ব্যঙ্গকৌতুক/অরসিকের স্বর্গপ্রাপ্তি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

৺গোকুলনাথ দত্ত। ইন্দ্রলোক

গোকুলনাথ। ( স্বগত) আমি দেখছি স্বর্গটি স্বাস্থ্যের পক্ষে দিব্য জায়গা হয়েছে। এ সম্বন্ধে প্রশংসা না করে থাকা যায় না। অনেক উচ্চে থাকার দরুন অক্সিজেন বাষ্পটি বেশ বিশুদ্ধ পাওয়া যায়, এবং রাত্রিকাল না থাকাতে নন্দনবনের তরুলতাগুলি কার্বনিক অ্যাসিড গ্যাস পরিত্যাগ করবার সময় পায় না, হাওয়াটি বেশ পরিষ্কার। এ দিকে ধুলো নেই, তাতে করে একেবারে রোগের বীজই নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এখানে বিদ্যাচর্চার যেরকম অবহেলা দেখছি তাতে আমি সন্দেহ করি ধুলোয় রোগের বীজ উড়ে বেড়ায় এ সংবাদ এখনো এঁদের কানে এসে পৌঁচেছে কি না। এঁরা সেই-যে এক সামবেদের গাথা নিয়ে পড়েছেন, এর বেশি আর ইণ্টেলেক্‌চুয়াল মুভ্‌মেণ্ট অগ্রসর হল না। পৃথিবী দ্রুতবেগে চলছে, কিন্তু স্বর্গ যেমন ছিল তেমনিই রয়েছে, কনসার্ভেটিভ যত দূর হতে হয়।

(বৃহস্পতির প্রতি) আচ্ছা পণ্ডিতমশায়, ঐ-যে সামবেদের গান হচ্ছে, আপনারা তো বসে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনছেন, কিন্তু কোন্‌ সময়ে ওর প্রথম রচনা হয় তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে পেরেছেন কি? কী বললেন? স্বর্গে আপনাদের ইতিহাস নেই? আপনাদের সমস্তই নিত্য? সুখের বিষয়। সুরবালকদের তারিখ মুখস্থ করতে হয় না! কিন্তু, বিদ্যাচর্চা ওতে করে কি অনেকটা অসম্পূর্ণ থাকে না? ইতিহাসশিক্ষার উপযোগিতা চার প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করা যেতে পারে।— প্রথম, ক—

মনোযোগ দিচ্ছেন কি?—( স্বগত) গান শুনতেই মত্ত, তার আর মন দেবে কী করে? পৃথিবী ছেড়ে অবধি এঁদের কাউকে যদি একটা কথা শোনাতে পেরে থাকি! শুনছে কি না শুনছে মুখ দেখে কিছু বোঝবার জো নেই : একটা কথা বললে কেউ তার প্রতিবাদও করে না, এবং কারও কথার কোনো প্রতিবাদ করলে তার একটা জবাব পাওয়াই যায় না। শুনেছি এইখানেই আমাকে সাড়ে পাঁচ কোটি সাড়ে পনেরো লক্ষ বৎসর কাটাতে হবে। তা হলেই তো গেছি। আত্মহত্যা করে যে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে সে সুবিধাও নেই। এখানকার সাপ্তাহিক মৃত্যুতালিকা অন্বেষণ করতে গিয়ে শুনলুম, এখানে মৃত্যু নেই। অশ্বিনীকুমার-নামক দুই বৈদ্য যে পদটি পেয়েছেন ওঁদের যদি বাঁধা খোরাক বরাদ্দ না থাকত তা হলে সমস্ত স্বর্গ ঝেঁটিয়ে এক পয়সা ভিজিট জুটত না। তবে কী করতে যে ওঁরা এখানে আছেন তা আমাদের মানুষের বুদ্ধিতে বুঝতে পারি নে। কাউকে তো খরচের হিসাব দিতে হয় না, যার যা খুশি তাই হচ্ছে। থাকত একটা ম্যুনিসিপ্যালিটি, এবং নিয়মমত কাজ হত, তা হলে আমি তো সর্বাগ্রে ঐ দুটি হেল্‌থ-অফিসারের পদ উঠিয়ে দেবার জন্যে লড়তুম। এই-যে রোজ সভার মধ্যে অমৃত ছড়াছড়ি যাচ্ছে, তার একটা হিসেব কোথাও আছে? সেদিন তো শচীঠাকরুনকে স্পষ্টই মুখের উপর জিজ্ঞাসা করলুম, স্বর্গের সমস্ত ভাঁড়ার তো আপনার জিম্মায় আছে; পাকা খাতায় হোক, খসড়ায় হোক, তার কোনো-একটা হিসেব রাখেন কি— হাতচিঠা কি রসিদ, কি কোনো রকমের একটা নিদর্শন রাখা হয়? শচীঠাকরুন বোধ করি মনে মনে রাগ করলেন; স্বর্গ সৃষ্টি হয়ে অবধি এরকম প্রশ্ন তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করে নি। যা পাব্লিকের জিনিস তার একটা রীতিমত জবাবদিহি থাকা চাই, সে বোধটা এঁদের কারও দেখতে পাই নে। অজস্র আছে বলেই কি অজস্র খরচ করতে হবে! যদি আমাকে বেশিদিন এখানে থাকতেই হয় তা হলে স্বর্গের সমস্ত বন্দোবস্ত আগাগোড়া রিফর্ম না করে আমি নড়ছি নে। আমি দেখছি, গোড়ায় দরকার অ্যাজিটেশন— ঐ জিনিসটা স্বর্গে একেবারেই নেই; সব দেবতাই বেশ সন্তুষ্ট হয়ে বসে আছেন। এঁদের এই তেত্রিশ কোটিকে একবার রীতিমত বিচলিত করে তুলতে পারলে কিছু কাজ হয়। এখানকার লোকসংখ্যা দেখেই আমার মনে হয়েছিল এখানে একটি বড়ো রকমের দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বেশ চালানো যেতে পারে। আমি যদি সম্পাদক হই, তা হলে আর দুটি উপযুক্ত সাব-এডিটর পেলেই কাজ আরম্ভ করে দিতে পারি। প্রথমত নারদকে দিয়ে খুব এক চোট বিজ্ঞাপন বিলি করতে হয়। তার পরে বিষ্ণুলোক ব্রহ্মলোক চন্দ্রলোক সূর্যলোকে গুটিকতক নিয়মিত সংবাদদাতা নিযুক্ত করতে হয়। আহা, এই কাজটি যদি আমি করে যেতে পারি তা হলে স্বর্গের এ চেহারা আর থাকে না। যাঁরা-সব দেবতাদের ঘুষ দিয়ে দিয়ে স্বর্গে আসেন, প্রতি সংখ্যায় তাঁদের যদি একটি করে সংক্ষেপ-মর্তজীবনী বের করতে পারি তা হলে আমাদের স্বর্গীয় মহাত্মাদের মধ্যে একটা সেন্‌সেশন পড়ে যায়। একবার ইন্দ্রের কাছে আমার প্রস্তাবগুলো পেড়ে দেখতে হবে। (ইন্দ্রের নিকট গিয়া) দেখুন মহেন্দ্র, আপনার সঙ্গে আমার গোপনে কিছু (অপ্সরাগণকে দেখিয়া) ও! আমি জানতুম না এঁরা সব এখানে আছেন— মাপ করবেন— আমি যাচ্ছি। একি, শচীঠাকরুনও যে বসে আছেন! আর, ঐ বুড়ো বুড়ো রাজর্ষি-দেবর্ষিগুলোই বা এখানে বসে কী দেখছে! দেখুন মহেন্দ্র, স্বর্গে স্বায়ত্তশাসন-প্রথা প্রচলিত করেন নি বলে এখানকার কাজকর্ম তেমন ভালো রকম করে চলছে না। আপনি যদি কিছুকাল এই-সমস্ত নাচ-বাজনা বন্ধ করে দিয়ে আমার সঙ্গে আসেন তা হলে আমি আপনাকে হাতে হাতে দেখিয়ে দিতে পারি এখানকার কোনো কাজেরই বিলিব্যবস্থা নেই। কার ইচ্ছায় কী করে যে কী হচ্ছে কিছুই দন্তস্ফুট করবার জো নেই। কাজ এমনতরো পরিষ্কার ভাবে হওয়া উচিত যে, যন্ত্রের মতো চলবে এবং চোখ বুলিয়ে দেখবামাত্রই বোঝা যাবে। আমি সমস্ত নিয়ম নম্বরওয়ারি করে লিখে নিয়ে এসেছি; আপনার সহস্র চক্ষুর মধ্যে একজোড়া চোখও যদি এ দিকে ফেরান তা হলে— আচ্ছা, তবে এখন থাক্‌, আপনাদের গান-বাজনাগুলো নাহয় হয়ে যাক, তার পরে দেখা যাবে।

(ভরত ঋষির প্রতি) আচ্ছা, অধিকারীমশায়, শুনেছি গান-বাজনায় আপনি ওস্তাদ, একটি প্রশ্ন আপনার কাছে আছে। গানের সম্বন্ধে যে ক'টি প্রধান অঙ্গ আছে, অর্থাৎ সপ্ত সুর, তিন গ্রাম, একুশ মূর্ছনা— কী বললেন? আপনারা এ-সমস্ত মানেন না? আপনারা কেবল আনন্দটুকু জানেন! তাই তো দেখছি— এবং যত দেখছি তত অবাক হয়ে যাচ্ছি। ( কিয়ৎক্ষণ শুনিয়া) ভরতঠাকুর, ঐ-যে ভদ্রমহিলাটি— কী ওঁর নাম— রম্ভা? উপাধি কী বলুন। উপাধি বুঝছেন না? এই যেমন রম্ভা চাটুজ্জে কি রম্ভা ভট্টাচার্য, কিংবা ক্ষত্রিয় যদি হন তো রম্ভা সিংহ—এখানে আপনাদের ও-সব কিছু নেই বুঝি? আচ্ছা, বেশ কথা, তা, শ্রীমতী রম্ভা যে গানটি গাইলেন আপনারা তো তার যথেষ্ট প্রশংসা করলেন; কিন্তু ওর রাগিণীটি আমাকে অনুগ্রহ করে বলে দেবেন? একবার তো দেখছি ধৈবত লাগছে, আবার দেখি কোমল ধৈবতও লাগে, আবার গোড়ার দিকে— ওঃ, বুঝেছি, আপনাদের কেবল ভালোই লাগে, কিন্তু ভালো লাগবার কোনো নিয়ম নেই। আমাদের ঠিক তার উলটো, ভালো না লাগতে পারে, কিন্তু নিয়মটা থাকবেই। আপনাদের স্বর্গে যেটি আবশ্যক সেটি নেই, যেটা না হলে চলে তার অনেক বাহুল্য। সমস্ত সপ্তস্বর্গ খুঁজে কায়ক্লেশে যদি আধখানা নিয়ম পাওয়া যায় তো তখনি তার হাজারখানা ব্যতিক্রম বেরিয়ে পড়ে। সকল বিষয়েই তাই দেখছি। ঐ দেখুন-না ষড়ানন বসে আছেন, ওঁর ছটার মধ্যে পাঁচটা মুণ্ডুর কোনোই অর্থ পাবার জো নেই। শরীরতত্ত্বের ক-খও যে জানে সেও বলে দিতে পারে একটা স্কন্ধের উপরে ছটা মুণ্ডু নিতান্তই বাহুল্য। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! ওঁর ছয় মাতার স্তন পান করতে ওঁকে ছটা মুণ্ড ধারণ করতে হয়েছিল? ওটা হল মাইথলজি, আমি ফিজিয়লজির কথা বলছিলুম। ছটা যেন মুণ্ডই ধারণ করলেন, পাকযন্ত্র তো একটার বেশি ছিল না। এই দেখুন-না, আপনাদের স্বর্গের বন্দোবস্তটা— আপনারা শরীর থেকে ছায়াটাকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সেটা আপনাদের কী অপরাধ করেছিল? আপনারা স্বর্গের লোক, বললে হয়তো বিশ্বাস করেন না, আমি জন্মকাল থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঐ ছায়াটাকে কখনো পশ্চাতে, কখনো সম্মুখে, কখনো দক্ষিণে, কখনো বামে সঙ্গে করে নিয়ে কাটিয়েছি, ওটাকে পুষতে একদিনের জন্যে সিকিপয়সা খরচ করতে হয় নি এবং অত্যন্ত শ্রান্তির সময়ও বহন করতে এক তিল ভার বোধ করি নি— ওটাকে আপনারা ছেঁটে দিলেন, কিন্তু ছটা মুণ্ড, চারটে হাত, হাজারটা চোখ, এতে খরচও আছে, ভারও আছে, অথচ সেটা সম্বন্ধে একটু ইকনমি করবার দিকে নজর নেই! ছায়ার বেলাই টানাটানি, কিন্তু কায়ার বেলা মুক্তহস্ত! সাধুবাদ দিচ্ছেন? দেবতাদের মধ্যে আপনিই তা হলে আমার কথাটা বুঝেছেন! সাধুবাদ আমাকে দিচ্ছেন না? শ্রীমতী রম্ভাকে দিচ্ছেন? ওঃ! তা হলে আপনি বসুন, আমি কার্তিকের সঙ্গে আলাপ করে আসি।

কার্তিকের পার্শ্বে বসিয়া) গুহ, আপনি ভালো আছেন তো? আপনাদের এখানকার মিলিটারি ডিপার্ট্‌মেণ্ট সম্বন্ধে আমার দুটো-একটা খবর নেবার আছে। আপনারা কিরকম নিয়মে— আচ্ছা, তা হলে এখন থাক্‌। আগে আপনাদের অভিনয়টা হয়ে যাক। কেবল একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, এই-যে নাটকটি অভিনয় হচ্ছে এর নাম তো শুনছি ‘চিত্রলেখার বিরহ'; এর উদ্দেশ্যটা কী আমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। উদ্দেশ্য দু রকমের হতে পারে, এক জ্ঞানশিক্ষা, আর-এক নীতিশিক্ষা। কবি, হয় এই গ্রন্থের মধ্যে কোনো-একটা জাগতিক নিয়ম আমাদের সহজে বুঝিয়ে দিয়েছেন, নয় স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ভালো করলে ভালো হয়, মন্দ করলে মন্দই হয়ে থাকে। ভেবে দেখুন বিবর্তনবাদের নিয়ম-অনুসারে পরমাণুপুঞ্জ কিরকম করে ক্রমে ক্রমে বিচিত্র জগতে পরিণত হল, কিংবা আমাদের ইচ্ছাশক্তি যে অংশে পূর্ববর্তী কর্মের ফল সেই অংশে বদ্ধ এবং যে অংশে পরবর্তী কর্মকে জন্ম দেয় সেই অংশে মুক্ত এই চিরস্থায়ী বিরোধের সামঞ্জস্য কোন্‌খানে— কাব্যে যখন সেই তত্ত্ব পরিস্ফুট হয় তখন কাব্যের উদ্দেশ্যটি হাতে হাতে পাওয়া যায়। চিত্রলেখার বিরহের মধ্যে এর কোন্‌টি আছে? আপনি তো বিগলিতপ্রায় হয়ে এসেছেন; যেরকম দেখছি দেবলোকে যদি ফিজিয়লজির নিয়ম বলে একটা কিছু থাকত তা হলে এখনই আপনার দ্বাদশ চক্ষু থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। যাই হোক কার্তিক, এ বড়ো দুঃখের বিষয়, স্বর্গে আপনাদের রাশি রাশি কাব্য-নাটকের ছড়াছড়ি যাচ্ছে, কিন্তু যাতে গবেষণা কিংবা চিন্তাশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় স্বর্গীয় গ্রন্থকারদের হাত থেকে এমন একটা কিছুই বেরোচ্ছে না। ( ঈষৎ হাস্যসহকারে) দেখছি ‘চিত্রলেখার বিরহ' নাটকখানা আপনার বড়োই ভালো লেগে গেছে, তা হলে অন্য প্রসঙ্গ থাক্‌, আপনি ঐটেই দেখুন।

(ইন্দ্রের নিকট গিয়া) দেখুন দেবরাজ, স্বর্গে পরস্পরের মতামত আলোচনার একটা স্থান না থাকাতে বড়োই অভাব বোধ করা যায়। আমার ইচ্ছা নন্দনকাননের পারিজাতকুঞ্জের মধ্যে যেখানে আপনাদের নৃত্যশালা আছে, সেইখানে একটা সভা স্থাপন করি, তার নাম দিই ‘শতক্রতু ডিবেটিং ক্লাব’। তাতে আপনারও একটা নাম থাকবে আর স্বর্গেরও অনেক উপকার হবে। না, থাক্‌, মাপ করবেন— আমার অভ্যাস নেই— আমি অমৃত খাই নে— রাগ যদি না করেন তো বলি, ও অভ্যাসটা আপনাদের ত্যাগ করা উচিত। আমি দেখেছি, দেবতাদের মধ্যে পানদোষটা কিছু প্রবল হয়েছে। অবশ্য, ওটাকে আপনারা সুরা বলেন না, কিন্তু বললে কিছু অত্যুক্তি হয় না। পৃথিবীতেও দেখতুম অনেকে মদকে ওআইন বলে কিছু সন্তোষলাভ করতেন। সুরেন্দ্র, আপনি শ্রীমতি মেনকাকে এইমাত্র যে সম্বোধনটা করলেন ওটা কি ভালো শুনতে হল? সংস্কৃত কাব্যে নাটকে দেখেছি বটে ঐ-সকল সম্বোধন প্রচলিত ছিল, কিন্তু আপনি যদি বিশ্বস্তসূত্রে খবর নেন তো জানতে পারবেন, ওগুলো এখন নিন্দনীয় বলে গণ্য হয়েছে। আমরা কিরকম সম্বোধন করি জানতে চাচ্ছেন? আমরা কখনো মাতৃসম্বোধনও করে থাকি, কখনো-বা বাছাও বলি, আবার সময়-বিশেষে ভালোমানুষের মেয়ে বলেও সম্ভাষণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে কোনোটিই আপনি এই-সকল মহিলাদের প্রতি প্রয়োগ করতে ইচ্ছা করেন না? তা না করুন, এটা স্বীকার করতেই হবে আপনারা ওঁদের সম্বন্ধে যে বিশেষণগুলি উচ্চারণ করে থাকেন, তাতে রুচির পরিচয় পাওয়া যায় না। কী বললেন? স্বর্গে সুরুচিও নেই, কুরুচিও নেই? প্রথমটি যে নেই সে বিষয়ে সন্দেহ করি নে; দ্বিতীয়টি যে আছে তা এখনই প্রমাণ করে দিতে পারি, কিন্তু আপনারা তো আমার কোনো আলোচনাতেই কর্ণপাত করেন না।

(শচীর নিকট গিয়া) দেখুন শচী, আপনার কি মনে হয় না, স্বর্গসমাজের ভিতরে যে-সমস্ত দোষ প্রবেশ করেছে সেগুলো দূর করবার জন্যে আমাদের বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত? আপনারা স্বর্গাঙ্গনারাও যদি এ-সকল বিষয়ে শৈথিল্য প্রকাশ করতে থাকেন তা হলে আপনাদের স্বামীদের চরিত্রের অবস্থা ক্রমশই শোচনীয় হতে থাকবে। ওঁদের সম্বন্ধে যে-সকল অপযশের কথা প্রচলিত আছে সে আপনাদের অবিদিত নেই; মধ্যে মধ্যে যদি সভা আহ্বান করে এ-সকল বিষয়ে আলোচনা হয়, আপনারা যদি সাহায্য করেন, তা হলে— কোথায় যান? গৃহকর্ম আছে বুঝি? ( শচীকে উঠিতে দেখিয়া সকল দেবতার উত্থান এবং অকালে সভাভঙ্গ)। মহা মুশকিলে পড়া গেল! কাউকে একটা কথা বললে কেউ শোনেও না, বুঝতেও পারে না। ( ইন্দ্রের নিকট গিয়া কাতর স্বরে) ভগবন্‌ সহস্রলোচন শতক্রতো, আমার সাড়ে পাঁচ কোটি সাড়ে পনেরো লক্ষ বৎসরের মধ্যে আর কত দিন বাকি আছে?

ইন্দ্র। ( কাতর স্বরে) সাড়ে পাঁচ কোটি পনেরো লক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার নয় শো নিরেনব্বই বৎসর।

গোকুলনাথ এবং তেত্রিশ কোটি দেবতার একসঙ্গে দীর্ঘনিশ্বাস-পতন।