ব্যঙ্গকৌতুক/ডেঞে পিঁপড়ের মন্তব্য

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


দেখো দেখো , পিঁপড়ে দেখো! খুদে খুদে রাঙা রাঙা সরু সরু সব আনাগোনা করছে–ওরা সব পিঁপড়ে , যাকে সংস্কৃত ভাষায় বলে পিপীলিকা । আমি হচ্ছি ডেঞে , সমুচ্চ ডাঁইবংশসম্ভূত , ঐ পিঁপড়েগুলোকে দেখলে আমার অত্যন্ত হাসি আসে ।

হা হা হা , রকম দেখো , চলছে দেখো , যেন ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে গেছে ; আমি যখন দাঁড়াই তখন আমার মাথা আকাশে ঠেকে! সূর্য যদি মিছরির টুকরো হ ' ত আমার মনে হয় আমি দাঁড়া বাড়িয়ে ভেঙে ভেঙে এনে আমার বাসায় জমিয়ে রাখতে পারতুম। উঃ , আমি এত বড়ো একটা খড় এতখানি রাস্তা টেনে এনেছি , আর ওরা দেখো কী করছে–একটা মরা ফড়িং নিয়ে তিন জনে মিলে টানাটানি করছে । আমাদের মধ্যে এত ভয়ানক তফাত! সত্যি বলছি , আমার দেখতে ভারি মজা লাগে ।

আমার পা দেখো আর ওদের পা দেখো! যতদূর চেয়ে দেখি আমার পায়ের আর অন্ত দেখি নে , এতোবড়ো পা! পদমর্যাদা এর চেয়ে আর কী আশা করা যেতে পারে! কিন্তু পিঁপড়েরা আমাদের খুদে খুদে পা নিয়েই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট আছে । দেখে আশ্চর্য বোধ হয় । হাজার হোক , পিঁপড়ে কিনা ।

ওরা একে ক্ষুদ্র , তাতে আবার আমি বিস্তর উঁচু থেকে দেখি–ওদের সবটা আমার নজরে আসে না । কিন্তু আমি আমার অতি দীর্ঘ ছ পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে কটাক্ষে দৃকপাত করে আন্দাজে ওদের আগাগোড়াই বুঝে নিয়েছি । কারণ , পিঁপড়ে এত ক্ষুদ্র যে ওদের দেখে ফেলতে অধিক ক্ষণ লাগে না । পিঁপড়ে-জাতি সম্বন্ধে আমি ডাঁই ভাষায় একটা কেতাব লিখিব এবং বক্তৃতাও দেব ।

পিঁপড়ে-সমাজ সম্বন্ধে আমার বিস্তর অনুমানলব্ধ আছে । ডেঞেদের সন্তানস্নেহ আছে , অতএব পিঁপড়েদের তা কখনোই থাকতে পারে না ; কারণ , তারা পিঁপড়ে , কেবলমাত্র পিঁপড়ে , পিঁপড়ে ব্যতীত আর কিছুই নয় । শোনা যায় পিঁপড়েরা মাটিতে বাসা বানাতে পারে ; স্পষ্টই বোধ হচ্ছে তারা ডেঞে জাতির কাছ থেকে স্থপতিবিদ্যা শিক্ষা করছে–কারণ , তারা পিঁপড়ে , সামান্য পিঁপড়ে , সংস্কৃত ভাষায় যাকে বলে পিপীলিকা ।

পিঁপড়েদের দেখে আমার অত্যন্ত মায়া হয় , ওদের উপকার করবার প্রবৃত্তি আমার অত্যন্ত বলবতী হয়ে ওঠে । এমন-কি , আমার ইচ্ছা করে , সভ্য ডেঞে-সমাজ কিছুদিনের জন্য ছেড়ে , দলকে-দল ডেঞে-ভ্রাতৃবৃন্দকে নিয়ে পিঁপড়েদের বাসার মধ্যে বাসস্থাপন করি এবং পিঁপড়ে-সংস্কারকার্যে ব্রতী হই–এতদূর পর্যন্ত ত্যাগস্বীকার করতে আমি প্রস্তুত আছি । তাদের শর্করকণা গলাধঃকরণ করে এবং তাদের বিবরের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে কোনোক্রমে আমরা জীবনযাপন করতে রাজি আছি , যদি এতেও তারা কিছুমাত্র উন্নত হয় ।

তারা উন্নতি চায় না–তারা নিজের শর্করা নিজে খেতে এবং নিজের বিবরে নিজে বাস করতে চায় , তার কারণ তারা পিঁপড়ে, নিতান্তই পিঁপড়ে । কিন্তু আমরা যখন ডেঞে তখন আমরা তাদের উন্নতি দেবই , এবং তাদের শর্করা আমরা খাব ও তাদের বিবরে আমরা বাস করব–আমরা এবং আমাদের ভাইপো , ভাগ্নে , ভাইঝি ও শ্যালকবৃন্দ ।

যদি জিজ্ঞাসা কর তাদের শর্করা আমরা কেন খাব এবং তাদের বিবরে কেন বাস করব তবে তার প্রধান কারণ এই দেখাতে পারি যে , তারা পিঁপড়ে এবং আমরা ডেঞে! দ্বিতীয় , আমরা নিঃস্বার্থভাবে পিঁপড়েদের উন্নতিসাধনে ব্রতী হয়েছি , অতএব আমরা তাদের শর্করা খাব এবং বিবরেও বাস করব । তৃতীয় , আমাদের প্রিয় ডাঁইভূমি ত্যাগ করে আসতে হবে , সেইজন্য , সেই দুঃখ নিবারণের জন্য , শর্করা কিছু অধিক পরিমাণে খাওয়া আবশ্যক । চতুর্থ , বিদেশে বিজাতির মধ্যে বিচরণ করতে হবে , নানা রোগ হতে পারে–তা হলে বোধ করি আমরা বেশি দিন বাঁচব না–হায় , আমাদের কী শোচনীয় অবস্থা! অতএব শর্করা খেতেই হবে, এবং বিবরেও যতটা স্থান আছে সমস্ত আমরা এবং আমাদের শ্যালকেরা মিলে ভাগাভাগি করে নেব ।

পিঁপড়েরা যদি আপত্তি করে তবে তাদের বলব , অকৃতজ্ঞ! যদি তারা শর্করা খেতে এবং বিবরে স্থান পেতে চায় তবে ডাঁই ভাষায় তাদের স্পষ্ট বলব , তোমরা পিঁপড়ে , ক্ষুদ্র , তোমরা পিপীলিকা । এর চেয়ে আর প্রবল যুক্তি কী আছে!

তবে পিঁপড়েরা খাবে কী! তা জানি নে । হয়তো আহার এবং বাসস্থানের অকুলান হতেও পারে , কিন্তু এটা তাদের ধৈর্য ধরে বিবেচনা করা উচিত যে , আমাদের দীর্ঘপদস্পর্শে ক্রমে তাদের পদবৃদ্ধি হবার সম্ভাবনা আছে । শৃঙ্খলা এবং শান্তির কিছুমাত্র অভাব থাকবে না । তারা ক্রমিক উন্নতি লাভ করুক এবং আমরা ক্রমিক শর্করা খাই , এমনি একটা বন্দোবস্ত থাকলে তবেই শৃঙ্খলা এবং শান্তি রক্ষা হবে , না হলে তুমুল বিবাদের আটক কী ?– মাথায় গুরুভার পড়লে এতই বিবেচনা করে চলতে হয় ।

শর্করাভাবে এবং অতিরিক্ত শান্তি ও শৃঙ্খলার ভারে যদি পিঁপড়ে জাতি মারা পড়ে ? তা হলে আমরা অন্যত্র উন্নতি প্রচার করতে যাব–কারণ , আমরা ডেঞে জাতি , উচ্চ পদের প্রভাবে অত্যন্ত উন্নত ।