ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/এরনাকুলম
(পৃ. ৩৭-৩৯)
এরনাকুলম কেরল রাজ্যের জেলা ও জেলা-সদর। জেলার আয়তন ৩২৮৯ বর্গ কিলোমিটার (১২৭০ বর্গ মাইল)। শহরের অবস্থান ১০° উত্তর ও ৭৬°১৯′ পূর্ব।
পূর্বতন ব্রিটিশ কোচিনের রাজধানী এরনাকুলমের প্রাচীন ইতিহাস বিশেষ কিছু জানা যায় না। কিংবদন্তি আছে, ঋষিনাগ নামে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী শেষ জীবনে এরনাকুলমে শিবলিঙ্গ-অর্চনায় রত ছিলেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী উক্ত সন্ন্যাসীর নামানুসারে এই স্থানের পূর্বনাম ছিল ঋষিনাগ-কুলম। ঋষিনাগ-কুলম শব্দের অপভ্রংশ হইতে এরনাকুলম নামের উৎপত্তি হইয়াছে বলিয়া মনে করা হয়।
১৯৬১ সালের জনগণনা অনুযায়ী আলোচ্য জেলার লোকসংখ্যা ১৮৫৯৯১৩ জন; তন্মধ্যে ১৩১২৪৮ জন পুরুষ এবং ৯২৮৬৬৫ জন নারী। পুরুষ ও নারীর অনুপাত ১০০০: ১৯৭। এরনাকুলম জেলা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ—প্রতি বর্গ কিলোমিটারে লোকসংখ্যা ৫৬৫ (প্রতি বর্গ মাইলে ১৪৬৪ জন)। এরনাকুলম শহরে বসবাসকারী ১১৭২৫৩ জন লোকের মধ্যে ৬০২৭১ জন পুরুষ ও ৫৬৯৮২ জন নারী।
এরনাকুলম জেলা বহুপ্রকার শিল্প ও ব্যবসায়ের কেন্দ্র। সরকারি শিল্পসংস্থাগুলির মধ্যে কোচিনে নৌকা তৈয়ারির কারখানা, কোচিন স্টেশন ওয়ার্কশপ ই. এম. ই., কোচিন হারবার ওয়ার্কশপ, ড্রাইডক এবং পাওয়ার স্টেশন ও আলওয়েতে ইণ্ডিয়ান রেয়ার আর্থস ফ্যাক্টরি উল্লেখযোগ্য। সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পসংস্থাগুলির মধ্যে আলওয়েতে কষ্টিক সোডা, সার ও রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা, ত্রিবাঙ্কুর অয়েল গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি এবং ইণ্ডিয়ান অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানির নাম করা যাইতে পারে। আলওয়েতে অনেকগুলি কাপড়ের কল, ট্রান্সফর্মার তৈয়ারির কারখানা এবং এরনাকুলম শহরের তেলকলগুলি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। সরকারি খাতে কুড়ি কোটি টাকা ব্যয়ে কোচিনে ভারতবর্ষের দ্বিতীয় জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের কারখানা ও ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি তৈল শোধনাগার এবং ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে এরনাকুলম শহরে হিন্দুস্থান মেশিন টুল্স ফ্যাক্টরি স্থাপন তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এতদ্ব্যতীত এরনাকুলম শহরে একটি কেব্ল ফ্যাক্টরি ও টিন প্লেট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ও আলওয়েতে ওয়ার রোপ, টায়ার, শিরিষ এবং দস্তা গালাইয়ের কারখানা স্থাপিত হইতেছে। কুটিরশিল্পের মধ্যে নারিকেল ছোবড়ার মাদুর ও দড়ি, উৎকৃষ্ট কুশন ও সূচিকার্যযুক্ত নানা রঙের মাদুর, কাঠের পুতুল এবং নারিকেল তৈল প্রধান। এখানে কিছু পরিমাণ চিনামাটি পাওয়া যায়। শিল্প ও বাণিজ্য -সমিতিগুলির মধ্যে মেরিন প্রডাক্ট্স এক্স্পোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিল প্রভৃতি উল্লেখ্য।
জেলার ভাষা মালয়ালম। জেলায় প্রতি হাজার লোকের মধ্যে ৫০৬ জন অন্ততঃ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন; প্রতি হাজার পুরুষ ও প্রতি হাজার স্ত্রীলোকের মধ্যে ঐ সংখ্যা যথাক্রমে ৫৭৮ ও ৮৩৩। এরনাকুলম শহরে ৪২২৩৩ জন পুরুষ ও ৩২৩৩৯ জন নারী শিক্ষিত ও অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। জেলার ১০টি কলেজের মধ্যে একটি আইন কলেজ ও একটি মহিলা শিক্ষণ কলেজ। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শিক্ষা ও গবেষণা -প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কৃতিকেন্দ্রের মধ্যে সেণ্ট্রাল ফিশারিজ টেক্নোলজিক্যাল রিসার্চ ইন্ষ্টিটিউট, ফাইলেরিয়াসিস ট্রেনিং সেণ্টার, সমস্ত কেরল সাহিত্য পরিষৎ ইত্যাদির নাম করা যাইতে পারে। সম্প্রতি এখানে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপিত হইয়াছে।
মালয়ালী উৎসবাদির মধ্যে ভাদ্র (‘চিঙ্গম’) মাসে পাঁচদিন ধরিয়া অনুষ্ঠিত ‘ওনাম’ উৎসব সর্বপ্রধান। এই উপলক্ষে প্রতিটি গৃহ পুষ্পদ্বারা সজ্জিত করা হয়। প্রীতি-ভোজ, প্রীতি-উপহার, নৃত্যগীত এবং নৌকা-প্রতিযোগিতা ওনাম উৎসবের প্রধান অঙ্গ। চৈত্রমাসে অনুষ্ঠিত মালয়ালী নববর্ষ উৎসব ‘বিশু’র স্থান ওনাম উৎসবের পরেই। সাধারণের বিশ্বাস, এই উৎসবের দিনে প্রত্যূষে শুভবস্তু দর্শনের উপরই মানুষের সারা বৎসরের সুখসমৃদ্ধি নির্ভর করে। এইজন্য উৎসবের পূর্বদিন সন্ধ্যায় একটি কাসার পাত্রে বিভিন্ন শস্য, ফলমূল, পয়সা, মূল্যবান ধাতু এবং ফুল সাজাইয়া রাখা হয়; ইহাকে ‘বিশু কানি’ বলে। পরিবারের লোকেরা প্রত্যুষে উঠিয়া ইহা দর্শন করে। পৌষ (ধানু) মাসে নায়ার রমণীগণ মদনোৎসব উদযাপন করেন। ইহার স্থানীয় নাম ‘তিরাভথি’র উৎসব।
এতদ্ব্যতীত ত্রিপুনিত্তুর মন্দিরে প্রতিবৎসর দশদিন ব্যাপিয়া তিনটি উৎসব পালিত হয়; ইহাদের মধ্যে অগ্রহায়ণ মাসের উৎসবটিতে প্রচুর দর্শকের সমাবেশ হয়। কোচিন রাজাদের কোনও অতীত যুদ্ধজয় স্মরণার্থ আগস্ট মাসে অত্তচামায়ম উৎসবটি সাড়ম্বরে পালিত হয়। কতকগুলি উৎসবে সর্বভারতীয় রূপ পরিস্ফুট। অন্যান্য উৎসবের মধ্যে নবরাত্রি (দশেরা) ও শিবরাত্রির নাম করা যাইতে পারে।
এখানকার অধিকাংশ উৎসবের সঙ্গে কেরলের বিখ্যাত নৃত্যগুলিও প্রদর্শিত হয়। এই নৃত্যগুলির মধ্যে প্রধান বিশ্ববিখ্যাত কথাকলি নৃত্য (‘কথাকলি’ দ্র)। ওনাম উৎসবের সময় এরনাকুলমের অনেক স্থানে কথাকলি নৃত্য প্রদর্শিত হয়। কথাকলি নৃত্যের অনুরূপ অথচ আড়ম্বরহীন ওটান তুল্লাল সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত প্রিয়। পুরাণ প্রভৃতি হইতে অংশবিশেষ আবৃত্তিযোগে কুথু নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
বিশিষ্ট দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে হ্রদের ধারে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত এরনাকুলম শহরটি সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য; এখানে অনেকগুলি মন্দির ও গির্জা আছে। এখানকার বিখ্যাত শিবমন্দির ‘এরনাকুলাথ আপ্পন’ অতি প্রাচীন; এতৎসংলগ্ন নাগ ও গণপতির মন্দির দুইটিও দর্শনযোগ্য। এখানকার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৌধ ও প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যাণ্ট গির্জা, ইহুদীদিগের ভজনালয়, হাইকোর্ট, জেনারাল হসপিটাল, পুরাতন হুজুর বিল্ডিংস, মহারাজার কলেজ, রাজেন্দ্র ময়দান ও দরবার হলের নাম করা যাইতে পারে। এরনাকুলম-সংলগ্ন মুলাভুকদ দ্বীপে সুসজ্জিত বোলাঘাট্টি প্রাসাদ (ওল্ড রেসিডেন্সি) অতি মনোরম; ইহা সাধারণ্যে ‘পোন্নিকর’ নামে পরিচিত। পূর্বে ইহা ওলন্দাজদিগের একটি কারখানা ছিল। ইহারই সন্নিকটস্থ ভল্লরপদম দ্বীপে কুমারী মেরির একটি প্রাচীন গির্জা আছে। এরনাকুলম শহরের প্রায় ৫ কিলোমিটার (৩ মাইল) দূরে কাঞ্জিরামথামে একটি সুন্দর মসজিদ আছে। মালাবার উপকূলে অবস্থিত ইতিহাসপ্রসিদ্ধ প্রাচীন বন্দর কোচিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোচিন দুর্গে ফ্রেস্কোর কাজ করা সান্তাক্রুজ ক্যাথিড্রাল এবং ভারতবর্ষে প্রথম ইওরোপীয় গির্জা বলিয়া প্রসিদ্ধ সেণ্ট ফ্রান্সিসের গির্জা দুইটি বিখ্যাত; শেষোক্ত গির্জায় ভাস্কো ডা গামার সমাধি আছে। বহু পুরাতন শহর, পুরাতন বন্দর ও কোচিনের পূর্বতন রাজধানী মত্তনচেরীতে ৫৮৭ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ইহুদীরা প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করে বলিয়া মনে করা হয়। ১৫৬৮ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত ইহুদীদিগের ভজনালয়টি অবশ্যই দর্শনীয়। ১৬৬২ খ্রীষ্টাব্দে ইহা অগ্নিতে ক্ষতিগ্রস্ত হইলে ১৬৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ওলন্দাজগণ ইহার পুননির্মাণে সাহায্য করেন। ষোড়শ খ্রীষ্টাব্দে ভাস্কর রবিবর্মা উক্ত ভজনালয় নির্মাণের জন্য ভূমি দান করেন। তাম্রফলকে লেখা দানপত্রখানি এখানে সযত্নে রক্ষিত আছে। এখানকার অন্যান্য দর্শনীয় প্রাসাদের মধ্যে প্রাচীরে সুদৃশ্য চিত্রের কাজ করা সপ্তদশ শতাব্দীর ওলন্দাজ প্রাসাদ এবং সুবৃহৎ কোঙ্কণী তিরুমল দেবস্বম্ মন্দিরের নাম করা যাইতে পারে।
আলওয়ে স্বাস্থ্যনিবাস এবং শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র। আলওয়ে নদীতীরে কালাডি নামক গ্রামে সুবিখ্যাত পণ্ডিত, ধর্মসংস্কারক ও দার্শনিক শংকরাচার্য অষ্টম শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। এখানে শংকরাচার্য, দেবী সারদা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মন্দির আছে। প্রাচীন পর্তুগিজরা আলওয়ে নদীতে অবগাহন করিতে ভালবাসিতেন। এবং এই কারণে ইহা তাঁহাদিগের নিকট ‘ফিয়েরা দালভা’ আখ্যা লাভ করিয়াছিল। নদীতীরে শিবালয়ে শিবরাত্রির দিনে বহু পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে। ত্রিপুন্নিত্তুরে অনেক প্রাসাদ ও পূর্ণত্রয়ীশের মন্দির আছে। এখানে বৎসরে দশদিনব্যাপী তিনটি ‘উৎসবম’ অনুষ্ঠিত হয়।
দ্র Madras District Gazetteers: Malabar and Anjengo, vol. 1, Madras, 1908: C. Achyuta Menon, The Cochin State Manual, Ernakulam, 1911; P. M. Thomas ed. Inside Ernakulam, Trichur, 1950; Census of India: Paper No. 1 of 1962 1961 Census: Final Population Totals, Delhi, 1962.