ব্যক্তিপ্রসঙ্গ/পরমহংস রামকৃষ্ণ দেব

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বহু সাধকের
বহু সাধনার ধারা,
ধেয়ানে তোমার
মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে
অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ
রূপ নিল এ জগতে;
দেশ বিদেশের
প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার
প্রণতি দিলাম আনি।।
 
শান্তিনিকেতন

• জগদীশচন্দ্র বসু। জয় হোক তব জয়! স্বদেশের গলে দাও তুমি তলে। যশোমাল! তাক্ষয় ! বহুদিনা হাতে ভারতের বাণ৷ আছিল নীরবে অপমান মানি তুমি তারে তাজি জাগায়ে তুলিয়া। রটালে বিশ্বময় ৷ | জ্ঞানমন্দিরে জালায়েছ। তুমি যে নব আলোকশিখা তোমার সকল ভ্রাতার ললাটে দিল উজ্জ্বল টিক ! অবারিত গত্তি তব জয়রথ ফিরে যেন তাজি সকল জগৎ । দঃখ দীনতা যা আছে মোদের তোমারে বাঁধি না রয়। মাঘ ৩০ মাসিক বসুমতী, জৈষ্ঠ ১৩৬০ ৷ জগদীশচন্দ্র বসু। সত্যের মন্দিরে তুমি যে দীপ জ্বালিলে অনির্বাণ। তোমার দেবতা সাথে তোমারে করিল দীপ্যমান। প্রবাসী, চৈত্র ১৩৪৪ ৩ নমস্কার অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহো নমস্কার। হে বন্ধু, হে দেশবন্ধু, স্বদেশ-আত্মার বাণীমূর্তি তুমি। তোমা লাগি নহে মান, নহে ধন, নহে সুখ; কোনো ক্ষুদ্র দান রবীন্দ্র-রচনাবলী চাহ নাই কোনো ক্ষুদ্র ; ভিক্ষা লাগি বাড়াও নি আতুর অঞ্জলি। আছ জাগি। পরিপূর্ণতার তরে সর্ববাধাহীন যার লাগি নরদেব চিররাত্রিদিন। তপোমগ্ন, যার লাগি কবি বজরবে গেয়েছেন মহাগীত, মহাবীর সবে গিয়েছেন সংকটযাত্রায়, যার কাছে আরাম লজ্জিত শির নত করিয়াছে, মৃত্যু হুলিয়াছে ভয়, সেই বিধাতার শ্ৰেষ্ঠ দান আপনার পূর্ণ অধিকার চেয়েছ দেশের হয়ে অকুঠ আশায়। সত্যের ে গৌরব প্রদীপ্ত ভাষায়। অখণ্ড বিশ্বাসে। তোমার প্রার্থনা আজি বিধাতা কি শুনেছেন ? তাই উঠে বাজি জয়শন্ধ ৰ্তার ? তোমার দক্ষিণকরে তাই কি দিলেন আজি কঠোর আদরে দুঃখের দারুণ দীপ, আলোক যাহার জুলিয়াছে বিদ্ধ করি .দেশের আধার ধ্রুবতারকার মতো ? জয় তব জয়! কে আজি ফেলিবে অঞ, কে করিবে ভয়-- সত্যেরে করিবে খর্ব কোন কাপুরুষ। নিজেরে করিতে রক্ষা! কোন্ অমানুষ তোমার বেদনা হতে না পাইবে বল! মোছ রে দুর্বল চক্ষু, মোছ অক্সজল ৷৷ দেবতার দীপ হন্তে যে আসিল ভবে সেই রুদ্রদূতে, বলো, কোন রাজা কবে। পারে শাস্তি দিতে! বন্ধনশূল তার। চরণবন্দনা করি করে নমস্কার কারাগার করে অভ্যর্থনা। রুষ্ট রাহু। বিধাতার সূর্য-পানে বাড়াইয়া বাহু আপনি বিলুপ্ত হয় মুহুর্তেক-পরে। ছায়ার মতন! শাস্তি! শাস্তি তারি তরে। যে পারে না শান্তিভয়ে হইতে বাহির লঙিঘয়া নিজের গড়া মিথ্যার প্রাচীর কপট বেষ্টন, যে নপুংস কোনোদিন। চাহিয়া ধর্মের পানে নিভীক স্বাধীন অন্যায়েরে বলে নি অন্যায়, আপনার মনুষ্যত্ব বিধিদত্ত নিত্য-অধিকার যে নির্লজ্জ ভয়ে লোভে করে অস্বীকার সভামাঝে, দুর্গতির করে অহংকার, কবিতা। দেশের দুর্দশা লয়ে যার ব্যবসায়, অন্ন যার অকল্যাণ মাতরক্ত-প্ৰায় — সেই ভীরু নতশির চিরশাস্তিভারে। রাজাকারা-বাহিরেতে নিত্যকারাগারে। বন্ধন-পীড়ন-দুঃখ-অসম্মান-সমাঝে। হেরিয়া তোমার মূর্তি কৰ্ণে মোর বাজে। আত্মার বন্ধনহীন আনন্দের গান মহাতীর্থযাত্রীর সংগীত, চিরপ্ৰাণ আশার উল্লাস, গম্ভীর নির্ভয় বাণী উদার মৃত্যুর। ভারতের বীণাপাণি, হে কবি, তোমার মুখে রাখি দৃষ্টি তার তারে তারে দিয়েছেন বিপুল ঝংকার নাহি তাহে দুঃখতান, নাহি ক্ষুদ্র লাজ, নাহি দৈন্য, নাহি ত্ৰাস। তাই শুনি আজ কোথা হতে ঝঙ্কা-সাথে সিন্ধুর গর্জন, অন্ধবেগে নিৰ্বরের উন্মত্ত নর্তন পাষাণপিঙর টুটি, বজ্রগর্জরব। ভেরিমন্দ্রে মেঘপুঞ্জ জাগায় ভৈরব। এ উদাত্ত সংগীতের তরঙ্গ-মাঝার, অরবিন্দ, রবীন্ত্রের লহো নমস্কার। তার পরে ঐারে নমি, যিনি ীড়াচ্ছলে গড়েন নূতন সৃষ্টি প্ৰলয়-অনলে, মৃত্যু হতে দেন প্ৰাণ, বিপদের বুকে সম্পদেরে করেন লালন, হাসিমুখে। ভক্তেরে পাঠায়ে দেন কটককান্তারে। রিক্তহস্তে শক্ৰমাঝে রাত্রি-অন্ধকারে; যিনি নানা কণ্ঠে কন, নানা ইতিহাসে, সকল মহৎ কর্মে, পরম প্রয়াসে, সকল চরম লাভে, ‘দুঃখ কিছু নয়— ক্ষত মিথ্যাক্ষতি মিথ্যামিথ্যা সৰ্ব ভয়। কোথা মিথ্যা রাজাকোথা রাজদণ্ড তার! কোথা মৃত্যু, অন্যায়ের কোথা অত্যাচার! ওরে ভীরু, ওরে মূঢ়, তোলো তোলা শির, আমি আছি, তুমি আছ, সত্য আছে স্থির।' শান্তিনিকেতন ৭ ভাদ্র ১৩১৪ বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১৩১৪ রবীন্দ্র-রচনাবলী নন্দলাল বসু শ্ৰীমান নন্দলাল বসু পরম কল্যাণীয়েযু তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে। ভারত-ভারতী চিত্ত। বঙ্গলক্ষ্মী ভাণ্ডারে সে যে। জোগায় নূতন বিত্ত। ভাগ্যবিধাতা আশিসমন্ত্র। দিয়েছে তোমার কর্ণে— বিশ্বের পটে স্বদেশের নাম লেখো অক্ষয় বর্ণে! তোমার তুলিকা কবির হৃদয় নন্দিত করে, নন্দ, তাই তো কবির লেখনী তোমায় পরায় আপন ছন্দ। চিরসূন্দরে করো গো তোমার রেখাবন্ধনে বন্দী! শিবজটাসম হোক তব তুলি চির রসনিষ্যন্দী। শান্তিনিকেতন ১২ বৈশাখ ১৩২১ প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩২১ নন্দলাল বসু কল্যাণীয় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু. রেখার রহস্য যেথা জাগলিছে দ্বার সে গোপন কক্ষে জানি জনম তোমার। সেথা হতে রচিতেছ রূপের যে নাড় মরুপথশ্ৰান্ত সেথা করিতেছে ভিড়। ৩. ১২. ৪০ শান্তিনিকেতন মাঘ ১৩৪৮ কবিতা চার্লস অ্যান্ডরুজের প্রতি প্রতীচীর তীৰ্থ হতে প্রাণরসধার হে বধূ, এনেছ তুমি, করি নমস্কার। প্রাচী দিল কষ্ঠে তব বরমাল্য তার, হে বন্ধু, গ্রহণ করো, করি নমস্কার। খুলেছ তোমার প্রেমে আমাদের দ্বার । হে বন্ধু, প্রবেশ করো, করি নমস্কার। তোমারে পেয়েছি মোরা দানরূপে যার হে বন্ধু, চরণে তার করি নমস্কার। এপ্রিল ১৯১৪ } তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা শ্রাবণ ১৮৩৬ শক । ১৩২১ বঙ্গাব্দ প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্ৰেম রসায়নে, ওগো সর্বজনপ্রিয় করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়। আনন্দবাজার পত্রিকা ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩২ • রামমোহন রায় হে রামমোহন, আজি শতেক বৎসর করি পার মিলিল তোমার নামে দেশের সকল নমস্কার । মৃত্যু-অন্তরাল ভেদি দাও তব অন্তহীন দান। যাহা কিছু জরাজীর্ণ তাহাতে জাগাও নব প্ৰাণ। যাহা কিছু মূঢ় তাহে চিত্তের পরশমণি তব এনে দিক উদবোধন, এনে দিক শক্তি অভিনব। The Student’s Ramohan Centenary Volume Calcutta 1934 ১ ৮ || ২ রবীন্দ্র-রচনাবলী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এনেছিলে সাথে ক’রে মৃত্যুহীন প্ৰাণ, মরণে তাহাই তুমি করি গেলে দান। | ১৩৩২ } ১০ • চিত্তরঞ্জন দাশ। স্বদেশের যে ধূলিরে শেষ স্পৰ্শ দিয়ে গেলে তুমি বক্ষের অঞ্চল পাতে সেথায় তোমার জন্মভূমি। দেশের বন্দনা বাজে শব্দহীন পাষাণের গীতে এসো দেহহীন স্মৃতি মৃত্যুহীন প্রেমের বেদীতে। ১৬ জুন ১৯৩৫ আনন্দবাজার পত্রিকা ১ আষাঢ় ১৩৪২ • আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একদা তোমার নামে সরস্বতী রাখিলা স্বাক্ষর, তোমার জীবন ওঁাহার মহিমা ঘোষিল নিরস্তর। এ-মন্দিরে সেই নাম ধ্বনিত করুক তারি জয়, তাহার পূজার সাথে স্মৃতি তব হউক অক্ষয়। আনন্দবাজার পত্রিকা ১৫ আষাঢ় ১৩৪২ ১২ • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাঙালির চিত্তক্ষেত্রে, আশুতোষ বিদ্যার সারথি, তোমারে আপন নামে সম্মানিত করেছে ভারতী। কবিতা প্রবল প্রভাবে তব বঙ্গবাণী বাহনের রথ জ্ঞানঅন্ন বিতরণে লভিয়াছে। অস্তরের পথ। তব জন্মভূমিতলে। কবি সেই বাণীর প্রসাদ। পাঠায় উদ্দেশে তব বঙ্গজননীর আশীৰ্বাদ। । বৈশাখ ১৩৪৬ } আনন্দবাজার পত্রিকা ১১ জৈষ্ঠ ১৩৪৬ ১৩ পণ্ডিত রামচন্দ্ৰ শৰ্মা প্রাণঘাতকের খঙ্গে করিতে ধিক্কার হে মহাত্মা, প্রাণ দিতে চাও আপনার, তোমারে জানাই নমস্কার। হিংসারে ভক্তির বেশে দেবালয়ে আনে, রক্তাক্ত করিতে পূজা সংকোচ না মানে। সপিয়া পবিত্র প্রাণ, অপবিত্রতার ক্ষালন করিবে তুমি সংকল্প তোমার, তোমারে জানাই নমস্কার। মাতৃস্তনচ্যুত ভীত পশুর ক্ৰন্দন। মুখরিত করে মাতৃ-মন্দিরপ্রাঙ্গণ। অবলের হত্যা অৰ্ঘে পূজা-উপচার এ ফুচাইবে স্বদেশমাতার, কলঙ্ক তোমারে জানাই নমস্কার। নিঃসহায়, আত্মরক্ষা-অক্ষম যে প্ৰাণী, নির্ভর পুণ্যের আশা সে জীবেরে হানি, তারে তুমি প্ৰাণমূল্য দিয়ে আপনার ধর্মলোভী হাত হতে করিবে উদ্ধার তোমারে জানাই নমস্কার। ১৫ ভাদ্র ১৩৪২ প্রবাসী, কার্তিক ১৩৪২ ১০ রবীন্দ্র-রচনাবলী ১৪ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল আচার্য শ্ৰীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, সুহৃদরে জ্ঞানের দুর্গম উর্ধে উঠেছ সমুচ্চ মহিমায়, যাত্ৰী তুমি, যেথা প্রসারিত তব দৃষ্টির সীমায়। সাধনাশিখরশ্ৰেণী; যেথায় গহন গুহা হতে সমুদ্রবাহিনী বার্তা চলেছে প্রস্তরভেদী শ্লোতে নব নব তীর্থ সৃষ্টি করি, যেথা মায়া-কুহেলিকা। ভেদি উঠে মুক্তদৃষ্টি তুসমৃঙ্গ, পড়ে তাহা লিখা। প্ৰভাতের তমোজয়,লিপি; যেথায় নক্ষত্রলোকে দেখা দেয় মহাকাল আবর্তিয়া আলোকে আলোকে বহুিমণ্ডলের জপমালা; যেথায় উদয়াচলে আদিত্যবরণ যিনি, মর্ত্যধরণীর দিগঞ্চলে অনাবৃত করি দেন তামৰ্ত্য-রাজ্যের জাগরণ, তপস্বীর কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্ছসিয়া -— শুন বিশ্বজম, শুন তামৃতের পুত্র, হেরিলাম মোহান্ত পুরুষ। মিক্সের পার হতে তেজোময়, যেথায় মানুষ। শুনে দৈববাণী। সহসা পায় সে দৃষ্টি দীপ্তিমান, দিকসীমাপ্রান্তে পায় অসীমের নূতন সন্ধান। বরেণ্য অতিথি তুমি বিশ্বমানবের তপোবনে, সত্যদ্ৰষ্টাযেথা যুগ-যুগান্তরে ধ্যানের গগনে গৃঢ় হতে উদারিত জ্যোতিষ্কের সম্মিলন ঘটে, যেথায় অঙ্কিত হয় বর্ণে বর্ণে কল্পনার পটে নিত্যসন্দরের আমন্ত্রণ। সেথাকার শুভ্র আলো বরমালারূপে তব সমুদার ললাটে জড়ালো। বাণীর দক্ষিণ পাণি। মোরে তুমি জানো বন্ধু বলি, আমি কবি আনিলাম ভরি মোর ছন্দের তাঞ্জলি। স্বদেশের আশীর্বাদ, বিদায়কালের অধ্য মোর বাহুতে বাধিনু তব সপ্ৰেম শ্ৰদ্ধার রাখিডোর। ১ ডিসেম্বর, ১৯৩৫ আনন্দবাজার পত্রিকা। ৪ পোষ ১৩৪২ প্রবাসী। মাঘ ১৩৪২ কবিতা ১৫ পরমহংস রামকৃষ্ণদেব বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা। তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে । মতন তীর্থ রূপ নিল এ-জগতে; দেশ-বিদেশের প্রণাম আনিল টানি সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি । প্ৰবাসা ফামুন ১৩৪. ১৬ • বিধুশেখর ভট্টাচার্য। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত শ্রীযুক্ত বিধুশেখর ভট্টাচার্য সুহৃদবরেম্ব বিদ্যার তপম্বা তুাম। আজ তুমি বশম্বী ভারতে; কবি তব জয়মাল্য দপি দিল তব জয়রথে। এই আশীৰ্বাদ করি :– তব যাত্রা হোক অগ্রসর অপূর্ব কীর্তির পথে উক্তরিয়া দেশদেশান্তর দূর হতে দূরে। একদিন যবে অখ্যাত নিভৃতে শুদ্ধ ছিলে, অস্তলীন আনন্দের তাদৃশ্য রশ্মিতে সিদ্ধি ছিল মহীরসীভারতীর প্রসাদটিতে ছিল তব পুরস্কৃতি, ছিল না তা লোকের দৃষ্টিতে। জ্ঞানের প্রদীপ তব দীপ্ত ছিল ধ্যানের আড়ালে। নিষ্কম্প তালোকে। আভ জনারণ্যে চরণ বাড়ালে, সেথা পরিচয় লাগি নাম মাগে উপাধির সীমা, সেথা মহিমার চোয়ে মানে লোকে চিহ্নের গরিমা। চিহ্ন না রহিতে তবু তোমারে চিনিয়াছিল যারা তাদের সম্মানমাল্য জনতার কাছে মূল্যহারা। যেথা যাহা প্রয়োজন তাই দিন সৌভাগ্যবিধাতা, পদবীর পরিমাপে হয় যদি হোক উচ্চ মাথা। বিশ্বে তুমি দৃশ্য হও ভালে বহি রাজদত্ত টিকা, বন্ধচিত্তে থাকো লয়ে নিলাঙ্কন আত্মালোকশিখা।। বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শান্তিনিকেতন ১২ মাঘ ১৩৪২ প্রবাসী, ফামুন ১৩৪২ রবীন্দ্র রচনাবলী ১৭ শরৎচন্দ্র যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে, ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে। দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি' দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি। (মাঘ ১৩৪৪] ভারতবর্ষ ফালুন ১৩৪৪ ১৮ হেরম্বচন্দ্র মৈত্রেয় জীবনভাণ্ডারে তব ছিল পূর্ণ অমৃত-পাথেয়, সংসারযাত্রায় ছিল বিশ্বাসের আনন্দ অমেয়। দৃষ্টি যবে আঁধারিল ছিল তব আত্মার আলোক, জরাআচ্ছাদনতলে চিত্তে ছিল নিত্য যে বালক। নির্বিচল ছিলে সত্যে, হে নির্ভীক, তুমি নির্বিকার তোমারে পরালো মৃত্যু অস্নানবিজয়মাল্য তার। ২ মাঘ ১৩৪৪ প্রবাসী ফাদুন ১৩৪৪ ১৯ যাত্রীর মশাল চাই রাত্রির তিমির হানিবারে, সুপ্তি শয্যাপান্থে দীপ বাতাসে নিভিছে বারে বারে। কালের নির্মম বেগ স্থবির কীৰ্তিরে চলে নাশি, নিশ্চলের আবর্জনা নিশ্চিহ্ন কোথায় যায় ভাসি। যাহার শক্তিতে আছে অনাগত যুগের পাথেয়। সৃষ্টির যাত্রায় সেই দিতে পারে আপনার দেয়। তাই স্বদেশের তরে তারি লাগি উঠিছে প্রার্থনা ভাগ্যের যা মুষ্টিভিক্ষা নহে, নহে জীৰ্ণ শস্যকণা । অন্ধুর ওঠে না যার, দিনান্তের অবজ্ঞার দান। আরম্ভেই যার অবসান। কবিতা সে প্রার্থনা পুরায়েছ হে বঙ্কিম, কালের যে বর এনেছ আপন হাতে নহে তাহা নির্জীব স্থাবর। নব যুগসাহিত্যের উৎস উঠি মন্ত্ৰম্পর্শে তব চিরচলমান স্নোতে জাগাইছে প্ৰাণ অভিনব এ-বঙ্গের চিত্তক্ষেত্রে, চলিতেছে সম্মুখের টানে। নিত্য নব প্রত্যাশায় ফলবান ভবিষ্যৎ পানে। তাই ধ্বনিতেছে তাজি সে বাণীর তরঙ্গ কল্লোলে, বঙ্কিম, তোমার নাম, তব কীর্তি সেই স্রোতে দোলে। বঙ্গভারতীর সাথে মিলায়ে তোমার আয়ু গনি, তাই তব করি জয়ধ্বনি। শনিবারের চিঠি আষাঢ় ১৩৪৫ ২০ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বঙ্গসাহিত্যের রাত্রি স্তব্ধ ছিল তন্দ্রার আবেশে। অখ্যাত জড়ত্বভারে অভিভূত। কী পুণ্য নিমেযে তব শুভ অভু্যদয়ে বিকীরিল প্রদীপ্ত প্রতিভা, প্রথম আশার রশ্মি নিয়ে এল প্রত্যুষের বিভা, বঙ্গভারতীর ভালে পরালো প্রথম জয়টিকা। রুদ্ধভাযা আঁধারের খুলিলে নিবিড় যবনিকা হে বিদ্যাসাগর, পূর্ব দিগন্তের বনে-উপবনে নব উদবোধনগাথা উচ্ছসিল বিস্মিত গগনে। যে বাণী আনিলে বহি নিস্কলুষ তাহা শুভরুচি, সকরুণ মাহাত্ম্যের পুণ গঙ্গাস্নানে তাহা গুচি। ভাষার প্রাঙ্গণে তব আমি করিব তোমারি অতিথি; ভারতীর পূজাতরে চয়ন করেছি আমি গীতি সেই তরুতল হতে যা তোমার প্রসাদসিঞ্চনে। মরুর পাষাণ ভেদি প্রকাশ পেয়েছে শুভক্ষণে। ২৪ ভাদ্র ১৩৪৫ প্রবাসী, কার্তিক ১৩৪৫ ২১ জলধর বাঙালির প্রীতি অৰ্ঘে তব দীৰ্ঘ জীবনের তরী ৱিন্ধ শ্রদ্ধাসুধারস নিঃশেষে লয়েছে পূর্ণ করি। ১৪ রবীন্দ্র-রচনাবলী আজি সংসারের পারে, দিনান্তের অস্তাচল হতে প্রশান্ত তোমার স্মৃতি উদ্ভাসিত অন্তিম আলোতে। ২'৬.৪.৩৯ ভারতবর্ষ। জ্যৈষ্ঠ১৩৪৬ কল্যাণীয় রথীন্দ্রনাথ। মধ্যপথে জীবনের মধ্য দিনে। উগুরিলে আজি; এই পথ নিয়েছিলে চিনে, সাড়া পেয়েছিলে তব প্ৰাণে দূরগামী দুৰ্গমের স্পধিত আহবানে ছিল যবে প্রথম যৌবন। সেদিন ভোজের পাত্রে রাখ নি ভোগের আয়োজন, ধনের প্রশ্রয় হতে আপনারে করেছ বঞ্চিত। অন্তরেতে দিনে দিনে হয়েছে সঞ্চিত পূজার নৈবেদ্যঅবশেষ, যে পূজায় তব দেশ তোমারে দিয়েছে দেখা দরিদ্র দেবতা রূপে আসীন ধূলির স্তুপে। অসম্মানে অবজায়। সপেছ জীবন তব অৰ্ঘ্য তার পায়ের তলায়। তপস্যার ফল তব প্রতিদিন ছিলে সমৰ্পিতে আমারি খ্যাতিতে। তোমার সকল চিত্তে, সব বিত্তে ভবিয্যের অভিমুখে পথ দিতেছিলে মেলে, তার লাগি যশ না'ই পেলে। কর্মের যেখানে উচ্চদাম সেখানে কর্মীর নাম নেপথ্যেই থাকে একপাশে। মানবের ইতিহাসে যে-সকল খ্যাতনাম বহিতেছে উজ্জ্বল অক্ষর তাদের অজানা লিপিকর আপনার অকীর্তিত জীবনের হোমাগ্নিশিখায়। লাগায় রঙের দীপ্তি সে নামলিখায়। প্রগভ জনতা যত দেয় পুরস্কার তার চেয়ে শ্ৰেষ্ঠ দান নিভৃতে নীরব বিধাতার। কবিতা ১৫ মন্দগতি গেছে কত দিন। মহুর দৈন্যোর ভারে কৃছুশীৰ্ণ বিশ্রামবিহীন। অকরুণ সংসারের দুঃখ তাপ শোক যাত্রাপথে ছায়াচ্ছন্ন করেছে আলোক বারংবার. অকারণ প্রতিকূলতার পেয়েছ আঘাত অকস্মাৎ; দুর্যোগের কুটিল ভ্ৰকুটি ক্ষণে ক্ষণে। অবসাদ ঘনায়েছে কর্মের লগনে। ভাগোর করুণ! কজ করে নির্মম ঔদাসাবেশে আকাংক্ষার দূর অগোচরে, বিধাতার প্রত্যাশিত বর প্রতিক্ষণে সেবা চাহে, দেয় শুধু সন্দিগ্ধ উত্তর! সফল ভাবার জাগরণ ভূমিগর্ভে ও প্ত থাকে, বাহিরের আকাশে যখন আশা আর নৈরাশ্যের উদবিগ্ন পর্যায় খর রোদ্ৰে কহু শাপ দেয়, আশ| দেয় মেঘের সংকেতে । অবশেষে অম্বরের দেখা মেলে কৃষিদণ ক্ষেতে, প্ৰসন্ন আঘানে সোনার আশ্বাস লাগে ধানে। প্রৌঢ় সেই শরতের সফল দিনের জয়ধ্বনি । তাঙর-আকাশ তব শুরুক অপাঁন। উধ্ব হতে আনন্দের ঘোতে । সম্পূর্ণ করিবে তারে বন্ধুদের বাহিরের দান। স্নেহের সম্মান । বিদায়প্রহরে রাব দিনাতের অস্তনত করে রেখে যাবে আশীর্বাদ তোমার ত্যাগের ক্ষেত্র-'পরে ৷৷ শান্তিনিকেতন । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৩৪৫ ২৩ কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্ৰীযুক্ত কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। হে বন্ধু, হে সাহিতোর সাথি, আসিছে আসন্ন হয়ে রাতি। ১৬ রবীন্দ্র-রচনাবলী আছি দোহে দিনান্তের প্রদোষচ্ছায়ায় পারের খেয়ার প্রতীক্ষায়। পথে দীপ ধ'রে আছে জানি না সে কোন শুকতারা কোন প্রভাতের কূলে বিদায়ের যাত্রা হবে সারা। মায়াবিজড়িত এই জীবনের স্বৰ্গরাজ্য হতে চির জাগরণ হবে পূর্ণের আলোতে মৃত্যুর আনন্দরূপ এ আশ্বাসে অন্তিম আঁধারে । দেখা দিক এ জন্মের দ্বিধাদ্বন্ধ পারে। ইতি ১৭. ১. ৪১ সহযাত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবাসী। আশ্বিন ১৩৪৮