ব্যঙ্গকৌতুক/প্রাচীন দেবতার নূতন বিপদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


মীটিঙে প্রায় সকল দেবতাই একযোগে স্ব স্ব কর্মে রিজাইন দিতে উদ্যত হইলেন ।

পিতামহ ব্রহ্মা বৈদিক ভাষায় উদাত্ত অনুদাত্ত এবং স্বরিত-সংযোগপূর্বক কহিলেন , ‘ভো ভো দেবগণ শৃন্বন্তু ।

‘আমার কথা স্বতন্ত্র । আমি তো এই বিশ্বসৃষ্টি এবং বেদরচনা সমাপ্ত করিয়া সমস্ত কাজকর্ম ছাড়িয়া দিয়া পেন্‌শন লইয়াছি । এমন-কি , আমার কাছে আর কোনো প্রত্যাশা নাই বলিয়া সকলে আমার পূজা পর্যন্ত বন্ধ করিয়াছে । এবং আমার প্রথম বয়সের বিশ্ব এবং বেদ-নামক দুটো রচনা লইয়া লোকে নির্ভয়ে স্ব স্ব ভাষায় অনুবাদ এবং সমালোচনা করিতে আরম্ভ করিয়াছে । কেহ বলে , রচনা মন্দ হয় নাই , কিন্তু আরও ঢের ভালো হইতে পারিত ; কেহ বলে , আমাদের হাতে যদি প্রুফ-সংশোধনের ভার থাকিত তাহা হইলে ছত্রে ছত্রে এত মুদ্রাকরপ্রমাদ থাকিত না । আমি চুপ করিয়া থাকি , মনে মনে তাহাদের সম্বোধন করিয়া বলি , বাবা , ওই আমার প্রথম রচনা । তোমরা অবশ্য আমার চেয়ে অনেক পাকা হইয়াছ , কিন্তু তখন যে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না ; একেবারে সমস্তই মন হইতে গড়িতে হইয়াছিল । তৎপূর্বে তোমরা যদি একটু মনোযোগ করিয়া জন্মগ্রহণ করিতে তাহা হইলে সমালোচনা শুনিয়া অনেক জ্ঞানলাভ করিতাম , ' একটি মস্ত স্ট্যাণ্ডার্ড পাওয়া যাইত । দুর্ভাগ্যক্রমে তোমরা বড়োই বিলম্বে জন্মিয়াছ । যাহা হউক , যখন দ্বিতীয় সংস্করণ আরম্ভ হইবে তখন তোমাদের কথা স্মরণ রাখিব ।

‘আবার কেহ কেহ , রচনা দুটো যে আমার তাহা একেবারে অস্বীকার করে । হয়তো অনায়াসে প্রমাণ করিতে পারিত ওটা তাহাদের নিজের , কিন্তু তাহা হইলে তাহাদের কল্পনাশক্তি ও প্রতিভার খর্বতা স্বীকার করা হয় বলিয়া ক্ষান্ত আছে । হরি হরি! এই দীর্ঘজীবনে ওই দুটো বৈ আর কোনো দুষ্কর্ম করি নাই , ইহাতেই এত কথা শুনিতে হইল ।

‘ যাহা হউক এ তো গেল আমার আক্ষেপের কথা । কিন্তু তোমরা কী মনোদুঃখে , মর্তলোকের প্রতি কী অভিমানে তোমাদের বহুকালের পদ পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ ? '

তখন দেবতারা কেহ বা বৈদিক , কেহ বা পৌরাণিক ভাষায় , কেহ-বা ত্রিষ্টুভ , কেহ-বা অনুষ্টুভ ছন্দে , দন্ত্য ন মূর্ধন্য ণ অন্তঃস্থ ব বর্গীয় ব এবং তিন সয়ের উচ্চারণ রক্ষা করিয়া বলিলেন , ‘ ভগবন্‌ , সায়ান্স-নামক একটা দানব অত্যন্ত জুলুম আরম্ভ করিয়াছে । ইহার নিকটে বৃত্র প্রভৃতি প্রাচীন অসুরদিগকে গণ্যই করি না । '

বৃদ্ধ পিতামহ মনে মনে হাসিলেন ; ভাবিলেন , কোনোমতে মানে মানে তাহার হাত হইতে উদ্ধার পাইয়াছ , এখন তাহাকে গণ্য না করিলেও চলে । কিন্তু তখন যে নাকালটা হইয়াছিলে সে বেশ মনে আছে । কিন্তু সে কথা আর উত্থাপন না করিয়া গম্ভীরভাবে চারিটি মস্তিক নাড়িয়া কহিলেন , ‘ অবশ্য অবশ্য । '

সুরগুরু বৃহস্পতি কহিলেন , ‘আর্য , শত্রুটাকে তত ডরাই না , কিন্তু মিত্রদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হইয়াছি । এতদিন আমরা ছিলাম মানুষের হৃদয়লোকে বিশ্বাসের স্বর্গধামে ; এখন তাহারা সায়ান্সের সহিত গোপনে সন্ধিস্থাপনপূর্বক সেখান হইতে নির্বাসিত করিয়া আমাদিগকে মাথার খুলির এক কোণে অত্যন্ত শুষ্ক সংকীর্ণ জায়গায় একটুখানি স্থান দিতে চায় । সেখানে একফোঁটা বিশ্বাসের অমৃত নাই । বলে , দেখো , তোমাদের কত গৌরব বাড়িল । ছিলে অজ্ঞানান্ধ হৃদয়গহ্বরে , এখন উঠিলে মস্তিষ্কঘৃতজ্বালিত জ্ঞানালোকিত মস্তকচূড়ায় । ভাগ্যে আমরা কয়জনা বুদ্ধিমান ছিলাম , নতুবা স্বর্গে মর্তে কোথাও তোমাদের স্থান হইত না । আমরা সকলের কাছে প্রমাণ করিয়াছি যে , তোমরা আর কোথাও যদি না থাক , নিদেন আমাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মধ্যে আছ । প্রতিবাদ করিয়া সেখান হইতে তোমাদিগকে বিচলিত করে এমন বুদ্ধিমান এখনো কেহ জন্মগ্রহণ করে নাই । বিষ্ণুর মীন কূর্ম বরাহ প্রভৃতি অবতারগুলিকে আমরা এভোল্যুশন থিওরি বলিয়া প্রচার করিয়াছি । দেবতাদের উদ্ধারের জন্য আমরা এত প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছি ।

‘ ভগবন্‌ , যথার্থ আন্তরিক ভক্তি কখনোই নিজের দেবতাকে লইয়া এরূপ ছেলে ভুলাইবার চেষ্টা করে না । দেব চতুরানন , এতকাল দেবতা ছিলাম , কেবল মাঝে মাঝে দৈত্যদের উপদ্রবে স্বর্গছাড়া হইয়াছি , কিন্তু এপর্যন্ত আমাদিগকে কেহ এভোল্যুশন থিওরি করিয়া দেয় নাই । প্রভু , তুমি যদি আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়া থাক তুমি জান আমরা কী , কিন্তু আজকাল তোমার অপেক্ষা যাহারা কিঞ্চিৎ বেশি শিখিয়াছে তাহাদের হাত হইতে আমাদিগকে রক্ষা করো । বড়ো আশা দিয়াছিলে তোমরা দেবতারা অমর , কিন্তু এইভাবে যদি কিছুদিন চলে , আমাদের মানববন্ধুরা যদি সাংঘাতিক স্নেহভরে আরও কিছুকাল আমাদের ব্যাখ্যা করিতে থাকেন, তবে সে আশা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইবে । '

বৃহস্পতির মুখে এই-সমস্ত সংবাদ শ্রবণ করিয়া পিতামহ ব্রহ্মা আর উত্তর করিতে পারিলেন না , চারিটি শুভ্র মস্তক নত করিয়া চিন্তিতভাবে বসিয়া রহিলেন ।

তখন দেবতাগণ স্ব স্ব পদ সম্বন্ধে পরিবর্তন প্রার্থনা করিলেন । বিজ্ঞ দেবতা প্রজাপতি এবং বালক দেবতা কন্দর্প সুরসভায় দাঁড়াইয়া কহিলেন , ‘ সকলেই জানেন , বিবাহ-ডিপার্ট‍্মেন্টে বহুকাল আমাদের কিঞ্চিৎ কর্তৃত্ব ছিল ; সেজন্য আমাদের কোনোরূপ নিয়মিত নৈবেদ্য অথবা উপরি-পাওনা ছিল না বটে , কিন্তু কৌতুক যথেষ্ঠ ছিল । সম্প্রতি টাকা-নামক একটা চক্রমুখো হঠাৎ-দেবতা টঙ্কশালা হইতে নিষ্কলঙ্ক পূর্ণ-চন্দ্রাকারে আবির্ভুত হইয়া একপ্রকার গায়ের জোরে আমাদের সে কাজ কাড়িয়া লইয়াছে । অতএব উক্ত ডিপার্ট্‌মেন্ট্‌ হইতে আমাদের নাম কাটিয়া আজ হইতে সেই প্রবলশক্তি নূতন দেবতার নাম বাহাল হউক । '

সর্বসম্মতিক্রমে তাহাই স্থির হইল ।

তখন যম উঠিয়া কহিলেন , ‘ এতকাল আমিই নরলোকের সর্বাপেক্ষা ভয়ের কারণ ছিলাম , কিন্তু এখন সেখানে আমা অপেক্ষা ভয় করে এমন-সকল প্রাণীর উদ্ভব হইয়াছে । অতএব , পুলিস-দারোগাকে আমার যমদণ্ড ছাড়িয়া দিয়া আমি অদ্য হইতে কাজে ইস্তফা দিতে চাই । '

অধিকাংশ দেবতার মতে যমরাজের প্রভাব নিতান্ত অসংগত না হইলেও ব্যাপারটা গুরুতর বিধায় আগামী মীটিঙে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আপাতত স্থগিত রহিল ।

কার্তিকেয় উঠিয়া কহিলেন , ‘ গুরুদেবের বক্তৃতার পর আমাকে আর অধিক কিছু বলিতে হইবে না । আমি দেবসেনাপতি । কিন্তু দেবতাগণকে রক্ষা করা আমার অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছে , অতএব , হয় আমার পোস্ট্‌ অ্যাবলিশ করিয়া এস্টাব্লিশ্‌মেন্ট্‌ কমানো হউক , নয় কোনো সাময়িক পত্রের সম্পাদকের উপর স্বর্গরক্ষাকার্যের ভার দেওয়া হউক । এমন-কি , আমার বহুকালের ময়ূরটিও আমি বিনা মূল্যে তাঁহাদিগকে ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছি । ইহার পেখম ছড়াইলে তাঁহাদের অনেকটা বিজ্ঞাপনের কাজ হইবে । '

দেবতাদের সম্মতিক্রমে সেনাপতির পোস্ট্‌ অ্যাবলিশ হইল , এখন হইতে ময়ূরের খোরাকি তাঁহার নিজের তহবিল হইতে পড়িবে ।

বরুণ উঠিয়া অশ্রুজল বর্ষণ করিয়া কহিলেন , ‘ নরলোকে আমার কি আর কোনো আবশ্যক আছে ? খোলাভাঁটিবাহিনী বারুণী আমাকে উচ্ছেদ করিবার সংকল্প করিয়াছে । এইবেলা মানে মানে সময় থাকিতে সরিতে ইচ্ছা করি । '

দেবতাগণ বহুল চিন্তা ও তর্কের পর স্ট্যাটিস্‌টিক্স্‌ দেখিয়া অবশেষে স্থির করিলেন , এখনো সময় হয় নাই । কারণ , এখনো সময়ে সময়ে বারুণীর প্রাখর্য নিবারণের জন্য দুর্বল মানব বরুণের সহায়তা প্রার্থনা করিয়া থাকে ।

তখন ধর্ম বলিলেন , ‘ লোকাচারকে আমার অধীনস্থ কর্মচারী বলিয়া জানিতাম , কিন্তু সে তো আমার সঙ্গে পরামর্শমাত্র না করিয়া আপন ইচ্ছামতো যাহা-তাহা করে , তবে সেই ছোঁড়াটাকেই সিংহাসন ছাড়িয়া দিলাম । ' বায়ু কহিলেন , ‘ পৃথিবীতে এখন উনপঞ্চাশ দিকে উনপঞ্চাশ বায়ু বহিতেছে , চাই-কি , এখন আমি অবসর লইতে পারি । ' আদিত্য কহিলেন , ‘ মানবসমাজে বিস্তর খদ্যোত উঠিয়াছে ; তাহারা মনে করিতেছে , সূর্য না হইলেও আমরা একলা কাজ চালাইতে পারি । জগৎ আলোকিত করিবার ভার তাহাদের উপর দিয়া আমি অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে ইচ্ছা করি । ' ভগবান চন্দ্রমা শুক্লপ্রতিপদের কৃশমূর্তি ধারণ করিয়া কহিলেন , ‘ নরলোকে কবিরা তাঁহাদের প্রেয়সীর পদনখরকে আমা অপেক্ষা দশগুণ প্রাধান্য দিয়া থাকেন , অতএব যে পর্যন্ত কবিরমণী-মহলে পাদুকার সম্পূর্ণ প্রচলন না হয় সে পর্যন্ত আমি অন্তঃপুরে যাপন করিতে চাই । ' এমন-কি , ভোলানাথ শিব অর্ধনিমীলিত নেত্রে কহিলেন , ‘ আমা অপেক্ষা বেশি গাঁজা টানে পৃথিবীতে এমন লোকের তো অভাব নাই ; সেই-সমস্ত সংস্কারকদিগের উপর আমার প্রলয়কার্যের ভার দিয়া আমি অনায়াসে নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি । এমন-কি , আমি নিশ্চয় জানি , আমার ভূতগুলারও কোনো আবশ্যক হইবে না । '

সর্বশেষে যখন শুভ্রবসনা অমলকমলাসনা সরস্বতী উঠিয়া বীণানিন্দিত মধুর স্বরে দেবসমাজে তাঁহার নিবেদন আরম্ভ করিলেন , তখন দেবগণ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন এবং মহেন্দ্রের সহস্র চক্ষের পল্লব সিক্ত হইয়া উঠিল ।

দেবী কহিলেন , ‘ অন্যান্য নানা কার্যের মধ্যে বালকদিগকে শিক্ষাদানের ভার এতদিন আমার উপর ছিল , কিন্তু সে কার্য আমি কিছুতেই চালাইতে পারিব না । আমি রমণী , আমার মাতৃহৃদয়ে শিশুদিগের প্রতি কিছু দয়ামায়া আছে–তাহাদের পাঠের জন্য আজকাল যে-সকল পুস্তক নির্বাচিত হয় সে আমি কিছুতেই পড়াইতে পারিব না । আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয় এবং তাহাদের ক্ষুদ্র শক্তি ভাঙিয়া পড়ে । এ নিষ্ঠুর কার্য একজন বলিষ্ঠ পুরুষের প্রতি অর্পিত হইলেই ভালো হয় । অতএব সুরসভায় আমি সানুনয়ে প্রার্থনা করি , যমরাজের প্রতি উক্ত ভার দেওয়া হউক । '

যমরাজ তৎক্ষণাৎ উঠিয়া প্রতিবাদ করিলেন , ‘ আমার কোনো আবশ্যক নাই , কারণ , ইস্কুলের মাস্টার এবং ইন্‌স্পেক্টর আছে । '

শিশুশিক্ষা-বিভাগে যমরাজের বিশেষ নিয়োগ যে বাহুল্য এ সম্বন্ধে দেবতাদের কোনো মতভেদ রহিল না ।