ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওয়ার্ডসওয়ার্থ, উইলিয়াম
(পৃ. ১০৫-১০৬)
ওয়ার্ডসওয়ার্থ, উইলিয়াম (১৭৭০-১৮৫০ খ্রী)। ঊনবিংশ শতকের ইংরেজী রোম্যাণ্টিক কাব্যধারার পুরোধা। জন্ম কাম্বারল্যাণ্ডে। কেম্ব্রিজে অধ্যয়ন সমাপ্ত করিবার পর ফরাসীবিপ্লবের মন্ত্রে মুগ্ধ হইয়া ইনি ফ্রান্সে চলিয়া যান (১৭৯১-২ খ্রী)। কিন্তু অল্প দিনেই মোহমুক্তি ঘটিলে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কবিবন্ধু কোল্রিজ ও ভগ্নী ডরোথির সাহচর্যে ক্রমে প্রকৃতির প্রতি তাঁহার বিশ্বাস ফিরিয়া আসে।
অল্প বয়সেই প্রকৃতির প্রাণময়ী শক্তি ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বারে বারে চমৎকৃত করিয়াছে। ক্রমে সেই বিচ্ছিন্ন ভাবানুভূতি একটি স্থির দার্শনিক প্রত্যয়ে সংহত হইয়া এক সার্বভৌম অধ্যাত্ম চেতনাকে তাঁহার কবিচেতনার অঙ্গীভূত করিয়াছে। প্রকৃতিকে তিনি তাঁহার সমস্ত আনন্দের উৎস, সমস্ত নীতিবোধের প্রেরণা, সমস্ত শক্তির আধার বলিয়া বারংবার ঘোষণা করিয়াছেন। প্রকৃতিই বিশ্বসত্তা ও ব্যক্তিসত্তার মধ্যে সেতু রচনা করে, সমস্ত জড় ও চেতন জগৎকে ভগবানের একই চিন্ময় স্বরূপের দ্বারা অবিদ্ধরূপে দেখায়, জীবনের সমস্ত জটিলতাকে সরল করে। প্রকৃতিপ্রেমিক ধ্যানতন্ময়তার আবেশে বহির্জগতের সমস্ত আপাত-বৈপরীত্যের মধ্যে কেন্দ্রগত সত্যকে অনুভব করে। এই ভাবধারার সহিত ভারতীয় অধ্যাত্মসাধনার এবং ফলতঃ রবীন্দ্রমানসের ঐক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
তাঁহার এই প্রকৃতিবোধ অবশ্য মানবজীবনেও আরোপিত হইয়াছে। কবির প্রতায় ছিল, যে সমস্ত মানুষ প্রকৃতির নির্জনতায় উহার মহান গাম্ভীর্য ও রিক্ত মহিমার আশ্রয়ে জীবন কাটায় তাহারা প্রকৃতিদত্ত স্বভাব-গৌরবের অধিকারী হয়। তাই তাঁহার ‘মাইকেল’ সমস্ত দৈব প্রতিকূলতা ও জীবন বিপর্যয় সত্ত্বেও পর্বতের মত মৌন, অটল মহিমায় অবিচল। তাঁহার জোঁককুড়ানো বৃদ্ধের (‘লীচ্ গ্যাদারার’) আচরণে এক রাজকীয় মর্যাদার উৎস লুকানো। প্রকৃতির প্রভাব যে তত্ত্বের সীমা অতিক্রম করিয়া কেমনভাবে হৃদয়াবেগের গভীরে রূপান্তর লাভ করে তাঁহার লুসি কবিতাগুলি তাহার নিদর্শন। দার্শনিক কবির দুরূহ তত্ত্বের মধ্যে কাব্যরস সঞ্চারের আশ্চর্য শক্তি ‘টিনটার্ন অ্যাবি’ ‘ওড্ টু ডিউটি’ এবং ‘ওড্ অন দি ইন্টিমেশন্স অফ ইমর্টালিটি’ কবিতাগুলিতেও উদাহৃত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের সনেটগুচ্ছে জাতির আত্মিক শক্তি উদ্বোধনের মধ্যে কবির বিশ্বনীতির প্রতি অটুট আস্থার পরিচয় মেলে। তাঁহার প্রেম কবিতাতেও নৈতিক সংযম ও উন্নত আদর্শবাদের প্রভাব পরিস্ফুট।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলি ১৭৯৮ হইতে ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে রচিত। এই দশকের পর তাঁহার প্রতিভায় ধীরে ধীরে শীর্ণতা ও অবক্ষয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হইতে থাকে। তাঁহার অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি ক্রমশঃ স্থূল নৈতিকতার দ্বারা অভিভূত হইয়া পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় মতের গোঁড়া সমর্থক হইয়া পড়েন। তাঁহার কাব্যভাষাও ক্রমশঃ স্বচ্ছতা হারাইয়া বহুভাষী গতানুগতিক আলংকারিকতায় পর্যবসিত হয়। কোল্রিজের সহযোগিতায় প্রকাশিত ‘লিরিক্যাল ব্যালাড্স’-এর ভূমিকায় (১৮০০ খ্রী) তিনি কবিতার ভাব, ভাষা ও বিষয়ের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলিয়াছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যায়ে তাহা নিছক প্রাচীনের অনুবর্তনে আপনাকে নিঃশেষিত করিয়াছে।তাঁহার রচনাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘অ্যান ইভনিং ওয়াক’; ‘ডেসক্রিপ্টিভ স্কেচেস’ (১৭৯৩ খ্রী); ‘লিরিক্যাল ব্যালাড্স’ (১৭৯৮ খ্রী; ২য় সং ১৮০০ খ্রী); ‘দি প্রেলিউড’ (রচনা ১৮০৫ খ্রী; প্রকাশ ১৮৫০ খ্রী; ‘দি এক্সকার্শন’ (১৮১৪ খ্রী)। ‘কোল্রিজ’ দ্র।
দ্র Helen Darbishire, Wordsworth, Writers and Their Works series, no. 8, London, 1954