ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/এচিং
(পৃ. ৩০-৩১)
এচিং চিত্রকর্মের পদ্ধতি বিশেষ। এচিং শব্দটির উদ্ভব সম্ভবতঃ প্রাচীন হাই জার্মান esjan অথবা প্রচলিত জার্মান atzen (অ্যাৎসেন্=জারণ করা) হইতে। বাংলায় বলা যাইতে পারে: অম্লজারিত রেখাচিত্র।
এচিং মূলতঃ এনগ্রেভিং (কফ্ৎগারি বা খোদকারি) পদ্ধতির রূপভেদ (‘লাইন এনগ্রেভিং’ দ্র)। পাশ্চাত্ত্যে ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এই চিত্রপদ্ধতির প্রথম প্রচলন দেখা গেলেও ভারতে প্রাচীন ও মধ্য-যুগে প্রচলিত শলাকালেখ পদ্ধতি ও মোগল কফ্ৎগারি পদ্ধতির সঙ্গে ইহা খুবই ঘনিষ্ঠ।
ভারতীয় শলাকালেখ পদ্ধতিতে প্রয়োজন হইত ধাতুনির্মিত বা হীরকাগ্র সূচিমুখ শলাকা। শিল্পীর সবল হাতের অনায়াস টানে বিভিন্ন প্রকারের জমিতে ক্ষোদিত রেখাচিত্র রূপায়িত হইত—‘যৈঃ সর্বত্র শলাকায়েব লিখিতৈর্দিগ্ভিওয়াশ্চিত্রিতাঃ’ (ত্রিবিক্রমভট্ট রচিত ‘নলচম্পূ’, শ্লোক ৩৫)। অবশ্য ভারতীয় এই পদ্ধতি সাধারণতঃ অক্ষর রচনা ও অলংকরণের প্রয়োজনই মিটাইয়াছে। মধ্যযুগে মোগল ও রাজপুত দরবারে বর্ম, ঢাল, তলোয়ার প্রভৃতির অলংকরণে অম্লজারণ পদ্ধতির ব্যবহার ঘটিয়াছে। তৎকালে খোদকারদের মধ্যে আপন ঘরোয়ানার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নকশা সংরক্ষণের প্রয়োজনে নিজ নিজ খোদাই-কাজ হইতে তেল-কালির ছাপ তুলিয়া রাখার প্রচলন ছিল।
এচিং-এর ব্যবহারবিধি প্রাথমিকভাবে শলাকালেখের অনুরূপ হইলেও উদ্দেশ্যের দিক দিয়া বিপরীত। শলাকালেখে প্রতিটি রচনাই একক। কিন্তু জারিত রেখাচিত্রের প্রয়োজন একই রচনার বহু প্রতিলিপিকরণে। এচিং করিতে গেলে প্রথমেই একটি ধাতুফলকের প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে সাধারণতঃ তাম্রফলক ব্যবহৃত হয়। তাম্রফলকটিতে রজন বা অন্য কোনও অম্লনিরোধক রাসায়নিক প্রলেপ মাখানো হয়। অতঃপর তীক্ষ্ণাগ্র শলাকা দ্বারা চিত্রকর্ম সম্পাদিত হয়। শলাকার ঘর্ষণে প্রলেপ কাটিয়া ধাতুফলক উন্মুক্ত হয়। এইবার ধাতুফলকটিকে নাইট্রিক অ্যাসিড কিংবা অনুরূপ অম্ল পদার্থের (ডাচ মর্ড্যাণ্ট প্রভৃতি) জলীয় দ্রবণে ডুবাইয়া রাখা হয়। উন্মুক্ত ধাতব অংশ এই ভাবে অম্লজারিত হয়। অবশ্য রেখার সূক্ষ্মতা ও গভীরতার উপর জারণপদ্ধতি নির্ভর করে। সূক্ষ্ম রেখার প্রয়োজন হইলে স্বল্প কাল জারণের পরেই ফলকটি উঠাইয়া সূক্ষ্ম অংশগুলি অম্লনিরোধক প্রলেপে পুনর্বার আচ্ছাদিত করিতে হয়। তাহার পর আবার অম্লজারণ চলে। এইভাবে বারংবার অম্লজারিত হইয়া ধাতুফলকটি মুদ্রণউপযুক্ত রেখাচিত্র রচনা করে।
প্রলেপযুক্ত ফলকটিতে ছাপার কালি মাখাইয়া কাপড় দিয়া মুছিয়া লইতে হয় যাহাতে কেবলমাত্র রেখার গভীর অংশ মসিলিপ্ত থাকে। অতঃপর স্বল্প আর্দ্র কাগজ ধাতু-ফলকের উপর রক্ষিত হয়; মুদ্রণযন্ত্রের চাপে আর্দ্র কাগজ ফলকে অঙ্কিত রেখার মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে ভিতরে সঞ্চিত কালি কাগজটিতে মুদ্রিত হয় এবং কাগজটি ধাতু ফলকে অঙ্কিত চিত্রের প্রতিলিপিতে পরিণত হয়।
পাশ্চাত্যে সপ্তদশ শতাব্দীর অমর ওলন্দাজ শিল্পী রোম্ব্রাণ্ট (১৬০৭-৬৯ খ্রী) তাহার প্রকাশ-মাধ্যম হিসাবে এচিংকে ব্যবহার করিয়া যেমন এই পদ্ধতির বিরাট সম্ভাবনা নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন তেমনই ঐ দেশে এচিংএর জনপ্রিয়তাও ঘটিয়াছে এই মহৎ প্রতিভার সংস্পর্শে আসিয়া। যুগস্রষ্টা শিল্পী ফান ডাইক (১৫৯৯-১৬৪১ খ্রী) কৃত প্রতিকৃতির এচিংগুলি এক রেম্ব্রাণ্ট ছাড়া সম্ভবতঃ আর কাহারও কাজের সঙ্গে তুলনীয় নহে।
স্পেনদেশীয় শিল্পী গোইয়া (১৭৪৬-১৮২৮ খ্রী) আপন প্রতিভাসংযোগে এচিংকে আরও সম্ভাবনাযুক্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। স্থাপত্যচিত্রণে নূতন দিগন্তের আভাস দিয়াছেন এচিং পদ্ধতিতে শার্ল মেরিওঁ (১৮২১-৬৮ খ্রী)। জেম্স হুইশ্লারও (১৮৩৪-১৯০৩ খ্রী) এই পদ্ধতিতে একটি অমর নাম। এচিং-এর সহিত জড়িত আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম: জোভান্নি পিরানেজি (১৭২০-৭৮ খ্রী), ঝাক্ কাল্পো (১৫৯২-১৬৩৫ খ্রী), স্তেফানো দেল্লা বেল্লা (১৬১০-৬৪ খ্রী), উইলিয়াম হোগার্থ (১৬৯৭-১৭৬৪ খ্রী) প্রভৃতি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক নবজাগরণে অনুপ্রাণিত বাঙালী শিল্পমনীষা দেশ-বিদেশ হইতে শিল্পশৈলী সংগ্রহ করিয়াছিল। বিস্তৃত ভারতীয় চিত্র-পরম্পরার হদিশ খুঁজিতে গিয়া যেমন অবনীন্দ্রনাথকে নূতন করিয়া ভারতীয় শিল্পশৈলী সৃষ্টি করিতে হইয়াছিল, তেমনই আর এক বিস্তৃত ভারতীয় চিত্রপদ্ধতি অম্লজারিত রেখাচিত্রের নব রূপে আত্মপ্রকাশ করিল, যাহার পুরোধা হইলেন অবনীন্দ্র-শিল্পরীতির ঐতিহ্যবাহী কলিকাতার সরকারি চিত্রবিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ মুকুলচন্দ্র দে, লাহোর সরকারি চিত্র-বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সমরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বিশ্বভারতী কলাভবনের নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। বোম্বাইয়ের জিজিভয় চিত্র-বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াই. কে. শুক্লাও ইতালি হইতে এই পদ্ধতি শিখিয়া আসিয়া পশ্চিম ভারতে তাহা জনপ্রিয় করিতে সচেষ্ট হন।
সমকালীন চিত্র-আন্দোলনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এচিংএর প্রায় সব কয়টি পদ্ধতিই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারাইয়া মিশ্র পদ্ধতিতে পরিণত হইয়াছে। তাই আধুনিক শিল্পী জারিত রেখাচিত্র রচনাকালে একই সঙ্গে বহু পদ্ধতির মিশ্রণ ঘটাইয়া নূতন রূপ দিতে সচেষ্ট হইয়াছেন। পাশ্চাত্ত্যের এই সমকালীন চিত্ররীতি হইতে ভারতও পিছাইয়া নাই। একই অম্লজারিত ধাতুফলক হইতে বহুবর্ণ মুদ্রণের ফরাসী পদ্ধতির সহ-আবিষ্কারক হইলেন বর্তমানে পারীপ্রবাসী বোম্বাইয়ের পাশী শিল্পী কায়কোবাদ মোতীওয়ালা (কিকোমোতী)। সাম্প্রতিক এই পদ্ধতি প্রসঙ্গে ভারতীয় শিল্পী কানোয়াল কৃষ্ণান ও সোমনাথ হোড়ের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
দ্র P. G. Hammerton, Etcher’s Handbook, London, 1912; E. S. Lumsden, Art of Etching, London, 1925; T. Plowman, Manual of Etching: A Handbook for the Beginner, London, 1925; David Strang, Printing of Etching and Engravings, London, 1930.
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়