ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওয়েভেল, আর্চিবল্ড পার্সিভাল
(পৃ. ১১০-১১১)
ওয়েভেল, আর্চিবল্ড পার্সিভাল প্রথম আর্ল ওয়েভেল (১৮৮৩-১৯৫০ খ্রী)। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক কৃতিত্ব এবং ব্রিটিশ শাসনের শেষ ভাগে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ওয়েভেলের নাম স্মরণীয়। উইন্চেষ্টার এবং স্যণ্ডহার্টে শিক্ষালাভের পর ওয়েভেল দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ফ্লাণ্ডার্স এবং প্যালেস্টাইনে সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সর্বময় কর্তৃত্ব লাভ করিয়া (জুলাই ১৯৩৯ খ্রী) ওয়েভেল অভাবিত তৎপরতায় ইতালীয় বাহিনীকে পরাজিত করেন (ডিসেম্বর ১৯৪০―ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ খ্রী) এবং পূর্ব আফ্রিকায় ইতালীয় আধিপত্য বিলুপ্ত হয়। গ্রীস, ক্রীটি এবং লিবিয়ায় ওয়েভেল জার্মান প্রতিরোধের বিরুদ্ধে অনুরূপ সাফল্য লাভ না করায় এবং পূর্ব এশিয়ায় জাপানী আক্রমণ ও অগ্রগমনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন অনুভূত হওয়ায় ওয়েভেলকে অবসরকামী লর্ড লিন্লিথ্গোর স্থলে ভারতের ভাইস্রয় মনোনীত করা হয় (১৯৪৩ খ্রী)।
১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ দমননীতি, জাপানী সৈন্যদল এবং সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের মালয় হইতে ভারত অভিমুখে অগ্রগমনের ফলে উদ্ভুত উত্তেজনা, সামরিক প্রয়োজনে খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও অন্যান্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা প্রচলনের জন্য ভারতে খাদ্যাভাব এবং বাংলা দেশে দুর্ভিক্ষ (১৯৪৩ খ্রী), কারারুদ্ধ জাতীয় নেতাদের অনুপস্থিতিতে জাতীয় আন্দোলনে বিশৃঙ্খলা, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্রমাবনতি—ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ওয়েভেলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কুশলতার অভাব প্রকট হইয়া পড়ে। অবশ্য ওয়েভেলের রাজনৈতিক অসফলতার জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাহাকে খুব দায়ী করা চলে না।
গান্ধী ও ওয়েভেলের পত্রালাপ (জুন-আগস্ট ১৯৪৪ খ্রী) এবং গান্ধী ও জিন্নার আলাপ-আলোচনা (সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ খ্রী) সত্ত্বেও তিন পক্ষের মধ্যে মতানৈক্যের ফলে সৃষ্ট অচল অবস্থার অবসানের জন্য ওয়েভেল ব্রিটিশ মন্ত্রীসভা কর্তৃক অনুমোদিত একটি পরিকল্পনা পেশ করেন (১৪ জুন ১৯৪৫ খ্রী)। তথাকথিত ওয়েভেল-প্রস্তাবসমূহের মূল সূত্রগুলি এই: গভর্নর জেনারেলের কার্য-নির্বাহক পরিষদে (এজিকিউটিভ কাউন্সিল) সমরবাহিনীর সর্বোচ্চ অধিনায়ক ভিন্ন আর সকল সদস্যপদে ভারতীয় সদস্য নিয়োগ; উক্ত পরিষদে বর্ণ-হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে সদস্য মনোনয়ন; ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল বৈদেশিক ব্যাপার কোনও ভারতীয় সদস্যের হস্তে অর্পণ; এবং ভারতে অন্যান্য ডোমিনিয়নের অনুরূপ ব্রিটিশ হাইকমিশন স্থাপন। ওয়েভেল ঘোষণা করেন যে এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য তিনটি: জাপানের বিরুদ্ধে সমরশক্তি সংহত করা, যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধোত্তর সমস্যার সমাধানকল্পে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী শাসনতন্ত্র গঠনের প্রয়াস। ওয়েভেল-প্রস্তাব আলোচনার উদ্দেশ্যে আহূত সিমলা সম্মিলন (২৫ জুন ১৯৪৫ খ্রী), হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতভেদের ফলে ব্যর্থ হয়।
যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের প্রথম নির্বাচনে জয়ী শ্রমিক দলের ভারতবর্ষ সম্পর্কে নূতন নীতি এবং অপর দিকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের বিচারের ফলে জনমতের উপর প্রতিক্রিয়া, ভারতীয় রাজকীয় নৌবহরের নাবিকদের সাহসিক বিদ্রোহ (ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ খ্রী) এবং ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কাউন্সিলের নির্বাচনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমর্থনে জনমতের প্রাবল্য স্বাধীনতার অনুকুলে ঘটনাপ্রবাহ ত্বরান্বিত করে।
ভারতবর্ষ সম্বন্ধে শ্রমিক দলের নুতন নীতি কার্যে পরিণত করিবার জন্য উচ্চক্ষমতাবিশিষ্ট ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় নেতাদের সহিত আলোচনা করিয়া যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তাহা কংগ্রেসের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হইলেও মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম নীতি (আগস্ট ১৯৪৬ খ্রী) ও হিন্দু সমাজের একাংশের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক হানাহানি বীভৎস রূপ ধারণ করে। তদুপরি মুসলিম লীগের অসহযোগ দেশের শাসনব্যবস্থাকে বিভিন্ন স্তরে বিপর্যস্ত করিয়া ফেলে। এই কারণে ও নূতন ভারতীয় সংবিধান সভায় (ডিসেম্বর ১৯৪৬ খ্রী) মুসলিম লীগ কোনও প্রতিনিধি প্রেরণ না করায় ওয়েভেলের বিব্রত অবস্থা, এবং এট্পি সরকারের সহিত কয়েকটি বিষয়ে মত-পার্থক্যের ফলে ওয়েভেলের অপসারণ বাঞ্ছনীয় হইয়া ওঠে। এট্লি ঘোষণা করেন (২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ খ্রী) যে লর্ড মাউণ্টব্যাটেন ওয়েভেলের স্থলাভিষিক্ত হইবেন এবং ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসের পূর্বেই ব্রিটেন শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত করিয়া ভারত ত্যাগ করিবে। ভারতের ৩৪তম এবং শেষ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল মাউণ্টব্যাটেন ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ মার্চ কার্যভার গ্রহণ করেন। এই বৎসর ফিল্ড মার্শাল ভাইকাউণ্ট ওয়েভেল, আর্ল উপাধিতে ভূষিত হন। ওয়েভেল প্রণীত সমরকৌশলবিষয়ক পুস্তক ‘দি প্যালেস্টাইন ক্যাম্পেন’ (১৯২৮ খ্রী), ‘দি ওল্ড সোল্জার’ (১৯৪৮ খ্রী) এবং ‘সোল্জার অ্যাণ্ড সোলজারিং’ (১৯৫৩ খ্রী) খ্যাতি অর্জন করিয়াছে।
দ্র Maj. Gen. H. Rowan Robinson, Wavell in the Middle East, Melbourne, 1942; R. H. Kiernon, Wavell, London, 1945; Rajendra Prasad, India Divided, Bombay, 1946; D. G. Tendulkar, Mahatma: Life of Mohandas Karamchand Gandhi, vols VI VIII, Bombay, 1951-54; E. W. R. Lumby. The Transfer of Power in India, 1945 7, London, 1954; V. P. Menon, The Transfer of Power in India, Calcutta, 1957; A. K. Azad, India Wins Freedom, Bombay, 1959; Leonard Mosley, The Last Days of British Raj, London, 1961.