ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওভিদ
(পৃ. ৯৯-১০০)
ওভিদ (৪৩ খ্রীষ্টপূর্ব-১৭ খ্রী) লাতিন কবি পুব্লিউস্ ওভিদিউস্ নাসো উত্তর ইতালির এক সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। সম্রাট আউগুস্তুসের রাজত্বের শেষ পর্বে রোমে যে উচ্ছৃঙ্খল অভিজাত সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছিল, অমায়িক প্রকৃতির এই যুবক অচিরে সেখানে স্বপ্রতিষ্ঠ হন। চপল-স্বভাব ও উন্নাসিক ওভিদ প্রথমে হালকা সুরে প্রেমের কবিতা লিখিতে থাকেন। ‘আমোরেস্’ (মদনদেবগণ) নামক কবিতাবলী তাঁহার এক প্রণয়িনী কোরিন্নার উদ্দেশে নির্লিপ্ত কৌতুকের ভঙ্গিতে রচিত। ‘হেরোইদেস্’ (নায়িকাগণ) হইতেছে প্রবাসী স্বামী বা প্রেমাস্পদের নিকট লিখিত পৌরাণিক নায়িকাদের পত্রাবলী (এই পুস্তকের অনুপ্রাণনায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ লিখিত)। ‘আর্স্ আমাতোরিয়া’ (প্রেমকলা) একটি নীতিকথামূলক বিদ্রূপাত্মক রচনা, প্রেমকে এখানে নাকি বিজ্ঞান হিসাবে দেখা হইয়াছে। গ্রন্থটি সম্ভ্রান্ত সমাজের সমস্ত শালীনতাবোধকে আহত করিয়াছিল। সম্রাট এই সময়ে রোমের নৈতিক মান উন্নয়নের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। হয়ত বা সেই কারণে ‘আব্স্ আমাতোরিয়া’ প্রকাশের কয়েক বৎসর পরে ওভিদ দূর দেশে (বর্তমান রুমানিয়ায়) নির্বাসিত হন (৮ খ্রী)। এই সময়ে তিনি যে দুইটি দীর্ঘ কাব্য রচনায় ব্যাপৃত ছিলেন তাহাতে তাঁহার গল্প বলিবার প্রতিভা সম্যক স্ফুর্তিলাভ করে, তন্মধ্যে ‘মেতামোর্ফোসেস্’ (রূপান্তরগ্রহণ) হইল গ্রীক পুরাণ হইতে গৃহীত আখ্যায়িকার সংকলন; ‘ফাস্তী’ (রোমান পঞ্জিকা) কাব্যের বিষয় ছিল পালপার্বণ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহাসিক গল্প ও পুরাণকাহিনী। নয় বৎসরের নির্বাসিত জীবনে তিনি অনেক শোকগাথাও রচনা করিয়াছিলেন। ইতিমধো তাঁহার মানসিক প্রবণতার অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। নিজেকে তিনি হতভাগ্য মনে করিতেছেন এবং করুণা অর্জনের চেষ্টা করিতেছেন। ‘ত্রিস্ত্রিয়া’ (বিলাপ) এবং ‘এপিস্তোলাএ এক্স পোন্তো’ (কৃষ্ণসাগরের পত্রাবলী) নির্বাসনদণ্ড নিরসনের জন্য রোম সম্রাটের নিকট করুণ আবেদন। ১৭ খ্রীষ্টাব্দে নির্বাসিত অবস্থাতেই তাঁহার মৃত্যু হয়।
‘মেদেয়া’ নামক অধুনালুপ্ত ট্র্যাজেডিটি বাদ দিলে ওভিদের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘মেতামোর্ফোসেস্’। পঞ্চদশ অধ্যায়-সংবলিত এই গ্রন্থটিতে দুই শতাধিক কাহিনী বর্ণিত। কাহিনীগুলির মধ্যে একটি ঐক্যসূত্র এই যে প্রতি গল্পেই মানুষ অলৌকিকভাবে পশু পাখি গাছ ফুল বা পাথরে রূপান্তরিত হইয়া যায়। যে মানবিক ভাবাবেগ তাঁহার নায়ক-নায়িকার এই রূপান্তর ঘটাইতেছে, সূক্ষ্ম বেগবান কাহিনীগুলিতে প্রায়শঃই তিনি তাহার বর্ণনা করিয়াছেন। প্রাচীন পুরাণকাহিনীগুলিকে যে রকম লঘু ও রোম্যাণ্টিক মেজাজে তিনি রূপ দিয়াছেন, মধ্য যুগের রোম্যাণ্টিক প্রেমচেতনার উপর তাহা নিশ্চিত প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। কালক্রমে তিনি রেনেসাঁসের অন্যতম আদর্শরূপে গৃহীত হন।