ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওয়াহাবি আন্দোলন
(পৃ. ১০৮-১১০)
ওয়াহাবি আন্দোলন (১৮২০-৭০ খ্রী) অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মক্কায় এক বিশিষ্ট ধর্মসংস্কার আন্দোলনের নেতা আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-৮৭ খ্রী) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মমতের নাম ওয়াহাবিবাদ। বিবিধ বহিরঙ্গ, আচার-অনুষ্ঠান ও পুরোহিততন্ত্র ধর্মের মূল প্রাণশক্তিকে খর্ব করে—এই ছিল আবদুল ওয়াহাবের বিশ্বাস। ঈশ্বরের একত্ববাদ প্রচার নূতন মতবাদের প্রধান দিক।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু হইতে ভারতবর্ষে এই ধর্মীয় বিপ্লব প্রভাব বিস্তার করে। বেরিলির সৈয়দ আহ্মদ নামক এক ব্যক্তি (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রী) এই নূতন মতবাদ প্রচারে অগ্রণী ছিলেন। সৈয়দ আহ্মদের উপর মক্কার আন্দোলনের প্রভাব কতদূর এবং কি জাতীয়, তাহা বলা কঠিন। দিল্লীতে ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে পারদর্শী পীর শাহ্ ওয়ালিউল্লার (১৭০২-৬২ খ্রী) কাছে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। খুব সম্ভবতঃ তাঁহার দ্বারা নূতন মতবাদ প্রচারে সৈয়দ আহ্মদ অনুপ্রাণিত হন। ১৮২২-৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মক্কায় যান। মক্কার শাসন-কর্তৃপক্ষ সৈয়দ আহ্মদ -প্রচারিত ধর্মমতের সঙ্গে ওয়াহাবিবাদের নিগূঢ় সাদৃশ্য খুঁজিয়া পান ও তাঁহাকে মক্কা হইতে বহিষ্কৃত করেন। এই ঘটনা তাঁহার চরিত্রে সামগ্রিক এক ভাবান্তর আনে এবং নূতন ধর্ম প্রচারের কঠিন সংকল্প লইয়া তিনি ভারতবর্ষে ফেরেন।
সৈয়দ আহ্মদ নিজেকে ইমাম বলিয়া ঘোষণা করেন। কালক্রমে এই মতবাদ প্রচারের জন্য তিনি নিপুণ এক সংগঠন গড়িয়া তোলেন। নূতন বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত অগণিত প্রচারক সুদূরতম পল্লীর মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে নূতন ধর্মের মর্মবাণী পৌঁছাইয়া দেন। পাটনা ছিল প্রচারের মূল কেন্দ্র। প্রচারের বাহন ছিল অনাড়ম্বর ভাষায় লিখিত গান ও কবিতা। বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপন ওয়াহাবি সংগঠনের অন্য একটি দিক।
প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও আনুষঙ্গিক আচার-অনুষ্ঠানের সংস্কার প্রচেষ্টা ভিন্ন ওয়াহাবিদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল তদানীন্তন বিধর্মী শাসকগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও ইসলাম ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। প্রথম দিকে রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পাঞ্জাবে শিখ-প্রভুত্বের অবসানের জন্য ওয়াহাবিরা তৎপর হয় ও ১৮২৬ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে। সীমান্তের বিবিধ উপজাতি ছিল ওয়াহাবি শক্তির প্রধান উৎস। ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দে পেশোয়ার অধিকার ওয়াহাবিদের ক্রমবর্ধমান শক্তির পরিচায়ক। কিন্তু এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে সৈয়দ আহ্মদ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। ইংরেজদের পাঞ্জাব অধিকারের পর (১৮৪৫-৯ খ্রী) ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ ওয়াহাবিদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়।
বাংলা দেশে কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে ওয়াহাবি নেতৃত্ব এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে। বাংলা দেশে ওয়াহাবিদের প্রচলিত নাম ছিল ‘ফেরাজি’ (আরবী শব্দ ফরজ-এর অর্থ আল্লাহ্র আদেশ)। পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ প্রভৃতি ছিল ফেরাজি-প্রভাবিত অঞ্চল। ফেরাজিদের বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বর সকল মানুষের জন্যই জমি সৃষ্টি করিয়াছেন, তাই ব্যক্তিগত মালিকানা ন্যায়ের বিরোধী। সরকারকে জমির ফসলের অংশবিশেষ খাজনা হিসাবে দেওয়া উচিত। কিন্তু এই বিষয়ে জমিদারদের কোনও অধিকার নাই। ফেরাজিরা সরকারি সম্পত্তি নূতন নদীচরগুলিতে তাহাদের উপনিবেশ স্থাপন করে। আইনসম্মত নয় এমন সমস্ত করের বিরুদ্ধে ওয়াহাবিরা সংঘবদ্ধ হয়। জমিদারগণ সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়া ফেরাজিদের নিজ অঞ্চল হইতে উচ্ছেদের চেষ্টা করিতে থাকে। জমিদার-আমলাদের একটি বিশিষ্ট কর্তব্যই ছিল ফেরাজিদের নূতন উপনিবেশ স্থাপনে বাধা দেওয়া। নীল চাষের মালিকদের বিরুদ্ধেও ওয়াহাবিদের প্রতিরোধ আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফেরাজি দমনের জন্য নীলকর ও জমিদার শ্রেণীর সমবেত প্রয়াস পল্লী বাংলায় শ্রেণীসংগ্রামের এক নূতন রূপ সূচিত করে।
১৮৩১-২ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার নিকটবর্তী বারাসত অঞ্চলে ফেরাজি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। নূতন ধর্মমতাবলম্বীদের উপর জমিদার কৃষ্ণ রায়ের কর আরোপের বিরুদ্ধে ফেরাজিদের এই সংঘবদ্ধ আন্দোলন তিতুমীরের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দ্বারা এই আন্দোলনকে দমন করা হয়। ১৮৩৯ খ্রীষ্টাব্দ হইতে পূব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে ফেরাজিদের কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। শরিয়াত উল্লা ও তাহার পুত্র দুদু মিঞা ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোভাগে। ১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে। পাঁচচর নামক স্থানে নীলকর সাহেব ডানলপ-এর কুঠি পোড়াইয়া দেওয়া হয়। স্থানীয় জমিদার গোপীমোহন এবং তাহার অত্যাচারী আমলাও এই আক্রমণের লক্ষ্য ছিল। স্থানীয় শাসন-কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরাজিদের বহু নিষ্ফল আবেদনের পর এক তীব্র হতাশাবোধ ফেরাজিদের এই সহিংস আন্দোলনে প্ররোচিত করে। ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দে নদিয়ায় আবদুল ছোবান নামক নেতার প্রভাবে ফেরাজিরা খাজনা হ্রাসের জন্য ও অননুমোদিত করের বিরুদ্ধে আবার আন্দোলন করে। ১৮৫৯ হইতে ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ফেরাজিদের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল বাথরগঞ্জ জেলার সরকারি সম্পত্তি তুশখালিতে।
১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজদের সহিত এক সংঘর্ষে ওয়াহাবিরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াহাবিরা প্রচণ্ডভাবে ইংরেজ-বিরোধী হইলেও ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহে তাহারা দলগতভাবে অংশ গ্রহণ করে নাই। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে তাহারা দিল্লী, আগ্রা, হায়দরাবাদ ও পাটনায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। অনেক জায়গায় তাহারাই ছিল বিদ্রোহের নায়ক। জয়পুর, ভোপাল ও হিসার হইতে বহুসংখ্যক ওয়াহাবি বিদ্রোহে যোগ দিতে দিল্লীতে প্রবেশ করে।
ওয়াহাবিদের প্রধান কেন্দ্র সীতানা ইংরেজদের উদ্বেগের কারণ ছিল। ১৮৫০ হইতে ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ইংরেজ সরকার ওয়াহাবি বিদ্রোহীদের ধ্বংস করিবার জন্য ১৬ বার সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। তবুও ইংরেজেরা সফল হয় নাই।
১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে ওয়াহাবিরা তাহাদের পুরাতন কর্মকেন্দ্র সীতানা পুনর্দখল করে। ইংরেজ সরকার বহু যুদ্ধের পর সীতানা বিধ্বস্ত করিয়া ওয়াহাবি বিদ্রোহ দমন করে। ১৮৫৭-৬৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ছয়টি অভিযানে প্রায় ২৫০০০ সৈন্য নিয়োগ করা হয়। অতঃপর মহারানীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ ঘোষণা করিবার অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন আদালতে ওয়াহাবি নেতাদের বিচার হয় এবং কয়েক জনের প্রাণদণ্ড ও বহু ওয়াহাবির কারাদণ্ড হয়। ইহার ফলে ওয়াহাবি আন্দোলনের শেষ চিহ্নও লুপ্ত হয়।
ধর্মের ক্ষেত্রে ওয়াহাবিদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলন মাত্র আংশিকভাবে সফল হইয়াছিল। ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে খণ্ডবিক্ষিপ্ত ওয়াহাবিদের রাজনৈতিক আন্দোলন সফল হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল। ফেরাজিদের ধর্মীয় গোঁড়ামি অর্থনৈতিক আন্দোলনকে যথেষ্ট দুর্বল করিয়াছিল। ভিন্ন মত সম্পর্কে ফেরাজিরা ছিল বিশেষভাবে অসহিষ্ণু; বলপ্রয়োগ ও অন্যান্য বহু পীড়নমূলক উপায়ে তাহারা নিজেদের মতবাদ প্রচার করিত। সাধারণ মুসলমান কৃষক ধর্মবিশ্বাসে আমূল পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে সহজে গ্রহণ করে নাই। নূতন আন্দোলনে আতঙ্কিত জমিদারগণ বিভিন্নভাবে কৃষকদের ফেরাজি প্রভাব হইতে মুক্ত রাখিতে চেষ্টা করিত। বলপ্রয়োগ ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য সাধারণ হিন্দু কৃষকও ফেরাজিদের প্রীতির চক্ষে দেখিত না। ১৮৩৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রায় ১৫০০ সাধারণ মানুষ ফেরাজিদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়। জমিদার ও নীলকুঠির সাহেবরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ফেরাজিদের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করিতে সক্ষম হয়; স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিপীড়ন ফেরাজিদের আংশিক ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণ। তবুও ফেরাজি আন্দোলনের ঐতিহ্য সাধারণ কৃষকদের বহুদিন পর্যন্ত অণুপ্রাণিত করিয়াছে। ‘তিতুমীর’ দ্র।
দ্র The Calcutta Review, vol. LI, 1870; M. Husain, ‘Origins of Indian Wahhabism’, Proceedings of Indian History Congress, Calcutta, 1939; W. W. Hunter, The Indian Mussalmans, Calcutta, 1945; S. B. Chaudhuri, Civil Disturbances During the British Rule in India, Calcutta, 1955; R. C. Majumdar, ed., The History and Culture of the Indian People, vol. IX, part I, Bombay, 1963.
বিনয় চৌধুরী