বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওজন পরিমাপ, ভারতীয়

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ৮২-৮৬)

ওজন পরিমাপ, ভারতীয় ভারতীয় ওজন ও পরিমাপের ইতিহাস অতিশয় প্রাচীন। প্রাচীন ভারতে ওজন ও মাপের অন্যদেশনিরপেক্ষ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি পদ্ধতি গড়িয়া উঠিয়াছিল। ঋগ্‌বেদ, শতপথব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণ, গোপথব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয়সংহিতা, কাঠকসংহিতা, নিরুক্ত ও কাত্যায়নের শ্রৌতসূত্রে তৎকালে প্রচলিত ওজনের নানা এককের উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময়ে ভারতে নিষক, মান, শতমান, সুবর্ণ, পাদ, কৃষ্ণল, কার্য প্রভৃতি একক প্রচলিত ছিল। ঋগ্‌বেদে (২.৩৩, ১০; ৮. ৪৭. ১৫) ও বৌদ্ধজাতকের গল্পে ১. ৩৭৫; ৬.৫৪৬—কুহকজাতক; বেস্‌সন্তরজাতক) নিষ্ক ও মানের এবং শতপথব্রাহ্মণে (১২.৭.২.১৩; ১২.৯.১.৪; ৫.৫.৫.১৬; ১৩.১.১.৪; ১৩.২.৩.২; ১৩.৪.১.১৩; ১৩. ২.৭.১৩; ১৫.৩.১.৩২), তৈত্তিরীয়সংহিতা (৩.২.৬.৩; ২.৩.১১.৫), কাত্যায়নের শ্রৌতসূত্র (১৫, ১৮১. ৩); পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী (৫. ১. ২৭) ও উহার বার্তিকে (৫.১.২৯) শতমানের উল্লেখ আছে। সুবর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায় শতপথব্রাহ্মণ (১৩. ২. ৩. ২) ও জাতকের বিভিন্ন গল্পে (ভূরিদত্তজাতক, উদয়জাতক, শঙ্খপালজাতক)। পাদের সাক্ষাৎ মিলে নিরুক্তে (২. ৭), বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩.১.১) ও অষ্টাধ্যায়ীতে (৫. ১. ৩৪)। কৃষ্ণল বা রক্তিকের উল্লেখ পাওয়া যায় তৈত্তিরীয়সংহিতা (২. ৩. ২. ১ প্রভৃতি), মৈত্রায়ণীসংহিতা (২. ২. ২.১), কাঠকসংহিতা (১১. ৪.), তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণ (১. ৩. ৬.৭), অনুপদসূত্র (৯. ৬) ও মনুসংহিতায় (৮.১৩৪)। বৌদ্ধজাতকের গল্পে ও মনুসংহিতায় (৮. ১৩৬) কার্ষাপণ বা কার্যের উল্লেখ আছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হইতে দেখা যায় তৎকালে রৌপ্য ও তাম্র—এই দ্বিধাতুভিত্তিক ওজনপদ্ধতি এই দেশে প্রচলিত ছিল। তাহা ছাড়া, মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যধর্মসূত্র ও নারদস্মৃতিতে ওজন ও মাপের বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। এই সমস্ত হইতে দেখিতে পাওয়া যায়, একটি সূক্ষ্ম ও সুসংবদ্ধ ওজনপদ্ধতি বহু পূর্ব হইতেই ভারতবর্ষে বিদ্যমান ছিল।

 মনুসংহিতায় (৮.১৩১-৭) ওজনের নিম্নোক্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে:

৮ ত্রসরেণুতে (রৌদ্রে পরিদৃশ্যমান বায়ুতে ভাসমান ধুলিকণা) ১ লিয়্যা (পোস্তদানা), ৩ লিয্যাতে ১ রাজসর্ষপ, ৩ রাজসর্ষপে ১ গৌরসর্ষপ, ৬ গৌরদর্ষপে ১ যব, ৩ যবে ১ কৃষ্ণল বা রক্তিক (রতি, গুঞ্জাফল)।

রৌপ্য: ২ রতিতে ১ মাষক, ১৬ মাষকে ১ ধরণ বা পুরাণ, ১০ পুরাণে ১ শতমান।

স্বর্ণ: ৫ রতিতে ১ মাষ, ১৬ মাষে ১ সুবর্ণ, ৪ সুবর্ণে ১ পল বা নিষ্ক, ১০ নিঙ্কে ১ ধরণ।

তাম্র: ৮ রতিতে ১ কার্যাপণ।

 মনুবর্ণিত এই ওজনপদ্ধতি হইতে দেখিতে পাওয়া যায়, প্রাচীন ভারতবর্ষে সোনা রুপা ও তামার ওজনের পাশাপাশি পরিপূরক একক হিসাবে পোস্তদানা, সরিষা, মাষ, যব, রতি প্রভৃতি শস্যবীজের প্রচলন ছিল, আর এই ওজনপদ্ধতির কেন্দ্রীয় একক ছিল রতি ও মাষ। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনুবর্ণিত সেই ওজনপদ্ধতির পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তু ভারতীয় ওজনপদ্ধতিতে এই রতি ও মাষের (‘মাষা’র) অস্তিত্ব হাজার হাজার বছর ধরিয়া চলিয়া আসিয়াছে।

 সে যুগে বর্তমান কালের মত ওজনের বিশুদ্ধি পরীক্ষার অন্য কোনও সহজ উপায় ছিল না। তাই জনসাধারণ শস্যবীজের সাহায্যে স্বর্ণকার ও ব্যবসায়ীদের ওজনের বিশুদ্ধি পরীক্ষার এক অভিনব নির্ভরযোগ্য উপায় বাহির করে। পোস্তদানা দিয়া কালো অথবা শাদা সরিষার, যব দিয়া রতির, আবার রতি দিয়া মাষের ওজনের বিশুদ্ধি পরীক্ষা করা হইত। পরবর্তীকালে এড্‌ওয়ার্ড টমাস, কানিংহ্যাম প্রমুখ প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ্‌গণের গবেষণার ফলে এই শস্যবীজমূলক ওজনপদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে।

 ঠিক কোন্ সময় হইতে প্রাচীন ভারতীয় রতিমাষ-কেন্দ্রিক ওজনপদ্ধতির মধ্যে তোলা, সের, মন প্রভৃতি একক স্থান লাভ করে তাহা সঠিক বলা কঠিন। মনুসংহিতায় ও যাজ্ঞবন্ধ্যের ধর্মসূত্রে ইহাদের কোনও উল্লেখ নাই। তবে ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তোলা, সের, মন প্রভৃতি একক ভারতবর্ষে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। বাবরের আত্মচরিতে দেখিতে পাওয়া যায়, সে সময়ে ৮ রতিতে ১ মাষা, ১২ মাষায় ১ তোলা, ১৪ তোলায় ১ সের, ৪০ সেরে ১ মন—মোটামুটি এই নিয়মই উত্তর ভারতে প্রচলিত ছিল। বাবর হইতে আরম্ভ করিয়া মোগল রাজত্বের শেষ পর্যন্ত, এমন কি, ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ রাজত্বকালেও উত্তর ভারতে ওজনের এই ধারাই মোটামুটি অব্যাহত থাকে।

 কিন্তু ভারতবর্ষে সাধারণতঃ তোলা ছটাক—(ষট্‌ + অঙ্ক বা আঁক)—সের (শেটক, সেটক)—মন-মূলক ওজনপদ্ধতির প্রচলন থাকিলেও এ ব্যাপারে বিভিন্ন অঞ্চলনিরপেক্ষ সর্বস্থলগ্রাহ্য কোনও মান প্রচলিত ছিল না। অঞ্চলে অঞ্চলে ওজনের মানের যথেষ্ট তারতম্য ছিল। এমন কি একই গ্রাম, শহর বা বাজারে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন মানে ওজনের রেওয়াজ ছিল। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অবশ্য বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়িয়া ওজনের এককসমূহের একই নাম প্রচলিত ছিল, কিন্তু নামের সমতা সত্ত্বেও তাহাদের মানে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ মন-সেরের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ভারতবর্ষের কোথাও রহিয়াছে ২৮০ তোলায় ১ মন, কোথাও বা ৩২০০ তোলায় আবার কোথাও বা ৮৩২০ তোলায়। আছে ৬০ তোলায় ১ সের, কোথাও ৮০ তোলায়, কোথাও ১৬০ তোলায়, আবার কোথাও বা ২৪ তোলায়। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে ওজনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন নাম প্রচলিত আছে। ৮ রতিতে ১ মাযা, ১২ মাষায় ১ তোলা, ৫ তোলায় ১ ছটাক, ১৬ ছটাকে ১ সের, ৪০ সেরে ১ মন—উত্তর ভারতে মোটামুটি এই নিয়ম প্রচলিত। দক্ষিণ ভারতে, বিশেষতঃ মাদ্রাজে, রতি-মাষা-ছটাকের নাম খুব কম লোকেই জানে। সেরের প্রচলন আছে বটে, তবে উত্তর ভারতের সেরের সঙ্গে তাহার তুলনা চলে না। কারণ, সেখানে ১ সের হয় মাত্র ২৪ তোলায়। মাদ্রাজের কোনও অঞ্চলে ৯৬০ তোলায় ১ মন, কোনও অঞ্চলে ১০০০ তোলায়, আবার কোনও অঞ্চলে বা ১১২০ তোলায়। ওড়িশায় বালসরি সের ৮০ তোলায়, আর কটকি সের ১০৫ তোলায়। মধ্য প্রদেশে জায়গায় জায়গায় পাি বা কাঠার মাপের পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায়। শুধু তাহাই নহে, একই বাজারে চাউলের পাল্লি ৪২৩ তোলায়, জোয়ারের ৩৮২ তোলায়, লবণের ৩০৫ তোলায়, আর তিলের ৩০৯ তোলায়। ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল হইতে জুলাই মাসের মধ্যে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (ন্যাশন্যাল স্যাম্প্‌ল সার্ভে) অনুসন্ধানের ফলে প্রকাশ পাইয়াছে যে ভারতবর্ষে সে সময়ে অন্ততঃ ১৪৩ রকমের বিভিন্ন ওজনপদ্ধতি প্রচলিত ছিল।

 ওজনের এই বৈচিত্র্যের ফলে জনসাধারণকে বিশেষ অসুবিধা ভোগ করিতে হইত। ইহার ফলে পণ্যদ্রব্যের যথার্থ স্তরবিন্যাস, মাননির্ধারণ ও মূল্য উল্লেখ এবং পরিসংখ্যানরচনা অতিশয় দুরূহ ব্যাপার ছিল। এইসব অসুবিধা দূর করিয়া সমস্ত ভারতবর্ষে একই মানের (স্ট্যাণ্ডার্ড) ওজন প্রবর্তনের জন্য ভারত সরকার সচেষ্ট হন। এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা হয় ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে। তাহারই ভিত্তিতে ১৮৭১ খ্রীষ্টাব্দে একটি আইনও পাশ হয়। কিন্তু নানাকারণবশতঃ আইনটি কখনও কার্যকর হয় নাই। তাহার পর ১৯০১, ১৯১৩ ও ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে ওজনের মাননির্ণয়ের প্রচেষ্টা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওজনব্যবস্থা আগে যেমন ছিল, তেমনই চলিতে থাকে। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে বিষয়টি আবার প্রাধান্য লাভ করে এবং ওজন ও মাপের মান নির্ণয় করিয়া ভারত সরকার একটি আইনও পাশ করেন। তাহার ফলে ৮০ তোলায় স্ট্যাণ্ডার্ড ১ সের এবং ৪০ সেরে স্ট্যাণ্ডার্ড ১ মন ধার্য করিয়া সর্বভারতীয় ভিত্তিতে ইহাকে গ্রহণ করার পরিকল্পনা হয়। কিন্তু আইনটি পাশ হওয়া সত্ত্বেও দুই-একটি প্রদেশ ব্যতীত ইহার বিধানসমূহ অন্যত্র কার্যকর হয় নাই।

 ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও দেশের দ্রুত শিল্পায়ন প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ওজন ও মাপের মাননির্ণয়প্রসঙ্গটি পুনরায় প্রাধান্য লাভ করে। পরিকল্পনা কমিশন অবিলম্বে ধাপে ধাপে ভারতবর্ষে মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ও মাপ প্রবর্তনের সুপারিশ করেন। তাহারই ফলে ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মেট্রিক পদ্ধতির ভিত্তিতে ‘ওজন ও মাপের মান নির্ণয়ন’ আইনটি ভারতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয় এবং ১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দের ১ অক্টোবর হইতে মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ও মাপ ভারতবর্ষে আইনতঃ চালু হয়। নূতন ব্যবস্থা অনুসারে ভারতবর্ষ হইতে মন-সের-ছটাক-তোলা প্রভৃতি ওজন ধীরে ধীরে সম্পূর্ণরূপে উঠিয়া যাইবে এবং তাহাদের স্থলে গ্রাম-কিলোগ্রাম-কুইণ্ট্যাল প্রভৃতি মেট্রিক এককের ব্যবহার হইবে।

 মেট্রিক পদ্ধতির ওজনের মূল একক হইল গ্রাম। ইহা আমাদের তোলার প্রায় দুই ভাগের সমান। এই মূল এককটিকে পর্যায়ক্রমে ১০ দিয়া গুণ অথবা ভাগ করিলে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মেট্রিক এককসমূহ পাওয়া যায়। এই গুণ-ভাগ করিবার জন্য সাধারণতঃ নিম্নোক্ত ছয়টি উপসর্গের ব্যবহার হয়:

ডেকা = ১০ গুণ ডেসি = /১০ ভাগ
হেক্টো = ১০০ গুণ সেণ্টি = /১০০ ভাগ
কিলো = ১০০০ গুণ মিলি = /১০০০ ভাগ

ইহাদের মধ্যে ডেকা, হেক্টো, কিলো—এই তিনটি গ্রীক শব্দ, আর ডেসি, সেণ্টি, মিলি—এই তিনটি লাতিন শব্দ। এই উপসর্গগুলিকে ওজনের মূল একক গ্রামের সহিত যোগ করিয়া হেক্টোগ্রাম, কিলোগ্রাম, সেণ্টিগ্রাম, মিলিগ্রাম ইত্যাদি এককসমূহ পাওয়া যায়। ইহারা এক গ্রামের কত গুণ অথবা কত ভাগ ওজন নির্দেশ করে, তাহা উপরিলিখিত তালিকা হইতে পাওয়া যাইবে।

 মেট্রিক পদ্ধতির বিভিন্ন এককসমূহের মধ্যে একটা সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত সম্বন্ধ আছে। যেমন, এক সেণ্টিমিটার লম্বা, এক সেণ্টিমিটার চওড়া ও এক সেণ্টিমিটার উঁচু (অর্থাৎ এক ঘন সেণ্টিমিটার বা সি.সি.) একটি পাত্র পূর্ণ করিতে চার ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেড তাপমাত্রার পরিস্রুত জল যতটা লাগে, সেই জলের ওজন হইল এক গ্রাম।

 প্রাচীন ভারতবর্ষে মুদ্রার দ্বৈত ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ যাহা ধাতুমুদ্রা তাহাই আবার ওজন বলিয়াও পরিগণিত হইত। ইংরেজ শাসনের গোড়ার দিকেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। বস্তুতঃ ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দের রেগুলেশনের পূর্ব পর্যন্ত মুদ্রা ও ওজন অভিন্ন ছিল। কিন্তু ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি হইতে পূর্বোক্ত রেগুলেশনের বিধান অনুযায়ী অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং মুদ্রায় বিশুদ্ধ রৌপ্যের পরিমাণ না বাড়াইয়া তামার সংমিশ্রণ প্রচলিত করা হয়। ফলে মুদ্রার স্ট্যাণ্ডার্ড-বিশুদ্ধতা নষ্ট হইয়া যায়। রেগুলেশনের পূর্বে এক টাকার ওজন ছিল ১৭৯৬৬৬ ট্রয় গ্রেন। তামার সংমিশ্রণের ফলে টাকার ওজন পূর্বের তুলনায় ১২২৫০/১৭৯৬৬৬ ভাগ বাড়িয়া যায় এবং ওজনের একককে টাকার অঙ্কে পরিবর্তন এক জটিল গাণিতিক হিসাবের ব্যাপারে পরিণত হয়। যাহাই হউক, তাম্রমিশ্রিত এই নূতন মুদ্রার নাম দেওয়া হয় সিক্কা টাকা। কিন্তু নূতন মুদ্রা বাজারে চালু হইলেও বিশুদ্ধ রৌপ্যনির্মিত পুরাতন মুদ্রাকে ‘সিদ্ধা ওজন’—এই নূতন নামে তখনও বাজারে চালু রাখা হয় এবং বাজার-ওজনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। পুরাতন সিক্কার প্রতি ৮০টির ওজন ১ সের, আর এইরূপ ৪০ সেরে ১ মন বলিয়া নির্ধারিত হয়। নূতন রেগুলেশনের বলে এইরূপে ‘সিক্কা ওজন’কে বাজার-মনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়।

 ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৭ নম্বর রেগুলেশনের বলে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ওজনের সমতাবিধান এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগে ব্যবহৃত ওজনসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা হয়। টাঁকশালে নির্দিষ্ট মানের পিতলের ১ সের ও ১ তোলা ওজনের বাটখারা তৈয়ারি করাইয়া বাংলা প্রেসিডেন্সির কালেক্‌টরি অফিসসমূহে বিতরণের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যতঃ উক্ত রেগুলেশনের অন্তর্গত ওজনের সংস্কারমূলক বিধানসমূহের প্রয়োগ জনসাধারণের সদিচ্ছার উপর ছাড়িয়া দেওয়া হয়। কোনও রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ কোম্পানি-পরিচালকগণের অভিপ্রেত ছিল না। পরবর্তী কালে শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক কারণবশতঃ মুদ্রায় বিশুদ্ধ রৌপ্যের পরিমাণের হ্রাসবৃদ্ধি সত্ত্বেও টাকার এক তোলা ওজন মোটামুটি অব্যাহত ছিল এবং তাহার সাহায্যে প্রয়োজনবোধে কোনও দ্রব্যের ওজনের বিশুদ্ধি পরীক্ষা করা সম্ভব হইত। ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দের রেগুলেশন অনুযায়ী ৮০ সিক্কায় ১ সের আর এরূপ ৪০ সেরে ১ মন হইত—এ কথা আগেই বলা হইয়াছে। সেই সময় হইতে স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগে দশমিক মুদ্রা প্রচলনের পূর্ব পর্যন্ত মুদ্রাভিত্তিক এই ওজনপদ্ধতি আমাদের দেশে অক্ষুণ্ণ ছিল। ভারতবর্ষে দশমিক মুদ্রা প্রচলনের পরেও মুদ্রা ও ওজনের এই সংযোগধারা বিচ্ছিন্ন হয় নাই। পূর্বের টাকার ওজন ১ তোলার পরিবর্তে দশমিক টাকার ওজন ১০ গ্রাম করা হইয়াছে। পূর্বে ৮০ টাকার ওজন ছিল ১ সের; দশমিক মুদ্রাব্যবস্থায় ১০০ টাকার ওজন ১ কিলোগ্রাম। ওজনের মূল একক ‘কিলোগ্রামে’র সহিত দশমিক মুদ্রার মূল একক ‘টাকা’র এইরূপে সংযোগসাধন করা হইয়াছে।

 ওজনের সাহায্যে কঠিন বস্তুর পরিমাণ নির্ণয়ের সাধারণ ব্যবস্থা ছাড়াও ভারতবর্ষে শস্যাদি কঠিন বস্তুর আয়তন মাপিবার এক বিকল্প পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। এই বিকল্প পদ্ধতি অনুসারে শস্যাদি পাল্লায় ওজন না করিয়া কাঠ, বেত বা মাটির তৈয়ারি বিশেষ ধরনের পাত্রের সাহায্যে মাপিয়া পরিমাণ স্থির করা হইত। ওজনের বিভিন্ন এককের সহিত সংগতি রাখিয়া এইসব পাত্রের আয়তন ও ধারণক্ষমতা ঠিক করা হইত। তরল বস্তুর আয়তন পরিমাপের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হইত। শস্য মাপিবার জন্য কাঠা, পাল্লি প্রভৃতির ব্যবহার হইত। দুধ প্রভৃতি তরল বস্তু মাপিবার জন্য কাঠ বা বাঁশের চোঙ বা ধাতুনির্মিত পাত্রের প্রচলন ছিল। কঠিন ও তরল বস্তু পরিমাপের এই পদ্ধতি অতি প্রাচীন কাল হইতেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। শস্য মাপিবার জন্য ঋগ্‌বেদে স্থিবি (১০.৬৮.৩; ১০.২৭.১৫) এবং ব্রাহ্মণসমূহে শরাব (তৈত্তিরীয় ১.৩.৪৫; শতপথ ৫. ১. ৪. ১২) প্রসৃত (শতপথ ১৩.৪.১.৫; শাঙ্খ্যায়ন-শ্রৌতসূত্র ১৬. ১. ৭) প্রভৃতি এককের উল্লেখ পাওয়া যায়। মনুসংহিতায় প্রসঙ্গক্রমে তরল বস্তুর আয়তন পরিমাপের উল্লেখ আছে। কিন্তু এই সম্বন্ধে আমরা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাই ‘অথর্ব-পরিশিষ্টে’। তাহা ছাড়া, বরাহ, স্কন্দ, ভবিষ্য ও পদ্ম-পুরাণেও এই সম্বন্ধে আলোচনা আছে। এইসব গ্রন্থ হইতে দেখা যায় যে সে সময়ে পল, প্রসৃতি, কুড়ব, প্রস্থ, আঢ়ক, দ্রোণ, কুম্ভ, বাহ প্রভৃতি এককের প্রচলন ছিল। ১ পল ছিল ৩২০ রতির সমান। প্রসৃতি, কুড়ব, প্রস্থ, আঢ়ক, দ্রোণ, কুম্ভ, বাহ যথাক্রমে ৭ তোলা, ১৪ তোলা, ৫৬ তোলা, ২২৪ তোলা, ৮৯৬ তোলা, ১৭৯২০ তোলা ও ১৯৭২০০ তোলার সমান ছিল। অর্থাৎ ১ কুম্ভ ছিল ৫ মন ২৪ সেরের সমান, আর এক বাহের পরিমাণ ছিল ৫৬ মন। আয়তন পরিমাপের এইসব একক বহুকাল আগেই এই দেশ হইতে লোপ পাইয়াছে। রতি-মাষার মত ইহাদের অস্তিত্ব কোথাও বর্তমান নাই।

 কিন্তু উপরে বর্ণিত এইসব প্রাচীন একক এই দেশ হইতে লোপ পাইলেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে শস্য ও তরল বস্তু পরিমাপের নানা আঞ্চলিক পদ্ধতি বরাবরই বিদ্যমান ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ গিদ্দা, সোলা, যাব, আদ্দা, কুঞ্চম্, বুরিপুত্তি, পেদ্দাপুত্তি, গরিমা (অন্ধ্র); চৌকি, কঙ্গন, তুলি, মুলিয়া, মন, মণি (মধ্য প্রদেশ); ওল্লোক, মরাকল, পরা, এদাঙ্গলি, কুট্টি, উরি, পাবু, সেরু, কুঠ্‌ঠি (মাদ্রাজ); আদা, সোলা, বোদা, আধা (ওড়িশা); চৌরি, সৈ, নলি, পৈলি (উত্তর প্রদেশ); পোয়া, সের, কাঠা (পশ্চিম বঙ্গ) প্রভৃতি এককের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দের জাতীয় নমুনা সমীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায় অনুসন্ধানের ফলে প্রকাশ পাইয়াছে, ভারতবর্ষে সে সময়ে অন্ততঃ ১৬০ রকমের ধারকত্ব পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু এক অঞ্চলের পরিমাপ পদ্ধতির সহিত অন্য অঞ্চলের পরিমাপ পদ্ধতির কোনও সামঞ্জস্থ ছিল না। ওজনের মূল একক সের অথবা মনের সহিত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহাদের কোনও স্বাভাবিক যোগও ছিল না। এইসব বিভিন্ন আঞ্চলিক পদ্ধতির পরিবর্তে দেশের সর্বত্র বিজ্ঞানসম্মত একটি মাত্র পরিমাপ পদ্ধতির প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে ভারত সরকার ১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দের ১ অক্টোবর হইতে ভারতবর্ষে মেট্রিক পদ্ধতি চালু করেন। ইহার ফলে সকল দেশজ একক বাতিল হইয়া তাহাদের স্থলে লিটার, কিলোলিটার প্রভৃতি এককের ব্যবহার আইনতঃ বাধ্যতামূলক হইয়াছে। এইসব একক মূলতঃ আয়তন (ভল্যুম) পরিমাপের একক। দশ সেণ্টিমিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বিশিষ্ট একটি কিউবের আয়তন হইল এক হাজার কিউবিক সেণ্টিমিটার বা এক লিটার। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে এক কিউবিক সেণ্টিমিটার পরিস্রুত জলের ওজন (চার ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেড তাপমাত্রায়) এক গ্রাম। অতএব এক লিটার অনুরূপ জলের ওজন হইবে এক হাজার গ্রাম বা এক কিলোগ্রাম। এক লিটার পরিমাণ অন্য কোনও তরল পদার্থের ওজন অবশ্যই তাহার আপেক্ষিক গুরুত্বের (স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি) উপর নির্ভর করিবে। যেমন, সমান আয়তনের পারদ জল অপেক্ষা ১৩.৬ গুণ ভারি, বলিয়া এক লিটার পারদের ওজন ১৩.৬ কিলোগ্রাম। মেট্রিক পদ্ধতিতে আয়তন ও ওজন পরিমাপের মূল এককদ্বয়ের মধ্যে এইভাবে সহজ গাণিতিক সম্বন্ধ স্থাপন করা হইয়াছে।

দ্র James Princep, Essays on Indian Antquities, vols. I-II, London, 1858; Edward Thomas, Ancient Indian Weights, London, 1874; B. R. Bhandarkar, Carmichael Lectures on Ancient Indian Numismatics, Calcutta, 1921.

অনিলকুমার আচার্য