বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/ওলিম্পিক ক্রীড়া

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ১১৫-১১৬)

​ওলিম্পিক ক্রীড়া প্রাচীন গ্রীসের জাতীয় ক্রীড়া-প্রতিযোগিতা উৎসব; বর্তমান কালে পুনরুজ্জীবিত হইয়া পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির প্রতিযোগিতামূলক বৃহত্তম ক্রীড়া-প্রতিযোগিতা উৎসবে পরিণত হইয়াছে। বিভিন্ন জাতির মধ্যে ঐক্যসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পেশাদার ক্রীড়াবিদ্‌দের স্থান নাই।

 প্রাচীন পেলোপন্‌নেসস-এর অন্তর্গত এলিস প্রদেশের ওলিম্পিয়া উপত্যকার বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। স্থানটি গ্রীক দেবতা জ়েউস-এর দেবস্থানরূপে বিবেচিত হইত। জনশ্রুতি অনুসারে ইতিহাস-পূর্ব যুগ হইতেই এই উপত্যকায় ওলিম্পিক ক্রীড়া-উৎসবের সূত্রপাত হয়।

 ইহার উৎপত্তি সম্বন্ধে কয়েকটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। একটি কিংবদন্তি অনুসারে প্রথম অনুষ্ঠানটি হইয়াছিল পেলোপ্‌স এবং ওইনোমাস নামে দুই ব্যক্তির প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ের ব্যাপারে। অন্য এক কিংবদন্তি অনুসারে সুবিখ্যাত বীর হেরাক্লেস ইহার প্রতিষ্ঠাতা। সাধারণভাবে অনুমান করা হয় যে খ্রীষ্টজন্মের বহু পূর্ব হইতেই ওলিম্পিয়ার এই উপত্যকায় উৎসব-অনুষ্ঠানটির আয়োজন হইয়াছিল।

 প্রথম যুগে পিসাবাসীগণ ইহার পরিচালনা করিতেন, কিন্তু পরিচালনা ব্যাপারে এলিসবাসীগণেরও কিছু হাত থাকিত বলিয়া মনে হয়। দুই দেশের এক এক অঞ্চল হইতে আটজন করিয়া নির্বাচিত ষোলজন নারী ওলিম্পিক বিজয়ীর পোশাকটি বয়ন করিয়া দিতেন বলিয়া ইহা পশ্চিম পেলোপন্‌নেসস-এর জাতিসমূহের ধর্মীয় সংঘ হিসাবে পরিচিত হইতে আরম্ভ করে। নিজ নিজ রাষ্ট্রের সুবিধার জন্য স্পার্টা প্রভৃতি গ্রীসের অন্যান্য রাষ্ট্র ইহাতে যোগদান করিতে আরম্ভ করে, ফলে ওলিম্পিক ক্রীড়া সমগ্র গ্রীসের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।

 খ্রীষ্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দ হইতে প্রতি চারি বৎসরের ব্যবধানে ওলিম্পিক ক্রীড়া নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হইবার উল্লেখও পাওয়া যায়। লাতিন ভাষায় ওলিম্পিয়াদ শব্দটির অর্থও চার বৎসরের ব্যবধান।

 ৩৯৩ খ্রীষ্টাব্দে রোমক সম্রাট থেওদোসিঅস-এর আজ্ঞায় ওলিম্পিক অনুষ্ঠান রহিত হইয়া যায়।

 ওলিম্পিকের প্রথম দিকে একদিনের উৎসবে শুধু একটি দৌড়-প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকিত; পরে রথ চালনা প্রভৃতি প্রতিযোগিতাসমূহ অঙ্গীভূত হওয়ায় উৎসবটি সাতদিন ব্যাপী হইয়া ওঠে। ক্রমশঃ ভূমধ্যসাগরের চতুষ্পার্শ্বস্থ দ্বীপসমূহের ঔপনিবেশিকগণও ইহাতে অংশগ্রহণের অধিকার লাভ করে। কিন্তু কয়েকটি উচ্চ শ্রেণীর দেবদাসী ব্যতীত অন্য নারীর ইহাতে অংশগ্রহণে অধিকার ছিল না। ক্রীড়ানুষ্ঠান শুরু হইবার পূর্বে প্রতিযোগী, তাহার স্বজন ও শিক্ষাগুরু এবং বিচারক প্রভৃতি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকলকেই এই মর্মে শপথ গ্রহণ করিতে হইত যে, ক্রীড়াসমূহের অংশগ্রহণে বা পরিচালনে তাহারা কোনরূপ অন্যায় আচরণ বা অন্যায় বিচার করিবেন না, সমস্ত অনুষ্ঠানকে নির্মল রাখিতে সহায়তা করিবেন।

 ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত অনুসারে পিসার ক্লীস্‌থেনেস, স্পার্টার লিকুর্গস, এলিসের ইফীতস প্রমুখ রাজন্যবর্গের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে প্রাচীন গ্রীসে ওলিম্পিক ক্রীড়ার প্রসার ঘটে। ওলিম্পিকের জন্মদাতা না হইলেও তাহারা ইহার পুনরুজ্জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন।

 দর্শকদের জন্য স্টেডিয়াম বা শ্বেতপাথরের নির্মিত বসিবার আসন ছিল। অনুশীলনকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার এবং বিজয়-বেদি প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাই ক্রীড়াপ্রাঙ্গণের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত থাকিত; তদুপরি সমগ্র উৎসব-অনুষ্ঠানের কেন্দ্ররূপে দেবরাজ জেউস-এর মূর্তিটি সমগ্র জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করিত। ষাট ফুট উচ্চ মন্দিরের অভ্যন্তরে স্থাপিত গজদন্ত ও সুবর্ণ-নির্মিত চল্লিশ ফুট উচ্চ দেবরাজের মূর্তিটি প্রধান দ্রষ্টব্য হিসাবে স্বীকৃত হইত। ষষ্ঠ শতাব্দীর ভূকম্পন ও বন্যায় ওলিম্পিয়ার ক্রীড়াক্ষেত্রের এই প্রান্তরটি ভূগর্ভে ধ্বসিয়া যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে (১৮৭৫-৮১ খ্রী) একদল জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিকের চেষ্টায় ওলিম্পিয়া প্রান্তরের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলি উদ্ধার পাওয়ার ফলে ওলিম্পিক ক্রীড়ার পুনরুজ্জীবনে বিশেষ সহায়তা হইয়াছে।

 ফরাসী চিন্তানায়ক বারঁ পিয়ের দ্য কুবেয়ার্‌ত্যাঁ-র (১৮৬৩-১৯৩৭ খ্রী) ঐকান্তিক চেষ্টায় ওলিম্পিক ক্রীড়াউৎসবের পুনঃপ্রচলন সম্ভব হয় (ইহার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে ইনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)। সর্বজনীন এক ক্রীড়া-উৎসবের আয়োজন দ্বারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মধ্যে প্রীতি, মৈত্রী ও সৌভ্রাত্র্য গড়িয়া তুলিবার পথ প্রশস্ত ​হইতে পারে উপলব্ধি করিয়া কুবেয়ার্‌ত্যাঁ। ১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দে ওলিম্পিক ক্রীড়া পুনঃপ্রতিষ্ঠাকল্পে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণের সহযোগিতায় পারী নগরে একটি সম্মিলন আহ্বান করেন এবং সেই সম্মিলনে সিদ্ধান্ত হয় যে গ্রীসের রাজধানী অ্যাথেন্স শহরে আধুনিক কালের প্রথম ওলিম্পিক ক্রীড়া-উৎসবের অনুষ্ঠান হইবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে আধুনিক কালের নবপর্যায়ের ওলিম্পিক ক্রীড়ার উৎসব-আসর বসে ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে গ্রীসের অ্যাথেন্স শহরে এবং ইহাতে ১২টি দেশের প্রতিনিধি যোগদান করেন। পূর্বরীতি এবং ওলিম্পিয়াদ শব্দের অর্থের সহিত সংগতি রাখিয়া অতঃপর প্রতি চার বৎসরের ব্যবধানে ওলিম্পিক ক্রীড়ার অনুষ্ঠান সংঘটিত হইতে থাকে। কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য ১৯১৬, ১৯৪০ এবং ১৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দে নির্দিষ্ট ওলিম্পিক উৎসব সংঘটিত হইতে পারে নাই।

 ওলিম্পিক ক্রীড়ানুষ্ঠানের লোকপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাইতে থাকায় ক্রমশঃ অধিক সংখ্যক দেশ এই বিশ্বজনীন ক্রীড়াউৎসবে যোগদান করিতেছে। নবপর্যায় ওলিম্পিকের প্রথম অনুষ্ঠানক্ষেত্র অ্যাথেন্সে উপস্থিত ছিল মাত্র বারটি দেশ, আর ১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে রোম ওলিম্পিকে যোগ দিয়াছিল চুরাশিটি দেশ।

 নবপর্যায়ের ওলিম্পিক ক্রীড়াসমূহ অনুষ্ঠিত হইয়াছে নিম্নোক্ত স্থানসমূহে: অ্যাথেন্স ১৮৯৬, পারী ১৯০০, সেণ্ট লুইস ১৯০৪, লণ্ডন ১৯০৮, স্টকহোল্‌ম ১৯১২, অ্যাণ্টওয়ার্প ১৯২০, পারী ১৯২৪, আমস্টার্‌ডাম ১৯২৮, লস্ এঞ্জেল্‌স ১৯৩২, বার্লিন ১৯৩৬, লণ্ডন ১৯৪৮, হেলসিংকি ১৯৫২, মেলবোর্ন ১৯৫৬, রোম ১৯৬০, টোকিও ১৯৬৪। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে পারীতে অনুষ্ঠিত নবপর্যায়ের ওলিম্পিক অধিবেশন হইতে নারীদের জন্য কয়েকটি প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা হইয়াছে এবং ক্রমশঃ অধিক সংখ্যায় তাঁহারা ইহাতে যোগদান করিতেছেন।

 ভারতবর্ষ কোন্ ওলিম্পিকে প্রথম অংশ গ্রহণ করিয়াছিল সে বিষয়ে মতবিরোধ আছে। ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে জি. এম. প্রিচার্ড নামে এক ব্যক্তি, ভারতীয় হিসাবে পারীর অনুষ্ঠানে যোগদান করিয়া দুইশত মিটার দৌড় এবং দুইশত মিটার হার্ডল্‌স, উভয় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ওলিম্পিকের খাতায় প্রিচার্ড ভারতীয় হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করিয়াছেন। তবে সরকারিভাবে বলা হয় যে ভারত প্রথম ওলিম্পিকে যোগদান করে ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে। ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে আমস্টার্‌ডামএর অনুষ্ঠানে ভারতীয় হকি দল প্রথম যোগদান করে এবং সেই হইতে ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত ওলিম্পিক পর্যন্ত প্রতিবারই ভারতীয় হকি দল স্বর্ণপদক লাভ করিয়াছে। বিশ্বের খেলাধুলার ইতিহাসে কোনও একটি খেলায় একটি দেশের উপর্যুপরি ছয়বার বিজয়ী হইবার দ্বিতীয় নজির আর নাই। হকি প্রতিযোগিতায় ভারতীয় দল পুনর্বার বিজয়ী হয় ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে। ইহা ব্যতিরেকে ভারতীয় মল্লবীর যাদব একবার (১৯৫২ খ্রী) ব্রোঞ্জ পদক লাভ করিয়াছিলেন। অপর কোনও প্রতিযোগিতায় ভারতবর্ষ এ পর্যন্ত কোনও পদক লাভ করিতে পারে নাই; যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অর্থাৎ ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দ হইতে প্রত্যেক ওলিম্পিকেই ভারতবর্ষ ব্যাপকভাবে অংশ গ্রহণ করিয়া আসিতেছে।

দ্র J. Kieran & A. Daley, The Story of the Olympic Games, 776 B. C.-1956 A. D., Philadelphia, 1957.

 অজয় বসু