বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (তৃতীয় খণ্ড)/চন্দ্রকেতুগড়

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ২৮৪-২৮৫)

চন্দ্রকেতুগড় কলিকাতা হইতে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) দূরে চব্বিশ পরগনা জেলার মধ্যে অবস্থিত। স্থানটি বেড়াচাঁপা নামেও প্রসিদ্ধ। অপর নাম দেবালয় বা দেউলিয়া। খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে রচিত পেরিপ্লাস (Periplus) গ্রন্থে বর্ণিত গাঙ্গে (Gange) এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর টলেমি কর্তৃক উল্লিখিত গাঙ্গারিদাই (Gangaridai) শহর (‘গাঙ্গারিদাই, গঙ্গরিডই’ দ্র) এবং চন্দ্রকেতুগড় যে অভিন্ন ইহা কেহ কেহ অনুমান করিয়াছেন।

 কথিত আছে, নুসলমান আক্রমণের সময়ে এখানে চন্দ্রকেতু নামে কোনও এক রাজা রাজত্ব করিতেন।

 এই অঞ্চলে প্রায় ৩ কিলোমিটারের (২ মাইল) অধিক স্থান ব্যাপিয়া প্রাচীন নগরবেষ্টনকারী প্রাচীর ও বসতির চিহ্ন আবিষ্কৃত হইয়াছে। অনতিদূরবর্তী হাদিপুর, সানপুকুর ও কালীতলা প্রভৃতি গ্রামে এখনও জলাশয় খনন, কৃষিকর্ম ও গৃহনির্মাণের জন্য ভূমিখননের ফলে প্রাচীন লাঞ্ছনময় (পাঞ্চ মার্ক্‌ড) মুদ্রা, মৃন্ময় মূর্তি, মৃৎ-ভাণ্ড ও মসৃণ চাকচিক্যপূর্ণ কৃষ্ণ বর্ণের মৃংকপাল প্রভৃতি পুরাবস্তু পাওয়া যায়।

 ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ হইতে চন্দ্রকেতুগড়ে খনন কার্য আরম্ভ হয়। বেড়াচাঁপা হইতে প্রায় অর্ধ মাইল দূরে হাড়োয়া যাইবার পথের পশ্চিম দিকে নগরবেষ্টনকারী প্রাচীন প্রাচীরের ভিতরে ধান খেতের এক স্থানে খননের ফলে ১৩ সেণ্টিমিটার (৫ ইঞ্চি), ২০ সেণ্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) ব্যাসের এবং ০.৭৯ মিটার (২ ফুট ৭ ইঞ্চি) দৈর্ঘ্যের পোড়ামাটির নল বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থিত পয়ঃপ্রণালী আবিষ্কৃত হইয়াছে। বর্তমানে ইহা ৭.৬২ হইতে ৯.১৪ মিটার (২৫ হইতে ৩০ ফুট) পর্যন্ত অনুসরণ করা হইয়াছে। ইহা ভূপৃষ্ঠ হইতে ৪ মিটার (প্রায় ১৩ ফুট) এবং জলময় স্তর (ওয়াটার টেব্‌ল্) হইতে প্রার ০.৩ মিটার (১ ফুট) নীচে আবিষ্কৃত হইয়াছে। উল্লিখিত পয়ঃপ্রণালী যে মৌর্য যুগে কিংবা কিছু পূর্বে ব্যবহৃত হইয়াছিল, স্তরবিন্যাস ও সমসাময়িক পুরাবস্তুর সাহায্যে এরূপ অনুমান অসংগত নয়। উৎখননের ফলে লাঞ্ছনময় তাম্রমুদ্রা, পোড়ামাটির নাগ দেবী, গজদন্ত-নির্মিত বলয় ও মালা, উজ্জ্বল ও মসৃণ কৃষ্ণ বর্ণের মৃৎকপাল, খর্ব নলবিশিষ্ট কৃষ্ণ বর্ণের মৃৎপাত্র (পানপাত্র?) এবং দৈনন্দিন ব্যবহারোপযোগী ক্ষুদ্র ও বৃহদাকার বিভিন্ন প্রকারের মৃৎপাত্র প্রভৃতি আবিষ্কৃত হইয়াছে। এখানকার কোনও কোনও মৃৎপাত্র বিদেশী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। মাটির ঢেলা ও মৃৎকপালের মধ্যে মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী লিপির নিদর্শনও আবিষ্কৃত হইয়াছে।

 শুঙ্গ ও পরবর্তী যুগে নির্মিত পোড়ামাটির বহু যক্ষিণী মূর্তি ও নানারূপ সীলমোহর, ছাঁচে ঢালা তাম্রমুদ্রা ও অন্যান্য পুরাবস্তুও এখানে যথেষ্ট আবিষ্কৃত হইয়াছে।

 গুপ্ত যুগ হইতে এখানে ইষ্টকের দ্বারা দেবমন্দির ও বাসগৃহ নির্মাণ হইত ইহার প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে। এখানে ‘খনামিহিরের ঢিপি’ নামক স্থানে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উৎখননের ফলে ইষ্টকনির্মিত ১৯.২০ মিটার (৬৩ ফুট) দীর্ঘ এবং ১৯.২০ মিটার (৬৩ ফুট) প্রস্থ এক বিশাল উত্তরমুখী মন্দির আবিষ্কৃত হইয়াছে। উত্তর দিকে সংলগ্ন ১৪ মিটার (৪৫ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ১৪ মিটার (৪৫ ফুট) প্রস্থের একটি মণ্ডপও রহিয়াছে; তাহার প্রাচীর ১.২ মিটার (৪ ফুট) পুরু। অনুরূপ অপর একটি ক্ষুদ্রায়তন মন্দিরও অল্প দূরে খনামিহিরের ঢিপির মধ্যেই আবিষ্কৃত হইয়াছে। পূর্বোল্লিখিত বৃহদাকার মন্দিরটি দুই যুগে নির্মিত হইয়াছিল বলিয়া অনুমিত হয়। মন্দিরের ঠিক মধ্য স্থলে দৈর্ঘ্যে ২.৪৩ মিটার (৮ ফুট), প্রস্থে ২.১৩ মিটার (৭ ফুট) এবং গভীরতায় ৭.১৬ মিটার (২৩ ফুট) এক গর্ভগৃহ আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহা বক্রভাবে নিম্নগামী হইয়া জলরেখার প্রায় ০.৬ মিটার (২ ফুট) নীচে চলিয়া গিয়াছে। ইহার তলদেশে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ০.৮৬ মিটার (২ ফুট ১০ ইঞ্চি) পরিমাপের ক্ষুদ্র একটি ইষ্টকবদ্ধ চতুরস্র ক্ষেত্র বর্তমান। যতদূর জানা যায়, এই মন্দিরটিকেই পশ্চিম বঙ্গের সর্বপ্রাচীন মন্দির বলিয়া গণ্য করা চলে।

 উক্ত মন্দির হইতে প্রায় ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) উত্তরে গভীর খননের ফলে জলরেখার নিম্নাংশ হইতে কালো রঙে চিত্রিত ধুসর বর্ণের মৃৎপাত্রের কয়েকটি খণ্ড আবিষ্কৃত হইয়াছে। এগুলি হস্তিনাপুর, অহিচ্ছত্র, কৌশাম্বী প্রভৃতি স্থানে লব্ধ চিত্রিত ধুসর মৃৎপাত্রের মত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এগুলি খ্রীষ্টপূর্ব ৭ম বা ৬ষ্ঠ শতকে নির্মিত এবং বৈদিক সভ্যতার সহিত সম্পর্কিত।

দ্র সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুলনার ইতিহাস, ১ম-২য় খণ্ড, কলিকাতা, ১৯১৪-২২; Indian Archaeology: A Review, 1956-57, 1957-58, 1958-59, 1959-60, 1960-61 1961-62, Delhi, 1956-62.

কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামী