বিষয়বস্তুতে চলুন

ভবঘুরে/আদান প্রদান

উইকিসংকলন থেকে

আদান প্রদান।

(১)

 নয়ানজুলির ব্রজ সরকার নিজে বিবাহ না করিয়া যখন খুড়তুত ভাই রসিকের বিবাহের উদ্যোগ করিল, তখন পাঁচ জনে এই নির্ব্বোধ লোকটির বুদ্ধিহীনতা-দর্শনে বিস্মিত না হইয়া থাকিতে পারিল না। তাহারা শুধু বিস্ময় অনুভব করিয়াই ক্ষান্ত রহিল না, অযাচিতভাবে মূর্খ ব্রজ সরকারকে নিজের বাপের বংশ বজায় রাখিবার জন্য অনেক উপদেশও দিল। বুদ্ধিহীন ব্রজ কিন্তু এই সকল বুদ্ধিমান্ হিতৈষীদিগের উপদেশের সার্থকতা অনুভব করিল না; সে হাসিয়া উত্তর করিল,—‘রসিকের বাপের বংশ আর আমার বাপের বংশ কি আলাদা!’

 আসল কথা, ছোট মুদীখানার দোকানটির আয়ে দুইটি পেট চালাইয়া দীর্ঘ সাত বৎসরের চেষ্টায় সে যে তিন শত টাকা সঞ্চয় করিয়াছিল, তাহাতে এক জনের বিবাহ হইতে পারে। সে একজন ব্রজ নিজে হইলে, আবার যে অতগুলি টাকার যোগাড় করিয়া রসিকের বিবাহ দিতে পারিবে, এমন সম্ভাবনা ছিল না। বিবাহ করিলে আর একটি পেটের খরচ বাড়িবে। এই সামান্য দোকানের আয়ে তিনটি পেটের খরচ যোগাইয়া আর দশ বৎসরেও সে এতগুলি টাকা সংগ্রহ করিতে পারিবে কি না সন্দেহস্থল। এ দিকে রসিকেরও বিবাহের বয়স হইয়াছে। অগত্যা ব্রজ নিজে বিবাহ না করিয়া সঞ্চিত টাকায় রসিকের বিবাহ দিতে উদ্যত হইল।

 খুড়া ধনঞ্জয় সরকার অনেকদিন পূর্ব্বে পৃথক হইয়াছিল, এবং জমীদারের সহিত মোকদ্দমা করিয়া মৃত্যুকালে এত দেনা রাখিয়া গিয়াছিল যে, জমী জমা ঘর ভিটা সব বেচিয়া লইয়াও মহাজন সমগ্র টাকার উশুল পাইল না। সাত বছরের ছেলে আর পাঁচ বছরের মেয়ে উমার হাত ধরিয়া খুড়ী কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহত্যাগ করিলেন। ব্রজ তাঁহাকে সাহস দিয়া বলিল,—‘ভাবনা কি খুড়ী, আমার কুঁড়ে তো আছে।’

 অনেকদিন আগে ব্রজ মাতৃপিতৃহীন হইয়াছিল। ঘরে আর কেহ ছিল না। সে নিজে রাঁধিত, নিজে খাইত; বাকী সময়টা তাসের আড্ডায় ও কীর্ত্তনের আখড়ায় ঘুরিয়া দিন কাটাইয়া দিত। যে দুই পাঁচ বিঘা জমী ভাগজোতে বিলি ছিল, তাহারই আয়ে কোনরূপে দিন চলিয়া যাইত। আর দিন চলিবার জন্য তাহার উদ্বেগও কিছুমাত্র ছিল না। শুধু এক এক দিন স্তব্ধ সন্ধ্যার গাম্ভীর্য্যের মধ্যে আপনাকে যখন নিতান্ত একা বলিয়া মনে হইত, তখন সে ঘরে চাবি লাগাইয়া কীর্ত্তনের আখড়ায় ছুটিয়া যাইত, এবং কীর্ত্তনীয়াদের সঙ্গে গলা মিলাইয়া গায়িতে থাকিত—

“আমি ভবে একা দাও হে দেখা,
ওহে বাঁকা বংশীধারী!”

 সুতরাং ব্রজ শূন্য সংসারে খুড়ীকে পাইয়া খুবই উৎসাহিত হইল। প্রতিবেশী যদু সান্ন্যাল মহাশয় বলিলেন,—“হাঁ হে ব্রজ, এ সব আবার জড়ালে কেন?’

 ব্রজ মাথা নাড়িয়া বলিল,—‘কও কথা দাদাঠাকুর, এ আবার জড়াজড়ি কি? মা আর খুড়ী কি আলাদা?’

 কিন্তু দিন কতক পরে যখন দিন চলিবার ভাবনা আসিল, তখন ব্রজনাথের আনন্দের মাত্রাটা যেন কিয়ৎপরিমাণে হ্রাস হইয়া পড়িল। তবে সে একেবারে নিরুৎসাহ হইল না, মায়ের এক যোড়া কাণের পাশা আর দুই গাছা রূপার পৈছে ছিল। তাহা পঞ্চাশ টাকায় বেচিয়া একটি ছোট মুদীখানার দোকান খুলিল। দোকানের আয়ে কোনরূপে সংসার চলিতে লাগিল। ব্রজ রসিককে পাঠশালায় ভর্ত্তি করিয়া দিল।

 একদিন ব্রজ মধ্যাহ্নে ঘরে শুইয়া শুনিতে পাইল, প্রতিবেশিনী বামার মা আসিয়া খুড়ীর দুর্ভাগ্যের জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করিতেছে, এবং এখনও যদি তিনি ছেলেটাকে মানুষ করিয়া তাহার মাথায় এক গণ্ডুষ জল দিয়া যাইতে পারেন, তাহা হইলেও যে তাঁহার যথেষ্ট সৌভাগ্য, ইহাও ব্যক্ত করিতেছে। তাহার আক্ষেপ শুনিয়া খুড়ী হতাশভাবে বলিতেছেন,—‘হায় মা, মাথা পেতে দাঁড়াবার জায়গা নাই, আর মাথায় জল দেব। কপাল আমার!’

 ব্রজ চুপ করিয়া শুইয়া এই সকল আক্ষেপোক্তি শুনিতে লাগিল।

 তারপর উমার বিবাহ হইল। খুড়ী মারা গেল। ব্রজ তিলকাঞ্চনে খুড়ীর শ্রাদ্ধ করিল। রসিক তখন পাঠশালা ছাড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জমীদারী-কাছারীর গোমস্তা শিবু চক্রবর্ত্তীকে ধরিয়া ব্রজ তাহাকে পাটোয়ারী কাজের শিক্ষানবীশ নিযুক্ত করিয়া দিল।

 চারি বৎসর শিক্ষানবীশীর পর রসিকের মাসিক পাঁচ টাকা মাহিনা হইল। ব্রজনাথের আনন্দের সীমা রহিল না। সে মহোৎসাহে ভ্রাতার বিবাহের উদ্যোগ করিতে লাগিল। লোকে বলিল,—‘ব্রজ, আগে নিজে বিয়ে ক’রে তারপর ভায়ের বিয়ে দেবে।’

 ব্রজ উত্তর করিল,―‘আমার কি আর বিয়ের বয়স আছে? এখন ছোঁড়াটার মাথায় এক গণ্ডুষ জল না দিয়ে নিজে টোপর মাথায় দেওয়া কি সাজে?’

 তাহাই হইল। ব্রজনাথ দুই শত টাকা কন্যাপণ দিয়া রাধানগরের নকুড় ঘোষের বারো বছরের মেয়ে থাকমণিকে ঘরে আনিল। বিবাহের এক মাস পরেই রসিক নরুণচকের গোমস্তার পদে নিযুক্ত হইল। নকুড় ঘোষ গর্ব্ব সহকারে ব্রজনাথকে বলিল,—‘আমার মেয়ের আয়-পয়টা দেখলে হে সরকারের পো?―

 আহ্লাদে গদগদকণ্ঠে ব্রজনাথ বলিল,—‘ছোট বৌমা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।’

 কিন্তু মাস কয়েক পরে যখন উমার বৈধব্য-সংবাদ আসিয়া ব্রজনাথের আনন্দটাকে ম্লান করিয়া দিল, তখন সে ছোট বৌমার লক্ষ্মীত্বের উপর সন্দেহ না করিয়া থাকিতে পারিল না। সে নিজে গিয়া সদ্যোবিধবা উমাকে গৃহে লইয়া আসিল। রসিক বলিল,—‘রায় মহাশয়ের (উমার স্বামীর) জমী জায়গাগুলার কি বন্দোবস্ত কর্‌লে?’

 ব্রজনাথ উদাসভাবে বলিল,—‘সে উমির দেওর যা হয় করবে।’

 রসিক বলিল,—‘সে একা ভোগ কর্‌বে?’

 বিরক্তির সহিত ব্রজনাথ বলিল,―“ভোগ করুক, বিলিয়ে দিক্‌, সে তার খুসী। আমার কি অত ঝঞ্ঝাট ভাল লাগে? আমার তিন তিন দিন দোকান বন্ধ!’

 জোষ্ঠের নির্বুদ্ধিতায় রসিকের হাসি আসিল। হাসি চাপিয়া সে মনে মনে স্থির করিল, সুবিধামত একদিন গিয়া জমীজায়গাগুলার বিক্রয়ের বন্দোবস্ত করিয়া আসিবে। অল্প জমী ত নয়, আট দশ বিঘা লাখরাজ জমী, অন্ততঃ সাত আট শো টাকায় বিক্রয় হইবে।


(২)

 ‘উমি ও উমি, ও পোড়ারমুখী!’

 ‘কেন গা দাদা?’

 ‘বলি—এ সব কি হয়েছে?’

 ‘কি হয়েছে আবার?’ বলিয়া উমা ছুটিয়া আসিল, এবং অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া বলিল,—‘ঐ ত তোমার তামাক সাজা রয়েছে, ধরিয়ে খাও না।’

 ‘আর এই গাড়ুর জল? এটাও খেতে হবে নাকি?’

 রাগে চোখ মুখ ঘুরাইয়া উমা বলিল,—‘না, আমার ছরাদ করতে হবে।’

 ব্রজনাথ হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল; হাসিতে হাসিতে বলিল, ‘এই পোড়ারমুখী রেগে মরেছে।’

 মুখখানা ভারি করিয়া উমা বলিল,―‘তোমার কথায় মরা মানুষেরও রাগ হয়, আমি তো জ্যান্ত মানুষ। তামাক সাজা রয়েছে, খাবে; গাড়ুতে জল আছে, মুখ হাত পা ধোবে; তা নয়, এটা কি হবে, ওটা কি হবে?’

 তাহার মুখের সম্মুখে হাত নাড়িয়া ব্রজ হাসিতে হাসিতে বলিল, ‘মর পোড়ারমুখী, সাধে কি বলি? তোর আক্কেলটা কি রকম? আমি মুদী মানুষ, আমার কি এই সাজা তামাক খাওয়া, গাড়ুর জলে পা ধোয়া পোষায়?’

 ভ্রাতার মুখের উপর একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, উমা গাড়ুটা তুলিয়া লইল, এবং জলটা উঠানে ঢালিয়া ফেলিতে ফেলিতে ক্রোধরুদ্ধ কণ্ঠে বলিল,—'আমার ঝকমারি হয়েছে; তুমি পুকুরঘাটে পা ধুয়ে এস; নিজে তামাক সেজে খাও; আমি যদি আর কক্ষণও তোমার কাজ করিতে যাই, আমাকে গুণে সাত ঝাঁটা মেরো।’

 ব্রজ তাহার হাত হইতে গাড়ুটা কাড়িয়া লইয়া হাস্য প্রফুল্লকণ্ঠে বলিল,—‘দূর পাগলী, তুই না করলে আমার কাজ করবে কে?’

 ‘ভূতে’ বলিয়া উমা রাগে গর্ গর্ করিতে করিতে চলিয়া গেল। ব্রজনাথ কিন্তু তাহার রাগ দেখিয়া একটুও শঙ্কিত বা বিমর্ষ হইল না; উমার এই তীব্র ক্রোধের ভিতর দিয়া যে একটা স্নেহের আভাস ফুটিয়া উঠিতেছিল, তাহারই মাধুর্য্য উপভোগ করিতে করিতে সে প্রফুল্লমুখে কলিকায় আগুন ধরাইল। তার পর ফুঁ দিয়া আগুনটা জমকাইয়া লইয়া তামাকে টান্ দিতে দিতে ডাকিল,—‘উমি, ও উমি!

 দুই তিন বার ডাকের পর উমা আসিয়া দরজায় দাঁড়াইল এবং ভারী মুখে গম্ভীরস্বরে বলিল,—‘আবার কি? হুঁকোর বাসি জলটা চাই নাকি? কিন্তু তা তো আর পাবার উপায় নাই।’

 ব্রজ এমনই জোরে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল যে, সে হাসি তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়া বিষম কাশি উৎপাদন করিল। খানিকটা খুব কাশিয়া হাসিয়া সে হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল,—‘নাঃ, তুই নেহাৎ হাসালি উমি।’

 উমা গম্ভীরভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। ব্রজনাথ হুঁকায় একটা জোর টান দিয়া একমুখ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল,—‘তুই রাগ করিস্ কেন? আমি বল্‌ছিলাম কি জানিস্?’

 ‘কি বল্‌ছিলে?’

 ‘আমি বলি যে, আমার এত কর্‌বার দরকার কি? যার না কর্‌লে চলে না, তাকে একটু দেখ্‌বি শুন্‌বি।’

 ‘তাকে দেখবার লোক কোন্ নাই?’

 ‘থাকলেও ছোট বৌমা একা, সংসারের কাজ কর্ম্ম আছে। আর আমি যেমন সব নিজের হাতে ক’রে নিতে পারি, সে তা পারে না। তার পান থেকে চূণটি খস্‌লে কি কাণ্ডটা করে, তা জানিস্ তো?’

 ‘খুব জানি।’

 ‘সেই তরেই তো বলি, তার দিকে একটু নজর রাখ্‌বি।’

 ভ্রূভঙ্গী করিয়া উমা বলিল,—‘সে হ’লো দশ টাকা মাইনের গোমস্তাবাবু, আর তুমি দোকানদার।’

 ব্রজ পুনরায় হাসিয়া উঠিল। হাসিতে হাসিতে বলিল,—‘এই দেখ্‌দেখি তোর ছেলেমানুষী। নাঃ, তোর কোনও কালেই বুদ্ধি হবে না।’

 উমা ঘাড় নাড়িয়া বলিল,—‘না হয় না হবে।’

 ব্রজনাথ মস্তক আন্দোলন করিতে করিতে অপেক্ষাকৃত মৃদুস্বরে বলিল,―‘না হয় না হবে! একটু বুঝে দেখ্‌না। আমার তরে তো কিছু আটকায় না। আর হাজার হোক, রস্‌কে হ’লো তোর মার পেটের ভাই। বলে—আক চেয়ে কি সোঁদর মিঠে?’

 ক্রোধ-তীব্রকণ্ঠে উমা বলিল,—‘তাই ভেবেই তুমি বুঝি আমার কাজ পছন্দ কর না দাদা? আমাকে তুমি আজকাল পর ভাব?’

 হাসিতে হাসিতে ব্রজনাথ বলিল,—‘মনে কর্ না—তাই ভাবি।’

আর আমার দেখাদেখি তুইও আমাকে একটু পর ভার দেখি।’

 উমা রাগে মুখ ভার করিয়া নিরুত্তরে দাঁড়াইয়া রহিল। ব্রজনাথ বলিল,—‘আসল কথাটা কি জানিস, আমার কাজ কর্‌তে গিয়ে তোকে যে লাঞ্ছনা সইতে হবে, সেটা কি ভাল?’

 উমা বলিল,―‘আমার আবার কিসের লাঞ্ছনা বল তো?’

 মৃদু হাসিয়া ব্রজনাথ বলিল,—‘কিসের লাঞ্ছনা, তা তুইই জানিস্ উমি, তবে আমাকে আর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দিস্ কেন? একে তো তোর কপাল পুড়ে আমার বুকে বাজ পড়েচে, তার উপর আমার তরে যদি তোকে দু’কথা শুন্‌তে হয়—না উমি, তা আমার সহ্য হবে না।’

 ব্রজনাথের স্বরটা গাঢ় হইয়া আসিল। উমা জোরে মাথা নাড়িয়া ভারি গলায় বলিল,—‘না হয় না হবে; কিন্তু আমি কারও দাসী বাঁদী নই যে সক্কলের কাজ কত্তে যাব। আমি কারও কিছু কর্‌তে পার্‌ব না, তাতে আমাকে ভাত কাপড় দাও―চাই না দাও।’

 উমার দুই চোখ দিয়া ঝর-ঝর করিয়া জল গড়াইয়া পড়িল। সে তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখ ঢাকিয়া ছুটিয়া পলাইল। ব্রজনাথের চক্ষুও শুষ্ক ছিল না; সে কোঁচার খুঁটে চোখ মুছিয়া আপন-মনে বলিল,—‘না, মেয়েমানুষগুলোর সঙ্গে পেরে উঠবার যো নাই।’

 সে হুঁকায় ঘন ঘন টান দিতে লাগিল। হঠাৎ রন্ধনশালা হইতে ছোট বোয়ের মৃদু অথচ তীব্র কণ্ঠস্বর তাহার কাণে আসিল। সে মুখের কাছ হইতে হুঁকাটা সরাইয়া কাণ খাড়া করিয়া রহিল। শুনিতে পাইল, ছোট বৌ উমাকে উদ্দেশ করিয়া আপন-মনে বলিতেছে,—‘দরদ দেখেও বাঁচি না। আদরের বোন; একটা সংসার পেটে পুরে এসেছেন, এখন আবার এ সংসারটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাচ্চেন।’

 হুঁকাটা বাঁ হাতে ধরিয়াই ব্রজনাথ ঘরের বাহির হইয়া আসিল এবং ক্রুদ্ধ-কণ্ঠে ডাকিল,—‘ছোট বৌমা!’

 ছোট বোয়ের কণ্ঠ নীরব হইল। ব্রজনাথ রোষ-ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলিল,—‘মুখ সাম্‌লে কথা কইবে বৌমা, উমি কারও বাবার ঘরে যায় নি, সেটা মনে রেখো।’

 সে হুঁকাটা রাখিয়া দ্রুতপদে বাড়ীর বাহির হইয়া গেল।


(৩)

 মেয়েমানুষ বিধবা হইয়া ভ্রাতৃগৃহে আশ্রয় লইলে, তাহাকে ভ্রাতার না হউক, অন্ততঃ ভ্রাতৃবধুর পাঁচ কথা শুন্‌তে হয়। ইহার উপর উমা যখন ব্রজনাথের উপর একটু বেশী টান দেখাইতে লাগিল, তখন এই পক্ষ-পাতিতার জন্য তাহাকে বেশ দশ কথা শুনিতে হইল। কথা শুনিলেও উমা কিন্তু এই পক্ষপাতিত্ব না দেখাইয়া থাকিতে পারিত না। সেযখন দেখিল দাদা—যে এই সংসারের স্তম্ভস্বরূপ, আপনার সকল শক্তি সামর্থ্য দিয়া যে এই সংসারটিকে খাড়া করিয়াছে, এবং সে জন্য যাহার নিজের দিকে চাহিবার অবসর একটুও হয় নাই, সেই লোকটির নিঃস্বার্থতা কাহারই সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই; তাহার দিকে কেহ ফিরিয়াও চাহে না; অথচ সে সংসারের এই গভীর অবজ্ঞাকে এমনই অনায়াসে সহ্য করিয়া যাইতেছে, যাহা রক্ত মাংসের শরীরে নিতান্তই অস্বাভাবিক ও আশ্চর্য্যজনক; সময়ে এক ঘটী জল, এক মুঠা ভাত পাইলেই সে কৃতার্থ হয়, অথচ সেটাও যেন তাহার ন্যায্য প্রাপ্যের মধ্যেই নয়; শুধু অপরের দয়ার উপরেই তাহার জীবনটা নির্ভর করিতেছে; যেন রাজ্যেশ্বর আপনার রাজৈশ্বর্য্য সব বিলাইয়া দিয়া ভিক্ষুকের বেশে লোকের করুণা চাহিয়া হাত পাতিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে; তখন ব্রজনাথের এই মহত্ত্বপূর্ণ ভিক্ষা উমার হৃদয়ে সম্ভ্রম ও ভক্তির উদ্রেক করিলেও লোকের নিদারুণ অকৃতজ্ঞতা তাহার অসহ্য হইয়া উঠিল; সুতরাং সে এই সকল অকৃতজ্ঞ লোকের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া অন্যায়ের প্রতীকারে উদ্যত হইল।

 কিন্তু এই অন্যায়ের প্রতিরোধ-চেষ্টাই যে কাহারও কাহারও নিকট নিতান্ত অন্যায় বলিয়া বোধ হইল, তাহা উমা বুঝিল না। আমার যাহা কর্ত্তব্য, তাহা আমি পালন করি বা না করি, অন্যে আসিয়া যে আমার কর্ত্তব্যের অসম্পূর্ণতাটুকু পূরণ করিয়া দিবে, ইহা সহ্য করিতে পারি না; মানুষের স্বাভাবিক দুর্ব্বলতা আসিয়া এখানে কৃতজ্ঞতার পরিবর্ত্তে একটা বিদ্বেষ উৎপাদন করে এবং তাহাতেই অপরের অযাচিত উপকার ও শ্লেষ ছাড়া আর কিছুই বোধ হয় না। সুতরাং জ্যেষ্ঠের উপর উমার পক্ষপাতে ছোট বোয়ের অন্তর বিদ্বেষে ভরিয়া উঠিল। সে বিদ্বেষটা ব্রজনাথের উপর নয়, উমার উপরেও নয়, শুধু নিজের অসম্পূর্ণ কর্ত্তব্যের উপর উমা যে হস্তক্ষেপ করিয়াছে, সেইটুকুর উপরেই তাহার সকল ক্রোধ, বিদ্বেষ আসিয়া পড়িল, এবং তাহার ফলে সময়ে সময়ে উমাকে বেশ দুই পাঁচ কথা শুনিতে হইল। উমা কিন্তু সে সব কথা গায়ে মাখিয়া সংসারে অশান্তির সৃষ্টি করিতে চাহিত না। সে সহিষ্ণুতার সহিত আপনার কাজ করিয়া যাইত।

 কিন্তু সেদিন তাহার জন্য ব্রজনাথকে বিচলিত হইতে এবং ছোট বোয়ের পিতৃ-উচ্চারণ করিতে শুনিয়া, সে শঙ্কিত হইয়া উঠিল। সন্ধ্যার পর ব্রজনাথ দোকান বন্ধ করিয়া ঘরে আসিলে, সে জ্যেষ্ঠের নিকট গিয়া তিরস্কারের স্বরে জিজ্ঞাসা করিল,—‘তোমার রকম কি দাদা?’

 ব্রজনাথ স্বাভাবিক মৃদু হাস্যের সহিত উত্তর দিল,—‘কিসের রকমটা উমি?’

 উমা ঘাড় দোলাইয়া হাত নাড়িয়া বলিল,—‘তোমার উপর অন্যায় হইলে আমি কিছু বল্‌তে পাব না, তবে আমার কথায় তুমি কথা কইতে যাও কেন?’

 তাহার মুখের উপর হাস্য-প্রফুল্ল দৃষ্টি স্থাপন করিয়া ব্রজনাথ বলিল,—‘তুই যে ছোট বোনটি।’

 উমা ঘাড় নাড়িয়া ক্রোধ-কম্পিতস্বরে বলিল,—‘কক্ষণো না, তুমিই বলেছ, মার পেটের ভাই নও, পর।’

 উমার চোখ দুইটা জলে ভরিয়া আসিল। ব্রজনাথ ঘাড় নীচু করিয়া তামাক সাজিতে লাগিল। উমা ভারি গলায় বলিল,—‘আমার তা হ’লে এখানে থাকা হবে না, দাদা!’

 ব্রজনাথ মুখ না তুলিয়াই জিজ্ঞাসা করিল,—‘কেন?’

 উমা বলিল,—‘পরের জন্য কথা কইতে গিয়ে তুমি যে একটা অনর্থ বাধাবে, তা আমি দেখ্‌তে পার্‌ব না।’

 মুখ তুলিয়া সহাস্যে ব্রজনাথ বলিল,—‘দূর পোড়ারমুখী, তুই পর?’

 উমা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কলিকায় ফুঁ দিতে দিতে ব্রজনাথ বলিল,—‘সত্যি উমি, মুখের কথা আর হাতের শর, একবার ছাড়্‌লে আর ফেরে না। ছোট বৌমাকে কথাটা ব’লে অবধি মনটা খারাপ হয়ে আছে।’

 উমা নিরুত্তর। ব্রজনাথ বলিল,—‘দাঁড়িয়ে রইলি যে, বোস্ না।’

 উমা বসিল। ব্রজনাথ হুঁকার মাথায় কলিকা বসাইয়া ফুৎকার দ্বারা হুঁকার ধুলা ঝাড়িয়া তাহাতে টান দিল। ঘরের ভিতর রেড়ীর তেলের আলোটা মিট্‌ মিট্‌ করিয়া জ্বলিতেছিল। সেই অস্পষ্ট আলোকে ঘরের জিনিস পত্রগুলা ঝাপসা দেখাইতেছিল। বাহিরে মেঘের গুরু-গম্ভীর ধ্বনির সঙ্গে ঝিম্-ঝিম্ বৃষ্টি পড়িতেছিল। ঘরের পিছনে খিড়কীপুকুরের পাড় হইতে ভেকের অশ্রান্ত চীৎকার উত্থিত হইতেছিল। ঠাণ্ডা বাতাসটা রহিয়া রহিয়া উদাসভাবে বহিয়া যাইতেছিল।

 উমা ডাকিল,—‘দাদা?’

 ‘কেন উমি?’

 ‘আমার একটা কথা রাখ্‌বে?’

 ‘তোর কোন্ কথা না রাখি?’

 ‘সে ছোট খাট কথা।’

 ‘বড় কথাই একটা ব’লে দেখ্।’

 ‘বল্‌লে রাখ্‌বে?’

 ‘রাখ্‌বো।’

 ‘তুমি বিয়ে কর।’

 এই অসম্ভাবিত প্রস্তাবে ব্রজনাথ যেন আকাশ হইতে পড়িয়া চোখ দুইটা বিস্তৃত করিয়া উমার মুখের দিকে চাহিল। বিস্ময়স্তব্ধকণ্ঠে বলিল,—‘বিয়ে! আমি!’

 জোর গলায় উমা বলিল,―‘হাঁ, তুমি! কেন, তোমাকে কি বিয়ে কত্তে নাই?’

 ব্রজনাথ নিঃশব্দে তামাক টানিতে লাগিল। উমা তাহার মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া আগ্রহপূর্ণস্বরে জিজ্ঞাসা করিল,—‘কি বল?’

 ব্রজনাথ হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। হাসিতে হাসিতে বলিল,—‘পাগল! বিয়ে!—এই বয়সে?’

 উমা বলিল,—‘কত আর বয়স তোমার? জোর তিরিশ হবে।’

 ব্রজনাথ বলিল,―‘দূর, আট গণ্ডা সাড়ে আট গণ্ডা হবে।’

 উমা ভ্রূভঙ্গী করিয়া বলিল,―‘তবে আর কি তোমার বিয়ের বয়স আছে? তোমার বোনকে কত বয়সের ছোকরার হাতে দিয়েছিলে?’

 ‘যতই হোক, তিরিশের বেশী হবে না।’

 বলিয়া ব্রজনাথ একটু ম্লান হাসি হাসিল। বাহিরে বিদ্যুৎস্ফূরণের সঙ্গে সঙ্গে মেঘ গড়-গড় শব্দে ডাকিয়া উঠিল। ব্রজনাথ জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া তামাক টানিতে আরম্ভ করিল।

 কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া উমা জিজ্ঞাসা করিল,―‘কি বল দাদা?’

 ব্রজনাথ মুখখানাকে একটু বিকৃত করিয়া বলিল,—‘ছিঃ, লোকে কি বলবে?’

 ‘কিন্তু লোকে কি অসময়ে তোমার মুখে এক গণ্ডুষ জল দিতে আস্‌বে?’

 ‘লোকে না দেয় তুই দিবি।’

 ‘আমার দায় পড়েছে।’

 বলিয়া উমা রাগে মুখ ফিরাইয়া লইল। ব্রজনাথ গম্ভীরভাবে হুঁকায় টান দিতে দিতে বলিল,—‘কিন্তু বিয়ে তো মুখের কথা নয়, তিন চার শো টাকা চাই।’

 উমা বলিল,—‘সে সব আমি জানি না, তুমি কর্‌বে কি না, তাই বল।’

 সহায্যে ব্রজনাথ বলিল,—‘যদি না করি?’

 উমা উঠিয়া দাঁড়াইল, তর্জনী উদ্যত করিয়া ক্রোধগম্ভীর স্বরে বলিল,—‘তা হ’লে এই ভিটেয় যদি তেরাত্তির পোয়াই, তবে আমার নাম উমিই নয়।’

 বলিয়া উমা ঝড়ের মত বাহির হইয়া গেল। ব্রজনাথ ডাকিল,—‘শোন্ উমি, শোন্।’

 উমা কিন্তু ফিরিল না। ব্রজনাথ হুঁকাটা মুখের কাছে ধরিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বাহিরে বৃষ্টির ঝম্ ঝম্ শব্দটা একটু প্রবল হইয়া আসিল।


(৪)

 পরদিন রসিক বাড়ী আসিলে, উমা তাহাকে ধরিয়া বসিল। দাদা বিবাহ করিবে শুনিয়া রসিক প্রথমে খুব খানিকটা হাসিল তারপর বিজ্ঞোচিত গাম্ভীর্য্যের সহিত বলিল,—‘বিদ্যা নাই, বুদ্ধি নাই, রোজগারের ক্ষমতা নাই, ওকে মেয়ে দেবে কে?’

 রসিকের কথায় উমার রাগ হইল; রাগিয়া বলিল,—‘দাদার রোজগারের ক্ষমতা না থাকলে আজ তুমি রোজগারী হ’তে না ছোটদা।’

 রসিক এই রূঢ় উত্তরে ভ্রুকুটী করিল। উমা বলিল,—‘টাকা পেলে মেয়ে দেবার অনেক লোক আছে, তুমি মেয়ের চেষ্টা দেখ।’

 রসিক বলিল,—‘তা যেন দেখবো, কিন্তু টাকা? দাদার হাতে টাকা আছে?’

 ‘তা আমি জানি না।’

 ‘কিন্তু সেটা আগে জানা দরকার। দেনা আমি করতে পারর্ না; ঋণ-পাপকে আমার বড্ড ভয়।’

 উমা বলিল,—‘দেনাই হোক, পাওনাই হোক, বিয়ের চেষ্টা তুমি দেখ।’

 উমা চলিয়া গেলে ছোট বৌ স্বামীকে বলিল,—‘আসল কথাটা কি জান, ঠাকুরঝিই ওঁকে বিয়ের তরে ধরে বসেছে।’

 রসিক গম্ভীরভারে মস্তক সঞ্চালন করিয়া উত্তর করিল,—‘সেটা আমি বুঝি; তা নৈলে এতদিনের পর দাদার বিয়ের ঝোঁক উঠ্‌বে কেন? বুড়ো বয়সে চূড়োকরণ!’

 ছোট বৌ বলিল,—‘তা চূড়োকরণই হোক, আর যাই হোক, তুমি চেষ্টা দেখ। নয় তো ভারী লোকনিন্দে হবে। অমনই তো লোকে কত কথা বলে, নিজে বিয়ে কর্‌লে না, ভায়ের বিয়ে দিলে!’

 বিরক্তিপূর্ণস্বরে রসিক বলিল,—‘কেন দিলে? আমি কি বিয়ের তরে কেঁদে বেড়িয়েছিলাম?’

 ছোট বৌ বলিল,—‘তা তুমি কেঁদেই বেড়াও, আর হেসেই বেড়াও, উনি যেমন তোমার বিয়ে দিয়েছেন, তেমনি তুমিও দিয়ে দোষ থেকে খালাস হও।’

 ক্রোধে মুখভঙ্গী করিয়া রসিক বলিল,―‘বিয়ে দেব, টাকা কোথায়? তিন চার শো টাকা চাই।’

 ছোট বৌ বলিল,—‘তুমিও কতক দাও, উনিও কতক যোগাড় করুন। তুমি তো আমাকে দুশো টাকার নেক্‌লেস দেবে বলেছিলে, তুমি সেই টাকাটাই না হয় দাও না।’

 বলিয়া ছোট বৌ একটু হাসিল। রসিক কিন্তু সে হাসিতে একটুও প্রীত হইল না; রাগে হাত নাড়িয়া বলিল,―‘সে টাকা আমার বাক্সে তোলা আছে কি না? পূজোর কিস্তী না এলে হবে না।’

 অগত্যা ছোট বৌ নিরস্ত হইল। উমা কিন্তু নিরস্ত হইল না; সে শুধু ছোটদার উপর ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারিল না, প্রতিবেশীদিগকেও চেষ্টা দেখিবার জন্য অনুরোধ করিল। প্রতিবেশীরা সরলপ্রাণ ব্রজনাথের উপর সন্তুষ্ট ছিল এবং সে বিবাহ না করায় তাহাদের অনেকে দুঃখিত হইয়াছিল। এক্ষণে ব্রজনাথ বিবাহ করিবে শুনিয়া তাহারা মহোৎসাহে পাত্রীর অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল।

 পাত্রীর অভাব হইল না। তিন শত টাকা পণে একটী মেয়ে স্থির হইল। বিবাহের দিনও নির্দ্দিষ্ট হইয়া গেল। সব ঠিক হইয়া গেলে রসিক জ্যেষ্ঠকে জিজ্ঞাসা করিল,—‘টাকার যোগাড় আছে তো দাদা?’

 ব্রজনাথ হাসিয়া বলিল,—‘টাকার যোগাড় না ক’রে কি কাজে হাত দিয়েছি রে ভাই?’

 রসিক শুনিয়া আশ্চর্য্যান্বিত হইল। ঐ তো সামান্য তিন পয়সার দোকান; উহার দ্বারা সংসার চলে; তাহার উপর এক কথায় এত টাকার যোগাড় কিরূপে হইল? কথাটা বুঝিতে না পারিলেও রসিক মুখ ফুটিয়া জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিল না, নিজেই, তোলাপাড়া করিতে লাগিল। রসিক জানিত না যে, সঞ্চয়ী ব্রজনাথ যে উপায়ে কিছু কিছু জমাইয়া তাহার বিবাহ দিয়াছিল, সেই উপায়েই এই কয় বৎসরে সে আড়াই শত টাকা জমইয়াছিল; বাকী শ’ খানেক টাকা কর্জ্জ করিবে, স্থির করিয়াছিল।

 রসিক ভিতরের কথা জানিত না; সুতরাং সে আপনার পাটোয়ারী বুদ্ধির দ্বারাও এই অর্থ-সংগ্রহের রহস্য উদ্ভেদ করিতে পারিল না। অনেক চিন্তার পর অবশেষে সে যেন একটা সূত্র খুঁজিয়া পাইল এবং সেই সূত্র ধরিয়া সে একেবারে উমার শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল।

 সেখানে গিয়া রসিক যাহা দেখিল, তাহাতে সে যেন সহসা গাছ হইতে পড়িল। সে দাদাকে বিদ্যাবুদ্ধিশূন্য বলিয়াই জানিত; কিন্তু সে যে এতটা বিশ্বাসঘাতক, এমন জুয়াচোর হইতে পারে, ইহা কোনও দিন কল্পনাতেও আনিতে পারে নাই। সে উমার দেবরের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া জমী জায়গাগুলার বন্দোবস্তের কথা তুলিতেই উমার দেবর তাহাকে একখানা বিক্রয়কোবালা দেখাইয়া দিল। রসিক দেখিল, তাহাতে উমা আপনার অংশের সমস্ত সম্পত্তি ছয় শত টাকায় দেবরকে বিক্রয় করিয়াছে। দলীলে ব্রজনাথ বকলমে উমার নাম স্বাক্ষর করিয়াছে। তাহার নীচে উমা বুড়া আঙ্গুলের ছাপ দিয়া দলিল রেজিষ্টারী করিয়া দিয়াছে। দেখিয়া রসিকের ক্রোধ ও ক্ষোভের সীমা রহিল না। এতক্ষণে সে দাদার বিবাহের টাকা যোগাড়ের গুপ্ত রহস্য হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল।


(৫)

 গাত্রহরিদ্রার পূর্ব্বদিনে সন্ধ্যার আগে ছোট বৌ বরণডালা সাজাইতেছিল; উমা পাশে বসিয়া কাল কখন কি করিতে হইবে, ছোট বৌকে তাহার উপদেশ দিতেছিল। ব্রজনাথ নিজের ঘরের দাবার উপর বসিয়া তামাক টানিতে টানিতে উমাকে ডাকিয়া বলিল,―‘আর কি কি চাই, এই সময়ে বল্ উমি; এর পর কাজের সময় এটা চাই, ওটা নিয়ে এস, ব’লে যেন জ্বালাতন করিস্‌নে।’

 উমা সহাস্যে বলিল,―‘কও কথা, দাদা এর মধ্যেই জ্বালাতনের ভয়? এই তো কলির সন্ধ্যা। এর পর বৌ এসে যে দিনরাত জ্বালাতন কর্‌বে। কি বল বৌদি?’

 ছোট বৌ ভ্রূভঙ্গী করিয়া নিম্নস্বরে বলিল, ‘দূর!’

 ব্রজনাথ ঈষৎ হাসিয়া বলিল,—‘সে জ্বালাতন শুধু আমি একা হব না উমি, তোরা দুজনেও তার ভাগ পাবি।’

 উমা হাঁসিয়া উঠিল। ছোট বৌ মৃদুস্বরে বলিল,—‘মেয়ের গায়ে হলুদের কাপড়টা কিন্তু ভাল হ’ল না।’

 উমা ডাকিয়া বলিল,—‘শুন্‌ছো দাদা?’

 ব্রজনাথ বলিল,—‘ওগো! বুড়ো বরের কনে, তার কাপড়ের ভাল মন্দ নাই।’

 উমা হাসিতে হাসিতে বলিল,—‘তুমি বুড়ো ব’লে কনে তো বুড়ী নয়?’

 ব্রজনাথ একটু হাসিয়া হুঁকায় ঘন-ঘন টান দিতে লাগিল। হঠাৎ একবার মুখের কাছ হইতে হুঁকাটা সরাইয়া বলিল,—‘এ ছোঁড়া গেল কোথায়? কাল গায়ে হলুদ, আজ পর্য্যন্ত দেখা নাই। নিজের বিয়ের বাজার আপনাকে কর্‌তে হবে জানলে উমি, কখনও তোর কথা শুন্‌তাম না। ছি ছি, লোকে বল্‌বে কি?’

 উমা বলিল,—‘বলবে কেন, বলছে।’

 “কি বল্‌ছে?’

 “নিন্দে। পাড়ায় কান পাতা দায়।’

 ‘তোর মাথা!’ বলিয়া ব্রজনাথ হাসিয়া উঠিল। তাহার হাসির বেগ না থামিতেই রসিক ধীরে ধীরে বাড়ী ঢুকিল। ব্রজনাথ ব্যস্তভাবে বলিয়া উঠিল,—‘এই যে, কোথায় ছিলি রে? আমাকে গাছে তুলে দিয়ে বুঝি সরে দাঁড়িয়েছিলি?’

 গম্ভীর ভাবে ‘হুঁ’ বলিয়া রসিক ধীর গম্ভীরপদে নিজের ঘরে ঢুকিল। মুখ হাত ধুইয়া ঠাণ্ডা হইয়া রসিক নিজের ঘরের দাবায় বসিল। ব্রজনাথ লণ্ঠন জ্বালিয়া গাত্রহরিদ্রার পান সুপারি আনিবার জন্য বাহির হইতেছিল; এমন সময় রসিক ডাকিল,―‘দাদা!’

 লণ্ঠনটা উঠানে রাখিয়া ব্রজনাথ উত্তর দিল,—‘কি রে রসিক?’

 রসিক বলিল,—‘সত্যি কথা বল্‌বে?’

 ব্রজনাথ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া বলিল,—‘সত্যি কথা? মিছে কথাই বা বল্‌বো কিসের তরে?’

 তীব্রকণ্ঠে রসিক বলিয়া উঠিল,―‘আর তোমার সাধুতা জানাতে হবে না। বিয়ের টাকাটা কোথা থেকে যোগাড় হলো শুনি?’

 বিস্ময়ের সহিত ব্রজনাথ বলিল,—‘কেন বল্‌ তো?’

 রসিক বলিল,—‘কেন কি? বলে ফেল না।’

 সহাস্যে ব্রজনাথ বলিল,—‘চুরি করেছি।’

 গর্জ্জন করিয়া রসিক বলিল,—‘চুরি নয়, জুয়াচুরি করেছ।’

 ব্রজনাথ বিস্ময়ে নীরব। ছোট বৌ রন্ধনশালার দরজা দিয়া মুখ বাড়াইল। উমা দাবার খুঁটীটা ধরিয়া স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। রসিক বলিল,—‘একটা অবীরা বিধবার সর্ব্বনাশ ক’রে বুড়ো বয়সে বিয়ে কর্‌তে লজ্জা করে না?’

 ব্রজনাথ সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া ধীর-প্রশান্ত কণ্ঠে-বলিল,―‘তুই কি বল্‌ছিস্ রসিক?’

 রসিক বলিল,—‘উমার জমীজায়গা কত টাকায় বেচে এসেছ?’

 বিস্ময়রুদ্ধকণ্ঠে ব্রজনাথ বলিল,―‘কত টাকায়?’

 রসিক চীৎকার করিয়া বলিল,—‘হাঁ, ছ’শো টাকা নিয়ে ওর দেবরকে বিক্রীকোবালা লিখে দিয়ে এসেছ। আর সেই টাকাগুলা এতদিন গাপ করে রেখে, এখন বিয়ে করতে যাচ্ছ। কেমন, ঠিক কি না?’

 ব্রজনাথ এমনই জোরে হো হো শব্দে হাসিয়া উঠিল যে, তাহাতে রসিকও চমকিত না হইয়া থাকিতে পারিল না। খুব খানিকটা হাসিয়া লইয়া সে হাস্য প্রফুল্লকণ্ঠে বলিল,—‘আচ্ছা চুরি তুই ধরেছিস্ রসিক। ওরে মুখ্যু, গোপাল রায় যখন কাঁদ্‌তে কাঁদ্‌তে বললে,—‘এই ক’ বিঘে জমীই পুঁজি দাদা, এই নিয়ে যদি তোমরা হাঙ্গামা বাধাও, তা হ’লে ছেলেপিলে নিয়ে আমি মারা যাব।” তখন আমিও ভেবে দেখলাম, কথাটা ঠিক। কিন্তু মানুষের মন নয় মতিভ্রম। তাই উমিকে দিয়ে একেবারে সাফ বিক্রী কোবালা লিখে দিয়ে এলাম। ব্যস্, হাঙ্গামার মূলোচ্ছেদ। বুঝলি?’

 রসিক কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে থাকিয়া শ্লেষ পূর্ণস্বরে বলিল,—‘চমৎকার গল্প বলেছ দাদা; কিন্তু আমিও পাটোয়ারীতে ঘুরি। এখন যদি ভাল চাও, টাকাগুলি বের করে দাও।’

 ব্রজনাথ জোর গলায় বলিল, ‘যদি না দিই?’

 রসিক বলিল, ‘মগের মুল্লুক নাকি? কালই দশ জন ভদ্রলোক ডেকে এর বিচার করবো। আমি রসিক সরকার, সহজে-ছাড়বো, মনে করো না।’

 ব্রজনাথ কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। তারপর ধীরগম্ভীর কণ্ঠে বলিল, “ভদ্রলোক ডাকিয়ে আমাকে অপমান করাবি?”

 রসিক মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘নিশ্চয়।’

 কিন্তু উমির টাকায় তোর কি অধিকার?

 ‘সম্পূর্ণ অধিকার। কেন না, সে আমার বোন।’

 ব্রজনাথের হৃদয় ভেদ করিয়া একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস বাহির হইল।

 রসিক বলিল, ‘যদি ভাল চাও, অন্ততঃ অর্দ্ধেক টাকা আমায় দাও।’

 ব্রজনাথ লণ্ঠনটা তুলিয়া লইয়া নিজের ঘরে ঢুকিল, এবং অবিলম্বে বাহির হইয়া আসিয়া রসিকের সম্মুখে তিন শত টাকা রাখিয়া দিল। উমা চীৎকার করিয়া বলিল, ‘কর কি দাদা, কাল যে গায়ে হলুদ।’

 ব্রজনাথের ওষ্ঠপ্রান্তে একটু ম্লান হাসি ফুটিয়া উঠিল। উমা ছুটিয়া আসিয়া নোটের তাড়াগুলা তুলিয়া লইতে উদ্যত হইল, কিন্তু তাহার পূর্ব্বেই রসিক সেগুলাকে হস্তগত করিল। উমা চীৎকার করিয়া বলিল, ‘নিমকহারাম, দাদা যে নিজের বিয়ের টাকায় তোমার বিয়ে দিয়েছে! তোমার এই অন্যায় কি ধর্ম্মে সইবে?’

 ব্রজনাথ তাহাকে ধমক দিয়া বলিল, ‘ছি উমি, আমার সামনে ওকে শাপসম্পাৎ দিস্ নে।”

 সহাস্যে ব্রজনাথ বলিল, ‘আর বিয়ে নয় উমি, বিয়ে না হ’তেই যে রসিক পর হ’তে যাচ্ছিল, বিয়ে হলে সে কি হ’তো বল দেখি।

 ছোট বৌ অগ্রসর হইয়া নিম্নস্বরে বলিল, ‘সে যা হয় হবে, কিন্তু তুমি বল ঠাকুরঝি, ঐ টাকা ক’টার তরে বিয়ে আটকাবে না!

 বলিয়া সে আপনার গায়ের গহনাগুলা খুলিয়া ব্রজনাথের পদপ্রান্তে স্থাপন করিল। ব্রজনাথ সবিস্ময়ে বলিল, ‘এ সব কি হবে ছোট বৌমা?’

 মৃদুস্বরে ছোট বৌ বলিল, ‘আপনার বিয়ে?’

 ব্রজনাথ আবার হাসিয়া উঠিল। হাসিতে হাসিতে বলিল, ‘তবে আজ আর একবার বলি বৌমা, এগুলা কি তোমার বাবার যে, যাকে তাকে দান করতে বসেছ? আমার বিয়ে আটক করে কে?’

 বলিয়া সে আস্তে আস্তে গিয়া রসিকের হাতটা ধরিল, এবং তাহার হাত হইতে নোটের তাড়া কাড়িয়া লইয়া হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। রসিক হতবুদ্ধির ন্যায় বসিয়া রহিল।