বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ঋগ্‌বেদ

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. -)

ঋগ্‌বেদ ভারতীয় আর্যগণের প্রাচীনতম সাহিত্যকৃতির নিদর্শন। ইহার রচনাকাল সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মধ্যে কোনও ঐকমত্য নাই। সমগ্র ঋক্‌সংহিতার সর্বপ্রথম সম্পাদক আচার্য মাক্‌স ম্যূলর বৈদিক যুগকে চারিটি সুনির্দিষ্ট স্তরে বিভক্ত করেন— ১. খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০-১০০০ অব্দ পর্যন্ত ছান্দস যুগ; ২. খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০-৮০০ অব্দ পর্যন্ত মন্ত্র যুগ; ৩. খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০-৬০০ অব্দ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ যুগ; এবং ৪. খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০-২০০ অব্দ পর্যন্ত সূত্র যুগ। ইহার মধ্যে প্রথম দুইটি স্তরের মধ্যেই সমগ্র ঋক্‌সংহিতার মন্ত্ররাজি ঋষিগণ কর্তৃক রচিত এবং সংকলিত হইয়াছিল। মাক্‌স ম্যূলরের এই সিদ্ধান্ত বহু পাশ্চাত্ত্য এবং ভারতীয় গবেষক মোটামুটি মানিয়া লইয়াছেন। কিন্তু কোনও কোনও পাশ্চাত্ত্য ভারততত্ত্ববিদ্ মনীষী উপরি-উক্ত স্তরবিন্যাস সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। মার্টিন হাউগ্ তাঁহার সম্পাদিত ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থের ভূমিকায় আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২৪০০-২০০০ অব্দ বৈদিক যুগের প্রাচীনতম স্তররূপে নির্দেশ করিয়াছেন। হের্‌মান য়াকোবি এবং গেওর্গ ব্যূলেরও মাক্‌স ম্যূলরের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। এই সকল সমালোচনার ফলে মাক্‌স ম্যূলরও পরবর্তী কালে তাঁহার পূর্বমত পরিবর্তন করিয়াছিলেন।

 ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে বালগঙ্গাধর টিলক জ্যৌতিষিক গণনার সাহায্যে ঋগ্‌বেদের এবং অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যের কাল- নির্ণয়ের এক অভিনব প্রচেষ্টা করেন। তিনি ‘অরিয়ন’ নামক তাঁহার সুপ্রসিদ্ধ গবেষণাপ্রবন্ধে ঋক্ -মন্ত্রসমূহের রচনাকাল যে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের ন্যূন হইতে পারে না, ইহা নানা সাক্ষ্য ও যুক্তির সাহায্যে প্রমাণ করিবার চেষ্টা করেন। পাশ্চাত্ত্য গবেষকগণ টিলকের এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে পারেন নাই। সাম্প্রতিক কালে প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করিয়া ঋগবেদের কাল- নির্ণয়ের প্রয়াস দেখা যাইতেছে। এই প্রসঙ্গে ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে মধ্যপ্রাচ্যের বোঘাজ কোই নামক স্থানে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ্‌ হুগো ভিঙ্‌ক্লের কর্তৃক হিত্তী ভাষায় লিখিত কয়েকটি মৃৎ-লেখের আবিষ্কারের উল্লেখ করা যাইতে পারে। পণ্ডিতগণ খ্রীষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দ এই মৃৎ-লেখের কাল বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন।

 বহির্ভারত হইতে আর্যগণের ভারত প্রবেশ এবং ঋগ্‌বেদের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের ঊর্ধ্বে হইতে পারে না, আধুনিক ঐতিহাসিকদের ইহাই সিদ্ধান্ত। মাক্‌স ম্যূলরের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সহিত ইহার মোটামুটি মিলও আছে।

 ‘ঋক্‌সংহিতা’ নামে যে সংকলন-গ্রন্থ বর্তমানে আমরা পাইয়া থাকি তাহাতে মোট সূক্তসংখ্যা হইল ১০১৭ (অথবা ১১টি ‘বালখিল্যসূক্ত’ লইয়া ১০২৮)। এই সূক্তগুলি ১০টি মণ্ডলে বিভক্ত; সেইজন্য ঋক্‌সংহিতার অপর এক সংজ্ঞা ‘দাশতয়ী’। এক একটি মণ্ডল আবার কয়েকটি অনুবাকে বিভক্ত। ঋগ্‌বেদের অপর এক বিভাগ অনুসারে সমগ্র সংহিতাটি আটটি অষ্টকে বিভক্ত। প্রতিটি অষ্টক আটটি বর্গ এবং প্রতি বর্গ পাঁচটি করিয়া মন্ত্র বা ঋক্ লইয়া গঠিত। কিন্তু মণ্ডল-বিভাগটিই প্রাচীন এবং যুক্তিসংগত। দশটি মণ্ডলের মধ্যে ২য় হইতে ৭ম মণ্ডল পর্যন্ত এক-একজন বিশেষ ঋষি এবং তাঁহার বংশধরগণ কর্তৃক পরিদৃষ্ট মন্ত্রের সংকলন। এই জন্য পাশ্চাত্ত্য গবেষকগণ এইগুলিকে ‘ফ্যামিলি বুক্‌স’ আখ্যায় অভিহিত করিয়া থাকেন। ৮ম মণ্ডলটি ‘প্রগাথ-মণ্ডল’ রূপে ও ৯ম মণ্ডল ‘পবমান-মণ্ডল’ রূপে পরিচিত। অবশিষ্ট ১ম এবং ১০ম এই দুইটি মণ্ডল অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের সংযোজন বলিয়া পণ্ডিতগণের অভিমত। ২য় হইতে ৭ম পর্যন্ত ৬টি মণ্ডলের ঋষিগণের নাম যথাক্রমে গৃৎসমদ, বিশ্বামিত্র, বামদেব, অত্রি, ভরদ্বাজ এবং বশিষ্ঠ অথবা তাঁহাদের বংশধরগণ। অপর পক্ষে ১ম মণ্ডলের সূক্তগুলি একাধিক ঋষি কর্তৃক পরিদৃষ্ট; ৮ম মণ্ডলটি প্রধানতঃ কণ্বগোত্রীয় ঋষিগণ কর্তৃক দৃষ্ট ‘প্রগাথ’ মন্ত্রের সংকলন; ৯ম মণ্ডলে সংকলিত প্রত্যেকটি সূক্তের দেবতা ‘পবমান সোম’ অর্থাৎ যজ্ঞে সোমাভিষবকালে ওষধি সোমের উদ্দেশে যে সকল মন্ত্র পাঠ করা হইত সেই সব মন্ত্র এখানে একত্র সংগৃহীত হইয়াছে; এই সকল মন্ত্রের স্রষ্টা একগোত্র-সম্ভূত ঋষি নহেন; কেহ বৈশ্বামিত্র, কেহ কাণ্ব, কেহ কাশ্যপ, কেহ বা আঙ্গিরস ইত্যাদি; ১০ম মণ্ডলটিও বিভিন্ন গোত্রীয় ঋষিগণ কর্তৃক দৃষ্ট মন্ত্রের সংকলন। ১ম মণ্ডলের ঋষিগণ শতর্চি-সংজ্ঞক; ১০ম মণ্ডলের ঋষিগণ ‘ক্ষুদ্রসূক্ত’ এবং ‘মহাসূক্ত’ এই দুই সংজ্ঞায় অভিহিত; অবশিষ্ট মধ্যবর্তী ২য় হইতে ৯ম পর্যন্ত আটটি মণ্ডলের ঋষিগণ ‘মধ্যম’রূপে পরিচিত। আধুনিক গবেষকগণের মতে ২য় হইতে ৯ম মণ্ডল পর্যন্ত ঋক্‌সংহিতার এই মধ্যবর্তী ভাগটিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন; অপর পক্ষে ১ম এবং ১০ম এই দুইটি মণ্ডলের সূক্তসমূহ অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের সংকলন। লক্ষ্য করিবার বিষয় যে ১ম এবং ১০ম মণ্ডলের সুক্তসংখ্যা ও হুবহু একরূপ—প্রত্যেকটিতেই ১৯১টি করিয়া সূক্ত আছে। ২য় মণ্ডলে ৪৩টি; ৩য় মণ্ডলে ৬২টি; ৪র্থ মণ্ডলে ৫৮টি; ৫ম মণ্ডলে ৮৭টি; ৬ষ্ঠ মণ্ডলে ৭৫টি; ৭ম মণ্ডলে ১০৪টি; ৮ম মণ্ডলে ৯২টি এবং ৯ম মণ্ডলে ১১৪টি সূক্ত বর্তমান। এইভাবে মোট সূক্তসংখ্যা দাঁড়ায় ১০১৭। বর্তমানে যে ‘ঋক্‌সংহিতা’ প্রচলিত তাহাতে ১০১৭টি সূক্তই আছে। সংহিতাটি ‘শাকল’ শাখার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ‘ঋক্‌সংহিতা’র শাকল শাখার বিভিন্ন সংস্করণে ৮ম মণ্ডলের অন্তর্গত ১১টি সূক্ত (৮.৪৯-৫৯ সূক্ত) ‘বালখিল্য-সূক্ত’ নামে পরিচিত। এইগুলি সম্ভবতঃ ঋগ্‌বেদের অপর এক শাখার ‘সংহিতা’ হইতে সংগৃহীত।

 ঋগ্‌বেদের খিল বা পরিশিষ্ট রূপে আরও কয়েকটি সূক্ত পাওয়া যায়। মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁহার ‘মহাভাষ্যে’র ‘সস্পশা’ আহ্নিকে স্পষ্টতঃই উল্লেখ করিয়াছেন যে 'বহবৃচ’গণের মধ্যে একুশটি শাখা প্রচলিত ছিল— (‘একবিংশতিধা বাহবৃচ...’)। শাকল শাখা ভিন্ন অবশিষ্ট শাখাগুলি নিশ্চয়ই কালক্রমে লোপপ্রাপ্ত হইয়াছে। হয়ত প্রত্যেক শাখারই বিভিন্ন সংহিতাগ্রন্থ ছিল এবং বিভিন্ন শাখাতে বহু নূতন সূক্তও হয়ত সংকলিত হইয়াছিল।

 ‘ঋক্‌সংহিতা’র উক্ত ১০টি মণ্ডলে সূক্তবিন্যাসের মধ্যেও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসৃত হইয়াছে। প্রধানতঃ দেবতা, ছন্দঃ এবং সূক্তের অন্তর্গত ঋক্‌সংখ্যার উপর ভিত্তি করিয়া ২য় হইতে ৭ম পর্যন্ত ৬টি মণ্ডলে সূক্তগুলি ক্রমিকভাবে সাজানো হইয়াছে। দেখা যায়, এই কয়টি মণ্ডলে সর্বপ্রথমে অগ্নিদেবতা, তাহার অব্যবহিত পরেই ইন্দ্রদেবতার উদ্দেশে উচ্চারিত সূক্তগুলি বিন্যস্ত। তাহার পর ‘বিশ্বেদেবাঃ’, ‘মরুৎ’ প্রভৃতি দেবতাগণের উদ্দেশে সূক্তগুলির স্থান। এক একটি দেবতার উদ্দেশে নির্দিষ্ট সূক্তগুলির বিন্যাসের মধ্যেও একটি ক্রম আছে―প্রত্যেকটি পরবর্তী সূক্ত অব্যবহিত পূর্ববর্তী সূক্ত অপেক্ষা অল্পসংখ্যক ঋক্‌বিশিষ্ট। ৮ম মণ্ডলে কিন্তু সূক্তবিন্যাসে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসৃত। ইহাতে এক একজন ঋষির যতগুলি সূক্ত আছে সবগুলি একত্র করিয়া বিভিন্ন দেবতা অনুসারে সূক্তগুলিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে এমনভাবে যে প্রত্যেকটি দেবতার উদ্দেশে সংকলিত সূক্তগুলির মধ্যে প্রথমটির ঋক্‌সংখ্যা ইহার অব্যবহিত পূর্ববর্তী দেবতার উদ্দেশে সংকলিত সূক্তরাজির ১ম সূক্তের ঋক্‌সংখ্যা হইতে ন্যূন। এই সকল সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া পণ্ডিতগণ অনুমান করেন যে ঋগ্‌বেদের ‘ফ্যামিলি বুক্‌স’ সর্বপ্রথম পৃথক পৃথক ভাবে সংকলিত হইলেও পরবর্তী কালে সেগুলি কতকগুলি সাধারণ নিয়ম অনুসারে পুনর্বিন্যস্ত হইয়াছিল।

 ঋগ্‌বেদের অন্যান্য শাখা কালক্রমে লুপ্ত হইলেও শাকল শাখার সংহিতা যে রক্ষিত হইয়াছে ইহার কারণ মহর্ষি শৌনক তাঁহার ‘ঋক্‌প্রাতিশাখ্য’তে ঋগ্‌বেদের সূক্তগুলির বর্ণ, স্বর এবং ব্যাকরণ-গত বৈশিষ্ট্য এমন পুঙ্খামুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করিয়াছেন যে, পরবর্তী কালে কোনও অবাঞ্ছিত অনধিকারপ্রবেশ অথবা অবক্ষয় ঋক্সংহিতাকে বিকলাঙ্গ করিতে পারে নাই।

 মহর্ষি শাকল্যের ‘পদপাঠ’ বৈয়াকরণ পদ্ধতি অবলম্বনে ঋগ্‌বেদের মন্ত্রগুলির স্বতন্ত্র পদরূপে বিশ্লেষণের সর্বপ্রথম প্রয়াস। ঋক্-মন্ত্রসমূহের যথাযথ অর্থবিষয়ে বহু সন্দেহ এই পদপাঠের সাহায্যে নিরাকৃত হইয়াছে। এতদ্‌ভিন্ন ক্রম, জটা, মালা, শিখা, রেখা, ধ্বজ, দ্বন্দ্ব, রথ এবং ঘন প্রভৃতি বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনে এক একটি মন্ত্রকে পাঠ করিয়া তাহার বিশুদ্ধি সংরক্ষণের জন্য পূর্বাচার্যগণ অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছেন।

 ঋক্‌সংহিতার প্রাচীনতম স্তরের (অর্থাৎ ২য় হইতে ৭ম মণ্ডল) ভাষাগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করিবার মত। এমন অনেক পদ [বিশেষতঃ ‘নাম’ (বিশেষ্য পদ) এবং ‘আখ্যাত’ (ক্রিয়া পদ)] এই সকল সূক্তে দেখিতে পাওয়া যায়, যেগুলি পরবর্তী সংস্কৃত ভাষাতে সম্পূর্ণভাবে অপ্রচলিত হইয়াছে অথবা তাহাদের মূল আদিম অর্থ পরিবর্তন করিয়াছে। এমন কি, মহর্ষি যাঙ্কের সময়ে এবং তাহার বহু পূর্ব হইতেই যে ঋক্-মন্ত্রগুলির প্রকৃত অর্থ সম্বন্ধে অধ্যেতৃ-সম্প্রদায়ের মনে নানারূপ সন্দেহের উদয় হইতেছিল তাহার অজস্র সাক্ষ্য তাঁহার ‘নিরুক্ত’ গ্রন্থে ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইয়া আছে। ‘নিঘণ্টু’ গ্রন্থের প্রথম দুইটি কাণ্ডে (যথাক্রমে ‘নৈঘণ্টু ক’ এবং ‘ঐকপাদিক’ বা ‘নৈগম’) যে সকল বৈদিক শব্দ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই পরবর্তীকালে অপ্রচলিত বা অর্থাস্তরে প্রযুক্ত হইয়াছে। মহর্ষি যাস্ক নির্বচনের (এটিমোলজি) সাহায্যে অতি দুরূহ বৈদিক শব্দগুলির অর্থ আবিষ্কার করিবার যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন। তবে সব সময় তাহা সস্তোষজনক হয় নাই। আধুনিক কালে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান আলোচনার প্রসারের ফলে বৈদিক সংস্কৃতের সহিত প্রাচীন ইরানীয় বা অবেস্তা, গ্রীক, লাতিন, জার্মান, ইন্দো-ইওরোপীয় গোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষার তুলনার দ্বারা অভিনব পদ্ধতিতে বৈদিক মন্ত্ররাজির আধুনিক ব্যাখ্যান হইতেছে। বৈদিক সাহিত্যের বহু অজ্ঞাত গ্রন্থও আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে। ফলে বহু অজ্ঞাত বৈদিক শব্দের অর্থনির্ণয়ের পথ সুগম হইতেছে। ঋক্-মন্ত্রগুলির ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যও উল্লেখযোগ্য। সন্ধি, শব্দরূপ, ধাতুরূপ, প্রত্যয় প্রভৃতির বৈচিত্র্য বৈদিক সংস্কৃতকে যথেষ্ট ঐশ্বর্যমণ্ডিত করিয়াছে। পরবর্তী লৌকিক সংস্কৃত ভাষা এইদিক দিয়া অনেকাংশে সরল। বৈদিক সংস্কৃতে সমাসের স্বল্পতা লক্ষণীয়। বাক্যগঠনরীতির দিক দিয়াও এই দুইটি ভাষার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বর্তমান। বৈদিক ভাষার আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ইহার ‘স্বর’ (অ্যাক্‌সেণ্ট)। উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত―এই ত্রিবিধ স্বরের সাহায্যে প্রতিটি মন্ত্র পাঠ করা হইত। এমন কি এক একটি পদের বাহ্যরূপের অভিন্নতা সত্ত্বেও স্বরভেদবশতঃ অর্থভেদ সংঘটিত হইত। বৈদিক মন্ত্রগুলি এইভাবে স্বর-চিহ্নিত হওয়ায় তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় বহু অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থল আলোকিত হইতে পারিয়াছে।

 বৈদিক সংস্কৃতের সহিত প্রাচীন ইরানীয়গণের ধর্মগ্রন্থ অবেস্তার ভাষার ঘনিষ্ঠ সাম্য লক্ষণীয়। অনেক ক্ষেত্রে অবেস্তার মন্ত্রগুলিকে কয়েকটি ধ্বনিপরিবর্তনের সাহায্যে ঋক্-মন্ত্রে রূপান্তরিত করাও সম্ভব।

 ঋক্-মন্ত্রগুলি মূলতঃ গায়ত্রী (২৪ অক্ষর), উষ্ণিহ্‌, (২৮), অনুষ্টুভ্‌ (৩২), বৃহতী (৩৬), পঙ্‌ক্তি (৪০), ত্রিষ্টুভ্‌ (৪৪), জগতী (৪৮)— এই সাতটি প্রধান ছন্দে গঠিত।

 ‘ঋক্’ শব্দের দ্বারা বুঝায় পাদনিবদ্ধ মন্ত্র। ঋষিদৃষ্ট এই সকল মন্ত্র প্রধানতঃ দেবস্তুতির উদ্দেশ্যেই উচ্চারিত। হিরণ্য, পশু, পুত্র প্রভৃতি ঐহিক এবং স্বর্গাদি পারলৌকিক অর্থাদি লাভের ইচ্ছায় ঋষিগণ এই সকল ঋক্-মন্ত্রের সাহায্যে দেবতাগণের স্তুতি করিয়াছেন। আচার্য যাস্ক ঋক্‌গুলিকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন: পরোক্ষকৃত, প্রত্যক্ষকৃত এবং আধ্যাত্মিক। দেবতাকে যেখানে পরোক্ষভাবে স্তব করা হয় এবং ক্রিয়াপদ প্রথম পুরুষে প্রযুক্ত হয়— তাহা ‘পরোক্ষকৃত’ ঋক্; দেবতা যেখানে ঋষির প্রত্যক্ষভূত এবং ক্রিয়াপদের মধ্যম পুরুষ প্রয়োগের দ্বারা তাঁহাকে সম্বোধন করা হয় সেখানে ঋক্‌টি ‘প্রত্যক্ষকৃত’; এবং যখন ঋষি স্বয়ং দেবতার সহিত তাদাত্ম্যপ্রাপ্ত হইয়া উত্তম পুরুষে ক্রিয়াপদের সাহায্যে আত্মস্তুতিতে প্রবৃত্ত হন তখন ঋক্‌টি ‘আধ্যাত্মিক’ রূপে বিবেচিত হইয়া থাকে। যাস্কের মতে ঋক্‌সংহিতায় পরোক্ষকৃত এবং প্রত্যক্ষকৃত মন্ত্রেরই বাহুল্য; আধ্যাত্মিক মন্ত্রের সংখ্যা খুবই অল্প। শুধু দেবস্তুতিই নহে, কোনও কোনও সূক্তে বাকোবাক্য বা কথোপকথন বর্ণিত হইয়াছে দেখা যায়। এইগুলি এখন সংবাদসূক্তরূপে অভিহিত। উদাহরণস্বরূপ ঋগ্‌বেদের ১০.৯৫ সূক্তে পুরূরবা এবং উর্বশীর (‘ঊর্বশী’ দ্র) সংবাদ উল্লেখ করা যায়। কোনও কোনও মন্ত্রে আবার আথর্বণ মন্ত্রের ন্যায় শপথ, অভিশাপ প্রভৃতি পরিদৃষ্ট হয়। ‘অক্ষসূক্তে’র ন্যায় সূক্তগুলিতে অনেক লৌকিক বিষয়বস্তুর অবতারণাও দেখা যায়। আবার এমন কতকগুলি সূক্ত আছে যেগুলিতে অতি গম্ভীর দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করা হইয়াছে। যেমন ঋগ্‌বেদের প্রসিদ্ধ ‘নাসদীয়সূক্ত’ (ঋগ্‌বেদ ১০. ১২৯) এবং ‘পুরুষসূক্ত’ (ঋগ্‌বেদ ১০. ৯০)। শৌনকীয় বৃহদ্দেবতার মতে এইগুলি ‘ভাববৃত্ত’ অর্থাৎ সৃষ্টিবিষয়ক সূক্ত। আধুনিক গবেষকগণের মতে এইগুলি দার্শনিক সূক্তরূপে পরিগণিত হইবার যোগ্য। এইভাবে দেখিতে পাওয়া যায় যে ঋষিগণের মন্ত্রদৃষ্টি বিচিত্র অভিপ্রায়সম্ভূত।

 ঋগ্‌বেদের সূক্তরাজিতে যে সকল দেবতার স্তব দৃষ্ট হয়, তন্মধ্যে অগ্নিই (‘অগ্নি’ দ্র) সর্বপ্রধান। এইজন্য অগ্নির উদ্দেশে উচ্চারিত মন্ত্রের সংখ্যাই সর্বাধিক। ইহার পরেই ইন্দ্রের স্থান (‘ইন্দ্র’ দ্র)। আদিত্য, মিত্র, বরুণ, বিষ্ণু, উষস্, অশ্বিদ্বয়, সূর্য, পর্জন্য, নদী ও দেবতা-স্বরূপিণী উভয়বিধ সরস্বতী ইত্যাদি অসংখ্য দেবতার স্তুতিও ঋগ্‌বেদের মন্ত্ররাজিতে পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। বহু মন্ত্রে দেবতাগণের পুরুষ-আকৃতি কল্পিত হইয়াছে, আবার কোনও কোনও মন্ত্রে তাহার বিপরীত কল্পনাও আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈদিক ঋষিগণ নৈসর্গিক ঘটনা বা পদার্থসমূহকে নানা দেবতা এবং উপাখ্যান রূপে কল্পনা করিয়া মন্ত্র রচনা করিয়াছেন। ইন্দ্র এবং বৃত্রের উপাখ্যানটিকে যাস্ক নৈসর্গিক বৃত্তান্তেরই প্রতিরূপক রূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। সেইরূপ মিত্র, বরুণ, অশ্বিদ্বয়, উষস্ প্রভৃতি দেবতা সম্বন্ধীয় উপাখ্যানকে নৈসর্গিক ঘটনাবলীর সাহায্যে ব্যাখ্যা করিবার প্রয়াস দেখা যায়। দেবতার সংখ্যা বিষয়েও মতভেদ আছে। যাঁহারা ‘অধিযজ্ঞ’-পক্ষ অবলম্বনপূর্বক মন্ত্র ব্যাখ্যা করেন তাঁহাদের মতে নামভেদে দেবতার স্বরূপভেদ স্বীকার করিতে হইবে। নৈরুক্ত সিদ্ধান্তে তিনটিই দেবতা— ‘পৃথিবীস্থান’ দেবতা অগ্নি, ‘অন্তরিক্ষস্থান’ ইন্দ্র অথবা বায়ু এবং ‘দ্যুস্থান’ সূর্য। অন্য সকল দেবতাই এই তিন দেবতার প্রকারভেদ মাত্র। আচার্য যাঙ্কের ইহাই মত। আবার ‘আধ্যাত্মিক’ সম্প্রদায়ের যাঁহারা আচার্য তাঁহাদের মতে দেবতা এক এবং অভিন্ন; তিনিই বিভিন্ন রূপে প্রতিভাসমান হইতেছেন, বিভিন্ন ভাবে ঋষিগণকর্তৃক স্তুত হইয়াছেন। সমস্ত দেবতাই সেই মহান আত্মা বা পরব্রহ্মের বিবর্তমাত্র। একমাত্র ‘আদিত্য’ বা সূর্য’ই ঋগ্‌বেদের মন্ত্ররাজিতে বিভিন্ন ভাবে স্তুত হইয়াছেন, মহর্ষি কাত্যায়ন তাঁহার ‘সর্বানুক্রমণিকা’ গ্রন্থে এইরূপ একটি মতও উল্লেখ করিয়াছেন।

 বৈদিক এই দেবতামণ্ডলীর সহিত বহু স্থলে ইন্দো-ইওরোপীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য জাতির― যেমন গ্রীক, রোমক, জার্মান, লিথুয়ানীয় প্রভৃতি দেবমণ্ডলীর স্বরূপ–কল্পনায় ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তুলনামূলক আলোচনার ফলে ইন্দো-ইওরোপীয় জাতিগণের ধর্মবোধের বহু সাদৃশ্য আমাদের সম্মুখে উদ্ঘাটিত হইয়াছে।

 বেদপন্থী ভারতীয় আচার্যগণ যদিও ‘বেদ’কে অপৌরুষেয় অথবা ঈশ্বরপ্রণীত, অতএব অনাদিরূপে স্বীকার করিয়া থাকেন, তথাপি বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বনে বিচার-বিশ্লেষণই আধুনিক গবেষকগণের বেদ-ব্যাখ্যার প্রধান শৈলী। এই পদ্ধতি অবলম্বনে সমগ্র ঋগ্‌বেদ অধ্যয়ন করিলে প্রাচীন ভারতীয় আর্যগণের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বহু কৌতুহলোদ্দীপক এবং মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করা সম্ভব।

 বৈদিক আর্যগণের দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাসম্পদেরও বহু প্রমাণ ঋক্‌সংহিতার একাধিক সূক্তে বিদ্যমান। ভারতীয় আস্তিক দর্শনশাস্ত্রের প্রধান ছয়টি প্রস্থান যে আপন আপন দার্শনিক চিন্তার ভিত্তি ঋক্‌-মন্ত্রগুলির উপর প্রতিষ্ঠিত করিতে যত্নশীল, ইহা বৈদিক ঋষিগণের উন্নত দার্শনিক মনীষারই পরিচায়ক। শুধু তাহাই নহে— পরবর্তী বহু পৌরাণিক উপাখ্যানের বীজও ঋক্‌সংহিতার সূক্তরাজির মধ্যে নিহিত।

 কবিকর্ম হিসাবেও এই সূক্তগুলির যথেষ্ট গৌরব আছে। এই মন্ত্রগুলির নির্মাণকৌশল, ইহাদের শব্দনির্বাচন, বাক্যগঠন প্রভৃতির মধ্যে সূক্ষ্ম শিল্পপ্রতিভার নিদর্শন বহুস্থলেই ধরা পড়িবে। বিশেষতঃ ঋগ্‌বেদের ঔষস সূক্তগুলির মধ্যে কবিপ্রতিভার বিস্ময়কর বিকাশ লক্ষ্য করা যায় (‘উষস্’দ্র)।

 ওল্‌ডেনবের্গ, পিশেল, গেল্‌নার, ব্লুমফিল্ড, গ্রাস্‌মান প্রমুখ পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতগণ ঋগ্‌বেদের ভাষার ভিন্ন ভিন্ন দিক লইয়া যেভাবে আলোচনা করিয়াছেন, আমাদের দেশে তাহার গুরুত্ব অনুধাবন করিবার মত মনোভাব কমই দেখা গিয়াছে।

 এক সময়ে বাংলা দেশে বেদচর্চার অভাব লক্ষ্য করিয়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চতুর্বেদ অধ্যয়নের জন্য চারি জন ব্রাহ্মণকে কাশী পাঠাইয়াছিলেন (১৮৪৫-৪৬ খ্রী)। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তিনি ঋগ্‌বেদের অনুবাদও অংশতঃ প্রকাশ করেন (১৮৪৮-৭১ খ্রী পর্যন্ত, ১২৪৮টি ঋক্)। পরে (১৮৮৫-৮৭ খ্রী) ইহার সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ করেন রমেশচন্দ্র দত্ত। ‘খিল’ দ্র।

দ্র ঋগ্বেদসংহিতা, ১-৮ অষ্টক, রমেশচন্দ্র দত্ত অনূদিত, কলিকাতা, ১৮৮৫-৮৭খ্রী; ঐ পুনর্মুদ্রিত, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও মণি চক্রবর্তী সম্পাদিত, কলিকাতা, ১৯৬৩ খ্রী; Max Müller ed., Rig-Veda-Samhita (together with the Commentary of Sayanacharya), vols. I-VI, London, 1849-74; H. Oldenberg, Die Religion des Veda, Berlin, 1894; E. J. Thomas, Vedic Hymns, London, 1923.

বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য