ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/একচেটিয়া
(পৃ. ১৪-১৯)
একচেটিয়া কোনও ব্যবসায়ের বিক্রেয় পণ্যদ্রব্যের মোট জোগান একটি প্রতিষ্ঠানের আয়ত্তে থাকিলে ব্যবসায়টি একচেটিয়া অবস্থায় উপনীত হয়। আবার কোনও ক্রেতব্য জিনিসের মোট চাহিদা একটি প্রতিষ্ঠানের আয়ত্তে থাকিলে সেই জিনিসটির বাজারে একচেটিয়া অবস্থার সৃষ্টি হয়। ক্রয় ও বিক্রয়, চাহিদা ও জোগান উভয় দিক হইতেই একচেটিয়া ব্যবসায়ের উদ্ভব হইতে পারে। বাস্তব ক্ষেত্রে বহু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার (পারফেক্ট কম্পিটিশন) দৃষ্টান্ত যেমন বিরল, তেমনই কোনও ব্যবসায়কে সবতোভাবে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত হইয়া পড়িতেও খুব দেখা যায় না। বস্তুতঃ অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ধরনের অসম্পূর্ণ প্রতিযোগিতাই (ইম্পারফেক্ট কম্পিটিশন) আরও সুপরিচিত। কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণের সহিত ক্রেতব্য বা বিক্রেয় জিনিসের দামের যোগাযোগের সূত্রেই অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অসম্পূর্ণ প্রতিযোগিতা বা একচেটিয়া ব্যবসায়ের মূল লক্ষণটি প্রকাশ পায়। কোনও শিল্প, বাণিজ্য বা সমগ্র আর্থিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের আপেক্ষিক কর্তৃত্বের আধিক্যে একচেটিয়া ক্ষমতার মৌলিক লক্ষণটি বিদ্যমান। তাই সম্পূর্ণভাবে একক কর্তৃত্ব বা একচেটিয়া লক্ষণযুক্ত অল্প কয়েক জনের প্রতিযোগিতা উভয়বিধ অবস্থাই আমাদের আলোচনায় একচেটিয়া সংজ্ঞার মধ্যে পড়িবে।
সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার মূল লক্ষণ এই যে বাজারের মোট ক্রয়-বিক্রয়ের অনুপাতে যে কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের কেনা-বেচার পরিমাণ এতই কম যে তাহার পক্ষে সেই ক্রয়-বিক্রয়ের জিনিসগুলির দামের উপর কোনও প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। ফলে সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার অবস্থায় কোনও ক্রেতা বা বিক্রেতার পক্ষে জিনিসের দাম স্থিরনির্দিষ্ট বলিয়া গ্রহণ করা ভিন্ন উপায় থাকে না। অর্থাৎ এককভাবে কাহারও পক্ষে চাহিদা বা জোগানের হ্রাস-বৃদ্ধি করিয়া জিনিসের দাম পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। বাজারদরের সীমানির্দিষ্ট ব্যয়ের ভিতর যত বেশি সম্ভব পণ্যোৎপাদনের সামর্থ্যই প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের মুনাফা অর্জনের একমাত্র পথ। সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট বাজারদরে একটি প্রতিষ্ঠান যত পরিমাণ জিনিস সরবরাহ করিতে পারে তাহার সবই বিক্রয় হইবার পথে কোনও বাধা নাই। এই পরিস্থিতিতে জিনিসের বাজারদর, জোগানের পরিমাণ ও তাহার উৎপাদনজনিত ব্যয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে তাহার ফলে কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের প্রভূততম মুনাফা অর্জন এবং সকলের স্বার্থে কাম্য উৎপাদনের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়। অন্যপক্ষে একচেটিয়া ব্যবসায় বা অসম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে জিনিসের দামের উপর প্রভাবের সুযোগ লইয়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জোগানের হ্রাস-বৃদ্ধি এবং তদনুযায়ী পণ্যমূল্যের পরিবর্তন ঘটাইয়া লাভ করিবার প্রয়াস পায়। এই অবস্থায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পণ্যমূল্যের স্থিরনির্দিষ্টতা বজায় থাকে না এবং জিনিসের বাজারদর চাহিদা বা জোগানের পরিমাণ ও তাহার উৎপাদনজনিত ব্যয়ের মধ্যে পূর্বোক্ত যথাযথ সম্পর্ক ছিন্ন হইয়া যায়। ফলে উৎপাদনের পক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের উপযুক্ত মাত্রা অনুযায়ী জিনিসের মূল্য ও সরবরাহ যাহা থাকিবার কথা বাজারে জিনিসটির দাম তদপেক্ষা বেশি এবং সরবরাহের পরিমাণ কম হইয়া পড়ে। একচেটিয়া পরিস্থিতিতে উৎপাদনের উপাদানের ব্যবহার ও পণ্যমূল্য নির্ধারণের এই লক্ষণটি অপচয় ও অসমবণ্টনের নানা রূপে প্রকাশ পায়।
বিজ্ঞাপন বা অন্য কোনও কারণে পণ্যের বিভেদীকরণ (প্রোডাক্ট ডিফারেন্শিয়েশন) মারফত স্ব স্ব বিক্রয়ের পরিমাণ আয়ত্তে রাখা সম্ভব হইলে কোনও ব্যবসায়ে বহু প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত থাকিলেও অসম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার অবস্থা ঘটিতে পারে। আবার অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এমন অবস্থা (অলিগোপলি) ঘটিতে পারে যে তাহাদের পণ্যমূল্য ও বিক্রয়সাধ্য পরিমাণের ব্যাপার পারষ্পরিক দ্বন্দ্বের সম্পর্কে উপনীত হয়। কোনও প্রতিষ্ঠান মূল্য হ্রাস করিয়া বিক্রয় বাড়াইতে প্রয়াস পাইলে অন্যরাও তাহাদের পণ্যমূল্য কমাইয়া সেই প্রচেষ্টার সফল প্রতিরোধে সমর্থ হইতে পারে। তখন অন্যদের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে অনিশ্চয়তার দরুন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের স্বাধীনতা ব্যাহত হয়। ফলে পণ্যমূল্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যাপারে চরম দ্বন্দ্বময় অস্থায়িত্বের পরিস্থিতি দেখা দেয়। এমতাবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাহ্যিকভাবে সম্পাদিত চুক্তির দ্বারা সম্মিলিত সংস্থায় (কার্টেল) পরিণত হয়, কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত বোঝাপড়ার সূত্রে তাহারা যেন নিহিত চুক্তি (কোয়েসাই এগ্রিমেণ্ট) অনুযায়ী নিজেদের কর্মধারা পরিচালনা করে। এই উভয়বিধ অবস্থাতেই যথাক্রমে দৃঢ়ভাবে বা শিথিলভাবে সম্মিলিত একচেটিয়া ক্ষমতা ও কর্মপ্রণালীর সৃষ্টি হয়। আবার ইহাদের মধ্যে এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর আয়তন ও উৎপাদন-ক্ষমতার উৎকর্ষ বা বিজ্ঞাপনের কার্যকরতার জোরে মূল্যনির্ধারণের ব্যাপারে নেতৃস্থানীয় প্রতিপত্তি বিস্তার করিতে পারে।
কোনও শিল্প বা ব্যবসায়ে একচেটিয়া ক্ষমতার উদ্ভব নানাবিধ সংগঠনের মাধ্যমে ঘটিতে পারে। ব্যবসায়ে নিযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই কর্তৃত্বের অধীনে তাহাদের সর্বপ্রকার কার্যকলাপের সংযুক্তি সাধন করিতে পারে। একচেটিয়া ক্ষমতার উদ্দেশ্যে এইরূপ সংযোগ ঘটিলে তাহা সচরাচর ট্রাস্ট আখ্যায় পরিচিত হয়। আবার কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখিয়া মূল্যনির্ণয়, বিক্রয়নীতি, মোট উৎপাদনের পরিমাণ, কাঁচামাল ক্রয় ইত্যাদি কোনও কোনও বিশিষ্ট ব্যাপারে সম্মিলিত কার্যক্রমের নিমিত্ত একত্র হইতে পারে। একচেটিয়া আধিপত্যের উদ্দেশ্যে গঠিত এই ধরনের সম্মিলিত সংস্থা কার্টেল নামে পরিচিত। এই সব সাংগঠনিক প্রকারভেদের সহিত আবার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সংহতির বিভিন্ন প্রকাশ ঘটিয়া থাকে। প্রতিষ্ঠানটি যে জিনিস উৎপাদন করে তাহারই পরিমাণ বাড়াইতে গেলে যে বিস্তার ঘটে তাহাকে অর্থনীতির পরিভাষায় সোজাসুজি সম্প্রসারণ (হরাইজন্টাল এক্সটেন্শন) বলা হয়। নির্মাণের অভিন্ন প্রণালী বা একই কাঁচামালের উৎস হইতে তৈয়ারি নানা জিনিসের উৎপাদনে ব্যাপৃত হওয়ার ফলে যে বিস্তার ঘটে তাহাকে পাশাপাশি সম্প্রসারণ (লাটরাল এক্সটেন্শন) আখ্যা দেওয়া যায়। যেমন মাংস, চামড়া, শিং ও হাড় সবই পশুবধ হইতে লভ্য। কোনও মাংসব্যবসায়ী যদি চামড়া, শিং ও হাড়ের ব্যবসায়ও নিজ আওতায় আনিয়া স্বীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তারসাধন করে তাহা হইলে পাশাপাশি সম্প্রসারণ ঘটিবে। আর এক ধরনের বিস্তার ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ (ভার্টিক্যাল এক্সটেন্শন)। উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরসমূহের কর্তৃত্বে একীকরণ ঘটিলে শেষোক্ত ধরনের পরিচয় পাওয়া যায়। বস্ত্রশিল্পের দৃষ্টান্ত দিলে বলা যায় যে তৈয়ারি সুতা হইতে বস্ত্রবয়নে নিযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান সুতা বুনিবার কাজও নিজে শুরু করিলে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের নজির মিলিবে। উৎপাদনে নিযুক্ত কোনও প্রতিষ্ঠান উৎপন্ন দ্রব্যের পরিবহন ও পাইকারি বিক্রয়ের ব্যবসায়ে কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত করিলে তাহাও ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের শ্রেণীতে পড়িবে।
ধনতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করিলে একচেটিয়া ধনতন্ত্রের ক্রমনির্ণয়ের সুবিধা হইবে। প্রথম পর্যায়ে ধনিকের মূলধন প্রধানতঃ বাণিজ্যকর্মে নিযুক্ত হইত। ঐ যুগে বড় বড় কোম্পানিগুলি আভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে রাষ্ট্রানুমোদিত একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিত। ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ইঙ্গ-ভারতীয় বাণিজ্যে ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একচ্ছত্র অধিকার এই ধরনের একচেটিয়া ব্যবস্থার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ধনতন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে ধনিকের মূলধন সরাসরিভাবে পণ্যোৎপাদনে নিয়োজিত হয়। ইংল্যাণ্ড-আমেরিকার ন্যায় সাবেক ধনতন্ত্রের দেশসমূহে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে ধনতান্ত্রিক শিল্পযোজনার প্রথম যুগে সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতার অবস্থা কায়েম ছিল। শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নাতিবৃহৎ আয়তন, কোনও একজন প্রতিযোগীর বাজারের উপর বিশেষ অধিকারের অভাব, অবাধ বাণিজ্য ও অবাধ প্রতিযোগিতা ঐ যুগের বৈশিষ্ট্য। এই অবস্থায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বদা স্বীয় উৎপাদনকৌশল ও ব্যবস্থাপনার উন্নতি বিধানের প্রয়াস পাইতে হইত। কারণ অন্যদের তুলনায় উন্নততর উৎপাদনকৌশলের সাহায্যেই একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিযোগিতায় অধিকতর সাফল্য ও মুনাফা অর্জনের উপায় ছিল। কার্য-কারণের এই যোগাযোগের দরুন সেই যুগে ধনতান্ত্রিক বিকাশ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজ করিত। কিন্তু কার্য-কারণের এই যোগসূত্রেই আবার পরবর্তী একচেটিয়া অবস্থা উদ্ভবের বীজ নিহিত থাকে। বহু ক্ষেত্রেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা শিল্পসংস্থার আয়তন না বাড়াইলে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি (টেক্নলজি) বা ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষ সাধন করা যায় না। প্রতিযোগিতায় সফল প্রতিষ্ঠানগুলি তাহাদের কৃতকার্যতার যুক্তিতেই অন্যদের তুলনায় বৃহত্তর হইয়া উঠে এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদনের সামর্থ্য অনুযায়ী তাহাদের সম্প্রসারণ ঘটে। তখন ক্রমশঃ একই ব্যবসায়ে নিযুক্ত অন্য প্রতিষ্ঠানসমূহের ঐ ক্ষেত্র হইতে অপসরণ বা প্রতিযোগী সত্তা বিসর্জন দিয়া সফল প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিকট অধিকার সমর্পণ ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। আবার সফল প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্প্রসারণের নিমিত্ত অর্থের প্রয়োজন মিটাইবার পথে বড় বড় ব্যাঙ্কগুলির সহিত শিল্পজ উৎপাদনের নিবিড সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং এইভাবে একচেটিয়া পরিস্থিতিতে বিরাট বিরাট ব্যাঙ্ক এবং বৃহৎ শিল্পের মালিকানা ও পরিচালনার একীকরণ ঘটে। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রভূততম ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের যে প্রেরণায় অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা রচিত হয় সেই প্রেরণার আত্যন্তিক প্রক্রিয়াতেই আবার একচেটিয়া ক্ষমতার আবির্ভাব অনিবার্য হইয়া পড়ে। ধনতন্ত্রের প্রগতিশীল পর্যায়ের কর্মধারার সহিত একচেটিয়া অবস্থায় বিবর্তনের এই যোগসূত্রেই উৎপাদনের উপাদানসমূহের ব্যক্তিগত মালিকানার অধীনে অর্থনৈতিক উন্নতির পথে অনিবার্য প্রতিবন্ধকের প্রশ্ন উঠিয়া পড়ে।
প্রতিযোগী হইতে একচেটিয়া পর্যায়ে পরিণতির পর ধনতন্ত্রের প্রগতিশীলতা বহুল পরিমাণে বাধাপ্রাপ্ত হয়। জোগানের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করিয়া জিনিসের দামের উপর প্রভাববিস্তারের সুযোগ ঘটিবার ফলে প্রভূততম মুনাফা এবং উৎপাদনের বিকাশের মধ্যে কার্য-কারণসূত্র ছিন্ন হইয়া যায়। উৎপাদন কমাইয়া মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগের দরুন প্রাপ্তিসাধ্য উৎপাদনক্ষমতার পরিপূর্ণ ব্যবহার হয় না। অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার (অলিগোপলি) ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া এবং তাহার ফলাফল সম্পর্কে অনিশ্চয়তার জন্য উৎপাদনের উৎকর্ষমূলক ব্যয়সংকোচন ও মূল্যহ্রাস করিবার প্রেরণা রুদ্ধ হইয়া যায়। পুরাতন যন্ত্রের খরচ উসুল হইবার পূর্বে যন্ত্রনিয়োগের আগ্রহ থাকে না। মজুরের প্রয়োজন যাহাতে কমে সেইরূপ যন্ত্রনিয়োগের ঝোঁক বাড়িয়া যায়। আবার একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজ নিজ সুবিধা বজায় রাখিবার নিমিত্ত নূতন আবিষ্কার পেটেণ্ট আইনের জোরে কুক্ষিগত করিয়া রাখে। পণ্য ও মূল্যের বিভেদীকরণ এবং বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ-বিকর্ষণে ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও সংস্থানের অপচয় ঘটে। উৎপাদনক্ষমতার বাধাপ্রাপ্ত নিয়োজনের ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়া যায় এবং তাহার সহিত একচেটিয়া ব্যবস্থাজনিত অসমবণ্টন মিলিয়া বাজারের ক্রয়ক্ষমতা বিশেষ হ্রাস পায়। ব্যক্তিগত মুনাফার অভিপ্রেত মাত্রা অনুযায়ী মূলধন বিনিয়োগের সুযোগ সংকীর্ণ হইয়া আসে। এই সংকটের চাপে সাম্রাজ্যবিস্তার মারফত মূলধন বিনিয়োগ ও বাজারের অন্বেষণ প্রয়োজন হয় এবং সেই পথ যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, শোষণ ও অব্যবস্থার কালিমা লিপ্ত ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে তাহার অজস্র দৃষ্টাস্ত রহিয়াছে।
গত শতাব্দীর শেষে এবং বর্তমান শতাব্দীর আরম্ভে ইংল্যাণ্ড আমেরিকার ন্যায় সাবেক ধনতন্ত্রের দেশে একচেটিয়া বিকাশের শুরু হইয়াছিল। বিবিধ আইনের সাহায্যে ঐসব দেশে একচেটিয়া ব্যবসায়ের ক্ষমতা খর্ব করিবার চেষ্টা হইয়াছে। কিন্তু ধনতন্ত্রের পরিণত পর্যায়ে এখন ঐসব দেশের আর্থিক কাঠামোয় বিরাট বিরাট একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্তহীন। আবার জার্মানি বা জাপানের মত দেশে বিলম্বিত ধনতন্ত্রের বিকাশ সূচনা হইতেই বহুলাংশে একচেটিয়া গতিপ্রকৃতি পরিগ্রহ করিয়াছিল। তাহা ছাড়া শিল্পযোজনার ঘাটতি দ্রুত হারে দূরীকরণের উদ্দেশ্যে বিলম্বিত ধনতন্ত্রের দেশগুলিতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় একচেটিয়া সংগঠন গড়িয়া উঠিতে দেখা গিয়াছে। এইরূপ সংগঠনের মালিকানা ও পরিচালনায় রাষ্ট্রের অংশ থাকে। রাষ্ট্রের আনুকূল্যেই তাহারা বিকাশ লাভ করে। এইরূপ ব্যবস্থা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট একচেটিয়া ধনতন্ত্র (স্টেট মনোপলি ক্যাপিট্যালিজ্ম) আখ্যায় পরিচিত। দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবেক ধনতন্ত্রের দেশেও রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট একচেটিয়া ধনতন্ত্রের দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। প্রধানতঃ অল্প কয়েকজনের প্রতিযোগিতা (অলিগোপলি) হইতে উদ্ভুত অনিশ্চয়তা ও অস্থায়িত্ব দূর করিবার উদ্দেশ্যেই শেষোক্ত দেশগুলিতে বাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে একচেটিয়া স্বার্থের সংহতি ঘটিয়াছে। আবার অর্থনৈতিক বিকাশের দিক দিয়া অনগ্রসর দেশগুলিতে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত মূলধনের সহযোগিতায় সৃষ্ট একচেটিয়া সংগঠনের পরিচালনায় শিল্পযোজনার নানাবিধ প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক ইতিহাসের আর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।
প্রতিযোগী হইতে একচেটিয়া অবস্থায় বিবর্তনের যে ধারার কথা পূর্বে লিখিত হইল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির কাঠামোয় বিধৃত ভারতীয় ধনতন্ত্রের বিশিষ্ট ইতিহাসে ঐরূপ পর্যায়ক্রম পূর্ণ সংগতি লাভ করে নাই। সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্বের কবলমুক্ত কৃষক-কারিগরের স্বাধীন জীবিকার সংকল্প এবং তাহার সামাজিক স্বীকৃতির ভিত্তিতেই ধনতন্ত্রের সাবেক জন্মভূমিসমূহে ঐ আর্থব্যবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের সূচনা হইয়াছিল। ভারতে ধনতন্ত্রের ইংরেজ বিজয় ঘটিত আদি সংঘাতে মধ্যস্বত্বভোগী ভূমিব্যবস্থার প্রবর্তনা ও দেশজ শিল্পের ধ্বংসলীলায় কৃষক-কারিগরের সংস্থান ও সাংগঠনিক উদ্যম বিনষ্ট হইয়া যায়। তারপর বণিকবৃত্তি এবং আর্থিক (ফিনান্শিয়্যাল) স্বার্থের কর্তৃত্ববিশিষ্ট যে ম্যানেজিং এজেন্সি ব্যবস্থার পরিচালনায় ভারতে ধনতন্ত্রের বিকাশ মুখ্যতঃ সাধিত হইয়াছে তাহার বিশেষ প্রণালীতে এ দেশে ধনতন্ত্র প্রথম হইতেই খানিকটা একচেটিয়া লক্ষণযুক্ত গতিপ্রকৃতিতে চিহ্নিত। ম্যানেজিং এজেন্সি ব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই হইল যে তাহার ফলে একটি কেন্দ্রীয় মালিকানা বিনিয়োগ ও পরিচালনার কর্তৃত্বে বহু প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠে। এইরূপে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সংখ্যা ও আয়তন -বৃদ্ধির সঙ্গে ম্যানেজিং এজেন্সি ব্যবসায়ের প্রসার ঘটে। তখন আবার তাহাদের অধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ একচেটিয়া কর্তৃত্বের লক্ষণযুক্ত হইয়া পড়ে। ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে শিল্পোৎপাদনের বিকাশ যে নানা কারণে সদাব্যাহত থাকে তাহা আমাদের সুবিদিত। ভারতে ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথার প্রাধান্যের দরুন আবার শিল্পপণ্যোৎপাদনের সংকীর্ণ পরিসরটুকু অল্প কয়েকটি বড় এজেন্সি ব্যবসায়ের অধিকৃত হইয়া একচেটিয়া অবস্থায় পৌছায়।
ধনতন্ত্রের স্বাভাবিক বিবর্তনের ধারায় সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতা হইতে একচেটিয়া অবস্থায় পরিণতি ঘটিলে তাহার পূর্ববর্তী অধ্যায়টি উৎপাদন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক উন্নতিতে সম্পৃক্ত থাকে। প্রতিযোগী পর্যায়ে উৎপাদন কৌশলের উন্নতি ও মুনাফাবৃদ্ধির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনুরূপ বিকাশের অনুকুল। সোজাসুজি পাশাপাশি বা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় যন্ত্রনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় নানাবিধ সংহতি ও উন্নয়নের কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি। কিন্তু ভারতে একচেটিয়া বিকাশের বিশেষ ধারায় উৎপাদন কৌশলের উন্নতি এবং ব্যবসায়ের আয়তন বৃদ্ধির মধ্যে অনুরূপ যোগাযোগের দৃষ্টান্ত বিরল। বিভিন্ন ম্যানেজিং এজেন্সির আয়ত্তে উৎপাদনের দিক হইতে সম্পর্কবিহীন নানাবিধ শিল্প ও ব্যবসায়ের যে সমাবেশ দেখা যায় তাহাতে কোনও উন্নতিমূলক সম্প্রসারণের কর্মধারা সাধিত হইয়াছে বলা যায় না। তাই অকিঞ্চিৎকর শিল্পজ উৎপাদনের বনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া ধনতন্ত্রের কুফলগুলি ভারতীয় অর্থনীতিতে পুরাপুরি বর্তাইয়াছে, কিন্তু একচেটিয়া ধনতন্ত্রে পরিণতির পক্ষে যথাযথ যন্ত্রশিল্পের পূর্ববর্তী বিকাশ সাধিত হয় নাই। ধনতন্ত্রের এই অনিয়মিত গতিপ্রকৃতিতে আধুনিক ভারতীয় অর্থনীতির একটি মূল দ্বন্দ্ব ও সমস্যার পরিচয় পাওয়া যায়।
বিবিধ তথ্য হইতে ভারতে একচেটিয়া ব্যবসায়ের প্রতিপত্তি ও ইদানীন্তন অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। একই ম্যানেজিং এজেন্সির পরিচালনায় একাধিক বিরাট কারখানা ও ব্যবসায়ের সমাবেশ ঘটিবার ফলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক প্রসার ঘটিয়াছিল। ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে একটি আইনের দ্বারা ভারত সরকার ম্যানেজিং এজেন্সিগুলির কর্মক্ষেত্রের পরিসর ও আয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। কিন্তু ম্যানেজিং এজেন্সি ব্যতিরেকেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক-মণ্ডলীতে (বোর্ড অফ ডিরেক্টরস) একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিও একচেটিয়া প্রতিপত্তির আর একটি উৎস। উল্লেখযোগ্য যে এই অভিন্ন পরিচালনার প্রণালীতেই বড় বড় ব্যাঙ্ক এবং বৃহৎ শিল্পস্বার্থের মধ্যে সংযুক্তি ঘটিয়াছে।
কোম্পানি আইন প্রশাসন বিভাগে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সম্পাদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা (গ্রন্থপঞ্জিতে উল্লিখিত ‘ইকনমিক উইক্লি’র প্রবন্ধটি দ্রষ্টব্য) হইতে জানা যায় যে সাম্প্রতিক কালে ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথার প্রতিপত্তি কিছুটা হ্রাস পাইলেও অন্যবিধ সাংগঠনিক ব্যবস্থার উদ্ভাবনে একচেটিয়া ধনতন্ত্রের প্রসার অব্যাহত রহিয়াছে। কয়েকটি বৃহৎ ব্যবসায়গোষ্ঠার অধিকারে অজস্র প্রতিষ্ঠানের সমগ্র বা আংশিক কর্তৃত্ব রহিয়াছে। এই সকল গোষ্ঠার মালিকানা ও কর্তৃত্ব বিস্তারের সম্পূর্ণ পরিচয় পাইতে হইলে বিচ্ছিন্নভাবে ম্যানেজিং এজেন্সি পরিচালিত কোম্পানিগুলির হিসাব নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বৃহৎ গোষ্ঠী একাধিক ম্যানেজিং এজেন্সি কোম্পানির কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠিত। এতদ্ব্যতীত বৃহৎ ব্যবসায়গোষ্ঠীদের মালিকানা ও প্রতিপত্তি লগ্নি-কারবারেও স্থাপিত হইয়াছে। নানা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করিয়া আর্থিক বিনিয়োগ ঐ কার বারের প্রধান অভিপ্রায় এবং এইরূপ বিনিয়োগের মারফত লগ্নি-কোম্পানিসমূহের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত ব্যবসায়গোষ্ঠী তাহাদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার প্রসার ঘটাইতে সমর্থ হয়। আবার বৃহত্তম ব্যবসায়গোষ্ঠাসমূহের প্রতিপত্তি শুধুমাত্র সরাসরি পরিপূর্ণ কর্তৃত্বের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিপূর্ণ একক কর্তৃত্ব বা গরিষ্ঠসংখ্যক শেয়ারের মালিকানা একটি গোষ্ঠীর অন্তর্বর্তী একচেটিয়া ক্ষমতার পরিমাপ নির্ণয় করে। তাহা ছাড়া বহু কোম্পানির মোট শেয়ারের আধাআধি বা তাহার কম মালিকানার মারফত বৃহৎ ব্যবসায়গোষ্ঠাদিগের আংশিক এবং পরস্পরের অনুষঙ্গী কর্তৃত্বের পরিধি বিস্তৃত হয়। পরিপূর্ণ এবং আংশিক কর্তৃত্বের এইরূপ যোগাযোগের প্রক্রিয়ায় একচেটিয়া ব্যবসায়ের বিপুল আয়তন গড়িয়া উঠিয়াছে।
ব্যাঙ্কিং ও বীমা ব্যবসায় (রাষ্ট্রায়ত্ত জীবনবীমা ব্যতিরেকে) যন্ত্রশিল্প খনিজ উৎপাদন বৈদেশিক বাণিজ্য আভ্যস্তরীণ পাইকারি বাণিজ্য সংবাদপত্র ইত্যাদি সংগঠিত শিল্প ও ব্যবসায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একচেটিয়া প্রতিপত্তির ফলে অর্থনৈতিক প্রগতির পথে নানাবিধ বাধাবিঘ্নের ব্যাপার অব্যস্বীকার্য। আর্থিক সংগতি, তাহার বিনিয়োগ এবং উৎপাদন হইতে লাভের বিরাট অংশ একচেটিয়া ধনিকগোষ্ঠীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর প্রভূততম লাভের অন্বেষণে এইসব একচেটিয়া ব্যবসায় কর্তৃক অনুসৃত কর্মপন্থার সহিত দেশের সর্বাঙ্গীণ অর্থনৈতিক কল্যাণের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে। তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরও ক্রমবর্ধমান জাতীয় আয় ও সম্পদের নিদারুণ অসমবণ্টনের একটি মুখ্য কারণ একচেটিয়া ধনতন্ত্রের প্রতিপত্তিতেই নিহিত। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত জাতীয় আয়বণ্টন কমিটির রিপোর্টেও ক্রমবর্ধমান আয় ও ধনবৈষম্য এবং তাহার সহিত একচেটিয়া ব্যবসায়ের যোগাযোগ স্বীকৃত হইয়াছে। একচেটিয়া ব্যবসায়ের প্রতিপত্তি ও ক্রিয়া-প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীরতর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের নিমিত্ত বিশেষজ্ঞদের লইয়া গঠিত একটি কমিশন (মনোপলি কমিশন) বর্তমানে নিযুক্ত রহিয়াছে। শিল্প ও ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানা ও পরিচালনার ক্রমবিস্তার এবং সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার দিকে পথনির্দেশের একটি বড় যুক্তি নিশ্চয়ই একচেটিয়া ধনতন্ত্রের কবল হইতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে মুক্ত করিবার প্রয়োজনেই উপযুক্ত তাৎপর্য পায়।
দ্র E. A. G. Robinson, Monopoly, London, 1941; E. H. Chamberlin, Theory of Monopolistic Competition, New York, 1956; William J. Baumol, Business Behaviour, Value & Growth, New York, 1959; George W. Stocking & Myron W. Watkins, Monopoly and Free Enterprise, New York, 1951; P. Sargant Florence, The Logic of British and American Industry, London, 1953; Paul M. Sweezy, The Theory of Capitalist Development, London, 1946; Maurice Dobb, Studies in the Development of Capitalism, London, 1946; Paul A. Baran, The Political Economy of Growth, New York, 1957; D. H. Buchanan, Development of Capitalistic Enterprise in India, New York, 1934; M. M. Mehta, Structure of Indian Industries, Bombay, 1955; S. L. Sharma, Some Trends of Capitalist Concentration in India, Aligarh, 1955; D. R. Gadgil, Planning and Economic Policy in India, Poona, 1961; R. K. Nigam, Managing Agencies in India, New Delhi, 1957; R. K. Nigam & N. C. Chaudhuri, The Corporate Sector in India, Delhi, 1961 S. R. Mohnot, Concentration of Economic Power in India, Allahabad, 1962; R. K. Hazari, ‘Ownership & Control: A Study of Inter-Corporate Investment’, Economic Weekly, vol. XII, Nos. 48-50, vol. XIII, No. 7, Bombay, 1960.