ভানুসিংহের পত্রাবলী/৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

৫৭

জাহাজ প্রায় ন-টার সময় ছাড়্‌লো। সেই আমাদের পুরোনো গঙ্গাতীর—এই তীর ছেলেবেলায় আমাকে কতদিন কী গভীর আনন্দ দিয়েচে। ধীরে ধীরে যখন সেই শান্ত সুন্দর নিভৃত শ্যামল শোভা দেখি আর এই উদার গঙ্গার কলধ্বনি শুনি তখন আমার সমস্ত মন একে আঁক্‌ড়ে ধরে;—ছোটো শিশু যেমন ক’রে মাকে ধরে। আমি জীবনের কতকাল যে এই নদীর বাণী থেকেই আমার বাণী পেয়েছি, মনে হয় সে যেন আমি আমার আগামী জন্মেও ভুল্‌বো না। বস্তুতঃ এই জীবনেই আমার সেই জন্ম কেটে গিয়েচে।

 ছেলেবেলায় যখন সমস্ত মন-প্রাণ দিয়ে এই জলস্থল আকাশের মহাপ্রাঙ্গণে আমার খেলা আরম্ভ ক’রেছিলুম, সেই খেলার দিন আজ ফুরিয়ে গেছে। আজ এই বিপুল বিচিত্র মাতৃ-অঙ্গন থেকে বহুদূরে এসেচি। সকালবেলাকার ফুলের সব শিশির শুকিয়ে গেচে—আজ প্রখর মধ্যাহ্নের কর্ত্তব্যক্ষেত্রে প্রবেশ ক’রচি। আমার কর্ম্মের সঙ্গে পাখীর গান, নদীর কল্লোল, পাতার মর্ম্মর আপনার সুর যোগ ক’রে দিতে পার্‌চে না—অন্যমনস্ক হ’য়ে আছি। নীলাকাশের অনিমেষ দৃষ্টি আমার দৃষ্টিতে এসে তেমন অবারিত আত্মীয়তায় মিল্‌চে না, কর্ম্মশালার জানলা-দরজার ফাঁক দিয়ে এই বিশ্বের হৃদয় আগেকার মতো তেমন সম্পূর্ণ ক’রে আমার বুকের উপর এসে পড়ে না, মাঝখানে কত রকমের চিন্তার, কত রকমের চেষ্টার ব্যবধান। এই তো দেখ্‌চি সেদিনকার লীলালোক থেকে আজকের দিনের কর্ম্মলোকে জন্মান্তর গ্রহণ ক’রেচি, তবু সেদিনকার ভোরবেলায় সানাইয়ের সুরে ভৈরবী আলাপ এখনো ক্ষণে ক্ষণে মনে প’ড়ে মনকে উতলা ক’রে দেয়।

 কাল গঙ্গার উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিলুম। তখন কেবলি জলের থেকে আকাশ থেকে তরুচ্ছায়াচ্ছন্ন গ্রামগুলি থেকে এই প্রশ্ন আমার কানে আস্‌ছিলো, “মনে পড়ে কি?” এবারকার এই দেহের ক্ষেত্র থেকে যখন বেরিয়ে চ’লে যাবো, তখনো কি এই প্রশ্ন ক্ষণে ক্ষণে আমার হৃদয়ের উপর হাওয়ায় ভেসে আস্‌বে? এবারকার এই জীবনের এই ধরণীর সমস্ত “জন্মান্তর-সৌহৃদানি”!

 কাল দোল-পূর্ণিমা গঙ্গার উপরেই দেখা দিল। জাহাজ বালির চরে জোয়ারের অপেক্ষায় রাত্রি সাতটা পর্য্যন্ত আট্‌কে প’ড়েছিলো। সমুদ্রে যদি দোল-পূর্ণিমার আবির্ভাব হ’তো তা হ’লেই তা’র নাম সার্থক হ’তো—তা হ’লে দোলনও থাক্‌তো, আর নীলের সঙ্গে শুভ্রের, সাগরের সঙ্গে জ্যোৎস্নার মিলনও দেখ্‌তুম।

 আজ ভোরে উঠে দেখ্‌লুম, জাহাজ কূলরেখাহীন জলরাশির উপরে ভেসে চ’লেচে—“মধুর বহিছে বায়ু।” আজ শনিবার; সোমবারে শুন্‌চি রেঙ্গুনে পৌঁচবো। সেখানে দিন-দুয়েক সভাসমিতি, অভ্যর্থনা, মাল্যচন্দন, বক্তৃতা, জনতার করতালিতে আমাকে চেপে মার্‌বার চেষ্টা। তা’রপরে বোধ হয় বুধবারে কোনো এক সময়ে মুক্তি। ইতি, চৈত্র ১৩৩০।