত আর একবার যাইতে পারি নতুবা, এ চিঠি লইয়া যাইতে পারিব না।” রামমোহনকে আর কিছু না বলিয়া বৃদ্ধ নয়ানচাঁদের হাতে রাজা সেই পত্রখানি দিলেন। সে সেই পত্র লইয়া যশোহরে যাত্রা করিল।

 পত্র লইয়া গেল বটে, কিন্তু নয়ানচাঁদের মনে বড় ভয় হইল। প্রতাপ আদিত্যের হাতে এ পত্র পড়িলে না জানি তিনি কি করিয়া বসেন। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া মহিষীর হাতে সে এই পত্র দিতে সংকল্প করিল। মহিষীর মনের অবস্থা বড় ভাল নয়। একদিকে বিভার জন্য তাঁহার ভাবনা, আর এক দিকে উদয়াদিত্যের জন্য তাঁহার কষ্ট। সংসারের গোলেমালে তিনি যেন একবারে ঝালাফালা হইয়া গিয়াছেন। মাঝে মাঝে প্রায় তাঁহাকে কাঁদিতে দেখা যায়। তাঁহার যেন আর ঘরকন্নায় মন লাগে না। এইরূপ অবস্থায় তিনি এই পত্রখানি পাইলেন—কি যে করিবেন কিছু ভাবিয়া পাইলেন না। বিভাকে কিছু বলিতে পারেন না; তাহা হইলে সুকুমার বিভা আর বাঁচিবে না। মহারাজের কানে এ চিঠির কথা উঠিলে কি যে অনর্থপাত হইবে তাহার ঠিকানা নাই। অথচ এমন সঙ্কটের অবস্থায় কাহাকে কিছু না বলিয়া, কাহারো নিকট কোন পরামর্শ না লইয়া মহিষী বাঁচিতে পারেন না, চারিদিক অকূল পাথার দেখিয়া মহিষী কাঁদিতে কাঁদিতে প্রতাপাদিত্যের কাছে গেলেন। কহিলেন—“মহারাজ, বিভার ত যাহা হয় একটা কিছু করিতে হইবে।”

 প্রতাপাদিত্য কহিলেন, “কেন বল দেখি?”

 মহিষী কহিলেন, “নাঃ, কিছু যে হইয়াছে তাহা নহে—তবে বিভাকে ত এক সময়ে না এক সময়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাইতেই হইবে!”

 প্রতাপাদিত্য—“সে ত বুঝিলাম, তবে এত দিন পরে আজ যে সহসা তাহা মনে পড়িল?”

 মহিষী ভীত হইয়া কহিলেন—“ঐ তােমার এক কথা, আমি কি বলিতেছি যে কিছু হইয়াছে? যদি কিছু হয়—”

 প্রতাপাদিত্য বিরক্ত হইয়া কহিলেন “হইবে আর কি?”

 মহিষী—“এই মনে কর যদি জামাই বিভাকে একেবারে ত্যাগ করে।” বলিয়া মহিষী রুদ্ধকণ্ঠ হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন।

 প্রতাপাদিত্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। তাঁহার চোখ দিয়া অগ্নিকণা বাহির হইল।

 মহারাজের সেই মূর্ত্তি দেখিয়া মহিষী জল মুছিয়া তাড়াতাড়ি কহিলেন, “তাই বলিয়া জামাই কি আর সত্য সত্যই লিখিয়াছে যে, ওগাে তােমাদের বিভাকে আমি ত্যাগ করিলাম, তাহাকে আর চন্দ্রদ্বীপে পাঠাইও না, তাহা ত নহে—তবে কথা এই, যদি কোন দিন তাই লিখিয়া বসে!”

 প্রতাপাদিত্য কহিলেন—“তখন তাহার বিহিত বিধান করিব, এখন তাহার জন্য ভাবিবার অবসর নাই।”

 মহিষী কাঁদিয়া কহিলেন,—“মহারাজ তােমার পায়ে পড়ি, আমার একটি কথা রাখ। একবার ভাবিয়া দেখ বিভার কি হইবে! আমার পাষাণ প্রাণ বলিয়া আজও রহিয়াছে, নহিলে আমাকে যতদূর যন্ত্রণা দিবার তা দিয়াছ। উদয়কে—আমার বাছাকে—রাজার ছেলেকে—সামান্য অপরাধীর মত রুদ্ধ করিয়াছ—সে-আমার কাহারাে কোন অপরাধ করে না, কিছুতেই লিপ্ত থাকে না, দোষের মধ্যে সে কিছু বােঝে সােঝে না, রাজকার্য্য শেখে নাই, প্রজা শাসন করিতে জানে না, তাহার বুদ্ধি নাই, তা ভগবান্ তাহাকে যা করিয়াছেন, তাহার দোষ কি।” বলিয়া মহিষী দ্বিগুণ কাঁদিতে লাগিলেন।

 প্রতাপাদিত্য ঈষৎ বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “ও কথা ত অনেকবার হইয়া গিয়াছে। যে কথা হইতেছিল তাহাই বল না।”

 মহিষী কপালে করাঘাত করিয়া কহিলেন, “আমারি পোড়া কপাল! বলিব আর কি? বলিলে কি তুমি কিছু শােন? একবার বিভার মুখপানে চাও মহারাজ! সে যে কাহাকেও কিছু বলে না—সে কেবল দিনে দিনে শুকাইয়া যায়, ছায়ার মত হইয়া আসে, কিন্তু সে কথা কহিতে জানে না! তাহার একটা উপায় কর।”

 প্রতাপাদিত্য বিরক্ত হইয়া উঠিলেন—মহিষী আর কিছু না বলিয়া ফিরিয়া আসিলেন।