বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কংগ্রেস

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ১৩০-১৩৭)

কংগ্রেস ব্রিটিশ যুগের ভারতবর্ষের ইতিহাসে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এমন একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে যে ‘কংগ্রেস’ অর্থাৎ ইংরেজী ‘সম্মিলন’সূচক এই সাধারণ শব্দটি কেবল ইহাকেই সূচিত করে।

 কংগ্রেসের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানা মত প্রচলিত আছে। ইংরেজ আই. সি. এস. অ্যালান অক্‌টেভিয়ান হিউম (১৮২৯-১৯১২ খ্রী) কংগ্রেসের জনক—ইহাই সাধারণ ও প্রচলিত মত। ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের উদ্দেশ্যে রচিত একখানি সুদীর্ঘ পত্রে তিনি তাহাদিগকে স্বদেশের উন্নতির জন্য আত্মোৎসর্গ করিতে আহ্বান করেন। এই আহ্বানে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে অনেকেই সাড়া দেন, এবং হিউম তাঁহাদের সহযোগিতায় ইণ্ডিয়ান ন্যাশন্যাল ইউনিয়ন (ভারতের সমবায়) নামে একটি সমিতি গঠন করেন। এই সমিতির পক্ষ হইতেই এক জাতীয় সম্মিলনে যোগদান করার আহ্বান জানাইয়া বহু লোকের নিকট একটি আমন্ত্রণলিপি পাঠানো হয়। রাজনীতিক উন্নতিসাধন যে এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য তাহা এই পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত ছিল।

 কংগ্রেস গঠনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে হিউম বলিয়াছেন, তিনি গোপনে বিশ্বস্তসূত্রে জানিতে পারিয়াছিলেন যে ইংরেজরাজের বিরুদ্ধে ভারতে একটি বিপ্লবের ষড়যন্ত্র চলিতেছে। যাহাতে শিক্ষিত ভারতবাসীগণ উহার সহিত যোগ না দেন, এই উদ্দেশ্যেই তিনি কংগ্রেসের কল্পনা করেন। হিউমের ভাষায় কংগ্রেস একটি ‘সেফটি ভ্যাল্‌ভ’ অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতিরোধক যন্ত্ররূপে কল্পিত হইয়াছিল।

 হিউম ও তাঁহার সহকর্মীগণ কোথা হইতে কংগ্রেস গঠনের আদর্শ ও প্রেরণা পাইলেন তদ্‌বিষয়ে মতান্তর আছে। কাহারও কাহারও মতে ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দের দিল্লী দরবার হইতে অথবা ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় গভর্নমেণ্ট যে বিরাট প্রদর্শনীর অনুষ্ঠান করেন, তাহা হইতেই নিখিল ভারতীয় প্রতিনিধি লইয়া একটি রাজনৈতিক সম্মিলনের কল্পনা হয়। অ্যানি বেসাণ্ট বলেন যে ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজে যে থিওসফিক্যাল কনভেনশন হয় তাহারই ১৭ জন সভ্য প্রথমে কংগ্রেসের পরিকল্পনা করেন। বেসাণ্টের মতের সমর্থনে কোনও প্রমাণ নাই। কংগ্রেসের ইতিহাস রচয়িতা এই সমুদয় মত প্রত্যাখ্যান করিয়া লিখিয়াছেন যে একটি নিখিল ভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কল্পনা বহু লোকেরই মানসে জাগিতেছিল, হিউম তাহাকে বাস্তব রূপ দেন।

 বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু এই কল্পনা দুই বৎসর পূর্বেই অর্থাৎ ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ভারত সভার (ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন) আমন্ত্রণে যে জাতীয় সমিতির (ন্যাশন্যাল কনফারেন্স) অধিবেশন হয় তাহাতেই বাস্তব রূপ পাইয়াছিল। বঙ্গ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক বিবর্তনের ফলে জাতীয় সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়। ইহাতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের রাজনীতিক নেতৃগণ যোগদান করেন এবং পরবর্তী কালে কংগ্রেসে যে সমুদয় বিষয় যেভাবে আলোচিত হয় এই জাতীয় সমিতিতেও মোটামুটি তাহাই হইয়াছিল। কলিকাতায় ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে এই জাতীয় সমিতির দ্বিতীয় অধিবেশন যেদিন শেষ হয়, তাহার ঠিক পর দিনই বোম্বাই নগরীতে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয়। ইহার উদ্যোক্তাগণ জাতীয় সমিতির অধিবেশনের বিবরণ জানিবার জন্য সুরেন্দ্রনাথকে চিঠি লিখিয়াছিলেন। সুতরাং কলিকাতার জাতীয় সমিতিই যে কংগ্রেসের আদর্শ ছিল এবং ইহার প্রেরণা জাগাইয়াছিল—ইহাই খুব যুক্তিসংগত অনুমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর বোম্বাই নগরীতে হিউম কর্তৃক আহূত জাতীয় সম্মিলনের প্রথম অধিবেশন হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে ৭২ জন প্রতিনিধি ইহাতে যোগদান করেন। কলিকাতার প্রসিদ্ধ ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতি পদে বৃত হন। তাঁহার অভিভাষণে তিনি বলেন যে এই সম্মিলনের মূল উদ্দেশ্য চারিটি—প্রথম, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যাঁহারা দেশের উন্নতির জন্য কাজ করিতেছেন তাঁহাদের মধ্যে পরিচয় ও সৌহার্দ্য স্থাপন করা। দ্বিতীয়, এই উপায়ে জাতি-ধর্ম ও প্রাদেশিক মনোবৃত্তির সংকীর্ণতা দূর করিয়া জাতীয় ঐক্যসাধনের পথে অগ্রসর হওয়া। তৃতীয়, শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আলোচনার দ্বারা গুরুতর সামাজিক সমস্যা সমাধনের পথ নির্ধারণ করা। চতুর্থ, রাজনৈতিক উন্নতির জন্য আগামী বৎসর কি কার্যপ্রণালী অবলম্বন করা উচিত তাহা স্থির করা। এই সভায় সরকারের নিকট পাঠাইবার জন্য নয়টি সুপারিশ গৃহীত হয়। ইহার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: ১. ভারতের শাসনব্যবস্থার তদন্তের জন্য একটি রাজকীয় সমিতি (রয়্যাল কমিশন) নিয়োগ করা ২. সেক্রেটারি অফ স্টেটের পরামর্শ সভা উঠাইয়া দেওয়া ৩. ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বিধান সভাগুলির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঐগুলিতে অধিক সংখ্যক ভারতীয় সদস্য নিযুক্ত করা ৪. ভারতের সামরিক ব্যয় হ্রাস করা এবং ইংল্যাণ্ড ও ভারতের মধ্যে এই ব্যয় ন্যায্যভাবে বণ্টন করা ৫. উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিয়োগের জন্য ভারতে ও ইংল্যাণ্ডে একযোগে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা ও পরীক্ষার্থীর ন্যূনতম বয়স বাড়াইয়া দেওয়া।

 কয়েকজন সরকারি কর্মচারী এই সকল সুপারিশের খসড়া করিতে সাহায্য করেন এবং বোম্বাই হাইকোর্টের জজ রানাডে এই সভায় বক্তৃতা দেন। দুইজন মুসলমান উক্ত অধিবেশনে যোগদান করিয়াছিলেন।

 এই প্রথম অধিবেশনেই স্থির হয় যে অতঃপর এই সম্মিলন ‘ভারতের জাতীয় কংগ্রেস’ (ইণ্ডিয়ান ন্যাশন্যাল কংগ্রেস) নামে অভিহিত হইবে। সভায় রাজভক্তির স্রোত বহিয়াছিল; এবং মন্তব্যগুলি যুক্তিপূর্ণ ও তাহার স্বপক্ষে বক্তৃতা খুব নরম সুরেরই হইয়াছিল। তথাপি ইংরেজগণ ইহা বিদ্রোহসূচক মনে করিলেন। লণ্ডনের বিখ্যাত টাইম্‌স পত্রিকা লিখিলেন: কংগ্রেসের দাবি মিটানোর অর্থ ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দিয়া আমাদের দেশে ফিরিয়া আসা; কিন্তু কয়েকজন বাক্যবাগীশের কথায় আমরা ভারত ছাড়িব না।

 কর্তৃপক্ষ কংগ্রেসের আবেদনে কর্ণপাত করিলেন না। কিন্তু কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবগুলির বহুল প্রচার হইল এবং বহু স্থানে রাজনৈতিক সভায় ইহার আলোচনা হইল। ইহাতে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে যে বেশ সাড়া জাগিয়াছিল পর বৎসর কলিকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে তাহার প্রমাণ পাওয়া গেল। এবারে কংগ্রেসে যাঁহারা যোগদান করেন তাঁহারা সকলেই স্থানীয় কোনও সভা-সমিতি কর্তৃক প্রকাশ্য সভায় রীতিমত প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেসের অধিবেশনের পূর্বে তাহাদের নাম প্রতিনিধিরূপে রেজিস্ট্রি করা হয়। ইহার পর প্রতি অধিবেশনেই এই প্রণালী অনুসৃত হয়। কিন্তু প্রথমবারে এ সকল কিছুই হয় নাই; বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সদস্যরূপে যোগ দিয়াছিলেন। কলিকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে ৫০০ প্রতিনিধি নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৪৩৪ জন।

 কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে বাংলার প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগদান করেন নাই; দ্বিতীয় অধিবেশনের ব্যবস্থা করিবার জন্য হিউম সাহেব যখন কলিকাতায় আসিলেন তখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে সুরেন্দ্রনাথকে বাদ দিয়া কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা সম্ভব নহে। সুতরাং তিনি সুরেন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হইলেন। সুরেন্দ্রনাথ তাঁহার দলবল লইয়া কংগ্রেসে যোগ দিলেন এবং কলিকাতার জাতীয় কন্‌ফারেন্স কংগ্রেসের সঙ্গে মিশিয়া গেল। ইহার ফলে কংগ্রেসে নূতন জীবন সঞ্চারিত হইল এবং বাংলার প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতবাদ কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠিত হইল। অতঃপর অনেকেই কংগ্রেসকে বাঙালী প্রতিষ্ঠান বলিয়া ঘোষণা করিলেন। কলিকাতার অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তিনি তাঁহার ভাষণে স্পষ্ট করিয়া বলিলেন যে আমাদের কোনও জাতীয় রাজনৈতিক সত্তা নাই; আমরা বিদেশী শাসকবর্গের অধীন তাঁহাদের সহিত জাতি, ধর্ম, ভাষা, আচার-ব্যবহার প্রভৃতি কোনও বিষয়েই আমাদের মিল নাই। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কংগ্রেসকে আশীর্বাদ করেন। দাদাভাই নওরোজী কলিকাতার অধিবেশনে সভাপতি হন। প্রথম অধিবেশনের ন্যায় এবারেও গভর্নমেণ্টের নিকট আবেদন জানাইয়া কতকগুলি সুপারিশ করা হয় এবং ভারতবর্ষের বিষম দ্রারিদ্র্যের প্রতি জনসাধারণ ও গভর্নমেণ্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই প্রস্তাব করিবার সময় দিনশাহ্‌ ওয়াচা বলেন যে ভারতের চারি কোটি লোক একবেলা খাইয়া জীবনধারণ করে, অনেক সময় তাহাও জোটে না।

 ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশন হয় মাদ্রাজে। ইহাতে ৬০৭ জন প্রতিনিধি যোগ দিয়াছিলেন এবং ইহার সভাপতি ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমান—বদরুদ্দীন তৈয়বজী। এই অধিবেশনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে: কংগ্রেসের কোনও নির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র ছিল না; ফিরোজশাহ্‌ মেহতা, দাদাভাই নওরোজী, দিনশাহ্‌ এদুলজী ওয়াচা, হিউম, সুরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি প্রধান নেতাই ইহা পরিচালনা করিতেন। কি কি প্রসঙ্গ সাধারণ অধিবেশনে আলোচিত হইবে তাঁহারাই তাহা স্থির করিতেন এবং তাহার খসড়াও পূর্বে প্রস্তুত করিয়া রাখিতেন। মাদ্রাজ অধিবেশনে বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ কয়েকজন যুবক ইহার ঘোরতর প্রতিবাদ করার ফলে স্থির হইল যে অতঃপর অধিবেশনের আরম্ভেই কয়েকজন প্রতিনিধিকে লইয়া একটি ক্ষুদ্র সমিতি গঠিত হইবে। এই সমিতি কংগ্রেসের কার্যসূচি ও আলোচ্য প্রসঙ্গগুলি স্থির করিয়া তাহার খসড়া প্রস্তুত করিবেন। ইহাই পরে বিষয় নির্বাচনী সমিতি (সাব্‌জেক্টস কমিটি) নামে কংগ্রেসের একটি প্রধান ও অপরিহার্য অঙ্গ হইয়া ওঠে। কংগ্রেসের একটি গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করিবার জন্যও মাদ্রাজের অধিবেশনে একটি কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু বিশ বৎসরের মধ্যে কোনও গঠনতন্ত্র রচিত হয় নাই।

 সভাপতি বদরুদ্দীন তৈয়বজী তাঁহার ভাষণে মুসলমানদিগকে কংগ্রেসে যোগদান করিবার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু ইহাতে বিশেষ ফল হয় নাই। সৈয়দ আহ্‌মদের দল প্রকাশ্যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করে।

 প্রতি বৎসরই কংগ্রেস শাসনপদ্ধতির নানাবিধ সংস্কার ও দেশের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করিবার জন্য নানাবিধ প্রস্তাব পাশ করিয়া গভর্নমেণ্টের নিকট পাঠাইতেন। কিন্তু তাহাতে কোনও ফল হইত না। কারণ, গভর্নমেণ্ট কংগ্রেসকে ইংরেজ রাজের বিরোধী বলিয়াই মনে করিতেন। লর্ড ডাফরিন হিউমকে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান গঠনে প্ররোচিত করিলেও পরে তিনিই ক্রমে কংগ্রেসের ঘোরতর বিরোধী হইয়া ওঠেন। বড়লাটের পদ হইতে অবসর লইবার অব্যবহিত পূর্বে তিনি এক প্রকাশ সভায় বলেন যে কংগ্রেসের দল এ দেশের লোকের মধ্যে এত ক্ষুদ্র সংখ্যক যে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য ব্যতীত তাহাদের অস্তিত্ব অনুভব করা যায় না। কারণ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ই প্রধানতঃ কংগ্রেসে যোগ দিতেন। ইহাদের আবেদন-নিবেদনে কোনও ফল হইতেছে না দেখিয়া হিউম প্রস্তাব করিলেন যে অতঃপর জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করিয়া দেশে গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি করিতে হইবে। ইংরেজ কর্মচারীরা ইহাতে কংগ্রেসের প্রতি আরও বিরূপ হইলেন এবং উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) গভর্নর কলভিন হিউমকে তীব্র আক্রমণ করিলেন। আমাদের দেশের অনেক নেতাও কলভিনের সমর্থন করিলেন। ইংরেজ শাসনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা তখনকার রাজনীতির মূলমন্ত্র ছিল। নেতারা মনে করিতেন যে ভারতবাসী উপযুক্ত হইলেই ন্যায়পরায়ণ ইংরেজজাতি তাহাদের প্রতি সদয় ও ন্যায্য ব্যবহার করিবেন। প্রতি বৎসরই ভারতের ভিন্ন ভিন্ন নগরীতে ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে তিন দিন ধরিয়া কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন হইত। ইহাতে নানা সংস্কার ও উন্নতিমূলক প্রস্তাব গৃহীত হইত; নরম-গরম বক্তৃতা হইত; ক্রমে ক্রমে প্রতিনিধির সংখ্যাও বাড়িতে লাগিল। কিন্তু অধিবেশনের পর সারা বৎসর প্রতিনিধিদের কোনও সাড়া পাওয়া যাইত না, গভর্নমেণ্টও কোনও উচ্চবাচ্য করিতেন না। ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে কাউন্সিল-সংস্কারের জন্য যে নূতন আইন হয়, অনেকের মতে কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদনের ফলেই তাহা হইয়াছিল। ইহাতেও কংগ্রেসের দাবির সামান্য অংশ মাত্র গভর্নমেণ্ট মঞ্জুর করিয়াছিলেন। কিন্তু প্রতি অধিবেশনে অন্য যে সকল গুরুতর দাবি করা হইতেছিল গভর্নমেণ্ট তাহাতে কর্ণপাত করিতেন না। ইহাতে ক্রমশঃ কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদনের রীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়িয়া ওঠে।

 বাংলা দেশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতি অনেকে এজন্য কংগ্রেসী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।

 মহারাষ্ট্রে বালগঙ্গাধর টিলক কেবল যে উক্ত নীতির প্রতিবাদ করেন তাহা নহে, তিনি বলেন যে স্বরাজ্য স্থাপনে আমাদের জন্মগত অধিকার আছে; ইংরেজের নিকট আবেদন-নিবেদন না করিয়া আমরা নিজেদের শক্তিতেই ইহা লাভ করিব। কংগ্রেসের মধ্যেও যখন এই নূতন ভাবের সঞ্চার হইতে লাগিল, তখন বঙ্গভঙ্গের ফলে বিদেশী পণ্য বর্জন (বয়কট) ও স্বদেশী আন্দোলন লইয়া কংগ্রেসে বিক্ষোভ উপস্থিত হইল। কংগ্রেসের একদল বয়কটের সমর্থন করেন, আর একদল বলেন যে ইংরেজের সহিত বিরোধসূচক এইরূপ কোনও প্রস্তাব কংগ্রেসের পক্ষে গ্রহণ করা উচিত নহে। বঙ্গভঙ্গের অব্যবহিত পরেই ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বারাণসীতে কংগ্রেসের অধিবেশনে এই দুই দলের মতভেদ উগ্ররূপ ধারণ করে এবং ইহারা চরমপন্থী (এক্‌স্‌ট্রিমিস্ট) ও নরমপন্থী (মডারেট) নামে অভিহিত হয়। বারাণসীর অধিবেশনে দুই দলের মধ্যে একটা আপস হয়। ফলে একটি প্রস্তাবে বাংলা দেশের বয়কটের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা হয় কিন্তু উহা সমর্থন করা হয় না। পর বৎসর ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। সভাপতি হন দাদাভাই নওরোজী। তিনি তাহার ভাষণে বলেন যে স্বরাজ লাভই কংগ্রেসের লক্ষ্য। বয়কট, স্বদেশী এবং জাতীয় শিক্ষা এই তিনটি বিষয়েই চরমপন্থীদের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ইহাতে নরমপন্থীরা ভীত হইয়া ওঠেন এবং সারা বৎসর (১৯০৭) দুই দলের মধ্যে তীব্র বাদ-প্রতিবাদ চলে। ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের অধিবেশন নাগপুরে হইবে স্থির হইয়াছিল। কিন্তু নরমপন্থী নেতা ফিরোজশাহ্‌ মেহতার কৌশলে সুরাতে অধিবেশন হইল। নাগপুরে চরমপন্থী দলের খুব প্রভাব, কিন্তু সুরাতে ফিরোজশাহ্‌ মেহতার অসীম প্রতিপত্তি। চরমপন্থীদের লাজপৎ রায়কে সভাপতি করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নরমপন্থী দলের প্রভাবে প্রসিদ্ধ আইনজীবী রাসবিহারী ঘোষকে সভাপতি ঘোষণা করা হইল। টিলক সুরাতে পৌঁছিয়া নরমপন্থীদিগকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইলেন: বয়কট, স্বদেশী ও জাতীয় শিক্ষা সম্বন্ধে কলিকাতার বিগত অধিবেশনে যে তিনটি প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছিল সুরাতে তাহার কোনও প্রকার পরিবর্তন হইবে না, এইরূপ আশ্বাস পাইলে চরমপন্থীগণ কোনও প্রকার গোলমাল করিবে না; নতুবা তাহারা সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাবে আপত্তি করিবে। এইরূপ কোনও আশ্বাস না পাওয়া যাওয়ায় ২৬ ডিসেম্বর অধিবেশনের প্রারম্ভে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব উঠিতেই চারিদিকে নানা গোলমাল শুরু হইল। সেইদিনকার মত অধিবেশন স্থগিত রহিল। কিন্তু দুইদলের মধ্যে কোনও আপস হইল না। ২৭ ডিসেম্বরের অধিবেশনে যথারীতি প্রস্তাব উত্থাপন ও সমর্থনের পরে রাসবিহারী ঘোষ সভাপতির আসন গ্রহণ করা মাত্র টিলক সভাপতি নির্বাচন সম্বন্ধে একটি সংশোধন প্রস্তাব করিবার জন্য দাঁড়াইলেন। কিন্তু রাসবিহারী টিলককে পুনঃ পুনঃ বাধা দেওয়ায় বিষম গোলযোগ উপস্থিত হইল। এই গোলযোগের মধ্যে কেহ একটি জুতা ছুঁড়িয়া মারিল; ইহা সুরেন্দ্রনাথের গা ঘেঁষিয়া মেহতার দেহে পড়িল। তারপর হাতাহাতি, চেয়ার নিক্ষেপ প্রভৃতি শুরু হইল এবং গতিক দেখিয়া পুলিশ আসিয়া সভা বন্ধ করিয়া দিল।

 অতঃপর কংগ্রেসের নরমপন্থীগণ পৃথকভাবে সভা করেন এবং চরমপন্থী আদর্শ ও লক্ষ্য বর্জন না করিলে যাহাতে কেহ কংগ্রেসে যোগদান করিতে না পারেন কংগ্রেসের নিয়মাবলীর এরূপ পরিবর্তন করেন। সুতরাং পরবর্তী নয় বৎসর চরমপন্থীদের বাদ দিয়া কংগ্রেস নামে ‘জাতীয়’ হইলেও প্রকৃতপক্ষে কেবল নরমপন্থী দলের প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হইল। পরে ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে গোখলে ও মেহতার মৃত্যু হওয়ার পরে নরমপন্থী দল এমনভাবে নিয়মাবলী পরিবর্তন করিলেন যাহাতে চরমপন্থীরাও কংগ্রেসে যোগদান করিতে পারেন। ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্দে লখনৌ অধিবেশনে নরম-গরম দুই দলের প্রতিনিধিই কংগ্রেসে যোগ দিলেন। টিলক যখন সভামণ্ডপে প্রবেশ করিলেন তখন সমবেত প্রতিনিধি ও দর্শকদল যেরূপভাবে তাঁহার সংবর্ধনা করিলেন তাহাতে বেশ বোঝা গেল যে দেশে চরমপন্থীদেরই প্রভাব ও প্রতিপত্তি অধিক। লখনৌ অধিবেশনের আর একটি স্মরণীয় ঘটনা— হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে গুরুতর রাজনৈতিক মতভেদ ছিল সেই বিষয়ে একটি আপস-রফার প্রস্তাব গ্রহণ।

 কংগ্রেসে সকল দলের মিলন হইল; কিন্তু টিলক ও অ্যানি বেসাণ্টের হোমরুল লীগের আন্দোলনে কংগ্রেসের প্রতিপত্তি চাপা পড়িয়া গেল। তারপর যখন ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ গভর্নমেণ্ট শাসনসংস্কার সম্বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলেন ও পর বৎসর ভারতসচিব মণ্টেগু এবং ভারতের বড়লাট চেমস্‌ফোর্ড কিভাবে এই সংস্কারকার্য হইবে তাহার সম্বন্ধে রিপোর্ট দিলেন, তখন চরম ও নরম-পন্থীদের মধ্যে আবার বিবাদ বাধিল। কারণ চরমপন্থীদের মতে সংস্কারের প্রস্তাব মোটেই সন্তোষজনক নহে, কিন্তু নরমপন্থীরা ইহাকে মোটের উপর ভাল বলিয়াই গ্রহণ করিলেন। এই প্রস্তাব সম্বন্ধে আলোচনা করিবার জন্য ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট বোম্বাই নগরীতে কংগ্রেসের এক বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়। অধিকাংশ নরমপন্থীই এই কংগ্রেসে যোগদান করিলেন না। এইভাবেই নরমপন্থীরা চিরকালের মত কংগ্রেস ত্যাগ করিয়া নভেম্বর মাসে ‘অল ইণ্ডিয়া লিবারেল ফেডারেশন’ নামে একটি নূতন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। নরমপন্থীরা অনুপস্থিত থাকিলেও কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে ৩৮৪৫ জন প্রতিনিধি যোগ দিয়াছিলেন। সভাপতি ছিলেন হাসান ইমাম। প্রস্তাবিত শাসনসংস্কার সম্বন্ধে ইহাদের মধ্যে গুরুতর মতভেদ দেখা দিল। কারণ একদল এই সংস্কারের প্রস্তাব একেবারেই বর্জন করিতে ইচ্ছুক ছিলেন। অবশেষে টিলক, মালব্য প্রভৃতির চেষ্টায় একটি আপস-রফা হইল। প্রস্তাবে বলা হইল যে যদিও মণ্টেগু-চেমস্‌ফোর্ডের প্রস্তাবে কোনও কোনও বিষয়ে শাসনপদ্ধতির উন্নতি হইবে, কিন্তু কংগ্রেস ইহাতে সন্তুষ্ট হয় নাই, তাহার দাবি আরও অনেক বেশি। এই দাবি মিটাইবার জন্য সংস্কারের প্রস্তাব যেভাবে পরিবর্তিত হওয়া আবশ্যক তাহাও বিস্তারিতভাবে উল্লিখিত হইল। টিলক, মালব্য প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আশা করিয়াছিলেন যে প্রস্তাবিত শাসনসংস্কার পুরাপুরি বর্জন না করিলে হয়ত নরমপন্থীরা পুনরায় কংগ্রেসে যোগ দিবেন। চরমপন্থীদের মধ্যেও যে দল বর্জনের স্বপক্ষে ছিলেন তাহারাও এই আশাতেই এই আপস-প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছিলেন। কিন্তু অতঃপর দিল্লীতে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনেও (ডিসেম্বর ১৯১৮ খ্রী) যখন নরমপন্থীরা যোগ দিলেন না, তখন এই আশা দূর হইল। চরমপন্থীগণ বোম্বাইতে যে প্রস্তাব করিয়াছিলেন, তাহাতে বলা হইয়াছিল যে ১৫ বৎসরের মধ্যেই প্রতি প্রদেশে শাসনের দায়িত্বভার সম্পূর্ণরূপে দেশবাসীগণের হাতে ন্যস্ত করা হউক। এবারে কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হইল যে ১৫ বৎসর অপেক্ষা না করিয়া অবিলম্বে এই দায়িত্বভার দিতে হইবে।

 ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে নূতন শাসনসংস্কার সম্বন্ধে যে আইন পাশ হইল তাহাতে দেখা গেল ভারতবাসীর পক্ষে কোনও কোনও বিষয়ে নূতন আইন রিপোর্টের প্রস্তাব হইতেও বেশি ক্ষতিকর হইয়াছে। ওদিকে রাউল্যাট আইন পাশ হওয়ার ফলে দেশময় বিক্ষোভ উপস্থিত হইল। গান্ধীজীর নির্দেশমত সারা দেশে হরতাল হইল এবং ইহার ফলে পাঞ্জাবে ঘোরতর অত্যাচার ও জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হইল। ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে অমৃতসরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন হয়। সভাপতি হইলেন পণ্ডিত মোতীলাল নেহরু। এখানে চিত্তরঞ্জন দাশ প্রস্তাব করিলেন যে, নূতন শাসনপদ্ধতি সম্পূর্ণ বর্জন করা হউক। গান্ধীজী ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন যে, এই পদ্ধতি স্বীকার করিয়া যেটুকু উন্নতি করা যায় তাহার চেষ্টা করাই উচিত। গান্ধীজীরই জয় হইল। কংগ্রেস শাসনকার্যে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দাবি করিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলা হইল যে যতদিন এই দাবি পূরণ না হয় ততদিন নূতন শাসনসংস্কারই মানিয়া লওয়া হউক। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইহার অল্পদিন পরেই গান্ধীজী গভর্নমেণ্টের সহিত অসহযোগের প্রস্তাব করিলেন। এই বিষয় আলোচনা করিবার জন্য ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের ৪ সেপ্টেম্বর কলিকাতায় কংগ্রেসের এক বিশেষ অধিবেশন হইল। সভাপতি হইলেন লাজপৎ রায়। মহাত্মা গান্ধী গভর্নমেণ্টের সহিত সম্পূর্ণ অসহযোগের প্রস্তাব করিলেন। চিত্তরঞ্জন দাশ ইহার প্রতিবাদ করিলেন। কিন্তু এবারেও গান্ধীজীরই জয় হইল। কিন্তু পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে নাগপুরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে যখন গান্ধীজী এই অসহযোগের প্রস্তাব করিলেন, তখন চিত্তরঞ্জনের দলও তাহার সঙ্গে যোগ দিলেন এবং একপ্রকার বিনা প্রতিবাদেই এই গুরুতর প্রস্তাবটি গৃহীত হইল। কলিকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন হইবার অল্পকাল পূর্বেই ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট তারিখে বালগঙ্গাধর টিলকের মৃত্যু হয়। কলিকাতা ও নাগপুরের কংগ্রেসে প্রমাণিত হইল যে, অতঃপর গান্ধীজীকেই দেশ অবিসংবাদিত নেতারূপে গ্রহণ করিয়াছে। নাগপুর কংগ্রেসে অসহযোগিতার প্রস্তাব গ্রহণ করিবার পর কংগ্রেস গান্ধীজীর হাতেই সকল কর্তৃত্ব অর্পণ করিল।

 ১৯২০ হইতে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেস এত গভীরভাবে গান্ধীজীর ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত যে, ইহাকে কেহ কেহ গান্ধীযুগ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।

 দক্ষিণ আফ্রিকা হইতে ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে ফিরিবার পর গান্ধীজী ব্যাপকতর ক্ষেত্রে সত্যাগ্রহ প্রয়োগের পরিকল্পনা করেন। জনসাধারণকে রাজনীতিগত অধিকার আয়ত্ত করিতে হইলে অবশেষে যে সত্যাগ্রহের উপরেই নির্ভর করিতে হইবে, ইহা তাঁহার দৃঢ় ধারণা ছিল। তখন দেশের শিক্ষিত সমাজ একদিকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে, অন্যদিকে সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী ছিলেন। সেইজন্য রাউল্যাট অ্যাক্টের প্রতিবাদে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে যখন গান্ধীজী সত্যাগ্রহের প্রস্তাব করেন, তখন কংগ্রেসের মারফত করেন নাই, সত্যাগ্রহ সভা নামে এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় করেন।

 যাহাই হউক, ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ ঠিকভাবে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ ক্রমে তাঁহার সহিত আদর্শে না হইলেও কার্যতঃ সহমত হইলেন তাহা এই প্রবন্ধেই পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। অসহযোগ আন্দোলন (‘অসহযোগ আন্দোলন’ দ্র) স্তিমিত হইলে ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দ হইতেই সভ্যগণের চিন্তাক্রমে একটি বিভেদের উদয় হয়। কেহ কেহ বলেন, কাউন্সিল বর্জনের নীতি পরিহার করিয়া বরং এইবার কাউন্সিলের মধ্যেও স্বরাজের আন্দোলন পরিচালনা করা কর্তব্য। আশঙ্কা ছিল যে গান্ধীজী-পরিচালিত কংগ্রেসের বাহিরে ইহার ফলে নূতন একটি রাজনৈতিক দল গড়িয়া উঠিতে পারে। কিন্তু গান্ধীজী এরূপ ভাঙনের সম্পূর্ণ বিপক্ষে ছিলেন। তাঁহারই পরামর্শে ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয় যে স্বরাজ্য পার্টি কংগ্রেসের অঙ্গ হিসাবেই কাউন্সিলের অভ্যন্তরে স্বীয় কার্যক্রম অনুসরণ করিয়া চলিবে (‘স্বরাজ্য পার্টি’ দ্র)।

 দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বাংলা দেশে কাউন্সিলে ব্রিটিশ সরকারকে নানা ভাবে বিপর্যস্ত করিয়া তুলিলেন। উপরন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের জন্য তিনি ১৭ ডিসেম্বর ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে উভয়পক্ষের মধ্যে এক শর্তাবলী স্বীকার করাইয়া লন। ইতিমধ্যে গান্ধীজী গ্রামে উৎপাদন ব্যবস্থার সংস্কারকল্পে কংগ্রেসেরই প্রস্তাবানুযায়ী খাদি উৎপাদনের ব্যবস্থা করেন। উপরন্তু ১৯২৩ হইতে ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে মেদিনীপুরে ইউনিয়ন বোর্ড আন্দোলন, পাঞ্জাবে গুরুদ্বারা সত্যাগ্রহ, কেরলের ভাইকমে অস্পৃশ্যতা-বিরোধী আন্দোলন, নাগপুর, মাদ্রাজ এবং পটুয়াখালিতে নানাবিধ আন্দোলন কংগ্রেসের নীতি অনুসারে ও প্রতিষ্ঠানের নৈতিক সমর্থনে পরিচালিত হইতে থাকে।

 খিলাফৎকে উপলক্ষ করিয়া (‘খিলাফৎ’ দ্র) হিন্দু মুসলমানের যে ঐক্য আপাততঃ স্থাপিত হইয়াছিল, ঐ সময়ে ভারতের নানা স্থানে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে তাহা বিপর্যস্ত হইতে লাগিল। গান্ধীজী এবং কংগ্রেসের অপর নেতৃবৃন্দের চেষ্টা সত্ত্বেও ইহা স্পষ্টতর হইতে লাগিল যে ভারতের সর্বত্র বিক্ষিপ্ত, ভিন্নভাষা-ভাষী বিচ্ছিন্ন মুসলিম সমাজ ক্রমশঃ স্বীয় ধর্মানুগ সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বর্ধিত করিয়া এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠিত করিবার চেষ্টা করিতেছেন। কংগ্রেসের মধ্যে মধ্যবিত্ত এবং প্রগতিশীল লিবারেল অথবা বিপ্লবীদের যেমন শক্তি বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, মুসলমান সমাজে তৎপরিবর্তে অভিজাতগোষ্ঠীর এবং মধ্যযুগীয় মনোভাবের বৃদ্ধি পরি লক্ষিত হইতে লাগিল।

 অপর দিকে দেশে ট্রেড ইউনিয়নের প্রসারলাভ ঘটিতে লাগিল। বামপন্থী মতের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হইল। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মধ্যে লালা লাজপৎ রায় ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে জওহরলাল নেহরু মাদ্রাজে রিপাবলিকান কংগ্রেস নামক এক সম্মিলনে প্রস্তাব করেন যে, কংগ্রেসকে প্রগতিশীল মতবাদ স্বীকার করিয়া লইতে হইবে।

 ইতিমধ্যে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের চেষ্টায় ১৯ মে ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে এক সর্বদলীয় সভায় প্রস্তাব হয় যে ভবিষ্যৎ ভারতের গঠনতন্ত্র কেমন হইবে তাহা স্থিরীকৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐ খ্রীষ্টাব্দেই মোতীলাল নেহরুর সভাপতিত্বে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত হয় এবং তাহার আলোচনা প্রসঙ্গে দেশময় রাজনৈতিক আদর্শ সম্বন্ধে বহুবিধ মতামত প্রকাশিত হয় (‘নেহরু, মোতীলাল’ দ্র)।

 গান্ধীজীর সহিত কংগ্রেসের নেতৃবর্গের চিন্তায় ও কর্মে ব্যবধান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইলেও তিনি স্বীয় কর্মপন্থা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অনুসরণ করিয়া চলিলেন। ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে বেলগাঁও কংগ্রেসের সভাপতিরূপে তিনি প্রস্তাব করেন যে, কংগ্রেসকে দেয় চাঁদা পয়সার পরিবর্তে সুতা কাটিয়া দেওয়া হউক। তাঁহার ইচ্ছা ছিল, দরিদ্রতম, অশিক্ষিত ভারতবাসীকেও এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সদস্য করিয়া তুলিতে হইবে। কিন্তু উক্ত প্রস্তাব কার্যতঃ গৃহীত হয় নাই।

 দেশে বিপ্লবী শক্তির অভ্যুত্থানেরও উত্তরোত্তর প্রমাণ পাওয়া যাইতে লাগিল। এরূপ অবস্থায় ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে নির্ধারিত হইল যে, অতঃপর পূর্ণ স্বাধীনতাই কংগ্রেসের রাজনৈতিক লক্ষ্য হইবে। সংকল্পকে কার্যে পরিণত করার জন্য গান্ধীজী ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে লবণ-সত্যাগ্রহের প্রবর্তন করেন। সমগ্র দেশ গভীরভাবে এই ডাকে সাড়া দিল। এক বৎসরের মত সত্যাগ্রহ চলিবার পর ব্রিটিশ গভর্নমেণ্টের আমন্ত্রণে আলোচনার নিমিত্ত গান্ধীজী কংগ্রেসের একক প্রতিনিধি হিসাবে বিলাতে যাত্রা করেন (‘গোল টেবিল বৈঠক’ দ্র)। তিনি ফিরিয়া আসিবার পর ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভ হইতেই আইন অমান্য আন্দোলন তীব্র আকারে দেশময় ছড়াইয়া পড়িল (‘আইন অমান্য আন্দোলন’ দ্র)। ইতিমধ্যে ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে ভারতের রাজনৈতিক এবং সামাজিক আদর্শ সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক নীতি স্বীকৃত হয়। ইহাই পরবর্তী কালে ভারতের সংবিধান রচনার ভিত্তিস্বরূপ ব্যবহৃত হইয়াছিল।

 ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দের আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ে কারারুদ্ধ হইবার পর ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৮ মে গান্ধীজী মুক্তিলাভ করিয়া পুনরায় গঠনকর্মে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করিলেন। কার্যতঃ ৭ এপ্রিল ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে আইন অমান্য প্রত্যাহৃত হইল এবং সেই বৎসরই কংগ্রেসের অধিবেশনে গান্ধীজী কংগ্রেসের সভ্যপদ পরিহার করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সহিত কার্যতঃ তাঁহার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হইল না। তিনি নেতৃবৃন্দের পরামর্শদাতা রহিয়া গেলেন এবং শহরের পরিবর্তে গ্রামাঞ্চলে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশন করিবার ব্যবস্থা করিলেন।

 ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে যে শাসনসংস্কার প্রবর্তিত করেন কংগ্রেস তাহা মানিয়া লইয়া অপরাপর রাজনৈতিক দলের সহিত নির্বাচনী দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়। আইন অমান্য আন্দোলনের অবসানে যে অবসাদ দেখা গিয়াছিল, তাহা কাটিয়া গেল। ভারতের ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৬টিতে এবং পরে আরও একটিতে কংগ্রেস প্রাদেশিক শাসনভার স্বীকার করিয়া লইল।

 শাসনভার গ্রহণ করার পর ভূমিসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, মাদকতাবর্জন প্রভৃতি বিষয়ে কার্যক্রম আরম্ভ হয়। দেশে যখন অর্থের অনটন রহিয়াছে, অথচ শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজন, তখন ইহা সম্ভব করিয়া তুলিবার জন্য গান্ধীজী বুনিয়াদি শিক্ষার প্রবর্তন করেন (‘বুনিয়াদি শিক্ষা’ দ্র)। প্রদেশে প্রদেশে কংগ্রেস সরকার ইহা যথাসাধ্য কার্যে পরিণত করার চেষ্টা করিতে লাগিল।

 ইতিমধ্যে দেশে কৃষক আন্দোলন এবং সামস্ত রাজগণের অধীন ওড়িশা, হায়দরাবাদ, কাঠিয়াওয়াড় প্রভৃতি বহু অঞ্চলে প্রজা-আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িল। কংগ্রেসের সভ্যগণই ইহার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী হইলেও প্রতিষ্ঠান হিসাবে কংগ্রেস ইহার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে নাই।

 এই সময়ের অপর একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য: সুভাষচন্দ্র বসু যখন ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি তখন তাঁহার নির্দেশে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে সমগ্র ভারতের জন্য একটি আর্থিক উন্নতিবিধানের পরিকল্পনা রচিত হয় (১৯৩৯ খ্রী)। উক্ত ন্যাশন্যাল প্ল্যানিং কমিশনের দ্বারা কয়েকটি মূল্যবান রিপোর্টও ক্রমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাহা কার্যে পরিণত হইবার পূর্বেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাধিয়া যায়। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে উৎপাদন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের যে নীতি গান্ধীজী প্রবর্তন করিয়াছিলেন, কংগ্রেস প্রবর্তিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তাহা প্রায় আমূল পরিত্যক্ত হয়। অর্থাৎ ইহাকে গান্ধীজীর সহিত কংগ্রেস নেতৃবর্গের আদর্শগত ক্রমবর্ধমান প্রভেদের একটি প্রমাণ বলিয়া বিবেচনা করা যাইতে পারে।

 ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দের শেষে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইল। কংগ্রেস দ্বিধাগ্রস্ত হইলেন। নেহরু, আজাদ প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেহ কেহ বিনা শর্তে ফ্যাসিস্ট শক্তিবৃন্দের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির সহায়তার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু গান্ধীজীর মত ছিল, বর্তমান যুদ্ধ সত্যসত্যই গণতন্ত্রের রক্ষার্থে পরিচালিত হইতেছে কিনা তাহা প্রথমে স্থিরীকৃত হওয়া প্রয়োজন। কতকটা গান্ধীজীর পরামর্শ উপেক্ষা করিয়া রাজাগোপালাচারীর পরামর্শে কংগ্রেস যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার প্রস্তাব করে (জুলাই ১৯৪০ খ্রী)। ব্রিটিশ সরকার কিন্তু তাহাতে সাড়া দিলেন না।

 ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করিল। সুদূর প্রাচ্যে জাপানের আঘাতে ইংরেজ নৌশক্তি এবং প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকান নৌশক্তি বিপর্যস্ত হইল। ফলে ভারতের মধ্যে অসহায়তার বশে কোথাও কোথাও সন্তোষের ভাব দেখা গেল। গান্ধীজী ইহাতে প্রমাদগনিলেন; এবং ভাবিলেন, যদি ভারতবাসী কংগ্রেসের নেতৃত্বে আজ স্বীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার শেষ চেষ্টা না করে, এবং জাপানের জয়ে নিজে উৎফুল্ল হইয়া ওঠে, তবে এই আত্মাবমাননা এবং মানসিক অপঘাত হইতে ভারতবর্ষকে রক্ষা করা দুঃসাধ্য হইবে।

 জওহরলাল নেহরু, মওলানা আজাদ প্রমুখ যুদ্ধকালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের স্বপক্ষে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ক্রমবর্ধমান তামসিকতার প্রসারের যুক্তি দেখাইয়া গান্ধীজী অবশেষে ইহাদিগকেও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের স্বপক্ষে রাজি করাইলেন। কংগ্রেস ইংরেজকে বলিল, ‘ভারত ছাড়’, এবং সমগ্র দেশবাসী আত্মবলে বলীয়ান হইয়া বলিল, ‘করিব না হয় মরিব’।

 ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সূচনাতেই (আগস্ট ১৯৪২ খ্রী) কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হইলেন। তৎসত্ত্বেও আন্দোলন বিপুল আকার ধারণ করিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে আন্দোলন সফল না হইলেও দেশে যে কাপুরুষজনোচিত মনোভাব ব্রিটেনের বিপর্যয়ে উল্লাসের আকারে আত্মপ্রকাশ করিতেছিল, তাহা মুছিয়া গেল।

 কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের তিন বৎসর কারাবাসের পর ১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হইলে ব্রিটিশ সরকার প্রস্তাব করিলেন, কংগ্রেস এবং দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল মিলিয়া নিজেরাই দেশের সংবিধান রচনা করুক। তদনুসারে নানা কুটিল পরিবর্তনের পর দেশকে দুই খণ্ডে ভাগ করিয়া অবশেষে ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসকবৃন্দ ভারতের প্রতিভূস্বরূপ কংগ্রেসের হাতে শাসনভার অর্পণ করিলেন।

 ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের আগস্টের পর হইতে কংগ্রেস গভর্নমেণ্ট নানা সমস্যায় জর্জরিত হইতে লাগিল। রাজনৈতিক সংস্থা হিসাবে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান তখন হইতে স্বীয় গভর্নমেণ্টকে সমর্থন করার দায়িত্বই বেশি করিয়া গ্রহণ করিল। অর্থাৎ জনগণের মধ্যে গঠনকর্মের যে দায়িত্ব পূর্বে কংগ্রেস স্বকীয় বলিয়া স্বীকার করিয়াছিল, তাহা শাসনবিভাগের দায়িত্বে পরিণত হইল।

 এরূপ অবস্থায় গান্ধীজী ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে প্রস্তাব করেন যে, কংগ্রেসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যখন সিদ্ধ হইয়াছে তখন প্রতিষ্ঠান হিসাবে তাহার আর অস্তিত্বের প্রয়োজন নাই। দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আনয়নের উদ্দেশ্যে কংগ্রেসের প্রাক্তন কর্মীগণকে গ্রামে গ্রামে সংগঠনকর্মে আত্মনিয়োগ করিতে হইবে।

 কংগ্রেস গান্ধীজীর প্রদত্ত এই রাজনৈতিক আত্মবিলোপের পরামর্শ গ্রহণ করিতে পারে নাই। ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে আবাদি নামক স্থানে কংগ্রেস সংকল্প গ্রহণ করে যে, ভারতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রচনা করাই তাহাদের লক্ষ্য। ভুবনেশ্বরে ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ঐ সংকল্পের পুনরাবৃত্তি হয়। তদনুসারে, অর্থাৎ কংগ্রেসের পরামর্শ অনুযায়ী, ভারত গভর্নমেণ্ট যেমন একদিকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দ্বারা উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতিবিধানের চেষ্টা করিতেছেন, তেমনই পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠার দ্বারা রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টাও করিয়া চলিয়াছেন।

দ্র হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, কংগ্রেস, কলিকাতা, ১৩২৭ বঙ্গাব্দ; হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, কলিকাতা, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ; B. Pattabhi Sitaramayya, The History of the Indian National Congress, Allahabad, 1935; Nirmal Kumar Bose, Studies in Gandhism, Calcutta, 1962.

রমেশচন্দ্র মজুমদার
নির্মলকুমার বসু