বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওড়িয়া লোকসাহিত্য, লোকসংগীত, লোকনৃত্য

উইকিসংকলন থেকে

ওড়িয়া লোকসাহিত্য, লোকসংগীত, লোকনৃত্য লোকসংগীত, উপকথা, সরস লোকোক্তি ও প্রবাদ রচনাদির প্রাচুর্যে ওড়িয়া লোকসাহিত্যের ঐতিহ্য অতি সমৃদ্ধ। গোপালচন্দ্র প্রহরাজ অনুযায়ী ওড়িয়া লোকপুরাণের (ফোকলোর) মধ্যে পড়ে ছেলেভুলানো ছড়া, ঘুমপাড়ানি গান, গাথা ও ছড়া, মহলের আড্ডায় প্রচলিত প্রবচন, প্রথম শ্বশুরগৃহে যাত্রাকালে নববধুর দুঃখ লইয়া রচিত করুণ গান, শকট-চালক, ধোপা, কাঠুরিয়া, কামার, চাষীদের কাজ করিতে করিতে গাওয়া গান, ভিখারি ও বেদের গান, বাউরি, শঅর (শবর) ইত্যাদি অস্পৃশ্য জাতির বামু নাচের গান, চৈত্রমাসে জেলেদের চৈতিমোড়ার গান, দোলযাত্রায় রাখালের গীত, সাপুড়ের সাপ নাচানো গান ইত্যাদি।

 বহুপ্রকার জনপ্রিয় লোকসংগীত আছে যেগুলি ওড়িশার (উড়িষ্যা) বিভিন্ন প্রকার লোকনৃত্যের সহিত সংশ্লিষ্ট। যেমন পটুয়া, করম, ডালখাই, রসরকেলি পুচি খেলঅ, দাণ্ডনাট প্রভৃতি।

 অসংখ্য ব্রতকথা ও আখ্যান আছে যেগুলিতে হর-পার্বতী বা অন্য কোনও দেব-দেবীর অলৌকিক মাহাত্ম্য বর্ণিত। এইরূপ বিবিধ বিচিত্র গাথার মধ্যে রহিয়াছে প্রেম-বিরহ, বৃদ্ধ-যুবা, রাজপুত্র-রাজকন্যা, কৃষক, মাঝি-মাল্লার কাহিনী। ভাদ্রমাসের প্রতি রবিবারে কুমারী মেয়েরা ভালকুনি বা তপই ওষার ব্রত পালন করিয়া থাকে। ইহার কাহিনীর মধ্যে ওড়িশার ‘সাধব’ নামে পরিচিত বণিক-সম্প্রদায়ের প্রাচীন সমুদ্রযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। গল্পের তপই সাত ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট বোন। সাত ভ্রাতৃজায়ার নিকট বোনকে রাখিয়া বাণিজ্য করিতে গেলে বউয়েরা ননদকে লাঞ্ছনা করিতে থাকে। ভাইয়েরা ঘরে ফিরিলে বোন কেমন করিয়া তাহার শোধ লইল, সেই কাহিনীই এখানে বর্ণিত হইয়াছে।

 বৎসরের পবিত্রতম কার্তিক মাসের পূর্ণিমা রাত্রে পুরুষ-স্ত্রীলোক এবং শিশুরা খেলনার নৌকা সমুদ্র নদী অথবা পুষ্করিণীর জলে ভাসাইয়া দিয়া বর্ষা ঋতুর অবসানে সমুদ্রযাত্রার শুভসূচনা করে। এই সময়ে একদল ভিক্ষুক সারা মাস ধরিয়া বাড়ি বাড়ি গান গাহিয়া ভিক্ষা করে। ইহারা নীচ জাতির ব্রাহ্মণ এবং চাকুলিয়া পণ্ডা নামে পরিচিত। ইহাদের লইয়া নানা প্রকার উপকথা প্রচলিত আছে।

 ওড়িয়া পল্লীগীতিগুলি বিভিন্ন ধরনের। যেমন, গাথা-কবিতা (গৃহস্থ নারীর সুখ-দুঃখের কথা), মঙ্গলকেলি (বিবাহাদি অনুষ্ঠানের মঙ্গলাচরণ), কান্দনা (পিত্রালয় ত্যাগ করিবার পূর্বে মেয়েদের গান), দোলিগীত (আষাঢ় মাসে রজ পর্বের গান), ওষাদিনর শপথগীত (কুমারী কন্যার উপবাসব্রত ও প্রার্থনা গান), গোঠোবাহুরা গীতি (গোধুলির গান), নাঁ দিয়া (ধাঁধা), পুচি খেল (দুর্গাপূজার পর কুমারীদের গান), শিশুগীতিকা (ঘুমপাড়ানি গান), ঢগঢ মালি (প্রবাদ বাক্য), অমরকেলি (যুদ্ধের গান) ইত্যাদি।

 কতকগুলি লোকসংগীতে একটি অংশ পুরুষ গায়ক গাহিবার পর স্ত্রীলোক তাহার উত্তর দেয়। জ্যৈষ্ঠমাসে সংক্রান্তি উৎসবে এবং আশ্বিন মাসে কুমারপূর্ণিমার রাত্রিতে বালক-বালিকারা দুলিয়া দুলিয়া গান গায়।

 ওড়িয়া লোকনাট্যের উদ্ভবের সঠিক কাল নির্ণয় দুরূহ। তবে জনসাধারণের উপর ইহার প্রভাব খুব গভীর। আদি লোকনাট্য গীতিবহুল ‘অপেরা’-জাতীয় ছিল। রামায়ণ মহাভারত এবং অন্যান্য পুরাণের কাহিনীই এইসব নাটকের মুখ্য উপজীব্য ছিল। প্রাচীন কালে রামলীলা, কৃষ্ণলীলা ও রাম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং এইগুলি ধীরে ধীরে যাত্রায় পরিণতি লাভ করে। লেখকেরা ছিলেন পল্লীবাসী, তাঁহাদের কেহ কেহ আবার অভিনয়ের ব্যবস্থা ও তদারকিও করিতেন। প্রথমে যাত্রাগানের পালাগুলি কেবল পুরাণ ও কিংবদন্তির কাহিনী অবলম্বনে রচিত হইত। এইগুলিকে দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করা চলে—একটি বিয়োগান্ত, তাহাতে শেষ পর্যন্ত দুষ্ট চরিত্রের কোনও দানব-রাক্ষসের নিধন দেখানো হইত, যেমন কংস-বধ বা ইন্দ্রজিৎ নিধন। অন্যটি মিলনান্ত—নায়ক-নায়িকার মিলন বা বিবাহে তাহার সমাপ্তি, যেমন উষাপরিণয়, সুভদ্রাহরণ, রুক্মিণীবিবাহ ইত্যাদি। এই সকল যাত্রা-অভিনয়ে সাধু এবং অসাধু চরিত্রের আচরণ ও পরিণাম নিরক্ষর জনসাধারণের মনে নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিত। যাত্রার কতকগুলি পেশাদার হাস্যরসিক সকলের মনোরঞ্জন করিত যেমন দ্বারী বা দ্বারপাল, ঝাড়ুদার ও তাহার পত্নী কিংবা বেদে। প্রতিটি চরিত্রকেই অভিনয়ের জন্য নির্দিষ্ট মুক্ত অঙ্গনে প্রবেশের সময় গান গাহিয়া আত্মপরিচয় দিতে হইত। এইসব রচনায় সরল ওড়িয়া ভাষার ফাঁকে ফাঁকে হিন্দী ও উর্দূ গান এবং কথাবার্তাও যে মধ্যে মধ্যে দেখা যায় তাহা মুসলমান প্রভাবের ফল। ‘মোগল তামাশা’ নামে একটি পালা বালেশ্বর জেলার ভদ্রকে খুবই প্রচলিত, ইহাতে মুসলমান শাসকবর্গের প্রতি যথেষ্ট ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আছে।

 গোপাল দাস, বৈষ্ণব পাণি এবং বালকৃষ্ণ মহাস্তি হইলেন বর্তমান শতাব্দীতে প্রসিদ্ধ পালা লেখক ও যাত্রাদলের ব্যবস্থাপক। পুরাতন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বর্তমান সমাজের চিত্রণে বৈষ্ণব পাণি বিশেষ কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন। তাঁহার মত অধিকসংখ্যক যাত্রার পালাও কেহ লেখেন নাই। আধুনিক শিক্ষার ক্ষতিকর প্রভাব, নগর ও গ্রামজীবনের গুরুতর অসংগতি, কলিকাতার পাটকলে চাকুরিপ্রার্থী শ্রমিকশ্রেণীর দুঃখদারিদ্র্য আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁহার লেখায় ফুটিয়া উঠিয়াছে।

 বালকৃষ্ণ মহান্তি বৈষ্ণব পাণির ন্যায় অভিনেতা ও লেখক ছিলেন। বাংলা দেশের গ্রামে পর্যস্ত তাঁহার যাত্রা-অভিনয়ের খ্যাতি ছড়াইয়াছিল। ওড়িয়া নাট্যামোদীগণের নিকট গোপাল দাস এবং জগু ওঝাও বিশেষ প্রিয়। অন্যান্য গীতিনাট্যরচয়িতাগণের মধ্যে ভিখারি, বন্ধু, মাগুনি, দুষ্কর, পদ্মলব এবং কৃষ্ণপ্রসাদের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখনকার দিনের রুচির উপযোগী করিবার জন্য ইহার যথেষ্ট পরিবর্তন হইয়াছে এবং এখনও জনসাধারণের শিক্ষা ও আনন্দের ইহা প্রধান উৎস। দক্ষিণে গঞ্জাম জেলায় ‘রাধাপ্রেমলীলা’র প্রচলন অধিক। রাধা এবং গোপীগণের সহিত শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা শরৎ ও বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়। এইগুলি যথাক্রমে শারদ রাস ও বাসন্ত রাস নামে পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পিণ্ডিকি শ্রীচন্দন শারদ রাস এবং বাসন্ত রামলীলা রচনা করেন। প্রায় প্রতি গ্রামেই সংকীর্তনের দল দেখা যায়। সংকীর্তনের পদকর্তাদের নাম অজ্ঞাত।

 রাসলীলা সংগীত ও যাত্রাগুলির মত অধিকাংশ লোকনৃত্য গীতসহযোগে অনুষ্ঠিত হয়। পালা নামে আর এক ধরনের অনুষ্ঠান ও ওড়িশায় প্রচলিত। সন্ত কবীর যেমন সারা ভারতে হিন্দু-মুসলমান মিলিত সংস্কৃতির প্রতীক, সত্যপীরের কাহিনী অবলম্বনে রচিত এই পালাগুলিও সেইরূপ উভয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির পরিচয় বহন করিতেছে। এই পালায় ঘাগরা এবং গোল টুপি পরা চার-পাচ জন অভিনেতা থাকেন। দলের একজন বন্দনাগান করেন আর যিনি দোহা ধরেন তাঁহার নাম পালিয়া, শেষে সকলে মিলিয়া বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সমস্বরে গাহিতে থাকেন। এই গানগুলি ওড়িশার প্রাচীন লেখকদের লেখা। গানগুলিকে পালাদল অতি সহজ পায়ের কাজের মধ্য দিয়া নৃত্যরূপ দেন। দাসকাঠিয়া পালাটি সবচেয়ে সরল। মাত্র দুইজনে কাঠের খঞ্জনি বাজাইয়া দ্রুত লয়ে হাতের ভঙ্গিতে গান গাহিতে থাকেন। পালাকারদের মত তাহারাও যুদ্ধের বর্ণনার সময় গাহিতে গাহিতে নাচিতে থাকেন। শিব-পার্বতীর বিবাহ লইয়া ‘দাণ্ডনাটে’র পালা অতি পুরাতন। ওড়িশার পাহাড়ি অঞ্চলে এই নাচের চল খুব বেশি। নর্তকেরা পালা আরম্ভের পূর্বে গান গাহিতে গাহিতে লোকের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করিয়া বেড়ায় এবং এই সময় তাহারা দেবতার পূজার নিমিত্ত একবেলা মাত্র আহার করে। দাণ্ডনাটের পালার মধ্যে যেমন বিভিন্ন দেব-দেবীর গীতি ও স্তুতি থাকে তেমনই সমসাময়িক সমাজের প্রতি কৌতুকের ইঙ্গিতও থাকে।

 ওড়িয়া লোকনৃত্যের মধ্যে ‘ছৌ’নাচ অত্যন্ত পরিণত পৌরাণিক কাহিনীর পুনর্কথন ইহার বিষয় (‘ছৌ’ দ্র)। পুরী জেলার নাগা-নৃত্যের সহিত ছৌ নাচের মিল দেখা যায়। ইহার মূক-নৃত্য এবং দড়াবাজির কৌশল ছৌ নাচের যুদ্ধ বর্ণনার অংশ মনে করাইয়া দেয়। ফসল তোলার পরে বসন্ত ঋতুতে চৈত্র মাস জুড়িয়া সারা ওড়িশায় নাচের মরশুম পড়িয়া যায়। চক্রিকা দেবীর সামনে আগুনের উপর দিয়া ঝাম নাচ চলে বাঙ্কীতে এবং মঙ্গলা দেবীর নামে নাচ চলে কাকটপুরে। এই গুলি খুব প্রসিদ্ধ। জেলেরা নাচে ঘোড়া নাচ, অস্পৃশ্য বাউরিরা নাচে পটুয়া নাচ, বাউল সরণি, ডালখাই, ঝুমরি নাচ চলে—সম্বলপুর, কালাহাণ্ডী, নয়াগড়, বলানগির এবং ময়ূরভঞ্জে। মেয়ে-পুরুষ মিলিয়া চৈত্র মাসে এইসব নাচে। কেলাকেলুনি বেদেদের নাচ ধুদুকি—পুরুষে ধুদুকি বাজায়, একটি মেয়ে নাচিয়া নাচিয়া গাহিতে থাকে। ওড়িশী গীতসহযোগে গোটিপুঅ নাচ প্রাচীন নৃত্যরীতির একটি মার্জিত রূপ (‘ওড়িশা’ দ্র)।

 ওড়িয়া লোকসংগীতের একটি সংগ্রহ প্রকাশের প্রথম চেষ্টা করেন (১৮৭৬ খ্রী) কপিলেশ্বর নন্দ। অতঃপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংকলন প্রকাশিত হয় নীলমণি বিদ্যারত্ন, মনশি শেখ আবদুল মজিদ, চন্দ্রশেখর বাহিনীপতি, রাঘবনন্দন দাস, চক্রসব মহাপাত্র, ভগবান হোতা, অপন্ন পাণ্ডা, মঞ্জু ত্রিপাঠী প্রভৃতির উদ্যোগে। যে সকল উৎস হইতে লোকসংগীত ও প্রবাদসমূহ সংগ্রহ করা সম্ভব এবং যে রীতিতে এইগুলির শ্রেণীবিভাগ করা উচিত, তাহার যথার্থ সন্ধান ও নির্দেশ দিয়াছেন গোপালচন্দ্র গ্রহরাজ। ওড়িয়া লোকসাহিত্যের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক সংকলন প্রকাশ করিয়াছেন কুঞ্জবিহারী দাস।

দ্র কুঞ্জবিহারী দাস, পল্লীগীতিসঞ্চয়ন, কটক, ১৯৫৪; কনকমঞ্জরী মহাপাত্র, কলিঙ্গকাহানী, কটক, ১৯৫৭; চক্রধর মহাপাত্র, ওড়িয়া গ্রাম্যগীতি, ভুবনেশ্বর, ১৯৫৮; Dhirendranath Pattanaik, Folk Dance & Music of Orissa, Cuttack, 1959-60.

কালিন্দীচরণ পাণিগ্রাহী
মৈত্রী শুক্ল