ভানুসিংহের পত্রাবলী/৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

৫৪

মাদ্রাজ

 এইমাত্র মাদ্রাজে এসে পৌঁচেচি। আজ রাত্রে কলম্বো রওয়ানা হবো। ইন্‌ফুলুয়েঞ্জা ও নানা ঘূর্ণিপাকের আঘাতে দেহ মন ভেঙে ছিঁড়ে বেঁকে চুরে গিয়েছিলো, ক্লান্তি ও অবসাদের বোঝ ঘাড়ে নিয়ে এসে বেরিয়েছিলুম।

 গাড়ি যখন সবুজ প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে চ’লছিলো তখন মনে হ’চ্ছিলো যেন নিজের কাছ থেকে নিজে দৌড়ে ছুটে পালাচ্চি। একদিন আমার বয়স অল্প ছিল; আমি ছিলুম বিশ্ব প্রকৃতির বুকের মাঝখানে; নীল আকাশ আর শ্যামল পৃথিবী আমার জীবন-পাত্রে প্রতিদিন নানা রঙের অমৃত রস ঢেলে দিত; কল্পলোকের অমরাবতীতে আমি দেবশিশুর মতোই আমার বাঁশী হাতে বিহার ক’র্‌তুম।

 সেই শিশু সেই কবি আজ ক্লিষ্ট হ’য়েচে, লোকালয়ের কোলাহলে তা’র মন উদ্ভ্রান্ত, তা’রই পথের ধুলায় তা’র চিত্ত ম্লান। সে আপন ক্লান্ত বিক্ষত চরণ নিয়ে তা’র সেই সৌন্দর্য্যের স্বপ্নরাজ্যে ফিরে যেতে চাচ্চে। তা’র জীবনের মধ্যাহ্নে কাজও সে অনেক ক’রেচে, ভুলও কম করেনি; আজ তা’র কাজ করবার শক্তি নেই, ভুল কর্‌বার সাহস নেই। আজ জীবনের সন্ধ্যাবেলায় সে আর-একবার বিশ্বপ্রকৃতির আঙিনায় দাঁড়িয়ে আকাশের তারার সঙ্গে সুর মিলিয়ে শেষ বাঁশী বাজিয়ে যেতে চায়। যে-রহস্যলোক থেকে এই মর্ত্ত্যলোকে একদিন সে এসেছিলো সেখানে ফিরে যাবার আগে শান্তি-সরোবরে ডুব দিয়ে স্নান ক’র্‌তে চায়। তেমন ক’রে ডুব দিতে যদি পারে তা হ’লে তা’র জীর্ণতা তা’র ম্লানতা সমস্ত ঘুচে যাবে; আবার তা’র মধ্য থেকে সেই চিরশিশু বাহির হ’য়ে আস্‌বে।

 সংসারের জটিলতায় ঘিরে ঘিরে আমাদের চিত্তের উপর যে জীর্ণতার আবরণ সৃষ্টি করে সেটা তো ধ্রুব সত্য নয়, সেটা মায়া। সেটা যে-মুহূর্ত্তে কুহেলিকার মতো মিলিয়ে যায় অমনি নবীন নির্ম্মল প্রাণ আপনাকে ফিরে পায়। এমনি ক’রে বারে বারে আমরা নূতন জীবনে নূতন শিশুর রূপ ধরি। সেই নূতন জীবনের সরল বাল্যমাধুর্য্যের জন্যে আমার সমস্ত মন আগ্রহে উৎকণ্ঠিত হ’য়ে উঠেচে।

 আজ আমি চ’লেচি সমুদ্র পারে কাজের ক্ষেত্রে; যখন সেই কাজের ভিড়ে থাক্‌বো তখন হয় তো আমার ভিতরকার কর্ম্মী আর-সকল কথা ভুলিয়ে দেবে। কিন্তু তবু সেই সুদূর গানের ঝরণাতলায় বাঁশীর বেদনা ভিতরে ভিতরে আমাকে নিশ্চয়ই ডাক্‌বে;—ডাক্‌বে সেই নির্জ্জন নির্ম্মল নিভৃত ঝরণাতলার দিকেই। সেই ডাক আমার সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদের ভিতর দিয়ে আমার বুকের মধ্যে আজ এসে কুহরিত হ’চ্চে। ব’ল্‌চে, সেখানে ফিরে যাবার পথ এখনো সম্পূর্ণ হয় নি, এখনো আমার সুরের পাথেয় সম্পূর্ণ নিঃশেষ হ’য়ে যায় নি, এখনো সেই নব নব বিস্ময়ে দিশাহারা বালককে কোনো এক ভিতরমহলে খুঁজে পাওয়া যায়।

 তাই, যদিও আজ চ’লেচি পশ্চিম-সমুদ্রের তীরে, আমার মন খুঁজে বেড়াচ্চে আর-এক তীরে সকল কাজভোলা সেই বালকটাকে। পূরবী গানে সে আপন লীলা শেষ ক’র্‌তে না পার্‌লে সন্ধ্যা ব্যর্থ হবে; এখন সে কোথায় ঘুরে ম’র্‌চে। ফিরে আয়, ফিরে আয়, ব’লে ডাক প’ড়েচে। একজন কে তা’র গান শুনতে ভালোবাসে। আকাশের মাঝখানে তা’র আসন পাতা, সেই তো শিশুকালে তাকে বাঁশীর দীক্ষা দিয়েছিলো, নিশীথরাতের শেষ রাগিণী বাজানো হ’লে তা’রপরে তা’র বাঁশী ফিরে নেবে। আজ কেবলি সেই কথাই আমার মনে প’ড়্‌চে। ইতি, ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯২৪।