বিষয়বস্তুতে চলুন

ভবঘুরে/মাণ্‌কের মা

উইকিসংকলন থেকে

মাণ্‌কের মা

(১)

 প্রথমা স্ত্রী চমৎকারী বিদ্যমানে গোরাচাঁদ খোড়ুই কুটুম্বিতা করিতে গিয়া যখন সপ্তদশবর্ষীয়া থাকমণিকে সঙ্গে করিয়া ঘরে আনিল, তখন চমৎকারী স্বামীকে কতকগুলা গালাগালি দিয়া এবং নিজ অদৃষ্ট-দেবতাকে বিস্তর অভিসম্পাত করিয়া স্বামীর সহিত হাঁড়ী পৃথক করিয়া লইল। গোরাচাঁদ উপায়ক্ষম হইলেও চমৎকারী কোনও দিনই তাহার উপার্জ্জনের উপর নির্ভর করিত না; নিজে মাছ ধরিয়া, মাছ বেচিয়া যাহা আনিত, তাহাতেই নিজের ও স্বামীর পেটের ভাত চালাইয়া দিত। আর গোরাচাঁদ যাহা উপার্জ্জন করিত, তাহার অধিকাংশই তাড়ীর আড্ডায়, মদের দোকানে দিয়া আসিত। ক্বচিৎ বা স্ত্রীর জন্য একখানা কল্কাপেড়ে শাড়ী কিনিয়া আনিয়া চমিকে যে আন্তরিক ভালবাসে, ইহাই সপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিত। স্বামীর ভালবাসার উপর চমির কিন্তু কোন সন্দেহই ছিল না, এবং সে ভালবাসার কোনখানে কোনও একটু শিথিলতা থাকিলেও তাহাকে প্রগাঢ়ভাবে পাইবার জন্যও তাহার তেমন বিশেষ আগ্রহ দেখা যাইত না। সুতরাং গোরাচাঁদের চেষ্টা যে সফল হইত, এমন বলা যায় না।

 তবে গত শীতের সময় গোরাচাঁদ যখন এক বছরের ছেলে মাণিকের জন্য একটা ছিটের জামা কিনিয়া আনিয়াছিল, তখন চমৎকারী সেই সাত আনা দামের ছিটের জামাটার মধ্যে কতটা গর্ব্ব নিহিত আছে, প্রতিবেশিনীদিগের নিকট কয়েকদিন ধরিয়া তাহাই খ্যাপন করিয়া বেড়াইয়াছিল, এবং সেদিন সে যে দুইটা বড় গল‍্দা চিংড়ী পাইয়াছিল, রমণ ঘোষ তাহার দর তিন আনা হাঁকিলেও পয়সার লোভ সংবরণ করিয়া তাহার ঝোল রাঁধিয়া গোরাচাঁদকে খাওয়াইয়া দিয়াছিল। গোরাচাঁদ ভাতের পরিবর্ত্তে এক ভাড় তাড়ীর সঙ্গে চিংড়ী দুইটার সদ্ব্যবহার করিলেও চমৎকারী তাহাতে কিছুমাত্র আপত্তি করে নাই।

 কিন্তু কুটুম্বিতায় গিয়া গোরাচাঁদ যখন নূতন সঙ্গিনী লইয়া আসিল, তখন স্বামীর এই ব্যবহারটা তাহার হস্তের মুদ্গরের আঘাত অপেক্ষা কঠোর বলিয়া চমির বোধ হইল। সে পর দিনই রান্নাচালার অপর পার্শ্বে একটা উনান কাটিয়া পৃথক হাঁড়ীতে রাঁধিয়া লইল।

 গোরা বলিল,—‘যখন হাঁড়ী আলাদা করেছিস্, তখন আমার কাছে তোর এক পয়সারও পিত্যেশ আর নাই, তা ব’লে রাখছি।

 মুখভঙ্গী করিয়া হাত দুইটা নাড়িয়া চমি বলিল, আরে আমার পিত্যেশ রে! তোর পিত্যেশ আমি করি?’

 গোরা ক্রোধ গম্ভীর-স্বরে বলিল, ‘এই কথা তো?’

 গর্জ্জন করিয়া চমি বলিল, ‘হাঁ, এই কথা। আমি এক বাপের বেটী আমার কাছে দোতা কথা নাই।’

 প্রতিবেশিনীরা তিরস্কার করিয়া বলিল, ‘হাঁ লা মাণ‍্কের মা, তুই তো বড্ড হাবা মেয়ে। ও আপদটাকে ঝাঁটা মেরে না তাড়িয়ে নিজেই আলাদা হ’লি?’

 উপেক্ষাসূচক মুখভঙ্গী করিয়া চমি উত্তর করিল, ‘চুলোয় যাক্ মা, ও মুখপোড়া মিন‍্সে ক্ষেপেছে ব’লে আমিও কি ওর সাথে পাগল হ’তে যাব?’

 প্রতিবেশিনী সহানুভূতির স্বরে বলিল, ‘সত্যি বাছা, গোরারই বা আক্কেলখানা কি? বুড়ো বয়সে ধেড়ে রোগ!’

 ‘মরণ-ছটফটানি মা ছটফটানি’ বলিয়া চমি দ্রুতপদে সেস্থান ত্যাগ করিল।


( ২ )

 ‘থাকি!’

 গম্ভীরস্বরে থাক উত্তর দিল, ‘কেনে?’

 চমি জিজ্ঞাসা করিল, ‘আজ তোদের হরিবাসর না কি?’

 থাক কোনও উত্তর না দিয়া নীরবে আপনার পরিহিত বস্ত্রের অপর প্রান্তটা শেলাই করিতে লাগিল। চমি একটু অপেক্ষা করিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, ‘আজ তোদের রান্না চড়বে না?’

 থাক বলিল, ‘এক মুঠো পান্তা ছিল, আমানি দিয়ে তাই খেয়েছি।’

 সহাস্যে চমি বলিল, ‘তুই পান্তা খেয়ে ঠাণ্ডা হয়েছিস, আর মিন্‌সে এসে বুঝি তোর পেটে হাত বুলুবে?’

 ঝঙ্কারের সুরে থাক বলিল, ‘পেটে হাত বুলুবে কি মাথায় হাত বুলুবে―সেই জানে। চাল না থাকলে কি রাঁধবো ছাই?’

 ঈষৎ হাসিয়া চমি বলিল, ‘রেঁধে দিতে পারলে মিনসে নতূন গিন্নির হাতের একটা নতুন জিনিষ খেতে পায় বটে। কিন্তু দিতে পারিবি কি?’  থাক নাসা কুঞ্চিত করিয়া নিরুত্তরে বসিয়া রহিল। চমি বলিল, ‘তা চাল নাই তো মিন্‌সেকে বলিসনি কেন?’

 থাক মুখখানা বিকৃত করিয়া বলিল, ‘কে রাতদিন বলতে যাবে? কাল সাঁজের বেলায় বল্লুম, তা রা করলে না।’

 চমি হাসিয়া উঠিল; বলিল, ‘তবেই তুই ফলনা ঘোড়ুয়ের ভাত খেয়েছিস্!’

 থাক ভ্রূ কুঞ্চিত করিল। চমি ভাতের হাঁড়ী হইতে কয়েকটা ভাত তুলিয়া লইয়া টিপিতে টিপিতে বলিল,—‘তা কারো ঘর থেকে আধ সের চাল ধার ক’রে আনলেও তো পারিস্।’

 ঝঙ্কার দিয়া তীব্রকণ্ঠে থাক বলিল,—‘কোথায় ধার কত্তে যাব? কে ধার দেবে?’

 চমি বলিল,—‘ধার নিবি, শোধ করবি, তা ধার দেবে না কেন?’

 আমার অমন বাপ চৌদ্দপুরুষে পরের দোরে চাল ধার ক’রে বেড়ায় না।

 বলিয়া থাক সপত্নীর দিকে একটা তীব্র কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল।

 চমি আর কিছু বলিল না। ভাতের হাঁড়ী উনান হইতে নামাইয়া ফেন ঝাড়িল, এবং মাছ রাঁধিয়া ছেলেকে ভাত খাওয়াইতে বসিল। থাক কাপড় সেলাই শেষ করিয়া ঘরে গিয়া শুইয়া পড়িল।

 ছেলেকে খাওয়াইয়া, ভাতের হাঁড়ীতে চাপা দিয়া, চমি জাল লইয়া তাহার ছিন্ন অংশের সংস্কারে প্রবৃত্ত হইল, এবং মাঝে মাঝে মুখ ফিরাইয়া উঠানের জাম গাছের ছায়াটা উত্তর দিক হইতে কতটা পূর্ব্ব দিকে সরিয়া গিয়াছে, তাহাই লক্ষ্য করিতে লাগিল।

 গামছা পরিয়া ভিজা কাপড়খানা গায়ে জড়াইয়া শুকাইতে শুকাইতে গোরা আসিয়া উঠানে দাঁড়াইল, এবং ঘরের ভিতর দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া ডাকিল,―‘থাক!’

 দুই তিন ডাকের পর থাক উত্তর দিল,—‘কি?’

 গোরা একটু উষ্ণস্বরে বলিল,—‘এমন সময় শুয়ে? ভাত দিতে হবে না?’

 থাক উঠিয়া বসিয়া উত্তর দিল,—‘ভাত কোথা?’

 গোরা বলিল,—‘ভাত নাই তো কি আছে? চিঁড়ে দই?’

 ক্রোধ-গম্ভীর স্বরে থাক বলিল, ‘না, আমার মাথা।’

 চমি গভীর মনোযোগের সহিত জাল সংস্কার করা করিতে লাগিল। গোরা ক্ষণকাল স্তব্ধভাবে থাকিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল,—‘তোমার মাথাটা তাড়ীর সঙ্গে হ’লে মন্দ হ’তো না। কিন্তু এখন ওটা তুলে রাখ।’

 থাক কোনও উত্তর দিল না। গোরা গামছা ছাড়িয়া কাপড় পরিতে পরিতে বলিল,―‘সত্যি, আজ রান্না হয় নি না কি?’

 থাক উত্তর করিল,―‘চাল কোথায় যে রাঁধবো?’

 ‘তবে খাব কি?’

 ‘আমার মাথা।’

 গোরা ঘরের ভিতর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিটা একবার নিক্ষেপ করিয়া, তামাক সাজিতে বসিল। তামাক সাজিতে সাজিতে চমিকে লক্ষ্য করিয়া গোরা বলিল,—‘সেরটাক চাল ধার দিতে পারিস্ মাণ‍্কের মা?’

 জাল হইতে মুখ না তুলিয়াই চমি বলিল,—‘আমার চাল বাড়ন্ত।’

 গোরার মুখখানা লাল হইয়া উঠিল; সে নীরবে বসিয়া কলিকায় ফুঁ দিতে লাগিল। চমি বলিল,—‘আমার হাঁড়ীতে ভাত আছে, খাবি?’

 ‘না।’

 ‘খেলে দোষ হবে নাকি?’

 ‘হাঁ।’

 ‘চাল ধার ক’রে খেলে দোষ হবে না, আর ভাত খেলে দোষ হবে?’

 ‘চাল ধার নেব, শোধ দেব; ভাত ধার নেওয়া যায় না,―শোধও দেওয়া যায় না।’

 ‘তা না হয় একদিন অমনই খেলি?’

 ‘উপোস দিয়ে শুকিয়ে মলেও নয়।’

 ‘তবে তাই মর!’ বলিয়া চমি সবেগে উঠিয়া দাঁড়াইল, এবং ভাত বাড়িয়া স্বামীর দিকে পিছন ফিরিয়া খাইতে বসিল। গোরা গম্ভীরভাবে বসিয়া তামাক টানিতে লাগিল।

 চমি খাইতে খাইতে এক একবার পশ্চাতে ফিরিয়া স্বামীর দিকে বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিল। গোরা হুঁকা রাখিয়া, গামছাখানা কাঁধে ফেলিয়া আস্তে আস্তে বাহির হইয়া গেল। চমি আর দুই এক গ্রাস মুখে তুলিয়াই মুখখানা বিকৃত করিল। তখনও অর্দ্ধেক ভাত পাতে পড়িয়া ছিল; সেগুলা দুই একবার নাড়িয়া চাড়িয়া পাথর শুদ্ধ তুলিয়া রাখিল, এবং হাত মুখ ধুইয়া ছেলেটাকে লইয়া দাবার এক পাশে শুইয়া পড়িল।


 দ্বিতীয় পক্ষকে লইয়া গোরাচাঁদ একটু মুস্কিলে পড়িয়াছিল। আগে চমিই সংসার চালাইত, আর সে নিজের উপার্জ্জনের পয়সা মদে তাড়ীতে উড়াইয়া আমোদে দিন কাটাইত। কিন্তু চমি হাঁড়ী পৃথক করিলে, তাহাকে সংসারের ভার লইতে হইল; সুতরাং আমোদের মাত্রাটা কমিয়া আসিল। ইহাতে গোরাচাঁদ ক্ষোভ ব্যতীত একটুও আনন্দ বোধ করিল না। সঙ্গীরা যখন তাড়ীর ভাঁড় বা মদের বোতল লইয়া স্ফুর্তির ফোয়ারা ছুটাইতে যাইত, তখন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গোরাচাঁদকে ক্ষুণ্ণ মনে সেখান হইতে চলিয়া আসিতে হইত। যেদিন প্রলোভনটা নিতান্ত অসংবরণীয় হইয়া উঠিত, বা সঙ্গীদের সাদর আহ্বান ও অনুরোধ কিছুতেই এড়াইতে পারিত না, যেদিন তাহার লাঞ্ছনার সীমা থাকিত না। সেদিন ঘরে ফিরিয়া শুধু যে চাউলের অভাবে উপবাস দিতে হইত, তাহা নহে; সেই সঙ্গে থাকর তর্জ্জন গর্জ্জন ও তীব্র বাক্যবাণ তাহাকে নীরবেই সহ্য করিতে হইত। যেদিন একটু অসহিষ্ণু হইয়া পড়িত, সেদিন থাককে দুই এক ঘা দিয়া আপনার অবিমৃশ্যকারিতাজনিত ক্ষোভটাকে দূর করিবার চেষ্টা করিত। তাহাতে কিন্তু ব্যাপারটা এমনই বীভৎস হইয়া দাঁড়াইত যে, তজ্জন্য গোরাচাঁদ ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িতে হইত। থাকর কান্নার চীৎকারে পাড়ার মেয়ে পুরুষ আসিয়া জড় হইত। তাহাদের কেহ থাকর দোষ দিয়া, কেহ বা গোরাকে দোষী করিয়া, সেই ক্ষুদ্র কুটীরের মধ্যে যে একটা আদালতের বিচারের অভিনয় আরম্ভ করিত, তাহা গোরাচাঁদের পক্ষে নিতান্তই অসহনীয় হইয়া পড়িত।

 কিন্তু সব চেয়ে অসহ্য হইত চমির হাসিটা। এই বিচার-বিতর্কের কোলাহলের মধ্যে চমি যে এক পাশে দাঁড়াইয়া মিটিমিটি হাসিত, সেইটাই গোরার নিকট সর্ব্বাপেক্ষা অসহনীয় হইয়া পড়িত। সেই শব্দহীন হাসিটুকুর মধ্যে এমনই একটা তীব্র তিরস্কার ধ্বনিত হইতে থাকিত যে; তাহাতে গোরার মাথার শিরগুলা পর্য্যন্ত টন্ টন্ করিয়া উঠিত। তাহার ইচ্ছা হইত, সে নদীতে গিয়া ঝাঁপ দেয়, অথবা গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করে।

 তবে সকল দিনই চমি এই শ্লেষের হাসিটুকু হাসিয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারিত না। যেদিন গোরাচাঁদের নেশার ঝোঁকটা একটু বেশী থাকিত, এবং প্রহারের মাত্রাটা অধিক দূর অগ্রসর হইবার উপক্রম করিত, সেদিন চমি আগে হইতেই মাঝে পড়িয়া হয় স্বামীকে, নয় থাককে টানিয়া আনিয়া বিবাদের নিষ্পত্তি করিয়া দিত। ইহাতেও যে গোরা আঘাত পাইত না, এমন নয়। নেশার ঝোঁক কাটিয়া গেলে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিত, আর কোনও দিনই সে তাড়ীর আড্ডা বা মদের দোকানের ছায়া স্পর্শ করিবে না। কিন্তু প্রলোভনের নিকট প্রতিজ্ঞা চিরদিনই পরাভূত। সুতরাং গোরাকে সময়ে সময়ে প্রতিজ্ঞাভ্রষ্ট হইতে হইত।

 তাহার এই প্রতিজ্ঞা-বিচ্যুতির জন্য চমি কিন্তু স্বামীকে দোষী মনে করিত না। পুরুষ মানুষ এইরূপই অসংযত হইয়া থাকে, এবং তজ্জন্য মেয়ে মানুষকে ধীর-সংযত-ভাবে সংসারের ভার মাথায় লইতে হয়। কিন্তু থাক সে ভার লইতে সম্পূর্ণ নারাজ। এমন দুলদুলে গতর লইয়া বসিয়া খাইবে, উপবাস দিবে, মার খাইয়া পাড়ার লোক জড় করিবে, তথাপি জাতি-ব্যবসা করিবে না। সকাল হইতে বেলা এক প্রহর পর্য্যন্ত মাছ ধরিলে চারপাঁচ আনার মাছ হয়। তাহাতে দুইটা পেটের ভাতের যোগাড়টা হইয়া যায়। কিন্তু স্বামী এক পয়সার মাছ কিনিয়া আনিবে, তবু সে পাঁচটা মাছ ধরিয়া সংসারের সুসার করিবে না। এমন মেয়েমানুষের কপালে কি সুখ থাকে?

 চমি সপত্নীকে অনেক বুঝাইল, কিন্তু থাক কিছুতেই জাল ঘাড়ে করিতে স্বীকৃত হইল না। চমি তাহাকে এবং তাহার কপালকে গালাগালি দিয়া নিরস্ত হইল। শুধু তাহাই নয়, এমন লক্ষ্মীছাড়া মেয়েকে ঘরে আনার জন্য স্বামীর উপরেও হাড়ে হাড়ে রাগিয়া গেল। আগে সে মধ্যে মধ্যে গোপনে হাঁড়ীর ভাত বাড়িয়া দিয়া উভয়কে উপবাস হইতে রক্ষা করিত; ভাল মাছ পাইলে কতকটা দিয়া আসিত; কিন্তু এখন হইতে তাহাদের মুখের দিকে চাহিয়া দেখা পর্য্যন্ত বন্ধ করিয়া দিল, এবং সে কুটা ছিঁড়িয়া এই দুইটি লোকের সঙ্গে সর্ব্বপ্রকার সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া দিবে বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল।

 কিন্তু সেদিন গোঁরাচাদ অভুক্ত অবস্থায় বাহির হইয়া গেলে ক্ষুধা সত্ত্বেও পাতের ভাতগুলার উপর যখন অরুচি আসিয়া উপস্থিত হইল, তখন সে এই প্রতিজ্ঞাটা বজায় রাখিতে পারিবে কি না, সে সম্বন্ধে তাহার যেন একটা সন্দেহ জন্মিল।

 কিন্তু ছিঃ, যে উপবাসটাকে স্বচ্ছন্দে স্বীকার করিয়া লইল, অথচ তাহার হাঁড়ীর ভাত খাইতে অস্বীকার করিল, উপবাস দিয়া শুকাইয়া মরিলেও তাহার ভাত খাইবে না বলিয়া মুখের উপর চোটপাট জবাব দিয়া গেল, তাহার জন্য আবার মমতা কি? হইলই বা সে স্বামী। স্বামী হইয়া সে কোন্‌দিন নিজের কর্ত্তব্য পালন করিয়াছে? স্ত্রীকে প্রতিপালিত করা দূরের কথা, স্ত্রীই বরং তাহাকে এতদিন প্রতিপালিত করিয়া আসিয়াছে। ইহার প্রতিদানে সে এই একটা লক্ষ্মীছাড়া মাগীকে আনিয়া তাহার বুকে যেন বাঁশ পুঁতিয়া দিল। আজ সাত বৎসর বিবাহ হইয়াছে; এই সাত বৎসর কাল চমি শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, সুখ অসুখ সকল তুচ্ছ করিয়া যাহাকে খাওয়াইয়া আসিল, সেই লোকটাই আজ নিতান্ত অকৃতজ্ঞের ন্যায় তাহার অন্নকে প্রত্যাখ্যান করিয়া তাহাকে রীতিমত অপমান করিয়া গেল! এই লোকটার জন্যই আবার মনের এত চাঞ্চল্য! চমি মনকে চোখ রাঙ্গাইয়া বলিল,—“খবরদার!”

 সন্ধ্যা হইলে চমি ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়া ছেলেকে ঘুম পাড়াইল। তারপর ছেলেকে ঘুম পাড়াইয়া দুপুর বেলার পাতের ভাতগুলা খাইয়া শয়নের উদ্যোগ করিল। শুইবার আগে একবার থাকর ঘরের দিকে চাহিয়া ডাকিল,―‘থাকি ঘুমিয়েছিস্ না কি?’

 অন্ধকার ঘরের ভিতর হইতে থাক উত্তর দিল,—‘না।’

 চমি বলিল,—‘এখনো ফিরলো না। রাত তো দু’ঘড়ি হলো, গেল কোথায়?’

 যেন গভীর উপেক্ষার স্বরে থাক উত্তর দিল, ‘কে জানে।’

 নিজের ঘরের বাঁশের আগড় ভেজাইয়া দিয়া চমি শুইয়া পড়িল। শুইল বটে, কিন্তু চোখে ঘুম আসিল না। লোকটার সন্ধ্যার সময়েই ফিরিবার কথা, অথচ এত রাত্রি পর্য্যন্ত কেন ফিরিল না, এই চিন্তাটাকে চাপা দিবার চেষ্টা করিল, এবং তজ্জন্য কাল বামুন-পুকুরে মাছ ধরিবে, বা জোমড়ার খালে যাইবে তাহারই মীমাংসায় প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু স্বল্পকালমধ্যেই যখন সে মীমাংসা হইয়া গেল, অথচ তখনও চোখে ঘুম আসিল না, তখন সে আর একটা নূতন চিন্তা জুটাইয়া লইল।

 তাহার মাণিক—এই দেড় বছরের ছেলেটুকু কতদিনে বড় হইবে? বড় হইয়া সে যখন মাছ ধরিতে শিখিবে, তখন চমি আর জাল ঘাড়ে করিয়া ঘুরিতে যাইবে না। বড় জোর সে বাজারে গিয়া মাছগুলা বেচিয়া আসিবে। পয়সা যাহা পাইবে, সব খরচ করিবে না। কিছু কিছু জমাইয়া চার গণ্ডা সাড়ে চার গণ্ডা টাকা হইলেই একটি বৌ ঘরে আনিবে। তারপর মাণিকের আবার ছেলে হইবে। এত আশাও মানুষে করে? কিন্তু আশা লইয়াই সংসার। তখন, আজ যেমন মাণিক পাশে শুইয়া আছে, এমনই করিয়া নাতিটিকে পাশে রাখিয়া ঘুম পাড়াইবে। আর ঐ হতচ্ছাড়া মিন্‌সে ফ্যাল্ ফ্যাল্ করিয়া তাকাইতে থাকিবে। সে কিন্তু কিছুতেই নাতিটিকে ঐ মিন্‌সের কাছে যাইতে দিবে না। সে থাকিকে লইয়া আসিয়াছে, তাহাকে লইয়াই থাকিবে।


(৪)

 ‘থাক!’

 চমি কাণ খাড়া করিল। থাক কি উত্তর দিল, শুনা গেল না। গোরাচাঁদ বলিল—‘পয়সা যোগাড় করে চাল নিয়ে আসতে রাত হ’য়ে গেল। এখন উঠে ভাত চাপিয়ে দাও।’

 থাক উত্তর দিল,—‘এই রাত দুপুরে আমি রাঁধতে পারবো না।’

 গোরাচাঁদ বলিল,—‘না রাঁধলে খাব কি?’

 থাক বলিল,—‘তা আমি জানি না।’

 গোরাচাঁদ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া গম্ভীরস্বরে বলিল,—কিন্তু, মাণ্‌কের মা নিশুতি রাতে উঠে আমাকে রেঁধে দিয়েছে।’

 চড়া গলায় থাক বলিল,―‘তবে মাণ্‌কের মার কাছেই যাও না, দেখি—কেমন রেঁধে দেয়।’

 ‘আচ্ছা’ বলিয়া গোরাচাঁদ চমির ঘরের দরজায় আসিয়া ডাকিল,—‘মাণ্‌কের মা!’

 চমি চোখ দুইটা জোরে টিপিয়া পড়িয়া রহিল। গোরাচাঁদ আগড়ে ধাক্কা দিতে দিতে ডাকিল,—‘মাণ্‌কের মা, ও মাণ্‌কের মা!’

 চমি উত্তর দিল না, পাছে শব্দ হয় বলিয়া নিঃশ্বাসটি পর্য্যন্ত ফেলিল না। গোরাচাঁদ আর দুই একবার ডাকিয়া, ‘দূর হোক’ বলিয়া চাউলের পুঁটুলিটা নিজের ঘরের দাবায় ধপ্ করিয়া ফেলিয়া দিল। চমির ইচ্ছা হইল, উঠিয়া রাঁধিয়া দেয়। কিন্তু তখনি মনে হইল, কেন সে রাঁধিতে যাইবে? সুয়ো রাণী দিক্ না। মিন্‌সের যে বড় তেজ। চোখ টিপিয়া ভাবিতে ভাবিতে চমি ঘুমাইয়া পড়িল।

 পরদিন সকালে চমি থাককে জিজ্ঞাসা করিল, ‘হাঁলা থাকি, কাল কখন ফিরলো?’

 থাক বলিল,—‘অনেক রাতে।’

 চমি বলিল,—‘সেই রাতে তোকে আবার রাঁধতে হ’লো?’

 মুখটা ভারি করিয়া থাক উত্তর করিল,—‘বোয়ে গেছে আমার রাঁধতে।’

 চমি। খেলে কি?

 থাক। কি আবার খাবে? হরিমটর।

 চমি। দুজ’নে ভাগ ক’রে খেয়েছিলি বোধ হয়?

 চমি একটু শ্লেষের হাসি হাসিল। থাক উত্তর না দিয়া গম্ভীরভাবে রহিল। চমি একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,—‘কেন, উঠে এক মুঠো রেঁধে দিতে পারলি নে?’

 মুখখানা বিকৃত করিয়া থাক উত্তর দিল—‘না।’

 তীব্র ভ্রূভঙ্গী করিয়া চমি বলিল,—‘ধন্যি মেয়ে তুই যা হোক। মানুষটা সারাদিন রাত না খেয়ে রইলো, আর তুই এক মুঠো রেঁধে দিতে পার্‌লি না?’

 ঠোঁটটাকে উল্টাইয়া তীব্রকণ্ঠে থাক বলিল,—‘এত দরদ তো তুমি উঠে রেঁধে দিলে না কেন? তোমার দরজায় গিয়ে তো মাথা কুটলে, একটা সাড়া পর্য্যন্ত দিলে না। এমন আল্‌গা দরদ সবাই দেখাতে পারে।’

 বলিয়া সে চমির মুখের কাছে আপনার হাত দুইটা নাড়িয়া দিল। চমিও উত্তরে চড়া সুরে কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু বলা হইল না। গোরা মুখহাত ধুইয়া উপস্থিত হইল, এবং থাককে সম্বোধন করিয়া বলিল,—‘আজ আর খাট্‌তে যাব না। সকাল সকাল রান্না চাপিয়ে দাও, আমি ছিপটা নিয়ে দেখি, দু’টো মাছ যদি পাই।’

 এই নির্লজ্জ পুরুষটার দিকে একটা তীব্র কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া চমি সরিয়া আসিল, এবং জালখানা ঘাড়ে লইয়া দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।

 সেইদিন চমি বুঝিল, স্বামী একেবারে গোল্লায় গিয়াছে। ঐ হতচ্ছাড়া মাগীটা নিশ্চয়ই উহাকে গুণ করিয়াছে; সেই গুণের প্রভাবে উহার আর মাথা তুলিবার সাধ্য নাই। সুতরাং স্বামীকে এখন আর কোনও কথা বলা বৃথা। চমি সেইদিন হইতে স্বামীর চিন্তা পরিহার করিবার সঙ্কল্প করিল, এবং মনকে অনেক বুঝাইয়া সেইরূপে চলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।


(৫)

 বাজারে যাইতে যাইতে প্রতিবেশী জগার মা বলিল,—‘ওলো চমি, আর শুনেছিস্, আমার বোন-জামায়ের ভাই রঘোকে দেখেছিস্ তো?’

 চমি কৌতূহলান্বিত হইয়া বলিল,—‘দেখেছি বৈ কি খুড়ী, সে যে কতবার তোমাদের ঘরে এসেছিল। তার কি হ’য়েছে?’

 জগার মা বলিল,—‘হতভাগা একটা বৌ থাকতে আর একটা বিয়ে করেছিল। এই তোরি মত আর কি!’

 চমি সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল,—‘তারপর?’

 জগার মা বলিল, ‘তার ঐ আগেকার বৌটা সোয়ামীকে বশ করবার তরে গুণ করেছিল। কি শেকড় মাকড় না গুঁড়ো খাইয়ে দিয়েছিল, তাতে ছোঁড়া একেবারে পাগল হ’য়ে গিয়েছে।’

 চমি শিহরিয়া উঠিল, শঙ্কিতভাবে জিজ্ঞাসা করিল,—‘বল কি খুড়ী?’

 জগার মা বলিল,—‘আর বাছা, শেকড় মাকড়ের কি গুণ, তা কি বলা যায়? কোনও শেকড়ে মানুষ মরে কোনও শেকড়ে বাঁচে।

 চমির মাথার চুলগুলা পর্য্যন্ত যেন ভয়ে খাড়া হইয়া উঠিল। থাকিও যদি এইরূপ কোনও শিকড় খাওয়াইয়া থাকে? যদি কেন, নিশ্চয় খাওয়াইয়াছে। নতুবা তেমন রাগী পুরুষটা কি এমন ভেড়া বনিয়া যায়? রূপ যৌবন? কিসের রূপ যৌবন! তাহারও ত এক সময়ে রূপ যৌবন ছিল; আর তাহা থাকির অপেক্ষা কোনও অংশেই ন্যূন ছিল না, বরং অনেকটা বেশীই ছিল। কিন্তু কৈ, তাহার মোহে স্বামী তো এমন ভেড়া বনে নাই; পান হইতে চূণটি খসিলেই অনর্থ বাধাইয়া দিত। কিন্তু এখন? নিশ্চয়ই কিছু খাওয়াইয়াছে। কিন্তু তাহার ফলে শেষে যদি পাগল হয়? বুঝি তাহার লক্ষণও একটু একটু দেখা দিয়াছে। এখন প্রায়ই একা চুপ করিয়া বসিয়া ভাবে। এমন চুপ করিয়া তো কখনও থাকিত না। তবে কি সত্যই পাগল হইয়া যাইবে?

 কথাটা ভাবিতেও চমির নিঃশ্বাসরোধ হইয়া আসিতে লাগিল। এদিকে জগার মা ‘গুণ’ সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ ও শ্রুত নানাপ্রকার মন্তব্য প্রকাশ করিতেছিল, কিন্তু সে সকল কথা চমির কাণে ঢুকিতেছিল না; সে শুধু স্বামীর পরিণামচিন্তায় ব্যাকুল হইয়া স্তব্ধভাবে পথ অতিবাহন করিতেছিল।

 যাইতে যাইতে হঠাৎ সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল,—‘আচ্ছা খুড়ী, এর কি কাটান নাই?’

 ‘কিসের কাটান?’

 ‘এই গুণ করার?’

 ‘কাটান থাকবে না কেন? তবে সবাই কি জানে?’

 ‘কে জানে?’

 ‘রঞ্জপুরের চৈতন মালিক একজন মস্ত গুণীন্। সে নাকি সব রকম তুক্‌ তাক্ জানে।’

 চমি ভাবিতে ভাবিতে নিঃশব্দে চলিতে লাগিল। জগার মা তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল,—‘দেখ্ চমি, কিছু মনে করিস না, আমার কিন্তু সন্দ হয়।’

 রুদ্ধশ্বাসে চমি জিজ্ঞাসা করিল,—‘কি সন্দ হয় খুড়ী?’

 জগার মা বলিল,—‘থাকি ছুঁড়ী নিজ্জস্ গোরাকে “গুণ” করেছে। এ যদি না হয়, তবে আমি রূপো জেলের মেয়েই নই।’

 একটা জোর নিঃশ্বাস ফেলিয়া চমি বলিল,—‘আমারও তাই সন্দ হয় খুড়ী।’

 জগার মা বলিল,—‘তুই এক কাজ কর্ বাছা, একবার রঞ্জপুর যা। ভারী গুণীণ। কিছু করেছে কি না, সে গুণে ব’লে দিতে পারবে। আর যদি কিছু ক’রেই থাকে, তারও কাটান দিতে পারবে।’

 চমি জিজ্ঞাসা করিল,—‘কি নেবে?’

 জগার মা বলিল,—‘বেশী কিছু নয়, পাঁচটা সুপারী, আর সপাঁচ আনা পয়সা। তারপর ফল হ’লে খুসী হ’য়ে যা দিস্।’

 ‘আচ্ছা দেখি’ বলিয়া চমি দ্রুতপদে অগ্রসর হইল।

 সেইদিন বাজার হইতে ফিরিয়া অবধি চমি স্বামীর উপর তীব্র লক্ষ্য রাখিল, এবং তাহার প্রত্যেক কাজের মধ্যেই যেন একটা পাগলামীর আভাস দেখিতে পাইল। একবার গোরা হুঁকা হাতে চুপ করিয়া বসিয়া কি ভাবিতেছিল। চমি আস্তে আস্তে কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—‘কি ভাবছিস্ মাণ্‌কের বাপ?’

 গোরা মুখ তুলিয়া বলিল,—‘ভাবছি, তোর মাথাটা কবে খাব?’

 চমি বলিল,―‘আমার মাথা তো অনেক দিনই খেয়েছিস্।’

 ঘাড় নাড়িয়া গোরা বলিল,—‘উঁহু, সে আমি নিজের মাথা খেয়েছি। একদিন তোর মাথার ঝোল রেঁধে আমাকে খাওয়াবি চমি?’

 বলিয়া গোরা হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। তাহার সেই অর্থহীন হাসি দেখিয়া চমি ভয়ে কাঁপিয়া উঠিল। সর্ব্বনাশ! এ যে পাগল হইয়া পড়িয়াছে! চমির বুকটা গুড়্-গুড়্ করিতে লাগিল।

চারদিন চমি মাছ ধরিতে গেল না। সওয়া পাঁচ আনার পয়সা লইয়া ছেলেটাকে কোলে করিয়া রঞ্জপুর যাত্রা করিল। লোকের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলিল,—‘ছেলেটার তরে দিগড়ের পঞ্চানন্দের ফুল আনতে যাচ্ছি।’


(৬)

 জগার মা জিজ্ঞাসা করিল,―‘কি হ’লো চমি?’

 চমি বলিল,—‘যা বলেছ খুড়ী, মস্ত গুণীন। গুণে হু-বহু সব ব’লে দিলে। পানের সঙ্গে গুঁড়ো খাইয়েছে। তাই তো বলি, মিন সে এত করে কেন?’

 সগর্ব্বে শিরঃসঞ্চালন করিয়া জগার মা বলিল,—‘এই দেখ্, আমি তো ব’লেছি, ঐ ছুঁড়ীই তোর মাথা খেয়েছে। কিছু ওষুদপত্র দিলে?’

 চমি বলিল,—‘তিনটে শেকড় দিয়েছে। ভাতের সঙ্গেই হোক, কি তরকারীর সঙ্গেই হোক, খাওয়াতে হবে।’

 ব্যস্তভাবে জগার মা বলিল, ‘তবে আর কি, খাইয়ে দে। ও অকাট্টি ওষুদ। দেখবি, ঐ গোরা যদি তোর পায়ে লুটিয়ে না পড়ে, আমাকে খুড়ী ব’লেই ডাকিস্ নে।’

 সলজ্জে হাসিয়া চমি বলিল,―‘তোমার এক কথা খুড়ী।’

 জগার মা হাসিয়া উঠিল। চমি বলিল,―‘কিন্তু ভাবছি খুড়ী, কি ক’রে খাওয়াব? আমার ঘরে তো খায় না।’

 জগার মা বলিল, ‘তাতে কি? ছেলের জন্মতিথি কি এমনি একটা অছিলে ক’রে ওদের দু’ মানুষকে নেমন্তন্ন কর্ না।’

 খুড়ীর এই উপদেশ চমি শিরোধার্য্য করিয়া লইল।

 পরদিন চমি স্বামী ও সপত্নীকে নিমন্ত্রণ করিল। খুব সকালে উঠিয়া কয়েকটা বড় বড় চিংড়ি মাছ ধরিয়া আনিল; বাজার হইতে আলু পটোল কিনিয়া আনিয়া আড়ম্বরসহকারে রন্ধনের উদ্যোগ করিল।

 রন্ধনশেষে চমি স্নান করিয়া আসিয়া এলো চুলে ভিজা কাপড়ে শিকর তিনটা বাটিতে বসিল। শিলের উপর শিকড়গুলাকে ফেলিতেই হঠাৎ তাহার বুকটা যেন ছাঁৎ করিয়া উঠিল। এও তো একটা অজানা শিকড়, ইহার গুণ কি কে জানে! যদি ইহাতেই কোনও অমঙ্গল হয়, যদি এগুলা বিষাক্ত হয়? বাটিতে গিয়া চমি ভয়ে ভয়ে হাত গুটাইয়া লইল।

 না না, চৈতন মালিক খুব ভাল গুণীন্। সে কি না জানিয়াই ইহা দিয়াছে? ইহাতে নিশ্চয়ই থাকির ঔষধের গুণ কাটিয়া যাইবে। শুধু স্বামীর পাগলামীর ভয়ই দূর হইবে না, থাকি তাহার চোখের বিষ হইবে। যেমন তাহাকে উপেক্ষা করিয়াছিল, তেমনই ফল পাইবে।

 চমি দাঁতে ঠোঁট চাপিয়া জোরে জোরে শিকড়গুলা বাটিয়া ফেলিল, এবং সেই বাটা শিকড় লইয়া স্বামীর ঝোলের বাটীতে মিশাইয়া দিল।

 গোরা খাইতে বসিয়াছিল, চমি কম্পিতহস্তে তাহার পাতের কাছে ঝোলের বাটীটা ধরিয়া দিল। গোরা একটু হাসিয়া বলিল,—‘তোর বেটার বিয়ে না কি মাণ্‌কের মা?’ চমি ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল,—‘না, বেটার বাবার বিয়ে।’

 সহাস্যে গোরা বলিল,—‘তোর সাথে বুঝি?’

 চমি হাসিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু হাসিতে পারিল না। সে মুখ ফিরাইয়া পাথরবাটীতে অম্বল ঢালিতে লাগিল। গোরা ঝোলের বাটীর দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ করিয়া বলিল,―‘জোমড়ার খালের চিংড়ী বুঝি? অনেকদিন তোর হাতের ঝোল খাইনি মাণ কের মা, দেখি আজ কেমন রেঁধেছিস্।’

 চমির বুকটা দুড়্ দুড়্ করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, চোখ মুখ দিয়া যেন আগুন ঠিকরাইয়া বাহির হইতে লাগিল। গোরা তখন এক গণ্ডুষ ঝোল লইয়া মুখের কাছে তুলিয়াছে। চমি পাগলের মত ছুটিয়া আসিয়া তাহার হাতটা খপ্ করিয়া ধরিয়া ফেলিল। গোরা হতবুদ্ধির ন্যায় তাহার উদ্বেগস্ফীত আরক্ত মুখের দিকে চাহিল।

 স্বামীর হাতটা নিজের কম্পিত হস্তে ধরিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে চমি বলিল,—‘সত্যি করে বল্ দেখি মিন্‌সে!’

 বিস্ময়জড়িতস্বরে গোরা বলিল, ‘কি বলবো মাণ্‌কের মা?’

 ‘চমি তোকে গুণ্ ক’রেছে?’

 গোরা হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল; বলিল,—‘তুই পাগল হ’য়েছিস্?’

 উত্তেজিতকণ্ঠে চমি বলিল,—‘আমি পাগল হই নি মিন্‌সে, তুই পাগল হ’তে ব’সেছিস্।’

 ‘তোর মাথা’! বলিয়া গোৱা হাত ছাড়াইয়া লইবার চেষ্টা করিল। চমি তাহার হাতটা আরও জোরে চাপিয়া ধরিয়া কম্পিতকণ্ঠে বলিল,—‘থাম্, সত্যি বল, তুই পাগল হবি না?’

 গোরা বলিল,—‘তোর জ্বালায় বোধ হয় এবার হবো। হাত ছাড়, ক্ষিদের সময় ন্যাক্‌রা ভাল লাগে না।’

 বলিয়া সে চমির হাত হইতে আপনার হাতটা ছিনাইয়া লইল, এবং হাসিতে হাসিতে পুনরায় ঝোলের বাটীতে হাত দিল। চমি দুইহাতে ধরিয়া ঝোলের বাটীটা তাহার সম্মুখ হইতে তুলিয়া লইল, এবং বাটী সমেত ঝোলটা উঠানে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। গোরা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিল,—‘এ কি চমি?’

 চমি জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল,—‘ওতে ওষুধ মেশান আছে রে মিন্‌সে, ও ঝোল বিষ!’

 বিস্ময়স্তব্ধকণ্ঠে গোরা বলিল,—‘কে ওষুধ মেশালে চমি?’

 চমি বলিল,—‘আমি মিশিয়েছি। থাকি তোকে গুণ্ করেছে, তারই কাটান ওষুধ ওতে আছে। চুলোয় যাক্ ওষুদ, চুলোয় যাক্ থাকি, তুই ওঠ মিন্‌সে, আমার ঘরে তোর খেতে হবে না।’

 বলিয়া সে গোরার হাত দুইটা ধরিয়া টানিতে লাগিল। গোরা তাহার উদ্বেগ চঞ্চল মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া হাস্য প্রফুল্লকণ্ঠে বলিল,—তা হচ্ছে না চমি, আজ থেকে তোর হাতে ছাড়া যদি আর কারও হাতে খাই, তবে আমি রামু খোড়ুয়ের ছেলেই নই। থাকি যদি আমাকে গুণ্ ক’রে থাকে, তবে সে গুণের কাটান তোর হাতেই আছে।

 চমি তাহার হাত দুইটা জড়াইয়া ধরিয়া পাতের কাছে বসিয়া পড়িল; কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল,—‘ওরে মিন্‌সে, তুই হাস্‌ছিস কি ক’রে! আমি যে তোকে বিষ খাওয়াতে গিয়েছিলাম! আমাকে দু’ঘা মারলেও যে আমার শান্তি হয় রে মিন্‌সে।’

 গোরা হাসিয়া বলিল,—‘মারবো এবার যেদিন হাঁড়ী আলাদা কর্‌বি। এখন উঠে আর ঝোল থাকে তো দে। মুখে আগুন তোর, অমন বড় বড় চিংড়ী দু’টো নষ্ট করে ফেল্‌লি।’

 চমি সকড়ী-হাতেই চোখ মুছিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, এবং হাসিতে হাসিতে বাকী ঝোলটা গোরার পাতে ঢালিয়া দিল। গোরা হাসিতে হাসিতে উচ্চকণ্ঠে বলিল,―‘ও থাকি, আমাকে ওষুদ খাওয়াচ্ছে—দেখে যা।’

 হাস্যোচ্ছ্বসিতকণ্ঠে চমি বলিল,—‘রেখে দে তোর থাকি! আমি কি আর তোর থাকিকেই ভয় করি, না তোকেই ডরাই রে মিন্‌সে? আমি আবার সেই চমি, সেই মাণ্‌কের মা!’