ভাব্বার কথা (১৯১৯)/ভাব্বার কথা
ভাব্বার কথা।
(১)
ঠাকুর-দর্শনে একব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত। দর্শন-লাভে তাহার যথেষ্ট প্রীতি ও ভক্তির উদয় হইল। তখন সে—বুঝি আদান প্রদান সামঞ্জস্য করিবার জন্য—গীত আরম্ভ করিল। দালানের এক কোণে থাম হেলান দিয়া চোবেজি ঝিমাইতেছিলেন। চোবেজি মন্দিরের পূজারী, পাহলওয়ান, সেতারী—দুই লোটা ভাঙ্ দুবেলা উদরস্থ করিতে বিশেষ পটু এবং অন্যান্য আরও অনেক সদ্গুণশালী। সহসা একটা বিকট নিনাদ চোখেজির কর্ণপটহ প্রবলবেগে ভেদ করিতে উদ্যত হওয়ায়, সম্বিদা-সমুৎপন্ন বিচিত্র জগৎ ক্ষণকালের জন্য চোবেজির বিয়াল্লিশ ইঞ্চি বিশাল বক্ষস্থলে “উত্থায় হৃদি লীয়ন্তে”— হইল। তরুণ-অরুণ-কিরণ-বর্ণ ঢুলু ঢুলু দুটি নয়ন ইতস্ততঃ বিক্ষেপ করিয়া, মনশ্চাঞ্চল্যের কারণানুসন্ধায়ী চোবেজি আবিষ্কার করিলেন যে, এক ব্যক্তি ঠাকুরজির সাম্নে আপনভাবে আপনি বিভোর হইয়া, কর্ম্মবাড়ীর কড়া মাজার ন্যায় মর্ম্মস্পর্শী স্বরে—নারদ, ভরত, হনুমান, নায়ক কলাবতগুষ্টির সপিণ্ডীকরণ করিতেছে। সম্বিদানন্দ উপভোগের প্রত্যক্ষ বিশ্বস্বরূপ পুরুষকে মর্মাহত চোবেজি তীব্র বিরক্তিব্যঞ্জকস্বরে জিজ্ঞাসা করিতেছেন—“বলি, বাপুহে—ও বেসুর বেতাল কি চীৎকার করছ?” ক্ষিপ্র উত্তর এলো—“সুর তানের আমার আবশ্যক কি হে? আমি ঠাকুরজির মন ভিজুচ্চি।” চোবেজি —“হু”, ঠাকুরজি এমনই আহাম্মক কি না? পাগল তুই— আমাকেই ভিজুতে পারিস্ নি—ঠাকুর কি আমার চেয়েও বেশী মূর্খ?”
ভগবান অর্জ্জুনকে বলেছেন—তুমি আমার শরণ লও, আর কিছু কর্বার দরকার নাই, আমি তোমায় উদ্ধার করিব। ভোলাচাঁদ তাই লোকের কাছে শুনে মহাখুসী; থেকে থেকে বিকট চীৎকার—আমি প্রভুর শরণাগত, আমার আবার ভয় কি? আমার কি আর কিছু কর্ত্তে হবে? ভোলাচাঁদের ধারণা—ঐ কথাগুলি খুববিট্কেল আওয়াজে বারম্বার ব’লতে পারলেই যথেষ্ট ভক্তি হয়, আবার তার উপর মাঝে মাঝে পূর্ব্বোক্ত স্বরে জানানও আছে, যে তিনি সদাই প্রভুর জন্য প্রাণ পর্য্যস্ত দিতে প্রস্তুত। এ ভক্তির ডোরে যদি প্রভু স্বয়ং না বাঁধা পড়েন, তবে সবই মিথ্যা। পার্শ্বচর দু’চারটা আহাম্মক ও তাই ঠাওরায়। কিন্তু ভোলাচাঁদ প্রভুর জন্য একটিও দুষ্টামি ছাড়্তে প্রস্তুত নন। বলি, ঠাকুরজি কি এমনই আহাম্মক? এতে যে আমরাই ভূলিনি!!
ভোলাপুরী বেজায় বেদান্তী—সকল কথাতেই তাঁর ব্রহ্মত্ব সম্বন্ধে পরিচয়টুকু দেওয়া আছে। ভোলাপুরীর চারিদিকে যদি লোকগুলো অন্নাভাবে হাহাকার করে—তাঁকে স্পর্শও করে না; তিনি সুখদুঃখের অসারতা বুঝিয়ে দেন। যদি রোগে শোকে অনাহারে লোকগুলো ম’রে ঢিপি হয়ে যায়, তাতেই বা তাঁর কি? তিনি অমনি আত্মার অবিনশ্বরত্ব চিন্তা করেন। তাঁর সাম্নে বলবান্ দুর্ব্বলকে যদি মেরেও ফেলে, ভোলাপুরী—“আত্মা মরেনও না, মারেনও না” এই শ্রুতিবাক্যের গভীর অর্থসাগরে ডুবে যান। কোনও প্রকার কর্ম্ম কর্ত্তে ভোলাপুরী বড়ই নারাজ। পেড়াপীড়ি ক’র্লে জবাব দেন যে, পূর্ব্ব জন্মে ওসব সেরে এসেছেন। এক জায়গায় ঘা পড়্লে কিন্তু ভোলাপুরীর আত্মৈক্যামুভূতির ঘোর ব্যাঘাত হয়,—যখন তাঁর ভিক্ষার পরিপার্টিতে কিঞ্চিৎ গোল হয় বা গৃহস্থ তাঁর আকাঙ্ক্ষানুযায়ী পুজা দিতে নারাজ হন, তখন পুরীজির মতে গৃহস্থের মত ঘৃণ্য জীব জগতে আর কেহই থাকে না এবং যে গ্রাম তাঁহার সমুচিত পুজা দিলে না, সে গ্রাম যে কেন মুহূর্ত্তমাত্রও ধরণীর ভার যুদ্ধি করে, এই ভাবিয়া তিনি আকুল হন।
ইনিও ঠাকুরজিকে আমাদের চেয়ে আহাম্মক ঠাওরেছেন।
বলি, রামচরণ! তুমি লেখা পড়া শিখ্লে না, ব্যবসা বাণিজ্যেরও সঙ্গতি নাই, শারীরিক শ্রমও তোমা দ্বারা সম্ভব নহে, তার উপর নেসা ভাঙ্ এবং দুষ্টামিগুলাও ছাড়্তে পার না, কি ক’রে জীবিকা কর বল দেখি? রামচরণ—“সে সোজা কথা মহাশয়—আমি সকলকে উপদেশ করি।”
রামচরণ ঠাকুরজিকে কি ঠাওরেছেন?
(২)
লক্ষ্ণৌ সহরে মহরমের ভারী ধুম। বড় মসজেদ্ ইমামবাড়ায় জাঁকজমক রোশ্নির বাহার দেখে কে! বেসুমার লোকের সমাগম। হিন্দু, মুসলমান, কেরাণী, য়াহুদী, ছত্রিশ বর্ণের স্ত্রী পুরুষ বালক বালিকা, ছত্রিশ বর্ণের হাজারো জাতের লোকের ভিড় আজ মহরম দেখ্তে। লক্ষ্ণৌ সিয়াদের রাজধানী, আজ হজরত ইমাম্ হাঁসেন হোঁসেনের নামে আর্তনাদ গগন স্পর্শ ক’রছে —সে ছাতিফাটান মসিয়ার কাতরাণি কার বা হৃদয় ভেদ না করে? হাজার বৎসরের প্রাচীন কারবালার কথা আজ ফের জীবত্ত হ’য়ে উঠেছে এ দর্শকবৃন্দের ভিড়ের মধ্যে দূর গ্রাম হইতে দুই ভদ্র রাজপুত তামাসা দেখতে হাজির। ঠাকুর সাহেবদের—যেমন পাড়াগেঁয়ে জমীদারের হ’য়ে থাকে—বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচ। সে মোসলমানি সভ্যতা, কাফ্, গাফের বিশুদ্ধ উচ্চারণসমেত লস্করী জবানের পুষ্পবৃষ্টি, আবা কাবা চুস্ত পায়জামা তাজ মোড়াসার রঙ্গ বেরঙ্গ সহর পসন্দ ঢঙ্গ অতদূর গ্রামে গিয়ে ঠাকুর সাহেবদের স্পর্শ ক’র্তে আজও পারে নি। কাজেই ঠাকুররা সরল সিধে, সর্ব্বদা শীকার ক’রে জমামরদ কড়াজান্ আর বেজায় মজবুত দিল্।
ঠাকুরদ্বয় ত ফটক পার হ’য়ে মসজেদ্ মধ্যে প্রবেশোদ্যত, এমন সময় সিপাহী নিষেধ ক’র্লে। কারণ জিজ্ঞাসা করার জবাব দিলে যে, এই ধে দ্বারপার্শ্বে মুরদ্ খাড়া দেখ্ছে, ওকে আগে পাঁচ জুতা মার, তবে ভিতরে যেতে পাবে। মূর্ত্তিটি কার? জবাব এলো—ও মহাপাপী ইয়েজ্বিদের মূর্ত্তি। ও হাজার বৎসর আগে হজরৎ হাঁসেন হোঁসেনকে মেরে ফেলে, তাই আজ এ রোদন, এ শোক প্রকাশ। প্রহরী ভাব্লে এ বিস্তৃত ব্যাখ্যার পর ইয়েজ্বিদ মূর্ত্তি পাঁচ জুতার জায়গায় দশ ত নিশ্চিত খাবে। কিন্তু কর্ম্মের বিচিত্রগতি—উল্টা সমঝ্লি রাম—ঠাকুরদ্বয় গললগ্নীকৃতবাস ভূমিষ্ঠ হয়ে ইয়েজিদমূর্ত্তির পদতলে কুমড়ো গড়াগড়ি আর গদগস্বরে স্তুতি—“ভেতরে ঢুকে আর কায কি, অন্য ঠাকুর আর কি দেখ্ব? ভল বাবা অজিদ্, দেবতা তো তুঁহি হ্যায়, অস্ মারো শারোকো কি অভিতক্ রোবত।” (ধন্য বাবা ইয়েজিদ, এমনি মেরেচো শালাদের—কি আজ ও কাঁদছে!!)
সনাতন হিন্দুধর্ম্মে র গগনস্পর্শী মন্দির—সে মন্দিরে নিয়ে যাবার রাস্তাই বা কত! আর সেথা নাই বা কি? বেদান্তীর নির্গুণ ব্রহ্ম হোতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সুয্যিমামা, ইঁদুরচড়া গণেশ, আর কুচ দেবতা ষষ্ঠী, মাকাল প্রভৃতি নাই কি? আর বেদ বেদান্ত দর্শন পুরাণ তন্ত্রে ঢের মাল আছে, যার এক একটা কথায় ভববন্ধন টুটে যায়। আর লোকেরই বা ভিড় কি, তেত্রিশ কোটী লোক সে দিকে দৌড়েছে। আমারও কৌতূহল হোল, আমিও ছুট্লুম্। কিন্তু গিয়ে দেখি, এ কি কাণ্ড! মন্দিরের মধ্যে কেউ যাচ্ছে না, দোরের পাশে একটা পঞ্চাশ মুণ্ডু, একশত হাত, দুশ পেট, পাঁচশ ঠ্যাঙ্গওয়ালা মূর্ত্তি খাড়া! সেইটার পায়ের তলায় সকলেই গড়াগড়ি দিচ্ছে। একজনকে কারণ জিজ্ঞানা করায় উত্তর পেলুম যে, ওই ভেতরে যে সকল ঠাকুর দেবতা, ওদের দূর থেকে একটা গড় বা দুটি ফুল ছুড়ে ফেল্লেই যথেষ্ট পূজা হয়। আসল পূজা কিন্তু এঁর করা চাই—যিনি দ্বারদেশে; আর ঐ যে বেদ বেদান্ত, দর্শন, পুরাণ, শাস্ত্র সকল দেখ্ছ, ও মধ্যে মধ্যে শুন্লে হানি নাই, কিন্তু পাল্তে হবে এঁর হুকুম। তখন আবার জিজ্ঞাসা ক’র্লুম—তবে এ দেবদেবের নাম কি?—উত্তর এলো, এঁর নাম “লোকাচার।” আমার লক্ষ্ণৌয়ের ঠাকুর সাহেবের কথা মনে প’ড়ে গেল, “ভল্, বাবা ‘লোকাচার’ অস্ মারো” ইত্যাদি।
গুড়গুড়ে কৃষ্ণব্যাল ভট্টাচার্য্য—মহা পণ্ডিত, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের খবর তাঁর নখদর্পণে। শরীরটি অস্থি-চর্মসার; বন্ধুরা বলে তপস্যার দাপটে, শত্রুরা বলে অন্নাভাবে! আবার দুষ্টেরা বলে, বছরে দেড়কুড়ি ছেলে হ’লে ঐ রকম চেহারাই হয়ে থাকে। যাই হোক্, কৃষ্ণব্যাল মহাশয় না জানেন এমন জিনিষটিই নাই, বিশেষ টিকি হ’তে আরম্ভ কোরে নবদ্বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ ও চৌম্বক শক্তির গতাগতি বিষয়ে তিনি সর্ব্বজ্ঞ। আর এ রহস্যজ্ঞান থাকার দরুণ দুর্গাপূজার বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা হোতে মায় কাদা পুনর্ব্বিবাহ দশ বৎসরের কুমারীর গর্ভাধান পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কর্ত্তে তিনি অদ্বিতীয়। আবার প্রমাণ প্রয়োগ— সে তো বালকেও বুঝ্তে পারে, তিনি এমনি সোজা কোরে দিয়েছেন। বলি, ভারতবর্ষ ছাড়া অন্যত্র ধর্ম্ম হয় না, ভারতের মধ্যে ব্রাহ্মণ ছাড়া ধর্ম্ম বুঝ্বার আর কেউ অধিকারীই নয়, ব্রাহ্মণের মধ্যে আবার কৃষ্ণব্যালগুষ্টি ছাড়া বাকী সব কিছুই নয়, কৃষ্ণব্যালদের মধ্যে গুড়গুড়ে!!! অতএব গুড়গুড়ে কৃষ্ণব্যাল বা বলেন, তাহাই স্বতঃপ্রমাণ। মেলা লেখাপড়ার চর্চ্চা হচ্চে, লোকগুলো একটু চম্চমে হোয়ে উঠ্ছে, সকল জিনিষ বুঝ্তে চায়, চাক্তে চায়, তাই কৃষ্ণব্যাল মহাশয় সকলকে আশ্বাস দিচ্ছেন যে, মাভৈঃ, যে সকল মুস্কিল মনের মধ্যে উপস্থিত হচ্ছে, আমি তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ক’র্ছি, তোমরা যেমন ছিলে, তেমনি থাক। নাকে সরিষার তেল দিয়ে খুব ঘুমোও। কেবল আমার বিদারের কথাটা ভুলো না। লোকেরা ব’ললে—বাঁচলুম, কি বিপদই এসেছিল বাপু! উঠে বসতে হবে, চ’ল্তে ফিরতে হবে, কি আপদ্!! “বেঁচে থাক্ কৃষ্ণব্যাল” বোলে আবার পাশ ফিরে শুলো। হাজার বছরের অভ্যাস কি ছোটে? শরীর কর্ত্তে দেবে কেন? হাজারো বৎসরের মনের গাঁট কি কাটে! তাই না কৃষ্ণব্যাল দলের আদর! “ভল্ বাবা ‘অভ্যাস’ অস্ মারো” ইত্যাদি।