বিষয়বস্তুতে চলুন

ব্রাহ্মধর্ম্মের মত ও বিশ্বাস/দশম উপদেশ

উইকিসংকলন থেকে

দশম উপদেশ।

মুক্তি।

মুক্তি? ইহার সহজ উত্তর এই, পাপ হইতে মুক্ত হওয়া, এই উত্তরে মুক্তির সমুদয় ভাব প্রকাশ পায় না। ইহা অভাব পক্ষে মুক্তির লক্ষণ বলা হইল। মুক্তির অবস্থা কেবল অভাবের অবস্থা নহে; পাপের অভাবই যে মুক্তি, তাহা নহে। পশুদিগের অবস্থা এবং শিশুদের নিষ্পাপাবস্থা মুক্তির অবস্থা নহে। যে মনে জ্ঞান প্রীতি এবং কর্ত্তৃত্ব প্রকাশ পাইয়াছে; যে মন আপন বলে সত্যের আশ্রয়ে বিষয়াসক্তি হইতে মুক্ত হইয়াছে; সেই মুক্ত। তখনই মুক্তাবস্থা, যখন ধর্ম্মের বল, পবিত্রতার বল, বিষয়ের প্রতিকূলে, প্রবৃত্তির প্রতিকূলে, লোকের প্রতিকূলে চালিত হয়, যখন জ্ঞান প্রীতি ও ইচ্ছা মুক্ত ভাবে কার্য্য করিতে থাকে। তিনি মুক্ত, যিনি ঈশ্বরের বিশ্বাসে উন্নত হইয়া যুধর্ম্মদ্ধে আসুরিক বৃত্তি-সকলকে দমন করেন এবং নীচ বিষয়-পাশ হইতে মুক্ত হইয়া উন্নত পবিত্র বিষয়ে আপনাকে নিয়োগ করেন। তিনিই মুক্ত, যিনি ঈশ্বরকে আপন সহায় জানিয়া তাঁহার হৃদয় লিখিত পবিত্র ধর্ম্ম আপন ইচ্ছাতে অবলম্বন করেন; তাঁহারই অনুযায়ী হইয়া আপনাকে নিয়মিত করেন; এবং সকল অবস্থাতেই আপনার কর্ত্তব্য সাধন করিয়া ঈশ্বরের মহিমাকে মহীয়ান্ করেন।

 সর্ব্ব মঙ্গলালয় পরমেশ্বর আমাদের আত্মাকে বলীয়ান্ করিবার জন্য আমারদিগকে লোভ এবং বিপদের দ্বারা আবৃত করিয়াছেন। তিনি আমাদিগকে এমন এক সংসারে স্থাপন করিয়াছেন, যেখানে অসৎ কর্ম্ম বহু প্রত্যাশা যুক্ত। যেখানে কর্ত্তব্যের পথ অসরল ও কণ্টকাবৃত, যেখানে নানা প্রলোভন আমাদের অন্তরের প্রহরীকে আক্রমণ করিতেছে; যেখানে মন অনেক সময় দেহ ভারে আক্রান্ত হইতেছে এবং বিষয় জাল আমারদিকে অনেক সময় ধর্ম্ম ও ঈশ্বর হইতে বিচ্যুত করিতেছে। এই সকল বিপত্তিকে অতিক্রম করিতে করিতেই আমাদের মুক্তাবস্থা আরম্ভ হয়।

 সেই আত্মাই মুক্ত যে আত্মা ইন্দ্রিয় সকলকে বশীভূত করে, যে সাংসারিক সুখ দুঃখেই একান্ত আক্রান্ত না হয়, যে আহার নিদ্রা আমোদ প্রমোদেই জীবন ব্যয় করে না কিন্তু ঈশ্বরের জন্যই ক্ষুধিত ও ভূষিত হইয়া জীবন যাপন করে।

 সেই আত্মাই মুক্ত, যে বিষয় আসক্তিকে অতিক্রম করিতে পারে; যে জড়ময় পৃথিবীতে বদ্ধ থাকিয়া ইহাকে কারা-গৃহ তুল্য করিয়া না ফেলে; কিন্তু এই স্থূল আবরণের মধ্য হইতে সর্ব্বাতীত পরমেশ্বরে গমন করে এবং সেই অনন্তের নামাক্ষর সর্ব্বত্র পাঠ করিয়া আপনাকে উন্নত করে।

 সেই আত্মাই মুক্ত, যে সংসারের অনুরোধ অপেক্ষা ঈশ্বরের অনুরোধ গুরুতর জ্ঞান করে; যে দেশাচারের নিকটেই অবনত না হয়, পৈতৃক ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াই তুষ্ট না থাকে; যেখান হইতেই হউক সত্যের আলোক পাইলেই আদর পূর্ব্বক গ্রহণ করে এবং মনুষ্যের উপদেশ অন্তরের ধর্ম্মোপদেশকে অতিক্রম করিতে না দেয়।

 সেই আত্মাই মুক্ত, যাহার প্রীতি সঙ্কীর্ণ নহে; যে এক দেশে বা এক সম্প্রদায়ের মধ্যে বদ্ধ নহে; যে সকলের প্রতি প্রসন্ন ভাবে দৃষ্টি করে; যে আলস্য অহঙ্কার স্বার্থপরতা অতিক্রম করিয়া হৃদয়-গ্রন্থি-সকল ছেদন করে এবং ঈশ্বরের জন্য আপনার সর্ব্বস্ব বলিদান দিতেও প্রস্তুত থাকে।

 সেই আত্মাই মুক্ত, যে আত্মা বাহিরের অবস্থাতেই সংরচিত হয় না; ঘটনার স্রোতেই নীয়মান হয় না; যে প্রবৃত্তির অধীনতাতেই কার্য্য করে না; কিন্তু আপনার জীবনের সঙ্কল্প স্থির রাখিয়া সকল ঘটনা, সকল অবস্থাকেই, আপনার উন্নতির অনুকূল করে।

 সেই আত্মাই মুক্ত, যে ধর্ম্ম-বলে সবল হইয়া পূর্ণ মঙ্গল স্বরূপ ঈশ্বরে আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করিয়া সকল ভয় পরিত্যাগ করে; পাপকে যাহার সকল বিপদের মধ্যে ভয়ানক বিপদ্ মনে হয়; কোন ভর্ৎসনা, কোন নির্যাতনা, যাহাকে ধর্ম্ম-পথ হইতে ভ্রষ্ট করিতে সমর্থ হয় না; যে এই অস্থায়ী স্থূল বাহ্য বিষয় হইতে নিবৃত্ত দু হইয়া বিষয়াতীত নিত্য ভূমা পরমেশ্বরের সঙ্গে সম্বদ্ধ নিবদ্ধ করে এবং তাঁহার অখণ্ড মঙ্গল-স্বরূপে নির্ভর করিয়া জীবন যাত্রা নির্ব্বাহ করে।

 আমাদের জ্ঞান ও ভাব ও ইচ্ছা ঈশ্বরের জ্ঞান প্রীতি ও ইচ্ছার সহিত যত মিলিত হইবে; তত আমাদের আত্মা মুক্ত ভাব ধারণ করিবে। জ্ঞান ব্যতীত আমরা মুক্ত হইতে পারি না; কেন না স্বাধীনতা জ্ঞানজ্যোতি হইতে পরিচ্যুত হইলে তাহা অন্ধ শক্তির ন্যায় কার্য্য করে। মঙ্গল ভাব ব্যতীতও আমরা মুক্ত হইতে পারি না, কেননা নীচ পশু-ভাবের অধীন হইলে আমাদের প্রকৃতি নিতান্ত হীন ও মলিন হইয়া থাকে। আমাদের জ্ঞানের মুক্তাবস্থায় সেই সত্য-স্বরূপ আমাদের জ্ঞানের অন্ন হইবেন, তাঁহার মহিমা আরো উজ্জ্বল রূপে দেখিতে পাইব। আমাদের ভাবসকল তখন মুক্ত হইবে, যখন তাহারা ঈশ্বর-প্রীতির পরূ ধারণ করিবে; যখন সত্যেতে মঙ্গলেতে তাহারা সমর্পিত হইবে। ইচ্ছার মুক্ত ভাব তখন হইবে, যখন তাহা নীচ বিষয়াকর্ষণ অতিক্রম করিয়া পূর্ণ সত্য, পূর্ণ মঙ্গলের অনুযায়ী হইবে। আমাদের বদ্ধ-ভাব গিয়া মুক্ত-ভাব ক্রমে হইতে থাকে। ঈশ্বরই এক মাত্র শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত স্বরূপ। তাঁহার জ্ঞান মোহেতে আচ্ছন্ন নহে; তাঁহার প্রীতির সঙ্গে দ্বেষের যোগ নাই; তাঁহার ইচ্ছা মঙ্গলের বিরোধিনী নহে; কিন্তু আমাদের যে জ্ঞান, ভাব ও ইচ্ছা, তাহা অল্পে অল্পে শুদ্ধ ভাব ও স্বাধীন ভাব ধারণ করে। অজ্ঞান পাশ কুটিলতার পাশ বিষয় বন্ধন হইতে আমরা ক্রমে মুক্ত হই। যে অবধি আমাদের জ্ঞান, প্রীতি ও কর্ত্তৃত্ব পরিষ্ফুটিত হইতে আরম্ভ হইয়াছে, সেই অবধি আমরা মুক্তি লাভের অধিকারী হইয়াছি এবং তাহারা যত বিবৃত হইবে, মুক্তির অবস্থা ততই গ্রহণ করতে থাকিব। আমাদের জ্ঞান যত ঈশ্বরের জ্ঞানের অনুগামী হইবে;―প্রীতি যত তাঁহার প্রীতিতে মিলিত হইবে; ইচ্ছা যত তাঁহার ইচ্ছার অনুযায়িনী হইবে; ততই আমাদের মুক্ত ভাব। আমাদের জ্ঞান ও ভাব ও ইচ্ছা, সেই সত্য সুন্দর মঙ্গল-পূর্ণ পুরুষের সহিত যত ঐক্য হইতে থাকিবে, ততই তাহারা মুক্তির অবস্থা প্রাপ্ত হইবে। আমাদের ইচ্ছা যখন তাঁহার ইচ্ছার সহিত মিলিত হইয়া আমাদের অন্তরে ভূলোক ও দ্যুলোকের সামঞ্জস্য শৃঙ্খলা বিরাজ করিতে থাকিবে, তখনই আমাদের মোক্ষাবস্থা। যখন সত্য-জ্যোতিতে জ্ঞান উজ্জ্বল হইবে, প্রীতির শিখায় হৃদয় উদ্দীপ্ত হইবে, বল পবিত্রতা ও উন্নত আশা আমাদের সমুদয় প্রকৃতিকে উজ্জ্বলিত করিবে, তখনই মুক্তি। সেই অমৃতের সঙ্গে যোগ হইলেই আমরা অমৃত সূর্য্য কিরণে বাস করতে থাকি।

 এই মুক্তি লাভ করা আমারদের অনন্তকাল সাধ্য। ঈশ্বরের পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণ ইচ্ছার সহিত মিলিত হইতে আমাদের অনন্ত জীবন গত হইবে। এখানে আমাদের মৃত্যু পর্য্যন্ত একটী কালের নির্দ্দেশ আছে। এখানে আমাদের এক পাঠ সাঙ্গ হইয়া গেল। কিন্তু পৃথিবীই আমাদের শিক্ষার শেষ স্থল নহে। এখন এক কাল, এজীবনের পর অবধি নিত্য কাল আরম্ভ হইবে। এখানে কেবল সংসারের সঙ্গে যোগ, ঈশ্বরের সহিত কিছু মাত্র যোগ নাই, মৃত্যুর পর অবধি ঈশ্বরের সঙ্গে যোগ হইবে; এমত নহে। ঈশ্বর আমাদের একালেরও ঈশ্বর, আমাদের পরকালেরও ঈশ্বর। এ জীবন আমাদের পরজীবনের অনুক্রমণিকা। মুক্তির সোপান এই পৃথিবী লোকেই স্থাপিত রহিয়াছে। এই প্রথম শ্রেণীর পাঠ অভ্যাস করিয়া পরে নূতন নূতন পাঠ অভ্যাস করিতে পাইব। আমরা অমৃতের অধিকারী, অমাদের ক্রমিক উন্নতিই হইবে। জ্ঞান, ধর্ম, প্রীতি, পবিত্রতা, ক্রমিক উন্নত ভাব ধারণ করিবে। আমাদের এ জীবন অনন্ত কালের অন্তর্ব্বর্ত্তী। বর্ত্তমানকাল অনন্তকাল হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। এই জীবদ্দশাতেই আমরা মুক্তির পথে পদ নিক্ষেপ করিতেছি এবং অনন্তকাল পর্য্যন্ত সেই পথে অগ্রসর হইতে থাকিব।

 এই পৃথিবী লোক হইতে আমাদের উৎকৃষ্ট লোক কি হইবে? সেই লোক, যেখানে পবিত্র প্রেম এবং নির্ম্মলানন্দ বহমান হইতেছে; যেখানে ঈশ্বর-প্রীতি হৃদয়কে উৎফুল্ল করিতেছে; তাঁহার ইচ্ছা সম্পন্ন করিতেই সকলের আনন্দ জন্মিতেছে। সেই লোকই দেবলোক, যেখানে আমরা ঈশ্বরের অধিকতর নিকটবর্ত্তী হইতে পারিব, যেখানে তামাদের জ্ঞান, ভাব ও ইচ্ছা ঈশ্বরের জ্ঞান, প্রীতি ও ইচ্ছার সহিত অধিক মিলিত হইবে। সেই স্বর্গ লোক, সেই পুণ্য ধাম। দেবতারা দেব নাম কেন ধারণ করিয়াছেন; কেন না ঈশ্বরের উপাসনাতেই তাঁহারা নিরন্তর নিমগ্ন আছেন। “মধ্যে বামনমাসীনং বিশ্বে দেবাউপাসতে" তাঁহাতেই তাঁহাদের আনন্দ, তাঁহাতেই তাঁহাদের জীবন। মনুষ্যের ও দেবভাব তাছে; কিন্তু সকল সময়ে তিনি সেই পবিত্র-ভাব রক্ষা করিতে পারেন না। এই হেতু তাহারা দেব নামের যোগ্য নহেন। এই পৃথিবীতেই আমরা স্বর্গ নরক উভয়েরই আভাস পাইতেছি। আত্মার প্রকৃত সুস্থবস্থা—তাহার নির্মল সুশৃঙ্খল ভাবই স্বর্গ। আত্মার বিকৃতাবস্থা, তাহার সমল দূষিত ভাবই নরক। পাপাত্মাকে স্বর্গলোকে রাখিলে তাহার কি হইতে পারে? চির রোগীকে তাহার অন্ধকার কুটীর হইতে সুসজ্জিত প্রাসাদে আলিয়া রাখি বল তাহার কি হইবে? সে যে স্থানে থাকুক, সকল স্থানই তাহার নরক তুল্য বোধ হয়। যে ব্যক্তি কোন দুঃসহ মনস্তাপ ভোগ করিতেছে, বসন্ত কালের মলয়ানিল, যাহা সুস্থ ব্যক্তির প্রাণ-তুল্য, তাহা তাহার যন্ত্রণাদায়ক। পাপীরও সেই প্রকার। যদি পাপাত্মাকে স্বর্গলোকে দের মণ্ডলীর মধ্যে রাখা যায়, তবে তাহার স্বর্গভোগ নহে, তাআই তাহার অতি কঠোর শাস্তি। যে সকল পুণ্যা আর ঈশ্বরের আনন্দ অধিক ভোগ করিতেছেন, তাঁহার জ্ঞান, প্রীতি, প্রচুর ভাবে অর্জন করিতেছেন, তাঁহারদিগের মধ্যে উন্নত পবিত্র জীবেরাই থাকিতে পারে!

 স্বর্গলোকে ঈশ্বরের প্রচুর ভাব পাওয়া যাইবে। জ্ঞান ধর্ম্ম ঈশ্বর প্রীতি আরো উন্নত ভাব ধারণ করিবে। আমরা উন্নত দেবতাদিগের মধ্যে থাকিয়া উৎকৃষ্ট শিক্ষা লাভ করিব। ঈ ঘরের অনুচর হইয়া কার্য করিতেছি, তাঁহার। মন্থল ভাব সম্পন্ন করিতেছি, ইহাতেই আমাদের আনন্দ হইবে। তঁহার মহিমা প্রচার করিয়া, তাহার প্রেম অস্বদন করিয়া, জীবন সার্থক করিব। সেই পবিত্র দেব লোকে যাইবার জন্য পৃথিবী লোকেই প্রস্তুত হইতে হইবে। এখলেই ঈশ্বরের সহিত সম্বন্ধ নিবন্ধ করলে পরে তাহাকে আমরা প্রকৃষ্ট রূপে জানিতে পাইব! এখানকার উপযুক্ত শিক্ষা পাইলে ইহা অপেক্ষা গুরুতর শিক্ষার অধিকারী হইব। আবার সেখানেই যে আমাদের শিক্ষার শেষ হইল, তাহা নহে! তাহা অপেক্ষা আর ও এক উন্নত অবস্থা। ইইবে; তাহা তাপেক্ষা উচচতর ভূমিতে আরোহণ করিতে পারিব। আমাদের জীবন উন্নতির স্রোতেই যাইবে। যাহার জীবন আছে, উন্নতি ব্যতীত তাহার মঙ্গল হয় না। আমরা এস্থান হইতে এমন এক লোকে যাইব; যেখানে ধর্ম ও পবিত্রতার স্রোত বহমান হইতেছে; যেখানে প্রেমানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, উৎসারিত হইতেছে; যেখানে, কি সৌভাগের বিষয়! যেখানে দেবতাদিগের সঙ্গে সম-স্বরে তামরা ঈশ্বরের গুণ গান করিব, তাঁহাদের সঙ্গে একত্রে তাহার মঙ্গলংঅয় কার্য সম্পন্ন করিব, ভহর মহিমাকে মহীয়ান করিব। কি আনন্দের লোক, তাহার জন্য এমন শত শত জীবন বলিদান দেওয়া যায়। কিন্তু ইহাতেই কি আমাদের উন্নতির শেষ হইল? না, এখনো নহে। ঈশ্বর এখনো বলিতেছেন, এ স্থান তোমার সম্পূর্ণ তৃপ্তির স্থল মছে। যদিও এখানে তুমি সহস্র সহস্র আনন্দ ভোগ করিতেছ, যাহা অন্য লোকে পায় নাই; তথাপি এই তোমার শেষ গতি, নহে, তোমার পরম সম্পৎ নহে, তোমার পরম লোক নহে। তখন তুমি আশ্চর্য্য হইবে এবং ঈশ্বরের প্রেম ও করুণ আশ্চর্য্যরূপে অনুভব করিবে। এখানেই আমাদের আত্মার উন্নতি স্পষ্টরূপে অনুভব করা যায়। এক বৎসর পূর্ব্বে ঈশ্বরে আমাদের যে প্রকার অনুরাগ ছিল, এক বৎসর পরে দেখিতে পাই, সে প্রীতি ও অনুরাগ আরো উন্নত হইয়াছে―তাঁহার কার্য্যে অমরা যত সময় ব্যয় করিতাম, তাহা অপেক্ষা অধিক সময় ব্যয় করি; তাঁহার অনুরোধ রক্ষা করিতে যে স্থানে সঙ্কুচিত হইতাম, তাহা এখন অনায়াসে রক্ষা করিতে পারি; তাঁহার জন্য যত টুকু ত্যাগ স্বীকার করিতে ক্ষুণ্ণ হইতাম, তাহা এক্ষণে অনায়াসে স্বীকার করিতে পারি। এই প্রকার উন্নতিতেই আমাদের সমস্ত জীবন যাপন হইবে। এখানকার উন্নতিতে আমাদের অনন্ত কালের মহান্‌ উন্নতির আভাস মাত্র পাইতেছি। তখন আমাদের জ্ঞান যে কত উজ্জ্বল হইবে, প্রীতি যে কত উন্নত হইবে, ইচ্ছা যে কত সবল হইবে; এখান হইতে তাহা বলিতে পারিনা। এখানে আমরা যে সত্যের আবরণ মাত্র দেখিতে পাই, পরে তাহার মধ্য দেশ দেখিতে পাইব; প্রীতি যেমন এখানে এক দেশ কি এক পরিবারে বদ্ধ আছে, তখন তাহা উদার ভাব ধারণ করিবে―তখন ঈশ্বরের উদার প্রীতি-দৃষ্টিতে আমরা জগৎ দর্শন করিব। এখানে ইচ্ছা সকল সময়ে আপনার প্রকৃত স্বাধীনতা রক্ষা করিতে পারে না, ক্রমে তাহা এমন বলীয়ান্‌ হইবে যে সে আপনাপনি ধর্ম্মের এবং ঈশ্বরের অনুযায়ী হইবে; প্রত্যেক প্রবৃত্তিকে তাহা অধীনে আনিবে এবং তাহার উপর আপ-

নার প্রকৃত অধিপত্য স্থাপন করিবে। যখন এই প্রকার আমাদের জ্ঞান, প্রীতি ও ইচ্ছা ঈশ্বরের জ্ঞান, প্রীতি, ইচ্ছার সহিত মিলিত হইতে থাকিবে, তখন আমরা মুক্তি লাভ করিয়া কৃতার্থ হইতে থাকিব।

 ব্রাহ্মধর্মের এই প্রকার মুক্তির ভাব অন্যান্য ধর্ম্মের সহিত তুলনা করিয়া দেখিলে এ ধর্ম্মের মাহাত্ম্য স্পষ্ট রূপে বুঝা যায়। কোন কোন পণ্ডিতেরা বলেন, জীবত্ব গিয়া ঈশ্বর হইয়া গেলে জীবের মুক্তি হইবে। ব্রাহ্মধর্মের মুক্তি ঈশ্বরের অধীন হইয়া থাকা; তাঁহাদের মুক্তি ঈশ্বর হইয়া যাওয়া। বস্তুতঃ তাহাতে জীবের ঈশ্বরত্ব হয় না, তাহাকে বিনাশ করিয়া ফেলা হয়। সংসারের অধীন না হইয়া ঈশ্বরের যে অধীনতা, তাহাতেই যথার্থ মুক্তি। যাঁহারা বলেন, জীব ঈশ্বর হইয়া যাইবে, তাঁহারা তাহাকে বিনাশ করিয়া ফেলেন। তাহাতে এই হয় যে ঈশ্বর যেমন আছেন, তেমনই থাকিবেন; জীবেরাই লয় হইয়া যাইবে। আমাদের আন্তরিক স্পৃহা এই যে ঈশ্বরের অধীন হইয়া থাকি; ঈশ্বর হইয়া যাই, ইহাতে আমাদের কোন ভাবই সায় দেয় না। তাহা হইলে আপনাকে বিনাশ করিয়া ফেলা হয়, ব্রাহ্মধর্ম্মের এ প্রকার নির্ব্বাণ মুক্তি নহে। শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্তস্বরূপের অধীন হওয়াই মুক্তি। বৈদান্তিক পণ্ডিতেরা বলেন যে যাহা দেখিতেছি তাহার বাস্তবিক সত্তা নাই; একমাত্র ঈশ্বরই আছেন, আর সকলই অসৎ, সকলই মায়া। তাঁহাদের এ বাক্য কল্পনা মাত্র। এই জগৎ যাহা আমরা দেখিতেছি, তাহা সত্য; কেন না তাহা সেই সত্য স্বরূপ-

কেই অবলম্বন করিয়া আছে। সেই সত্যের আশ্রয়ে এই তাবৎ সত্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে, তাহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইলেই ইহা অসৎ; কিন্তু বাস্তবিক কিছুই তাহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকিতে পারে না; তবে আমরা যে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখি, সে আমাদের কল্পনা মাত্র। বৃক্ষকে কি কখন আমরা মূল হইতে বিচ্ছিন্ন মনে করিতে পারি? না জগৎ সংসারকে জগৎ কর্ত্তা হইতে বিচ্ছিন্ন মনে করিতে পারি? তাঁহার আশ্রয়ে থাকিয়া এই জগৎ সত্য রূপে প্রতিভাত হইতেছে। বৈদান্তিক মতের প্রধান পোষক যে শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য, তাঁহার সিদ্ধান্ত এই যে আমরা সংসার হইতে উপরত হইয়া ও কর্ম্মের ফলাফলে নিরাকাঙ্ক্ষী হইয়া পর ব্রহ্মের উপাসনা করিলে তাঁহার সহিত এক হইয়া যাই; তাঁহাতে আর আমাতে কোন প্রভেদ থাকে না। হীনমতি কুলোকের হস্তে এই মত পড়িয়া তাহার ফল এই হইয়াছে যে তাহাদের মধ্যে পাপ-প্রবাহ বৃদ্ধি পাইয়াছে; তাহারা বলে আমি যাহা করিতেছি, ঈশ্বরই করিতেছেন; আমি পাপ পুণ্যের ভাগী নহি।

 জানামি ধর্ম্মং ন চ মে প্রবৃত্তির্জানান্যধর্ম্মং ন চ মে নিবৃত্তিঃ।
ত্বয়া হষীকেশ হৃদিস্থিতেন
যথা নিযুক্তোঽস্মি তথা করেমি।

 এই সমস্ত মত ব্রাহ্মধর্মের সম্পূর্ণ বিরোধী। আমরা ঈশ্বরের অনুচর হইয়া তাঁহার অধীনতাতেই চির কাল থাকিব। যতক্ষণ তাঁহার অধীন না থাকি, ততক্ষণ আমাদের মুক্তভাব নহে সংসারের অধীনতাতেই বদ্ধ ভাব, ঈশ্বরের অধীনতাতেই মুক্ত ভাব। “যদা সর্ব্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ। অর্থ মর্ত্তোঽমৃতোভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে" যখন আমাদের মোহ, স্বার্থপরতা, দ্বেষ, কুটিলতা, এই সকল হৃদয়গ্রন্থি ভিদ্যমান হইবে; যখন আমরা ঈশ্বরকে সর্ব্বস্ব দান করিব; কেবল ফুল চন্দন নয়, কিন্তু প্রাণ মন সকলই তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিব, তখনই আমাদের মুক্তি লাভ হইবে; তখন মর্ত্ত্য হইয়াও আমরা অমৃত হইব।

 অতএব ব্রাহ্মধর্ম্মের মুক্তি ব্রহ্মেতে লয় হওয়া নহে; ব্রাহ্ম ধর্ম্মের মুক্তি আত্মার অনন্ত কালের উন্নতি! ব্রাহ্মধর্ম্ম এ প্রকারও উপদেশ দেন না যে অন্যের হস্তে মুক্তির ভার সমর্পণ করিয়া আমরা মুক্ত হইব, কোন মানব দেবতা কি কোন ধর্ম্মযাজক আমাদের জন্য মুক্তি আনিয়া দিবেন। ব্রাহ্মদের বিশ্বাস ইহা নয় যে পুরাকালের কোন নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণে আমরা একেবারে পতিত হইয়াছি; আমারদিগকে ঈশ্বরেরও ত্রাণ করিবার সাধ্য নাই; আমাদের অনুতাপও কোন কার্য্যের নহে; এক জন মানব-দেবতার সহায়তা চাই। ব্রাহ্মধর্ম্মের মতে ঈশ্বরই আমারদের মুক্তিদাতা, তিনিই আমারদের পরিত্রাতা। আমরা “আত্ম প্রভাবাৎ দেব প্রসাদাৎ” ঈশ্বরের প্রসাদে ও স্বীয় যত্নে অন্তরে মুক্ত না হইলে তীর্থ-দর্শনে বা গঙ্গা স্নানে বা কোন ঐন্দ্রজালিক ব্যাপারে আমারদের মুক্তি হইবে না। আমারদের মুক্তি এই পৃথিবীর মধ্যে কি কোন একটি স্বর্গ লো-

কের মধ্যেই বদ্ধ নহে; কিন্তু ঈশ্বর প্রসাদে তাঁহার আশ্রয়ে আমরা চিরকাল থাকিয়া মুক্তির পথে উৎকৃষ্ট হইতে উৎকৃষ্টতর স্বর্গে অনন্ত কাল পর্যন্ত অগ্রসর হইতে থাকিব। ব্রাহ্মধর্ম্মের এই স্বর্গ, এই মুক্তি।

সমাপ্ত।

― ☆☆ ―