ভারতকোষ (দ্বিতীয় খণ্ড)/কণ্টকত্বক প্রাণী
(পৃ. ১৪৭-১৪৮)
কণ্টকত্বক প্রাণী যে সকল অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহের বহির্ভাগ সুচের মত কাঁটার দ্বারা আবৃত, তাহাদের কণ্টকত্বক গোষ্ঠীর (ফাইলাম-একিনোদের্মাতা, Phylum Echinodermata) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই গোষ্ঠীর সকল প্রাণীই সামুদ্রিক। অমেরুদণ্ডী হইলেও অন্যান্য অমেরুদণ্ডীদের কাহারও সহিত ইহাদের বিশেষ মিল নাই। প্রায় চারি হাজারেরও অধিক প্রজাতি এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ইহাদের আকৃতি বিভিন্ন প্রকারের—কাহারও দেহ তারার
মত, কোনওটি শসার মত, কোনওটি আবার লিলিফুলের মত। এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও ইহাদের সকলের আকৃতির মধ্যে কতকগুলি মিল আছে। যেমন, সকলের দেহই শক্ত খোলা ও কণ্টক দ্বারা আবৃত; দেহের মধ্যস্থলকে কেন্দ্র ধরিলে ইহাদের সকলের দেহই পাঁচটি ব্যাসার্ধে প্রসারিত; ঐ কেন্দ্রের মধ্য দিয়া ইহাদের দেহকে যে কোনও ব্যাস বরাবর দুইভাগে বিভক্ত করিলে প্রতিবারই একই রকম আকৃতির দুইটি খণ্ড পাওয়া যাইবে। ইহাদের সকলের
সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হইল অসংখ্য জল-নালী লইয়া গঠিত জল-সংবহনতন্ত্র (ওয়াটার ভ্যাস্কিউলার সিস্টেম)। দেহের উপরিভাগে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র
ছিদ্র হইতে শুরু হইয়া এই নালীগুলি মুখের চারিদিকে বৃত্তাকারে ও প্রতিটি ব্যাসার্ধে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত। প্রতিটি লম্বা নালীর সহিত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নলের যোগ আছে; এই নলগুলির নাম নলপদ এবং এগুলি দেহের নিম্নভাগে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত থাকে। জল-সংবহনতন্ত্রের মধ্যে জলপ্রবাহের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের দ্বারা নলপদগুলি সংকুচিত ও প্রসারিত হয়; এই নলপদ ও তৎসংলগ্ন পেশীর সাহায্যে কণ্টকত্বক প্রাণীরা চলাফেরা ও খাদ্য সংগ্রহ করিয়া থাকে।
এই গোষ্ঠীর প্রাণীদের আভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ উন্নত ধরনের, কেবল নার্ভতন্ত্র কিছুটা অনুন্নত। ইহাদের অনেকের
খাদ্যসংগ্রহের পদ্ধতি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যেমন—তারামাছ সাধারণতঃ ঝিনুক শিকার করে; ইহারা নলপদের সাহায্যে চাপ দিয়া ঝিনুকের শক্ত খোলা খুলিয়া নিজের পাকস্থলীটি বাহির করিয়া ঝিনুকের মাংসল দেহের উপর ছড়াইয়া দেয় ও কিছুক্ষণ পরে নিষ্পেষিত ঝিনুকের মাংসসহ পাকস্থলীটি নিজের শরীরের মধ্যে ঢুকাইয়া লয়।
ইহাদের আত্মরক্ষার পদ্ধতিও বিচিত্র। ব্রিট্ল স্টার নামক কণ্টকত্বক প্রাণী শত্রুর নিকট আক্রান্ত বাহু পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করে। সমুদ্র-শসা (সী-কিউকাম্বার) নামক প্রাণীর আত্মরক্ষার পদ্ধতি আরও চমৎকার। আক্রান্ত হইলেই ইহারা দেহের সমস্ত আভ্যন্তরীণ অঙ্গ মুখ দিয়া বাহির করিয়া দেয়; শত্রু যখন সেই পরিত্যক্ত অঙ্গগুলি ভোজনে রত থাকে, সেই অবসরে ইহারা নিরাপদ স্থানে সরিয়া যায়। উভয় কণ্টকত্বক প্রাণীর ক্ষেত্রেই কিছুকাল পরে ঐ বিনষ্ট অঙ্গগুলির পুনর্জন্ম ঘটে।
পুরুষ-প্রাণীর শুক্রাণু ও স্ত্রী-প্রাণীর ডিম্বাণুর মিলনে ইহাদের বংশবৃদ্ধি হয়। পূর্ণতাপ্রাপ্ত স্ত্রী-প্রাণীর দেহের
অধিকাংশ স্থানই প্রজনন-ঋতুতে ডিম্বে পূর্ণ থাকে। সী-আর্চিন নামক প্রাণীর প্রজননকালে একটি দেহেই প্রায় কুড়ি লক্ষ ডিম থাকে। খাদ্য হিসাবে ফ্রান্স ও ইতালিতে এই ডিমের চাহিদা আছে। ডিম্বজাত শূককীটের দেহ কেবল একটি ব্যাস দিয়াই দুইটি সমান খণ্ডে ভাগ করা যায়। কিছুকাল সাঁতার কাটিবার পর এই শূককীট ক্রমে পূর্ণাবয়ব প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়। শূককীটের গঠনবৈচিত্র্য লক্ষ্য করিয়া অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে এই গোষ্ঠীর প্রাণী ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর উৎস একই।
দ্র R. Buchsbaum, Animals Without Backbones, Chicago, 1948; E. Hanson, Animal Diversity, New Jersey, 1961.
বঙ্কুবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়