বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (তৃতীয় খণ্ড)/থ্রম্বোসিস

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ৭৭৫-৭৭৬)

থ্রম্বোসিস জীবিতাবস্থায় রক্তবাহের মধ্যে রক্ততঞ্চনের নাম থ্রম্বোসিস। সাধারণতঃ ধমনী অথবা শিরায় থ্রম্বোসিস দেখা যায়। কোনও রক্তবাহে থ্রম্বোসিস হইয়া রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হইলে অথবা বন্ধ হইলে সেই রক্তবাহের বিভিন্ন শাখা দিয়া বেশি পরিমাণে রক্ত সঞ্চালিত হইয়া থাকে। ধমনীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোসিসগ্রস্ত অংশের পূর্ব হইতে উদ্ভূত শাখাগুলিতে এবং শিরার ক্ষেত্রে ঐরূপ অংশের পরে উদ্ভূত শাখাগুলিতে রক্তসঞ্চালনের এরূপ বৃদ্ধি ঘটে। যে শাখাগুলি সাধারণ অবস্থায় বন্ধ থাকে এ সময়ে সেগুলিতে রক্তসঞ্চালন হইতে থাকে। এই বিকল্প রক্তসঞ্চালনে যদি দেহাংশের রক্তাভাব না হয়, তবে থ্রম্বোসিসের কোনও উপসর্গ প্রকাশ পায় না।

 ধমনীর থ্রম্বোসিসের প্রকৃত কারণ এখনও অজ্ঞাত। সাধারণত: বার্ধক্য বা অন্য কোনও কারণে ধমনীগুলির স্থিতিস্থাপকতার অভাব, অত্যধিক রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল এবং চর্বিজাতীয় পদার্থের আধিক্য প্রভৃতিই থ্রম্বোসিসের কারণ বলিয়া ধরা হয়। শিরার প্রদাহজনিত রোগ, রক্তে তরল পদার্থের অভাব, পলিসাইথিমিয়া রোগে লোহিত রক্তকণিকার আধিক্যবশতঃ রক্তের ঘনত্ববৃদ্ধি এবং রক্তসঞ্চালনের শ্লথ গতির জন্য শিরায় থ্রম্বোসিস হইয়া থাকে।

 হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক অথবা ফুসফুসের ধমনীর থ্রম্বোসিসকে যথাক্রমে করোনারি, সেরিব্রাল অথবা পাল্‌মোনারি থ্রম্বোসিস বলা হয়। অঙ্গাদির ধমনীতে থ্রম্বোসিস হইলে সেই অঙ্গ গীতল হইয়া যায়, নাড়ীর স্পন্দন কমিয়া যায় এবং পরিশেষে রক্তাভাবে অঙ্গটি পচিয়া যাইতে পারে। করোনারি থ্রম্বোসিস সাধারণতঃ ৫০ বৎসরের অধিক বয়স্ক পুরুষের বেশি হয়। মধুমেহ রোগেও এই ব্যাধির প্রকোপ দেখা যায়। করোনারি থ্রম্বোসিসগ্রস্ত রোগী সহসা বুকের বাম দিকের উপরিভাগে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে। এই যন্ত্রণা কখনও কখনও গ্রীবাদেশ অথবা বামহস্তের কনিষ্ঠ অঙ্গুলি পর্যন্ত বিস্তারিত হয়। রোগী দুর্বল, ঘর্মাক্ত এবং শীতল হইয়া যায়, চেতনা হারায় এবং মৃত্যু পর্যন্তও ঘটিতে পারে। রক্তাভাবে হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক সংকোচনের ফলে নাড়ী ক্ষীণ, দ্রুত, শ্লথ অথবা অনিয়মিত হইয়া রক্তচাপ কমিতে থাকে। কখনও কখনও বমি হয়। হৃৎপিণ্ডের অবসাদের জন্য নিলয়ের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। এ অবস্থায় রোগীর সম্পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন; ক্ষেত্রবিশেষে রক্তের অস্বাভাবিক তঞ্চন দূর করিবার জন্য হেপারিন, ডিণ্ডিভ্যান ইত্যাদি তঞ্চনরোধক ঔষধ দেওয়া হয়। সাময়িকভাবে সুস্থ হইলে রোগীর রক্তে কোলেস্টেরল কমাইবার জন্য নিকোটিনিক অ্যাসিডজাতীয় ঔষধ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। এই রোগ প্রতিরোধ করিতে হইলে অত্যধিক চিন্তা ও উদ্বেগ কমানো এবং কোলেস্টেরল বা সংপৃক্ত স্নেহপদার্থপূর্ণ খাদ্যসামগ্রী (যেমন ডিম, ঘি ইত্যাদি) কম খাওয়া কর্তব্য।

 মস্তিষ্কের ধমনীর থ্রম্বোসিসে মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে রক্তসঞ্চালনের অভাব ঘটায় উক্ত আক্রান্ত অংশ-কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত অঙ্গ ও কার্যাদি বিপর্যন্ত হয়। ফলে রোগীর কোনও অঙ্গ অথবা দেহার্ধ ধীরে ধীরে অবশ হইতে থাকে। সকল সময়ে চেতনালোপ না হইতেও পারে। অনেক সময়ে দৃষ্টিশক্তির অথবা গলাধঃকরণের কার্যে ব্যাঘাত ঘটে এবং মুখের পক্ষাঘাত দেখা দেয়। রোগের সূচনায় যে জটিলতা দেখা দেয় তাহা কাটিবার পর ধমনীকে প্রসারিত করিবার জন্য নিকোটিনিক অ্যাসিড অথবা আর্লিডিন-জাতীয় ঔষধ দেওয়া হয়।

 ফুসফুসের ধমনীর থ্রম্বোসিসে করোনারি থ্রম্বোসিসের ন্যায় অসহ্য যন্ত্রণা, নিঃশ্বাসের কষ্ট, জ্বর এবং ফুসফুসধরা কলা (পিউরা)-র প্রদাহ হইতে পারে। এক্‌স-রে দ্বারা গৃহীত বুকের ছবিতে অনচ্ছ দাগ দেখা যায়। এই রোগে হেপারিন ও ডিণ্ডিভ্যান-জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা হয়। সকল থ্রম্বোসিস রোগের পরে অঙ্গের অবশতা কাটাইবার জন্য ফিজিওথেরাপি করা হইয়া থাকে।

 শিরার থ্রম্বোসিসে আক্রান্ত সংশ্লিষ্ট শিরাটি এবং অঙ্গটি ফুলিয়া ওঠে, বেদনা হয়, জ্বরও হয়। অঙ্গটিকে বিশ্রাম দিলে যন্ত্রণা প্রশমিত হয়। অ্যাণ্টিবায়োটিক ও রক্ততঞ্চনরোধক ঔষধ এবং অবস্থাবিশেষে অস্ত্রোপচারের দ্বারা রোগ নিরসন করা যায়। ফাইলেরিয়া, পলিসাইথিমিয়া ইত্যাদি রোগের প্রভাবে থ্রম্বোসিস হইলে উহাদিগেরও উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। পোর্টাল শিরায় থ্রম্বোসিস হইলে রক্তবমন, রক্তদাস্ত, পেটে জল, প্লীহাবৃদ্ধি ইত্যাদি হইতে পারে। অস্ত্রোপচার দ্বারা ইহার চিকিৎসা করা হয়।

কমলকুমার মল্লিক