বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/এন্‌জ়াইম

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ৩৩-৩৪)
এন্‌জ়াইম কিণ্বসত্ত্ব। এন্‌জ়াইম জীবদেহের বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় (কেমিক্যাল রিঅ্যাক্‌শন) অনুঘটকরূপে কাজ করে। জীবদেহের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজ্‌ম) ইহাদেরই উপর নির্ভর করে। বিভিন্ন এন্‌জ়াইমের কার্যের ফলে খাদ্যের পরিপাক ও আত্তীকরণ সম্ভব হয়, দেহে অত্যাবশক পদার্থগুলির সংশ্লেষণ ঘটে, খাদ্যে নিহিত রাসায়নিক শক্তি জীবদেহে উত্তাপ, শ্রমশক্তি ও বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই সকল রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাহায্য করিবার ফলে অন্যান্য অনুঘটকের মতই এন্‌জ়াইমের অণুগুলিরও কোনরূপ ক্ষয় বা ক্ষতি হয় না।

 যাবতীয় এঞ্জাইমই প্রোটিনজাতীয় পদার্থ। তবে ইহাদের কতকগুলি সরল প্রোটিন এবং কতকগুলি প্রোটিন ও প্রোটিনেতর পদার্থের সমন্বয়। এই দ্বিতীয় প্রকারের এন্‌জ়াইম অণুগুলির প্রোটিন অংশকে বলে অ্যাপো-এন্‌জ়াইম এবং প্রোটিনেতর অংশকে বলে প্রস্‌থেটিক গ্রুপ বা কো-এন্‌জ়াইম—এই অংশ দুইটি কিন্তু পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এন্‌জ়াইমের কোনও কার্যই করিতে পারে না। ভিটামিন বি-কম্‌প্লেক্‌স, ভিটামিন সি প্রভৃতি ভিটামিন, লোহা, তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ প্রভৃতি ধাতু, নানাবিধ শর্করাজাত এবং রঞ্জক -দ্রব্য প্রভৃতি পদার্থ প্রস্‌থটিক গ্রুপ বা কো-এন্‌জ়াইমে থাকিতে পারে।

 এন্‌জ়াইম জীবকোষেই উৎপন্ন হয়। কতকগুলি এন্‌জ়াইম কোষের মধ্যেই থাকে, আবার কতকগুলি কোষের বাহিরে ক্ষরিত হয়। কোনও কোনও এন্‌জ়াইম নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ক্ষরিত হয়, পরে অন্য এন্‌জ়াইম ইত্যাদির সাহায্যে সক্রিয় হইয়া উঠে; যেমন—অগ্ন্যাশয়ের পাচকরসের ট্রিপ্‌সিনোজেন ক্ষুদ্রান্ত্রের পাচকরসের এন্‌টেরোকাইনেজ নামক এন্‌জ়াইমের সাহায্যে সক্রিয় টিপ্‌সিন এন্‌জ়াইমে পরিণত হয়।

 প্রতিটি এন্‌জ়াইম কেবল সীমাবদ্ধ তাপমাত্রা ও নির্দিষ্ট অম্ল বা ক্ষারধর্মী পরিবেশে সক্রিয় থাকে। কতকগুলি এন্‌জ়াইমের সক্রিয়তার জন্য আবার কোনও বিশেষ অণু বা আয়নের উপস্থিতি প্রয়োজন। যেমন— লালার টায়ালিন নামক এন্‌জ়াইমের কার্যের জন্য ক্লোরাইড আয়নের প্রয়োজন।

 প্রত্যেক এন্‌জ়াইম মাত্র একটি বা অল্প কয়েকটি রাসায়নিক বিক্রিয়াতেই সাহায্য করিতে পারে। দেহে কয়েকটি এন্‌জ়াইমের উপযুক্ত সমন্বয়ে একাদিক্রমে কয়েকটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়া থাকে।

 এন্‌জ়াইমের কার্যপদ্ধতি সম্পূর্ণ জানা নাই। প্রতিটি এন্‌জ়াইমের অণুতেই এক বা একাধিক সক্রিয় কেন্দ্র থাকে। যে পদার্থের উপর এন্‌জ়াইমটি কার্য করে, তাহার অণু প্রথমে এন্‌জ়াইমের ঐ সক্রিয় কেন্দ্রের সহিত সংযুক্ত হইয়া যায়। তখন এন্‌জ়াইম-অণুর অন্যান্য অংশ ঐ সংলগ্ন অণুটির উপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সংলগ্ন অণুটি নূতন এক বা একাধিক অণুতে রূপান্তরিত হইয়া এন্‌জ়াইমের অণু হইতে আবার বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে।

 এযাবৎ প্রায় ৭০০ এন্‌জ়াইমের কথা জানা গিয়াছে। তাহার মধ্যে প্রায় শতাধিক এন্‌জ়াইমকে বিশুদ্ধ অবস্থায় কেলাসিত (ক্রিস্‌ট্যালাইজ্‌ড) করা সম্ভব হইয়াছে।

 প্রধানতঃ কার্যের প্রকৃতির উপর নির্ভর করিয়া এন্‌জ়াইমগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হইয়াছে। যথা—ডিহাইড্রোজেনেজ, অর্থাৎ যে সকল এন্‌জ়াইম কোনও পদার্থ হইতে হাইড্রোজেন বিযুক্ত করিতে সাহায্য করে; ট্রান্‌স্‌অ্যামাইনেজ, অর্থাৎ যে সকল এন্‌জ়াইম অ্যামাইনো-গ্রুপকে এক অণু হইতে অন্য অণুতে স্থানাস্তরিত করে; অক্‌সিডেজ, অর্থাৎ যাহারা কোনও পদার্থের জারণ বা অক্‌সিডেশন ঘটায়— ইত্যাদি।

 রোগ চিকিৎসায় এন্‌জ়াইম নানাভাবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণতঃ বলা যায়, পরিপাকের গোলযোগে পেপ্‌সিন, ট্রিপ্‌সিন প্রভৃতি এন্‌জ়াইম ব্যবহার করিলে প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের পরিপাকের উন্নতি হয়। প্রদাহের চিকিৎসাতেও এন্‌জ়াইম কাজে লাগে।

দ্র J. B. Sumner & G. F. Somers, Chemistry and Methods of Enzymes, New York, 1953; M. Dixon & E. C. Webb, Enzymes, New York, 1958; J. M. Reiner, Behavior of Enzyme Systems, Minneapolis, 1959.

অজিতকুমার চৌধুরী