ভারতকোষ (তৃতীয় খণ্ড)/চর্যাগীত
(পৃ. ৩০০-৩০২)
চর্যাগীত বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপটি যে গানগুলির মধ্যে পাওয়া গিয়াছে সে গানগুলির নাম ‘চর্যাগীত’ বা ‘চর্যাপদ’। ‘গীত’ বা ‘পদ’ অর্থে গান। ‘চর্যা’ শব্দের অর্থ কাহারও মতে আচরণীয়। শব্দটি বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের একটি পারিভাষিক শখও বটে, আবার এক শ্রেণীর গানের নামও বটে।
চর্যাগানগুলি নেপাল রাজদরবার গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত একখানি নামহীন পুথিতে প্রথম পাওয়া যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুথিখানি আবিষ্কার করেন এবং ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’, সংক্ষেপে ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ নাম দিয়া প্রকাশ করেন। এই পুস্তকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চারখানি পুথি প্রকাশ করিয়াছিলেন—‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’, ‘সরোজবজ্রের দোহাকোষ’, ‘কাহ্নপাদের দোহাকোষ’ এবং ‘ডাকার্ণব’। ইহার মধ্যে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামীয় পুথিখানিতেই চর্যাগানগুলি বর্তমান। পুথির নামকরণ করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি নামটির আভাস পুথির সূচনার একটি সংস্কৃত শ্লোক হইতে পাইয়াছিলেন। কেহ কেহ বলেন, পুথির যথার্থ নাম ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’।
‘বৌদ্ধগান ও দোহা’-য় প্রকাশিত চারখানি পুথির ভাষাকেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা বলিয়া অনুমান করিয়াছিলেন। সাধারণভাবে সে অনুমান ভুল নয়। তবে সূক্ষ্মবিচারে ‘দোহাকোষ’ এবং ‘ডাকার্ণব’-এর ভাষাকে অবহট্ট বলা উচিত। সর্বপ্রথম সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই সূক্ষ্মবিচার করেন।
‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ আসলে চর্যাগানের টীকার পুথি। টীকার সঙ্গে মূল গানগুলি উদ্ধৃত হওয়ায় পুথিখানি সংকলনের আকার ধারণ করিয়াছে। টীকা সংস্কৃতে লেখা। পুথিমধ্যে কিছু খণ্ডিত এবং শেষে দুই-একটি পাতা নাই। তাই টীকাকারের নাম ইহাতে পাওয়া যায় না। টীকাকার মুনিদত্ত। টীকাটির নাম ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ পুথিতে অনুল্লিখিত হইলেও চর্যাগানগুলি এবং সংস্কৃত টীকা তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হইয়াছিল। টীকাকারের নাম এই তিব্বতী অনুবাদের সহায়তায় জানা গেল এবং সেই সঙ্গে খণ্ডিত পুথিতে লুপ্ত গানগুলির বিষয়ও জানা গেল। তিব্বতী অনুবাদ প্রকাশ করেন প্রবোধচন্দ্র বাগচী।
‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ খণ্ডিত পুথি। পুথির প্রাপ্ত অংশে ৪৬টি সম্পূর্ণ গান এবং একটি গানের ভগ্নাংশ পাওয়া গিয়াছে। এই ৪৬টি গান ২৪ জন কবির রচনা। গানগুলির দৈর্ঘ্য ১০ হইতে ১২ লাইনের মধ্যে; দুই-একটি দীর্ঘতর গানও আছে। গানে ‘ভণিতা’ আছে। ‘ভণিতা’-য় রচয়িতার নাম পাওয়া যায়। তদুপরি প্রত্যেক গানের শুরুতে রাগ-রাগিণীরও উল্লেখ আছে।
গানগুলি যে ভাষায় লেখা সে ভাষা অধুনা প্রচলিত বাংলা ভাষার দুই পুরুষ পূর্বতন রূপ। গানে ব্যবহৃত অনেক শব্দ বর্তমান কালেও প্রচলিত আছে, যেমন— ‘জান’, নিল’, ‘গেল’, ‘রাতি’, ‘দুই’, ‘ঘরে’, ‘করি', 'বিনু’, ‘মাঝে’, ‘চড়িলে’, ‘ছাড়ি’।
গানগুলি ‘সন্ধাভাষা’-য় রচিত বলা হয়। ‘সন্ধাভাষা’ কোনও ভাষার নাম নয়। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সংস্কৃত-অবহট্ট-বাংলা রচনায় অবলম্বিত বিশিষ্ট রীতির নাম ‘সন্ধা’। এই রীতিতে শব্দের বাচ্যার্থের এক অর্থ, গুহ্যার্থের আর এক অর্থ। শব্দের গুহ্যার্থের সাহায্যে সাধকেরা সাধন-পদ্ধতির নিগূঢ় কথা ব্যক্ত করিয়াছেন।
কোনও কোনও গানের রচনারীতি প্রহেলিকাত্মক, যেমন—রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই। / (গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়)। / ‘বলদ বিআঅল গবিয়া বাঝে।/ (বলদ প্রসব করিল গাভী বন্ধ্যা)।
কোনও কোনও গানে তত্ত্বকথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে, যেমন—জইসো জাম মরণবি তইসো। / জীবন্ত মঅলেঁ নাহি বিষেসো॥ / (জন্মও যেমন মরণও তেমনি। / জীবন্ত ও মৃতে পার্থক্য নাই॥)।
চর্যাগানগুলিতে ব্যবহৃত রূপক প্রতিভাসের ভিতর দিয়া তদানীন্তন বাঙালী জীবনের একটি নিখুঁত ছবিও ফুটিয়া উঠিয়াছে।
গানগুলির রচনাকাল অনিশ্চিত, সম্ভবতঃ খ্রীষ্টীয় একাদশ-ত্রয়োদশ শতকে লেখা।
দ্র হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-সম্পাদিত, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা, সাহিত্য-পরিষদ-গ্রন্থাবলী ৫৫, কলিকাতা, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ; সুকুমার সেন, চর্যাগীতিপদাবলী, বর্ধমান, ১৯৫৬; Suniti Kumar Chatterji, Origin and Development of the Bengali Language, Calcutta, 1926; P. C. Bagchi & Santi Bhiksu - Sastri, ed., Caryagitikosa, Visva-Bharati, 1956; Sashibhusan Dasgupta, Obscure Religious Cults, Calcutta, 1963; Tarapada Mukherji, The Old Bengali Language and Text, Calcutta, 1963.
চর্যা প্রকীর্ণক শ্রেণীর প্রবন্ধের অন্তর্গত। যে সব গীত দেশে বিক্ষিপ্তভাবে বিদ্যমান ছিল মধ্যযুগে সেগুলিকে প্রকীর্ণক বলা হইত এবং কলি দ্বারা নিবদ্ধ গীতকে প্রবন্ধ বলা হইত। চর্যা, পদ ও তাল—এই দুই অঙ্গযুক্ত তারাবলী-জাতীয় প্রবন্ধ। শাস্ত্রানুসারে চর্যা উদ্গ্রাহ, ধ্রুব এবং অভোগ এই তিনটি কলি দ্বারা নিবদ্ধ। শার্ঙ্গদেব রচিত ‘সংগীতরত্নাকর’ গ্রন্থে (১২১০ - ৪৭ খ্রী?) চর্যাগীতির যে লক্ষণ বর্ণিত হইয়াছে তাহা হইতে জানা যায় যে ইহার বিষয় আধ্যাত্মিক, পাদান্ত অনুপ্রাসযুক্ত, ইহা পদ্ধাড়ী (পজ্ঝটিকা) ও তৎপর্যায়ের ছন্দে রচিত এবং দ্বিতীয় বা অনুরূপ তালে নিবদ্ধ। চর্যাগীতি দুই প্রকার। ছন্দ-প্রধান গীতিগুলিকে বলা হইত পূর্ণ এবং যেগুলিতে ছন্দের প্রাধান্য থাকিত না সেইগুলিকে বলা হইত অপূর্ণ। চর্যার আরও দুইটি প্রকারভেদ ছিল: একটি সমধ্রুবা, অপরটি বিষমধ্রুবা। সমধ্রুবা অর্থে সবগুলি পদের এবং বিষমধ্রুবা অর্থে কেবলমাত্র ‘ধ্রুব’ অংশের সমকণ্ঠে আবৃত্তি বুঝাইত। চর্যায় রাগের ব্যবহার ছিল কিন্তু ইহা মুখ্যতঃ রাগসংগীত নহে। যে সমস্ত চর্যা পাওয়া গিয়াছে তাহাতে দেখা যায় চর্যায় ব্যবহৃত রাগের মধ্যে পটমঞ্জরী রাগের সংখ্যা সর্বাপেক্ষা অধিক। এতদ্ব্যতীত মল্লারী, ভৈরবী, কামোদ, বরাড়ী, গুর্জরী, কহ্নগুর্জরী, গৌড়ী, দেশাখ, রামক্রী, শবরী, অরুদেবক্রী, ধানশ্রী, মালশ্রী এবং বঙ্গাল—এই রাগগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। চর্যাগীতির সহিত মণ্ডি-ডক্কা (মড্ডু বা মোড়া) নামক তন্ত্রীযুক্ত চর্মবাদ্য বাজানো হইত। হরিপাল (ত্রয়োদশ শতক) জানাইয়াছেন যে চর্যা বহু প্রকারের হইত এবং ইহা যোগীরা গাহিতেন—‘যোগিভির্গীয়তে চর্যা প্রকারৈর্বহুভিত্ত্বসৌ’।
দ্র শার্ঙ্গদেব, সংগীত রত্নাকর, ঐ টীকা, কল্লিনাথ, সিংহভূপাল; রামকৃষ্ণ কবি-সম্পাদিত, ভরতকোষ, তিরুপতি, ১৯৫১।