ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/এঙ্গেল্স, ফ্রিড্রিষ
(পৃ. ২৯-৩০)
এঙ্গেল্স, ফ্রিড্রিষ (১৮২০-৯৫ খ্রী) মার্ক্স-এর সহিত যুগ্মভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৮২০ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ নভেম্বর জার্মানির বার্গেন শহরের একটি ধনী ও রক্ষণশীল শিল্পপতি পরিবারে তাঁহার জন্ম। তরুণ বয়স হইতেই তিনি বহু ভাষা ও বিদ্যার চর্চা করিতে থাকেন। ১৮৪১ খ্রীষ্টাব্দে এঙ্গেল্স বের্লিন (বার্লিন) -এ যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিতে যান। বের্লিনে তিনি হেগেলীয় দর্শনে বিশ্বাসী বামপন্থী গোষ্ঠার সংস্পর্শে আসেন। কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-৮৩ খ্রী) -এর খ্যাতি তখন তরুণ মহলে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে। দুই জনের রচনা পাঠ করিয়াই মার্ক্স ও এঙ্গেল্স পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হন। এঙ্গেল্স-এর পিতা ১৮৪২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহাকে ম্যান্চেস্টারে তাঁহাদের একটি সুতাকলে কাজ করিতে পাঠান। ইংল্যাণ্ডে যাইবার পথে ক্যাল্ন্ (কোলোন) -এ মার্ক্স-এর সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তখন হইতে উভয়ের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপ শুরু হয়। এঙ্গেল্স ১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে আগস্ট মাসের শেষে পারীতে (প্যারিস) মার্ক্স-এর সহিত দেখা করেন। এই সাক্ষাৎকারের পর হইতেই উভয়ের প্রসিদ্ধ সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সূত্রপাত। মার্ক্স-এঙ্গেল্সের সৌহার্দ্য তাঁহাদের জীবনের সকল ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। নিদারুণ অর্থাভাব হইতে যথাসম্ভব মুক্ত থাকিয়া মার্ক্স যাহাতে আরব্ধ কার্য সম্পন্ন করিতে পারেন তাহার জন্য এঙ্গেল্সের চেষ্টার অবধি ছিল না।
তিনি ১৮৪৫-৫০ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামে বৈপ্লবিক শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাডেন-এর বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানে (১৮৪৯ খ্রী) এঙ্গেল্স প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। বিপ্লবীদের পরাজয়ের পর তিনি ইংল্যাণ্ডে প্রত্যাবর্তন করেন। এঙ্গেল্স ১৮৫০-৬৯ খ্রী পর্যন্ত ম্যান্চেস্টারে পৈতৃক ব্যবসায়ে লিপ্ত ছিলেন। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে বিষয়কর্ম হইতে অবসর গ্রহণের পর তাঁহার অবশিষ্ট জীবন রাজনীতিতে ও লেখার কাজে অতিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন প্রথম ইণ্টারন্যাশন্যালের তিনি নেতৃপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং গোড়ার দিকে দ্বিতীয় ইণ্টারন্যাশন্যালের কাজেও তিনি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন।
প্রকৃতি, সমাজ ও ইতিহাসের গতি বিশ্লেষণে মার্ক্সবাদের সার্থকতা পরীক্ষা ও প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে এঙ্গে্সের দান স্মরণীয়। মার্ক্স-এঙ্গেল্স কর্তৃক যুগ্মভাবে প্রণীত প্রথম গ্রন্থ হইল: ‘দি হাইলিগে ফামিলিয়ে’ (পবিত্র পরিবার, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ১৮৪৫ খ্রী)। ব্রুনো বাউয়ের প্রমুখ হেগেলপন্থীদের বাস্তববোধহীন ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা ও বৈপ্লবিক বস্তুবাদের প্রতিপাদন এই গ্রন্থের উপজীব্য। একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর দ্বারাই যে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর সম্ভব এই প্রত্যয়ও উক্ত গ্রন্থে বিবৃত। যে গ্রন্থ রচনার পর এঙ্গেল্স-এর খ্যাতি ইওরোপময় ছড়াইয়া পড়ে তাহার নাম ‘দি লাগে দের্ আর্বাইটেন্ডেন ক্লাসে ইন্ এংলাণ্ড’ (ইংল্যাণ্ডে শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা, লাইপ্ৎসিক, ১৮৪০ খ্রী)। ধনতান্ত্রিক সমাজে ধনিকশ্রমিক বিরোধের স্বরূপ এবং শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা এই গ্রন্থে বিশ্লেষিত হইয়াছে। ‘মানিফেস্ট দের্ কমুনিস্টিশেন্ পার্টাই’ (কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার, লণ্ডন, ১৮৪৮ খ্রী) মার্কস্-এঙ্গেল্সের যুগ্ম রচনা। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে ইউটোপিয়ান বা কল্পরাজ্যমূলক ধ্যানধারণা হইতে মুক্ত করার ব্যাপারে এঙ্গেল্স-এর দান এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা যে ঐতিহাসিক গতির ক্রিয়াপ্রক্রিয়াতেই অনিবার্য তাহা এঙ্গেল্স-এর বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক সত্যের নিশ্চিতি পায় (অ্যাণ্টি-দ্যূরিং, ১৮৭৮ খ্রী)। তাহার অর্থ ইহা নহে যে তিনি কোনও রূপ যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপোষকতা করেন। বরং নূতন সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে মানুষের সচেতন ভূমিকার গুরুত্ব এবং সেই প্রসঙ্গে যান্ত্রিক বস্তুবাদ হইতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মৌলিক পার্থক্যের ব্যাখ্যা তৎপ্রণীত ‘লুড্ভিগ ফয়ের্বাখ্ উন্দ দের্ আউসগাংগ দের্ ক্লাসিশেন ডয়েট্শেন ফিলজ্ফি’ (লুড্ভিগ ফয়ের্বাখ ও চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান, স্টুট্গার্ট, ১৮৮৮ খ্রী) নামক গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু। ‘দের্ উর্দ্রুং দের্ ফামিলিয়ে দেস্ প্রিফাট আইগেণ্টুম্স উন্দ দেস্ স্টাট্স’ (পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, লাইপ্ৎসিক, ১৮৮৪ খ্রী) গ্রন্থে এঙ্গেল্স আদিম মানবসমাজ হইতে আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত সভ্যতার স্তর-পরম্পরার গতি ও প্রকৃতি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দিক দিয়া আলোচনা করিয়াছেন। আদিম সমাজ সম্পর্কে এই গ্রন্থের বহু তথ্য এল. এইচ. মর্গ্যান (১৮১৮-৮১ খ্রী)-এর ‘এনশেণ্ট সোসাইটি’ (প্রাচীন সমাজ, নিউ ইয়র্ক, ১৮৭৭ খ্রী) গ্রন্থ হইতে সংকলিত। পরবর্তী কালে নৃবিদ্যার গবেষণার এমন তথ্য উদ্ঘাটিত হইয়াছে যাহার ফলে এঙ্গেল্স-এর কোনও কোনও প্রতিপাদ্য সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। তাঁহার ‘ডিয়ালেক্টিক দের্ নাটুর’ (প্রকৃতির ডায়ালেক্টিক, ১৯২৫ খ্রী) বইটিরও কোনও কোনও বিশ্লেষণ আধুনিক বিজ্ঞানে গ্রাহ নয়। মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার বিকাশে এঙ্গেল্স-এর দান মার্ক্স-এঙ্গেল্স পত্রাবলীর প্রামাণিক সংগ্রহেও পরিস্ফুট।
মার্ক্স-এর মৃত্যুর (১৮৮৩ খ্রী) পর এঙ্গেল্স-এর জীবনের শেষ ১০-১২ বৎসর মার্ক্সবাদকে প্রতিষ্ঠিত করিবার প্রয়াসে নিয়োজিত হইয়াছিল। ‘দাস্ কাপিটাল’ (পুঁজি) গ্রন্থের দ্বিতীয় (১৮৮৫ খ্রী) ও তৃতীয় (১৮৯৪ খ্রী) খণ্ড মার্ক্স-এর মৃত্যুর পর এঙ্গেল্স কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের ৬ মার্চ লণ্ডনে তাঁহার মৃত্যু হয়। ‘মাক্স, কার্ল’ দ্র
দ্র কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেল্স, রচনা সংকলন, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, মস্কো, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ; Franz Mehring, Karl Marx, The Story of His Life, London 1936; George Lichtheim, Marxism, London, 1961.