ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/একক ক্ষেত্রতত্ত্ব
(পৃ. ৯-১৩)
একক ক্ষেত্রতত্ত্ব ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি। পদার্থবিদ্যাকে জ্যামিতিক রূপ দিবার প্রচেষ্টা বিজ্ঞান-অনুরাগীদের কাছে সুবিদিত। সাধারণ আপেক্ষিকবাদে (‘আপেক্ষিকবাদ’ দ্র) শক্তি সম্বন্ধে ধারণা করা হয় জ্যামিতির মারফত। মহাকর্ষ (গ্র্যাভিটেশন) শক্তির ব্যাপারে এই প্রচেষ্টা সাফল্য লাভ করিয়াছে। তবে এই সার্থকতা সম্পূর্ণ হইত যদি এই তত্ত্ব তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হইত। এখানে মনে রাখা দরকার যে, ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে আইনস্টাইন যখন তাঁহার নূতন মহাকর্ষ তত্ত্ব সৃষ্টি করেন তখন তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রের অস্তিত্ব সম্বন্ধে মানুষের কোনও ধারণা ছিল না। আর তাহার সম্যক প্রয়োজনও ঘটে নাই। তখনকার পদার্থবিদ্যার একটা বিশেষ ধারণা ছিল, দৃশ্যতঃ বিশ্বচরাচরে যত বিভিন্ন শক্তিরই অস্তিত্ব থাকুক না কেন, সবারই উৎপত্তি মূলতঃ মহাকর্ষ বা তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র হইতে।
আমরা আরও জানি যে সাধারণ আপেক্ষিকবাদে ক্ষেত্র নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন হয় এক ব্যবকলনীয় সমীকরণ সমষ্টির। অন্যভাবে ইহাদের বলা হয় ক্ষেত্র-সমীকরণ। এই সকল ক্ষেত্র-সমীকরণ দ্বারা ক্ষেত্র-পরিবর্তকসমূহ (ফিল্ড ভ্যারিয়েবল্স) নির্ণীত হয়। বাহ্যতঃ ক্ষেত্রপরিবর্তকদের সংখ্যা ১৬টি। তবে আসলে মাত্র ১০ টি ক্ষেত্র-পরিবর্তকই মহাকর্ষ-ক্ষেত্র বা জ্যামিতিক ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণ নির্ণয় করে। তাহার কারণ চতুর্মাত্রিক দেশে (স্পেস) সুসামঞ্জস্যের অস্তিত্ব রহিয়াছে। এই দশটি মূল সুসমঞ্জন ক্ষেত্র-পরিবর্তকের গাণিতিক গুণাবলীর উল্লেখ এখানে নিষ্প্রয়োজন।
এখন দেখা যাক, এই সকল ক্ষেত্র-পরিবর্তক যে ক্ষেত্র নির্ণয় করে তাহার বৈশিষ্ট্য কি। মহাকর্ষক্ষেত্রের উৎপত্তি বস্তুর অবস্থান হইতে। এক বস্তুর মহাকর্ষ-ক্ষেত্রের প্রভাব ক্রমে ক্রমে অন্যান্য বস্তুসমষ্টির উপরে গিয়া পড়ে। কাজেই যে বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করা হইতেছে, তাহা নির্ভর করিবে বস্তুর ভর, গতিবেগ এবং উহার তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর। চলমান তড়িৎবাহী বস্তু তাহার গতিপথের চারিদিকে তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে বলিয়া শেষোক্ত নির্ভরশীলতার উদ্ভব হয়।
সাধারণ আপেক্ষিকবাদে বস্তুর ভর, তাহার গতিবেগ ও আনুষঙ্গিক তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র, ভা সবের স্থান অভিজ্ঞতা-জগতের অবদান হিসাবে। কারণ কোনও বস্তুর উপরে কার্যকর তড়িৎ-চৌম্বক শক্তি তাহার ভরের উপর নির্ভরশীল নয়, ইহা নির্ভর করে তাহার তড়িৎআধানের উপর। কাজেই তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী বস্তুর গতিপথ নির্ণয়ের জন্য বস্তুর ভর, তড়িৎআধান ও তাহার নিজস্ব প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞানের প্রয়োজন। এইখানেই মহাকর্ষ-ক্ষেত্রের সহিত তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের মূল প্রভেদ। মহাকর্ষ-ক্ষেত্র নিজের জোরে এবং একাই আমাদের বিশ্বের জ্যামিতিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে। সাধারণ আপেক্ষিকবাদে তাই এই দুই ক্ষেত্রের আলোচনা বিভিন্নমুখী। সহজ কথায়, মহাকর্ষ-ক্ষেত্রের যেন দুইটি দিকই আছে—যথা, পদার্থিক ও জ্যামিতিক। অন্য দিকে তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের মাত্র একটি দিক আছে; আর সেইটি হইল পদার্থিক।অবশ্য তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র যে একটি ক্ষেত্র সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। তাই ইহার জ্যামিতিক ব্যাখ্যাও সম্ভবপর হওয়া উচিত। বস্তুতঃ ধ্রুপদী পদার্থবিদ্যার লক্ষ্য হইল বিশ্বের একটি সর্বজনগ্রাহ্য জ্যামিতিক কাঠামো হইতে, এক ও অদ্বিতীয় একটি প্রাকৃতিক নিয়মের সাহায্যে, কেমন করিয়া প্রকৃতির সব রকমের শক্তির অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়। কিন্তু ক্ষেত্রতত্ত্বের কাঠামোতে বস্তুর ভর, বস্তুর গতিবেগ বা শক্তি—এই সব সংজ্ঞার ন্যায্য স্থান নাই। এইসব সংজ্ঞা নিউটনীয় যুগের স্মৃতিচিহ্ন। ক্ষেত্রতত্ত্বে এই সব সংজ্ঞার বদলে প্রয়োজন নৃতন সংজ্ঞার (‘ক্ষেত্রতত্ত্ব’ দ্র)। বস্তুর ভরের বদলে প্রশ্ন তুলিতে হইবে কোন্ স্থানে ক্ষেত্রের মান বেশ বেশি। বস্তুর গতিবেগ বা শক্তির পরিবর্তে প্রশ্ন করিতে হইবে ক্ষেত্রের মান কেমনভাবে স্থান হইতে স্থানান্তরে, কাল হইতে কালাস্তরে বদলায়। আর ক্ষেত্রের শক্তিশালী অংশটুকুরই বা স্থান-কালের সঙ্গে সঙ্গে কতটা পরিবর্তন কেমন ভাবে ঘটে। এই অসংগতির জন্যই সাধারণ আপেক্ষিকবাদে মহাকর্ষ-ক্ষেত্র ও তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পূর্ণ বিভিন্ন ভাবে আলোচিত। সেখানে বস্তু ও ক্ষেত্রের আচরণবিধির যুপগৎ সহ-অবস্থান লক্ষ্য করার বিষয়।
মহাকর্ষ ও তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে এই প্রভেদ মাত্র অল্প কয়েক জন বিজ্ঞানী সত্যই সুনজরে দেখিতে পারেন নাই। উভয় ক্ষেত্রকেই তুল্যভাবে দেখার জন্য আন্দোলন ধীরে ধীরে গড়িয়া ওঠে। বিজ্ঞানীরা এই দুই ক্ষেত্রতত্ত্বকে যে একক ক্ষেত্রতত্ত্ব দ্বারা স্থানচ্যূত করার প্রয়াস করেন, তাহাকেই একক ক্ষেত্রতত্ত্ব নামে অভিহিত করা হয়।
এই প্রচেষ্টায় সর্বপ্রথম অগ্রণী হন (১৯১৮ খ্রী) জার্মানির খ্যাতনামা, অধুনা পরলোকগত, গণিতজ্ঞ হেরমান ভাইল। সাধারণ আপেক্ষিকবাদে দুইটি ঘনসন্নিহিত বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব অপরিবর্তনীয়। আলোক-কোণও একটি বিশেষ প্রকার দূরত্বের সূচক। সেখানে দূরত্বের মাপ শূন্য। তাই আলোক-কোণও অপরিবর্তনীয়। ভাইল ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দের মহাকর্ষতত্ত্বকে বিশদভাবে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফলে তিনি চিন্তা করিলেন কেমন করিয়া বিশ্ব-জ্যামিতিকে বদলানো যায়, যাহাতে আলোক-কোণ অপরিবর্তনীয় থাকে অথচ সাধারণ দূরত্বের অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়। কারণ ভাইল যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান তাহা হইল: বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে কোনও দূরত্বের মাপ সাধারণতঃ বিভিন্নই হইবে, কারণ তাহা নির্ভর করিবে কোন্ পথ অনুসরণ করিয়া তুলনা করা হইয়াছে তাহার উপর।
এখানে লক্ষণীয় যে, আলোক-কোণের উপর অবস্থিত দূরত্বের মান সম্পূর্ণ নির্ধারিত হইবে পূর্বে উল্লিখিত দশটি ক্ষেত্র-পরিবর্তকের আনুপাতিক হার দ্বারা। অর্থাৎ পরিবর্তকগুলির নিজস্ব, আসল মূল্য নির্ণয়ের প্রয়োজন নাই। তাই ভাইলকে নূতন এক রূপান্তরের অবতারণা করিতে হইল; আর সেটি সাধারণ আপেক্ষিকবাদের স্থিতিনির্দেশকসমূহের রূপান্তরের উপর। তিনি তথাকথিত গেজ-রূপান্তরের অস্তিত্ব ধরিয়া লইলেন। এই রূপান্তরের কাজ হইল, ১০টি ক্ষেত্র-পরিবর্তককে একটি উৎপাদক দিয়া গুণ করা, আর সেই উৎপাদক হইল স্থিতিনির্দেশকগুলির অনির্ণীত ফাংশন। আবার যে কোনও দৈর্ঘ্য-খণ্ড বা দূরত্বই ১০টি ক্ষেত্র-পরিবর্তক বা তাহাদের একঘাতিক সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল। কাজেই দূরত্বও একই উৎপাদক দিয়া পরিবর্তিত হইবে। অর্থাৎ সাধারণতঃ দূরত্ব বা দৈর্ঘ্যখণ্ড গেজ-অপরিবর্তনীয় থাকিবে না। কিন্তু যেহেতু আলোক-কোণের উপর অবস্থিত দূরত্বের মাপ শূন্য, সেইজন্য উৎপাদকের কোনও অবদান নাই। অর্থাৎ আলোককোণের উপর অবস্থিত দূরত্ব গেজ-অপরিবর্তনীয় থাকিবে। ইহার দ্বারা অবশ্য স্থিতি-নির্দেশক রূপান্তরে দূরত্বের অপরিবর্তন মোটেই ব্যাহত হইল না। ভাইল এই ধরনের এক নূতন জ্যামিতি খাড়া করিতে সক্ষম হইলেন। তাঁহার জ্যামিতি রীমানীয় জ্যামিতি হইতে পৃথক, উহাকে এক কথায়, অ-রীমানীয় জ্যামিতি বলা যায়। তবে তাঁহার জ্যামিতি স্থিতি-নির্দেশক ও গেজ—এই উভয় প্রকার, রূপান্তরে সমপরিবর্তনীয়।
ভাইলের এই জ্যামিতি রীমানীয় জ্যামিতি অপেক্ষা ব্যাপকতর। কারণ রীমানীয় জ্যামিতি—যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মহাকর্ষতত্ত্ব গড়িয়া উঠিয়াছে—সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয় ষোলটি (মূলতঃ দশটি) সুমসঞ্জস ক্ষেত্রপরিবর্তকের দ্বারা। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় ইহারা হইল চতুর্মাত্রিক ক্ষেত্রে মাত্রিক টেন্সরের ষোলটি উপাঙ্গ। এই মাত্রিক টেন্সরসহ আরও চারিটি নূতন ক্ষেত্র-পরিবর্তকের দ্বারা ভাইলের জ্যামিতি নির্ধারিত হয়। এই নূতন চারিটি পরিবর্তক মাত্রিক দেশে তথাকথিত একটি ভেক্টরের চারিটি উপাঙ্গ। ভাইল-তত্ত্বে সুসমঞ্জস মাত্রিক টেন্সর, অর্থাৎ তাহার মূল দশটি উপাঙ্গ, নির্ধারণ করে মহাকর্ষ-ক্ষেত্র; আর ভেক্টর-উপাঙ্গগুলি নির্ধারণ করে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র। তবে ভাইলের এই বিরাট প্রচেষ্টা দুইটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় ঘটাইতে পারে নাই।
ভাইলের এই প্রচেষ্টাকে অন্য এক দিক হইতে সার্থক করিয়া তোলার চেষ্টা করেন অস্ট্রীয় গণিতজ্ঞ থেয়োডোর কালুৎসা (১৯২১ খ্রী)। ভাইল-তত্ত্বে যে ১৪টি (১০+৪) ক্ষেত্র-পরিবর্তকের স্থান আছে, কালুৎসা তাহাদের উপস্থাপিত করিতে চাহিলেন পঞ্চমাত্রিক দেশের মারফত। দৃশ্যতঃ পঞ্চমাত্রিক দেশে মাত্রিক টেন্সরের উপাঙ্গের সংখ্যা হইল ২৫টি। তবে সুসামঞ্জস্যহেতু ইহাদের কার্যকর সংখ্যা হইল ১৫। অর্থাৎ নূতন জ্যামিতি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন ১৫টি ক্ষেত্র-পরিবর্তকের। কিন্তু পদার্থিক জগৎ চতুর্মাত্রিক। তাই কালুৎসাকে ধরিয়া লইতে হইল, যদি সুবিধামত স্থিতিনির্দেশকমণ্ডলী পছন্দ করা যায়, তাহা হইলে টেন্সরের উপাঙ্গসমূহ অপদার্থিক—অর্থাৎ, পঞ্চম মাত্রার উপর নির্ভর করিবে না। আর যেহেতু মোট ১৪টি ক্ষেত্রপরিবর্তকের প্রয়োজন, তাই কালুৎসা প্রস্তাব করিলেন যে, উপরি-উক্ত পরিস্থিতিতে একটি উপাঙ্গ ধ্রুবক ও তাহার মান এক। এইভাবে পঞ্চমাত্রিক দেশের দৈর্ঘ্যখণ্ডকে ক্ষেত্র-পরিবর্তকগুলির সাহায্যে এমনভাবে খাড়া করিলেন যাহাতে তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎ-বাহী বস্তুকণাপুঞ্জের গতি-সমীকরণ রূপান্তরিত হয় বক্রদেশের তথাকথিত ‘সরলরেখা’র সমীকরণে।
এই পঞ্চমাত্রিক আপেক্ষিকবাদকে আরও মার্জিত ও পরিবর্ধিত করেন (১৯২৬-২৭ খ্রী) সুইডেনের পদার্থবিদ্ অস্কার ক্লাইন। কালুৎসা-তত্ত্বেরই এক সুন্দর বিকল্প রূপ দিয়াছেন অস্ওয়াল্ড ভেব্লেন ও ব্যানেশ হফ্মান (১৯৩৩ খ্রী), এবং ভোলফ্গাংগ্ পাউলি (১৯৩৩ খ্রী)। তাঁহাদের তত্ত্ব প্রজেক্টিভ আপেক্ষিকবাদ নামে অভিহিত। ভাইলের বিরাট প্রচেষ্টা ফলবতী না হইলেও তাহা আরও নানা বৈজ্ঞানিককে নূতন প্রেরণা দেয়। ভাইলের কাজের খুব অল্প দিনের মধ্যেই ইংরেজ পদার্থবিদ আর্থার এডিংটন ভাইলের জ্যামিতিকে আরও ব্যাপক করার চেষ্টা করেন (১৯২১ খ্রী)। এডিংটনের এই প্রচেষ্টা (এবং বস্তুতঃ পরে যাঁহারা ভাইল-এডিংটনের প্রদর্শিত পথে সাফল্যের চেষ্টা করেন তাঁহাদের প্রায় সকলেরই প্রচেষ্টা) মূলতঃ সমান্তরত্বের সংজ্ঞার উপর ভিত্তি করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে।
সাধারণ আপেক্ষিকবাদের সৃষ্টির ফলে বক্রদেশে সমান্তরত্বের প্রশ্ন প্রকট হইয়া ওঠে। কারণ পদার্থবিদ্যার প্রয়োজন মিটাইতে বক্রদেশে ভেক্টর তত্ত্ব খাড়া করা অপরিহার্য হইয়া পড়িল। জানিবার প্রয়োজন হইল, চতুর্মাত্রিক দেশে এক বিন্দু হইতে অন্য এক বিন্দুতে গেলে ভেক্টরগুলির কি পরিবর্তন ঘটে। এউক্লিদেস (ইউক্লিড) -এর জ্যামিতির কথা ধরা যাক। সেখানে একই বিন্দু হইতে নির্গত দুইটি বিভিন্ন ভেক্টরের অন্তর পরিমেয়। প্রয়োজন শুধু ভেক্টরগুলির ত্রিভুজ নিয়মের সঙ্গে পরিচিতি। কিন্তু ভেক্টর দুইটি যদি বিভিন্ন বিন্দু হইতে নির্গত হয় তাহা হইলে উপরি-উক্ত পন্থা সরাসরি প্রয়োগ করা যাইবে না। অর্থাৎ পন্থা যেখানে প্রযোজ্য, সেই পরিস্থিতি আগে তৈয়ারি করিয়া লইতে হইবে। বিশদ করিয়া বলিলে বলিতে হয়, একটি ভেক্টরকে এমন সমাস্তরভাবে পরিবহন করিতে হইবে যাহাতে পরিবাহিত ভেক্টরের উৎস-বিন্দু দ্বিতীয় ভেক্টরের উৎস-বিন্দুর সহিত মিলিয়া যাইতে পারে। কেবলমাত্র সেই রকম পরিস্থিতিতেই সাধারণ ভেক্টর-সমন্বয়ের নিয়ম প্রযোজ্য। সুতরাং দেখা যাইতেছে দুইটি বিভিন্ন বিন্দু হইতে নির্গত ভেক্টরের অন্তর জানিতে হইলে সমান্তর পরিবহনের সংজ্ঞাও নির্ণয় করিতে হইবে। জ্যামিতি এউক্লিদেশীয় বা অন্যরূপ যাহাই হউক, ইহার যাথার্থ্য অনস্বীকার্য।
১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে ইতালির গণিতজ্ঞ তুলিও লেভি-চিভিতা সমান্তর পরিবহনের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা খাড়া করিতে সক্ষম হন। পরিবাহিত ভেক্টরের উপর সমান্তর পরিবহনের প্রভাবও গণনীয়। বস্তুতঃ, এই রকম পরিবহন মারফত তথাকথিত ক্রিস্টোফেল প্রতীকের জ্যামিতিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাইতে পারে। এই নূতন সংজ্ঞার ফলে দেশ সম্বন্ধে যে ধারণা গড়িয়া ওঠে তাহা হইল, দেশ অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ড দিয়া তৈয়ারি; আর বলা যাইতে পারে ঘনসন্নিহিত খণ্ডগুলি সমান্তর পরিবহন দ্বারা সংযোজিত। আর এই সমান্তর পরিবহনের সাহায্যে বলা সম্ভব, কোনও অবস্থায় একটি ক্ষুদ্র খণ্ডের মধ্যে অবস্থিত ভেক্টরকে সন্নিহিত আর একটি খণ্ডের ভেক্টরের সমান্তর বলিয়া গণ্য করা যাইবে। ক্ষেত্র-বিশারদদের ভাষায় সমান্তর পরিবহন একটি পরিবহনক্ষেত্র নির্ধারণ করে। আর এই পরিবহনক্ষেত্রের পরিচয় পাওয়া যায় তথাকথিত ক্ষেত্র পরিবর্তকসমূহের মাধ্যমে। বাহ্যতঃ ইহাদের সংখ্যা হইল ৬৪। তবে সুসামঞ্জস্যহেতু ইহাদের আসল সংখ্যা হইল ৪০। এই ৪০টি পরিবহনক্ষেত্র-পরিবর্তকদের সর্বজনগ্রাহ্য নাম হইল আপন-সংযোজক (অ্যাফিন কানেক্শন)। উপরে যাহা বলা হইয়াছে তাহা হইতে দেখা যাইতেছে যে কোনও ব্যবকলনীয় জ্যামিতির কথাই চিন্তা করা যাক না কেন, তাহার মূলে একটি নির্দিষ্ট সমান্তর পরিবহন বা আপন-সংযোজকদের কথা ভাবিতে পারা যাইবে।
মাত্রিক প্রকৃতির সহিত নূতন এই জ্যামিতিক সংজ্ঞার সংযোজনের ফলে তদানীন্তন পদার্থবিদ্দের মধ্যে নূতন আশার সঞ্চার হয়। তাঁহারা আশা করিলেন যে এই দুই সংজ্ঞার দৌলতে মহাকর্ষ ও তড়িৎ-চৌম্বক, উভয় ক্ষেত্রকেই একটি জ্যামিতির সাহায্যে বর্ণনা করা যাইবে। বস্তুতঃ ভাইল-এডিংটন ও কালুৎসা -তত্ত্ব লইয়া বিজ্ঞানী মহলে যথেষ্ট আলোচনা হয়। অবশ্য ইহাদের কাহারও তত্ত্বই পূর্ণ সাফল্য দাবি করিতে সক্ষম হয় নাই।
স্বভাবতঃই এই সমস্যা সমাধানে নিজেকে পূর্ণশক্তিতে নিয়োগ করেন (১৯২৯-৫৫ খ্রী) বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ্ অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। জীবনের শেষার্ধ তিনি অতিবাহিত করেন এই সমস্যারই সমাধানে। এই প্রচেষ্টায় কখনও তিনি একাই, কখনও সহকর্মীসহ, বিবিধ গবেষণা প্রকাশ করিতে শুরু করেন। তাঁহার হাতে একক ক্ষেত্রতত্ত্ব নূতন নূতন রূপ পরিগ্রহ করিতে থাকে। একই সময়ে একক ক্ষেত্রতত্ত্বে কণাতমবাদের এক বিশিষ্ট স্রষ্টা, জার্মান পদার্থবিদ এরউইন শ্রোয়েডিংগার-এর অবদান নূতন ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আইনস্টাইন ও শ্রোয়েডিংগারএর অবদানের গুরুত্ব অবিসংবাদিত বটে, তবে এ কথা ও অনস্বীকার্য যে আজ পর্যন্ত আমরা যে জ্ঞান অর্জন করিয়াছি তাহার ভিত্তিতে বলা যায় যে ইহাদের প্রতিটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে।
আইনস্টাইন ও শ্রোয়েডিংগার শেষ পর্যন্ত যে সব প্রচেষ্টা করিয়াছেন তাহা মূলতঃ এডিংটনের আপন-ক্ষেত্রের উপর ভিত্তি করিয়া। কার্যতঃ, আপন-ক্ষেত্রের সংজ্ঞার সঙ্গে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে নূতন এক দাবি। সে দাবির উদ্দেশ্য হইল: মাত্রিক টেন্সরের ও আপন-সংযোজকদের সুসামঞ্জস্য সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে বিচার করিলে বলা যাইতে পারে যে, বিশুদ্ধ মহাকর্ষতত্ত্বে সুসমঞ্জস মাত্রিক টেন্সরের যে সার্থকতা, আইনস্টাইনের নূতন তত্ত্ব খাড়া করিতে অসমঞ্জস টেন্সরেরও সেই সার্থকতা। এই নূতন তত্ত্বে তাই মাত্রিক টেন্সরের ১৬টি কার্যকর উপাঙ্গ; আর আপন-সংযোজকদের সংখ্যা হইল ৬৪। আর সামঞ্জস্য ত্যাগ করার উদ্দেশ্য হইল, মাত্রিক টেন্সরের প্রতি-সমঞ্জস অংশের সাহায্যে তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র বিশ্লেষণ, কারণ তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রেও অনুরূপ, অর্থাৎ প্রতি-সমঞ্জস, বস্তুর অস্তিত্ব আছে। এই তত্ত্বেও ক্ষেত্র সমীকরণ নির্ধারিত হইয়াছে; আর তাহাদের মধ্যে সংগতির অভাব নাই।
এক দিকে যেমন একটা পদার্থবিদ্যাকে জ্যামিতিক ব্যাখ্যা দিবার বিরাট প্রচেষ্টা চলিয়াছিল, অন্য দিকে তেমনই পদার্থবিদ্যা হইতে জ্যামিতিকে সম্পূর্ণ বাদ দিবার চেষ্টাও চলিয়াছিল। এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী অস্ট্রীয় গণিতজ্ঞ ফ্রিড্রিখ্ কোট্লার (১৯২২ খ্রী)। তিনিই প্রথম প্রশ্ন তুলিতে আরম্ভ করিলেন, জ্যামিতি বাদ দিয়া পদার্থবিদ্যা কত দূর খাড়া করা যায়। জ্যামিতি বাদ দিবার হেতু হইল: মাত্রিকের ধারণা জটিল; ইহা বুঝিতে প্রয়োজন জটিলতর বস্তুর—যেমন অনমনীয় বস্তু। তাই যেখানে মাত্রিকের মৌলিক কোনও অবদান নাই, সেখানে মাত্রিকের উপর নির্ভর করিতে কোট্লার রাজি হন নাই। এই চিন্তাধারাকে বিশেষভাবে আগাইয়া লইয়া যান হল্যাণ্ডের গণিতজ্ঞ ডি. ভান ডানৎসিগ্ (১৯৩৪-৩৬ খ্রী)। কোট্লার-ভান ডানৎসিগ্ তত্ত্বে একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। তাহা হইল ডিফারেন্শাল সম্বন্ধকে ইন্টগ্র্যাল সম্বন্ধ দ্বারা স্থানচ্যুত করা।
আজ হইতে প্রায় একশত বৎসরেরও আগে একজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী পরীক্ষামূলকভাবে মহাকর্ষ-ক্ষেত্র ও বিদ্যুৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের সংযোগ সাধনের এক প্রচেষ্টায় বহু দিন ব্যাপৃত থাকিয়া ব্যর্থকাম হন। তিনি হইলেন ইংরেজ পদার্থবিদ মাইকেল ফ্যারাডে। তড়িৎ-চৌম্বক শক্তি ও নিউটনীয় মহাকর্ষ শক্তির সঙ্গে গূঢ় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা তিনি করেন। এই প্রসঙ্গে ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার ল্যাবরেটরি ডায়ারিতে লেখেন—মহাকর্ষ: নিরীক্ষার দ্বারা এই শক্তির সঙ্গে তড়িং, চৌম্বক এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে একটা সম্বন্ধ অবশ্যই স্থাপন করা সম্ভবপর হওয়া উচিত। এই সম্বন্ধকে এই সব শক্তির সঙ্গে এমনভাবে তৈয়ারি করা যাইতে পারে, যাহাতে তাহারা পারষ্পরিক ক্রিয়া ও তুল্য ফল হিসাবে প্রকাশ পায়।
নানা প্রকারের নিরীক্ষার উদ্ভাবনে বিফল হইয়া তিনি ডায়ারির এই অংশে তাঁহার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন: উপস্থিত কালের মত আমার প্রচেষ্টা এইখানেই শেষ হইল। যদিও এই সব পরীক্ষার ফলে তড়িৎ-চৌম্বক ও মহাকর্ষক্ষেত্রের মধ্যে কোনও সম্বন্ধের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় নাই, তথাপি এইরূপ সম্বন্ধের অস্তিত্বে আমার দৃঢ় ধারণা ক্ষুণ্ন হয় নাই।
এদিকে কালের গতির সহিত তাল রাখিতে গিয়া একক ক্ষেত্রতত্ত্বের কার্যসূচি জটিলভাবে ও বহুল পরিমাণে বাড়িয়া গিয়াছে। নিরীক্ষাজগতে অব্যাহত প্রগতির ফলে আজ মানুষের জ্ঞান মাত্র দুই রকমের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নহে। তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র ধীর অথচ নিশ্চিত গতিতে সূচনা করিয়াছে কোয়াণ্টামবাদ বা কণাতমবাদের। কণাতমবাদের আবির্ভাবের ফলে ভবিষ্যতে একক ক্ষেত্রতত্ত্বকে হইতে হইবে সুদূরপ্রসারী ও গভীর। বর্তমান কালে যুক্তিগ্রাহ্য একক ক্ষেত্রতত্ত্বকে কেবলমাত্র মহাকর্ষ-ক্ষেত্র ও তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের বর্ণনাতেই ক্ষান্ত হইলে চলিবে না। সেই তত্ত্বকে আজ মৌলিক কণাসমূহের ব্যাখ্যাও দিতে হইবে। অন্যভাবে বলা যাইতে পারে যে, একক ক্ষেত্রতত্ত্বকে কণাতম পদার্থবিদ্যার নিয়মাবলীরও আধার হইতে হইবে। কারণ মৌলিক কণাসমূহের আচরণবিধির ব্যাখ্যা আজ আর কণাতমবাদ ছাড়া সম্ভব নয়।
এই রকম নির্ধারণমূলক কোনও তত্ত্বের সম্ভাবনা সম্বন্ধে পদার্থবিদ্রা কোনদিনই একমত ছিলেন না। মাত্র অল্প কয়েক জন বিজ্ঞানীসহ আইনস্টাইন এই রকম তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত ধারণা পোষণ করিতেন। তিনি তাঁহার পদার্থবিদ্যাকে জ্যামিতিকরণের মাধ্যমে শুধুমাত্র মহাকর্ষ- ও তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের সমস্যা সমাধানের কথাই কল্পনা করেন নাই। তাঁহার বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল যে তাঁহার এই প্রচেষ্টা অন্যান্য মৌলিক কণার আচরণবিধিরও বিশদ ব্যাখ্যা দান করিবে। আইনস্টাইনের সমকালীন পদার্থবিদ্রা সাধারণতঃ তাঁহার বিরুদ্ধ মতই পোষণ করিতেন। বর্তমান কালেও প্রায় সব পদার্থবিদ্ই আইনস্টাইনের বিপরীত মতের সমর্থক। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁহাদের আসল মতদ্বৈধ পন্থা লইয়া, লক্ষ্য লইয়া নহে। কণাতমবাদের বিজয় অভিযানের পর তাঁহারা স্বভাবতঃই প্রাক্-কণাতম যুগের নির্ধারণবাদী তত্ত্বে কোনও প্রকার আস্থা রাখিতে অস্বীকার করেন।
খ্যাতনামা পদার্থবিদ নীলস বোর ও ভোল্ফগাংগ্ পাউলি এই বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের নেতৃত্ব করিয়াছেন। প্রথিতযশা বৈজ্ঞানিক, যথা মাক্স্ বোর্ন, ভার্নার হাইজেনবার্গ ইত্যাদি শেষোক্ত মতাবলম্বী। তবে কিছুকাল হইল হাইজেনবার্গ কণাতম পদার্থবিদ্যায় এক নূতন প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত আছেন। প্রচলিত তত্ত্বে ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক কণা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র নির্ধারিত করে। আর মৌলিক কণাসমূহের সংখ্যাও অল্প নহে। তাই আইনস্টাইনের অনুসরণ করিয়া হাইজেনবার্গ চেষ্টা করিতেছেন যাহাতে এই বিভিন্ন ক্ষেত্রসমূহকে একক ক্ষেত্র দিয়া স্থানচ্যুত করা যায়। সেখানে অবশ্য মহাকর্যতত্ত্বের কোনও স্থান এখনও হয় নাই। সত্য সত্যই দুরূহ্ এক কাজে হাইজেনবার্গ ও তাঁহার সহকর্মীগণ আজ লিপ্ত আছেন। তবে তাঁহাদের প্রচেষ্টাকে বিন্দুমাত্র ছোট না করিয়াও বলা যায় যে, আইনস্টাইনের মত হাইজেনবার্গের প্রচেষ্টাও এখন পর্যন্ত বিশেষ সাফল্য লাভ করিতে পারে নাই। পদার্থবিদ্যার জগতে এই পরিস্থিতি আজিও বিজ্ঞানীদের অপরাজেয় জিজ্ঞাসাকে দুঃসাহসিক উদ্যমের প্ররোচনা জোগাইতেছে।
দ্র P. G. Bergmann, Introduction to the Theory of Relativity, New York, 1942; H. Weyl, Space-Time-Matter, U. S. A. 1950; E. Schrödinger, Space-Time Structure, Cambridge, 1950; ‘Jubilee of Relativity Theory’, Helvetica Physica Acta, Supplement IV, Switzerland, 1956; M. Faraday, Diary, Royal Society, London; A Einstein, The Meaning of Relativity, London, 1960.