বিষয়বস্তুতে চলুন

ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কণাসন্ধানী যন্ত্র

উইকিসংকলন থেকে
একাধিক লেখক সম্পাদিত
(পৃ. ১৪৫-১৪৭)

কণাসন্ধানী যন্ত্র পরমাণু বিজ্ঞানের গবেষণার ও শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই যন্ত্রে দ্রুতগতিসম্পন্ন পরমাণুর কেন্দ্রক, তেজস্ক্রিয় কণিকা ও রশ্মি ধরা পড়ে। কণার অস্তিত্ব নির্ণয় ভিন্ন এইসব যন্ত্রের সাহায্যে প্রতি সেকেণ্ডে গণনার হার, তেজস্ক্রিয় কণিকার অর্ধায়ু, কণার ভর, বেগ, শক্তি, আধান (চার্জ) প্রভৃতি বিষয়ে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ ও তেজস্ক্রিয় কেন্দ্রকগুলির ক্ষয়চিত্র (ডিকে স্কিম) নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

 আহিত (চার্জড) কণা কোনও বস্তুর মধ্য দিয়া যাইবার সময় আয়ন সৃষ্টি করে (‘আয়ন’ দ্র)। অর্থাৎ একটি ছুটন্ত আহিত কণা আশেপাশের পরমাণুর কক্ষস্থিত ইলেকট্রনগুলির দুই-একটিকে পরমাণু হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। আহিত কণার এই ধর্ম কণাসন্ধানী যন্ত্র নির্মাণে কাজে লাগানো হইয়াছে। গামারশ্মি বা রঞ্জনরশ্মির ফোটোনগুলি বস্তুর মধ্যে সোজাসুজি আয়ন সৃষ্টি করিতে পারে না, কিন্তু পরোক্ষভাবে আলোক-তড়িৎ প্রভাব (ফোটো-ইলেকট্রিক এফেক্ট) ও কম্পটন বিক্ষেপণ প্রভাবের (কম্পটন স্ক্যাটারিং এফেক্ট) সাহায্যে পরমাণু হইতে ইলেকট্রন বিচ্যুত করে এবং ইলেকট্রন-পজিট্রন যুগল তৈয়ারি (পেয়ার প্রোডাকশন) করে। এইভাবে বিচ্যুত ইলেকট্রনগুলিকে সন্ধানী যন্ত্রে ধরিয়া গামারশ্মি বা রঞ্জনরশ্মির অস্তিত্ব ও ধর্ম নির্ণয় করা যায়।

 প্রথম আবিষ্কৃত কণাসন্ধানী যন্ত্র আয়নন প্রকোষ্ঠ (আয়োনাইজেশন চেম্বার)। ইহার পর বহুপ্রকার
চিত্র ১: আয়নন প্রকোষ্ঠ
কণাসন্ধানী যন্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে। বিশেষ বিশেষ কণা বা রশ্মির ধর্ম অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ ধরনের যন্ত্র ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ইহাদের মধ্যে ব্যবহারের ব্যাপকতা ও গবেষণাকার্যে গুরুত্বের দিক হইতে গাইগার-ম্যূলর গণক (গাইগার ম্যূলর কাউণ্টার) এবং উইলসন মেঘ-প্রকোষ্ঠের (উইলসন ক্লাউড চেম্বার) কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 গাইগার মূলের গণক: এই গণকটি ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে গাইগার আবিষ্কার করেন এবং পরে তিনি ও ম্যূলর সংশোধন করেন। সাধারণতঃ একটি ধাতব পাতের নল এবং তাহার অক্ষ বরাবর স্থাপিত একটি সরু তার দিয়া এই যন্ত্র তৈয়ারি। নলের ভিতরটি বায়ুশূন্য করিয়া নিম্নচাপে আরগন ও অ্যাকোহলের মিশ্র গ্যাস ভর্তি করা হয়। নলটি উচ্চ ঋণাত্মক (নেগেটিভ) বিভবের সহিত যুক্ত এবং মধ্যবর্তী তারটি একটি উচ্চ মানের রোধের সহিত সংলগ্ন করিয়া রোধটির অপর প্রান্ত ভূমিতে প্রোথিত থাকে। কোনও একটি কণা নলের মধ্যে প্রবেশ করিলে, প্রথমে উহা স্বল্পসংখ্যক আয়ন ও ইলেকট্রন সৃষ্টি করে। ইলেকট্রনগুলি কেন্দ্রস্থিত ধনাত্মক (পজিটিভ) তারের দিকে যাইবার সময় পথে গ্যাস অণুগুলিকে ধাক্কা দিয়া ক্রমাগত বেশি সংখ্যক ইলেকট্রন সৃষ্টি করিতে থাকে। এইভাবে অল্পসময়ের মধ্যে মোট ইলেকট্রন সংখ্যা হিমানী সম্প্রপাতের (অ্যাভালান্‌শ) মত বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য একটি উচ্চমানের তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করে। ফলে রোধের দুই প্রান্তের মধ্যে তড়িৎসংকেত সৃষ্টি হয়। এইরূপে নলে প্রবেশকারী কণাটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। তেজস্ক্রিয়তা গণনায় গাইগার গণকই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। আলফা বা বিটা কণা ধরিতে হইলে কণাগুলি যাহাতে
চিত্র ৩: মেঘ প্রকোষ্ঠ
শোষিত না হইয়া ভিতরে যাইতে পারে সেইজন্য নলটির দ্বার অতি পাতলা অভ্র বা মাইলার (mylar) ঝিল্লিদ্বারা আবৃত থাকে। গাইগার গণকের সন্ধানদক্ষতা আলফা ও বিটা কণার বেলায় ১০০%। গামারশ্মির ক্ষেত্রে প্রায়
চিত্র২: গাইগার-ম্যুলার গণক
হাজারে এক (০·১%)। বিশেষ বিশেষ ধাতু দ্বারা নির্মিত নল ব্যবহার করিলে গামারশ্মির ক্ষেত্রে ইহার সন্ধানদক্ষতা কিছুটা বাড়ানো যায়।

 উইলসন মেঘ-প্রকোষ্ঠ বা উইলসন ক্লাউড চেম্বার: এই যন্ত্রটি ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে সি. টি. আর. উইলসন (১৮৬৯-১৯৫৯ খ্রী) আবিষ্কার করেন। মেঘ-প্রকোষ্ঠটির আয়তন একটি পিস্টনের সাহায্যে প্রয়োজনমত ছোট-বড় করা যায়। প্রকোষ্ঠটি অ্যালকোহলের বাষ্পে সংপৃক্ত রাখা হয়। প্রকোষ্ঠের বায়ু ও বাষ্প দ্রুত সম্প্রসারণ করিলে ঐ বাষ্প অতিসংপৃক্ত (সুপারস্যাচুরেটেড) হইয়া পড়ে। তখন ঐ বাষ্প তরলে পরিণত হইতে চায়। কিন্তু সাধারণতঃ কোনও কণাকে আশ্রয় করিতে না পারিলে শূন্যে তরলীভবন ঘটে না। তাই অতিসংপৃক্ত অবস্থায় যদি প্রকোষ্ঠ দিয়া কোনও কণা যাইতে থাকে ও আয়ন সৃষ্টি করে তবে মূল কণাটির চলার পথে সৃষ্ট আয়নগুলির উপর বাষ্প জমিবে ও কণার সঞ্চরণ-পথটি একটি রেখার আকারে দেখা যাইবে। আকাশে মেঘ সৃষ্টিও অনুরূপ পদ্ধতিতে ঘটে বলিয়া ইহাকে মেঘ-প্রকোষ্ঠ বলে। উপযুক্ত আলোর ব্যবস্থা করিয়া ক্যামেরার সাহায্যে ঐ রেখার আলোকচিত্র গ্রহণ সম্ভব। আলোকচিত্র হইতে আহিত কণার আপেক্ষিক আয়নন (স্পেসিফিক আয়োনাইজেশন), কণিকাটির আধান প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য জানা সম্ভব। প্রকোষ্ঠের মধ্যে আহিত কণার প্রসর (রেঞ্জ) মাপিয়া তাহার শক্তি নির্ণয় করিতে পারা যায়। চৌম্বক ক্ষেত্রে মেঘ-প্রকোষ্ঠটি বসাইলে কণিকাটির ভর, বেগ, আধানচিহ্ন প্রভৃতি বহু ধর্ম জানা যাইবে। মেঘ-প্রকোষ্ঠ মহাজাগতিক রশ্মির গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হইতেছে।

 অন্যান্য যন্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্ফুলিঙ্গায়ন গণক (সিণ্টিলেশন কাউণ্টার), চেরেনকভ গণক (চেরেনকভ কাউণ্টার), স্বল্পপরিবাহী গণক (সেমিকণ্ডাক্‌টর ডিটেক্টর), বুদবুদ-প্রকোষ্ঠ (বাব্‌ল চেম্বার), স্ফুলিঙ্গ-প্রকোষ্ঠ (স্পার্ক চেম্বার) এবং ফোটোগ্রাফিক অবদ্রব (ফোটোগ্রাফিক ইমালশান)। গামারশ্মির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রস্তুত স্ফুলিঙ্গায়ন গণকের সন্ধানদক্ষতা প্রায় ৯০% পর্যন্ত বাড়ানো যায়। রাশিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী পি. এ. চেরেনকভ (১৯০৪ খ্রী-)-এর নামে পরিচিত ‘চেরেনকভ গণকে’র সাহায্যে আহিত কণা কোন্ দিক হইতে আসিতেছে তাহাও নির্ণয় করা সম্ভব। মহাজাগতিক রশ্মির বিশ্লেষণে এই যন্ত্র অতি গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পপরিবাহী বস্তুর দ্বারা আহিত কণার গণনা অল্প দিন হয় সম্ভব হইয়াছে। এই যন্ত্রের সাহায্যে আহিত কণার শক্তি নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা যায়। বুদবুদ-প্রকোষ্ঠে উচ্চশক্তিসম্পন্ন মেসন, হাইপেরন প্রভৃতি অনুসন্ধান করা চলে। উচ্চশক্তিসম্পন্ন কণিকা-সম্পর্কিত গবেষণায় স্ফুলিঙ্গ-প্রকোষ্ঠ ব্যবহৃত হয়। আধুনিক কালে মহাজাগতিক রশ্মির গবেষণায় অনেকগুলি যুগান্ত কারী পরীক্ষা সম্ভবপর হইয়াছে ফোটোগ্রাফিক অবদ্রবের সাহায্যে।

দ্র J. Sharfe, Nuclear Radiation Detector, London, 1955; W. J. Price, Nuclear Radiation Detection, New York, 1958; D. H. Frish & A. M. Thorndike, Elementary Particles, Princeton, 1962

শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়