ব্যঙ্গকৌতুক/মীমাংসা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


আমাদের বাড়ির পাশেই নবীন ঘোষের বাড়ি । একেবারে সংলগ্ন বলিলেই হয় ।

আমি কখনো আমাদের বাড়ির ছাদে উঠি না , জানালায়ও দাঁড়াই না । আপন মনে গৃহকার্য করিয়া যাই ।

নবীন ঘোষের বড়ো ছেলে মুকুন্দ ঘোষকে কখনো চক্ষে দেখি নাই ।

কিন্তু মুকুন্দ ঘোষ কেন বাঁশি বাজায়! সকালে বাজায় , মধ্যাহ্নে বাজায় , সন্ধ্যাবেলায় বাজায় । আমার ঘর হইতে স্পষ্ট শোনা যায় ।

আমি কবি নই , মাসিক পত্রিকার সম্পাদক নই , মনের ভাব সম্পূর্ণ ব্যক্ত করিয়া উঠিতে পারি না । কেবল সকালে কাঁদি , মধ্যাহ্নে কাঁদি , সন্ধ্যাবেলায় কাঁদি এবং ইচ্ছা করে ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া যাই ।

বুঝিতে পারি রাধিকা কেন তাঁহার সখীকে সম্বোধন করিয়া কাতর স্বরে বলিয়াছিলেন ‘ বারণ কর্ লো সই , আর যেন শ্যামের বাঁশি বাজে না বাজে না ' ।

বুঝিতে পারি চণ্ডীদাস কেন লিখিয়াছেন-

যে না দেশে বাঁশির ঘর সেই দেশে যাব ,

ডালে মূলে উপাড়িয়া সাগরে ভাসাব ।

কিন্তু পাঠক , আমার এ হৃদয়বেদনা তুমি কি বুঝিয়াছ ?

উত্তর

আমি বুঝিয়াছি। যদিও আমি কুলবধূ নই । কারণ , আমি পুরুষমানুষ । কিন্তু আমার বাড়ির পাশেও একটি কন্সর্টের দল আছে। তাহার মধ্যে একটি ছোকরা নূতন বাঁশি অভ্যাস আরম্ভ করিয়াছে–প্রত্যুষ হইতে অর্ধরাত্রি পর্যন্ত সারিগম সাধিতেছে । পূর্বাপেক্ষা অনেকটা সড়গড় হইয়াছে ; এখন প্রত্যেক সুরে কেবলমাত্র আধসুর সিকিসুর তফাত দিয়া যাইতেছে । কিন্তু আমার চিত্ত উদাসীন হইয়া উঠিয়াছে ; ঘরে আর কিছুতে মন টেঁকে না । বুঝিতে পারিতেছি রাধিকা কেন বলিয়াছিলেন ‘ বারণ কর্ লো সই , আর যেন শ্যামের বাঁশি বাজে না বাজে না ' । শ্যাম বোধ করি তখন নূতন সারিগম সাধিতেছিলেন । বুঝিতে পারিতেছি চণ্ডীদাস কেন লিখিয়াছিলেন-

যে না দেশে বাঁশির ঘর সেই দেশে যাব ,

ডালে মূলে উপাড়িয়া সাগরে ভাসাব ।

বোধ হয় চণ্ডীদাসের বাসার পাশে কন্সর্টের দল ছিল ।

আমার বাড়ির পাশে যে ছোকরা বাঁশি অভ্যাস করে বোধ হয় তাহারই নাম মুকুন্দ ঘোষ ।

–শ্রীসংগীতপ্রিয়

আমার এ কী হইল! এ কী বেদনা! নিদ্রা নাই , আহার নাই , মনে সুখ নাই । থাকিয়া থাকিয়া ‘ চমকি চমকি উঠি ' ।

কমলপত্র বীজন করিলে অসহ্য বোধ হয় , চন্দনপঙ্ক লেপন করিলে উপশম না হইয়া বিপরীত হয় ।

শীতল সমীরণে সমস্ত জগতের তাপ নিবারণ করে , কেবল আমি হতভাগিনী সখীকে ডাকিয়া বলি , ‘ উহু উহু , সখী , দ্বার রোধ করিয়া দাও ' ।

সখীরা স্নেহভরে দেহ স্পর্শ করিলে চমকিয়া হাত ঠেলিয়া দিই । না জানি কোন্‌ স্পর্শে আরাম পাইব ।

মনোহরা শারদপূর্ণিমা কাহার না আনন্দদায়িনী! কেবল আমার কষ্ট কেন দ্বিগুণ বাড়াইয়া তোলে ?

আমার ন্যায় আর-কোনো হতভাগিনী সম্বন্ধে জয়দেব লিখিয়াছেন–

নিন্দতি চন্দনমিন্দুকিরণমনুবিন্দতি খেদমধীরম্‌ ।

ব্যালনিলয়মিলনেন গরলমিব কলয়তি মলয়সমীরম্‌ ।

অন্যত্র লিখিয়াছেন ‘ নিশি নিশি রুজমুপযাতি ' । আমারও সেই দশা । রাত্রেই বাড়িয়া উঠে । আমার এ কী হইল ?

উত্তর

তোমার বাত হইয়াছে । অতএব পূবে হাওয়া বহিলে যে দ্বার রোধ করিয়া দাও সেটা ভালোই কর । পরীক্ষাস্বরূপে চন্দনপঙ্ক লেপন না করিলেই উত্তম করিতে । পূর্ণিমার সময় যে বেদনা বাড়ে সে তোমার একলার নহে , রোগটার ওই এক লক্ষণ । চাঁদের সহিত বিরহ বাত পয়ার এবং জোয়ার-ভাঁটার একটা যোগ আছে ।

রাধিকার ন্যায় রাত্রে তোমার রোগ বৃদ্ধি হয় । কিন্তু রাধিকার সময় ভালো ডাক্তার ছিল না , তোমার সময়ে ডাক্তারের অভাব নাই । অতএব আমার ঠিকানা সম্পাদকের নিকট জানিয়া লইয়া অবিলম্বে চিকিৎসা আরম্ভ করিয়া দিবে ।

–নূতন উত্তীর্ণ ডাক্তার