বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কড়ি

উইকিসংকলন থেকে

কড়ি শম্বুক গোষ্ঠীর (ফাইলাম-মোলাস্কা, Phylum-Mollusca) সামুদ্রিক প্রাণী। পৃথিবীর সব সমুদ্রেই কড়ি পাওয়া যায়। কড়ির খোলকটি এক বর্ণ হইতে শুরু করিয়া বহু বর্ণের হইতে পারে। ‘শম্বুক’ দ্র।

সীমানন্দ অধিকারী

 হিন্দুর বিভিন্ন ধর্মকার্য ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে কড়ি ব্যবহৃত হইত এবং এখনও কিছু কিছু হয়। ধনের প্রতীক হিসাবে লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীর আসনে কড়ির ব্যবহার প্রচলিত আছে। মুদ্রারূপে কড়ির ব্যবহার এখন আর নাই। তবে দুগ্ধবতী ধেনু বা তাহার মূল্য হিসাবে ব্রাহ্মণকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কড়ি বা কড়ির অভাবে অর্থ দান করিয়া পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার বিধান আছে। কড়ির পরিবর্তে এখন উহার মূল্যস্বরূপ অর্থদানের রীতি দাঁড়াইয়াছে। মৃতবৎসা জননী অনেক ক্ষেত্রে নবজাত পুত্রকে আঁতুড়ঘরে ধাত্রী বা অপর কাহারও নিকট বিজোড় সংখ্যক কড়ির বিনিময়ে বিক্রয় করিয়া ক্রেত্রীর প্রতিনিধিরূপে পুত্রের লালন পালন করেন। প্রাপ্ত কড়ির পরিমাণমত পুত্রের নাম এককড়ি, তিনকড়ি, পাঁচকড়ি বা সাতকড়ি রাখা হয়। উপনয়ন বা বিবাহের সময় উক্ত কড়ি ফেরত দিয়া পুত্রকে পুরাপুরি নিজের করিয়া লওয়া হয়। বিবাহাদি শুভকর্মে অনেক স্থানে আনুষ্ঠানিক স্নানের পর কড়ির উপর উপুড় করিয়া রাখা মাটির পাত্র পা দিয়া ভাঙিবার নিয়ম আছে। বধুবরণের সময় শ্বশুরবাড়িতে ঘরের মধ্যে কৃত্রিম ধনাগারে লুকানো কড়ি বা ধনরত্ন বধুকে উদ্ধার করিতে হয়। শবদাহের পরে শ্মশান ত্যাগ করিবার পূর্বে একটি জলপূর্ণ মাটির কলসের উপর একটি মাটির সরায় আটটি কড়ি রাখিয়া আসিবার রীতি আছে। ‘সঙ্গে দিবে মেটে কলসি কড়ি দিবে অষ্ট কড়া’—দেহতত্ত্ববিষয়ক গানের এই পদের মধ্যে উক্ত প্রথার ইঙ্গিত আছে।

চিন্তাহরণ চক্রবর্তী

সুদূর প্রাচীন কাল হইতে খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা দেশে ও ভারতের নানা স্থানে কড়ি সাধারণ লোকের ব্যবহৃত মুদ্রা ছিল। সোনা, রুপা ও তামার মুদ্রার প্রচলনের পূর্বে এবং পরেও ইহার বহুলপ্রচলন দেখা যায়। খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে ফা-হিয়েন লিখিয়াছেন যে, ভারতবর্ষে জনসাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য কড়ি ব্যবহার করিত। গুপ্ত যুগের পর পালরাজ বিগ্রহপালের পূর্বে কড়িই সাধারণ মুদ্রার কাজ করিত। বাংলা দেশে সেনরাজগণের তাম্রশাসনে কপর্দক-পুরাণের উল্লেখ আছে। কপর্দক কড়িরই সংস্কৃত নাম। কেহ কেহ মনে করেন যে কপর্দক-পুরাণ নামে কোনও মুদ্রা ছিল না—কিন্তু যে সংখ্যক কড়ি একটি পুরাণ-মুদ্রার সমতুল্য— তাহাই বুঝাইত। সেন রাজগণের সময়ে যে বাংলা দেশে কড়িই ‘প্রধান’ মুদ্রারূপে সচরাচর ব্যবহৃত হইত তাহার প্রমাণ আছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে ‘কবডি’ অর্থাৎ কড়ির ব্যবহারের উল্লেখ আছে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে চীনা পর্যটকগণ বাংলায় কড়ির ব্যবহার দেখিয়াছিলেন। কড়ি ওজন করিয়া মূল্য নির্ধারণ করা হইত। কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে দেখিতে পাই দরিদ্র ফুল্লরা খুদের জাউ ও নালিতা শাক দিয়া কোনও মতে ক্ষুন্নিবৃত্তি করিলেও চারিটি কড়ি কর্জ করিয়া লবণ কিনিয়াছিলেন। ১৭৫০ খ্রীষ্টাব্দেও কড়ি দিয়া বাজার করা হইত এবং শুল্ক আদায়ের জন্যও কড়ি গ্রহণ করা হইত।

রমেশচন্দ্র মজুমদার