বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (তৃতীয় খণ্ড)/গাজন

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ১০০-১০১)

গাজন বাংলা দেশের লৌকিক উৎসব। ইহা নিম্ন শ্রেণীর লোকের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। চৈত্র সংক্রান্তি হইতে আরম্ভ করিয়া আষাঢ়ী পূর্ণিমা পর্যন্ত কোনও কোনও সংক্রান্তি কিংবা পূর্ণিমা তিথিতে বাংলার সর্বত্রই ইহা অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে।

 বাংলা দেশে ইহা বিভিন্ন পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার নামের সঙ্গে সংযুক্ত হইয়াছে, যেমন শিবের গাজন, ধর্মের গাজন, নীলের গাজন, আদ্যের গাজন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্য সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুবৃষ্টি লাভের আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়। কোনও কোনও গ্রামবাসী পূর্ব হইতে মানসিক করিয়া ইহাতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়া থাকে, তাহাদিগকে সন্ন্যাসী বা ভক্ত্যা বলে। সন্ন্যাসীরা হবিষ্যান্ন ভোজন করে, উত্তুরী (উত্তরীয়) ও একখণ্ড বেত্র ধারণ করে। তাহার ফলেই দেবকর্মে তাহাদের অধিকার জন্মায়। সন্ন্যাসীরা শিবমন্দিরের প্রাঙ্গণে নানা প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন দ্বারা দেবতার মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিবার প্রয়াস পায়। এই সব কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে জিহ্বা ফোঁড়া, কাঁটা ঝাঁপ, আগুনের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাওয়া, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চড়ক গাজন অনুষ্ঠানের একটি অঙ্গ। এই উপলক্ষে এক শোভাযাত্রা বাহির করিয়া গ্রামান্তরের শিবতলায় লইয়া যাওয়া হয়, একজন শিব ও একজন গৌরী সাজিয়া নৃত্য করে, অন্যান্য সন্ন্যাসী নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত দৈত্যদানব প্রভৃতি সাজিয়া নৃত্য করিয়া থাকে। শিবের সম্পর্কে নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়, তাহাতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া তাঁহার কৃষিকর্ম পর্যন্ত নানা বিষয়ের উল্লেখ থাকে। এই অনুষ্ঠান সাধারণতঃ তিন দিন ব্যাপী চলিয়া থাকে।

 পূর্ব বাংলায় চৈত্রসংক্রান্তির গাজন উপলক্ষে কালীকাচ একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। অসুরবধ উপলক্ষে কালীর নৃত্য ইহার বিষয়। বাংলার লোকনৃত্যের ইহা একটি বিশিষ্ট নিদর্শন। ‘চড়ক’ দ্র।

দ্র আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোক-শ্রুতি, কলিকাতা, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ, আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, কলিকাতা, ১৩৭১ বঙ্গাব্দ।

আশুতোষ ভট্টাচার্য